জুলহাজ-তনয় হত্যা, আর নিউজ ফ্যাক্টরির ক্যামেরা (যেভাবে একটা অপ্রাসঙ্গিক ছবি জঙ্গিদের চিনিয়ে দিয়েছিলো তাদের টার্গেট)

এপ্রিলের পঁচিশ তারিখ, বৈশাখের কত?
পঞ্জিকায় কত তারিখ পড়েছিলো সেদিন? যেদিন জুলহাজ মান্নান খুন হলো?
জানিনা কতক্ষণ ভনিতা করা যায়। সোজাসুজি যা বলতে চাই, সেটা বলে ফেললেই তো চলে! তারপরও নানা বাতাবরণ দিয়ে কথাকে সাজাতে হয়।
বহুদিন আগে টিভিতে একটা নাটক দেখেছিলাম। এতোদিন পর সেটার নাম আর মনে নেই। নায়িকা চিৎকার করছিলো সমানে, এই মেক আপ!
কাহিনী হলো, নাটকটাই নাটক বানানো নিয়ে। নাটকের শ্যুটিং চলছে, নায়িকার মেক আপ একটু পর পর জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে, নায়িকা চিৎকার করছে, এই মেক আপ!
পঁচিশ তারিখে, জুলহাজ মান্নানের বাসায়, কতগুলো ছেলে, গিফট দেয়ার নাম করে চাপাতি নিয়ে ঢুকে পড়ে। ঠিক সেই সময়ে জুলহাজ মান্নানের সঙ্গে আর কেউ ছিলো না, কেবল মাহবুব রাব্বি তনয় ছাড়া। তনয় ভাইয়ের নামটা কত জায়গায় কতভাবে ল্যাখা হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। অনেকেই লিখেছে, তনয় মজুমদার। রূপবানের কাগজপত্রে ওনার নাম মাহবুব তনয়।
বৈশাখের তারিখ আমরা গুণি না। বাংলা তারিখের খবর কেউ রাখে না, আমিও না।
আমি খ্রিস্টীয় তারিখের হিসেবেই চলি। এমনকি জিলকদ শাবান রমজানেরও পরোয়া করি না।
সেই হিসেবে, খুনগুলো শুরু হয়েছে গত বছর। ২০১৫য়। প্রথম খুনটা হয়েছিলো ২০১৩ সালে। জবাই কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছিলো রাজীব হায়দারকে দিয়ে।
এতোদিন জবাই কর্মসূচির হট্টগোলে আস্তে আস্তে সয়েই এসেছিলো শরীরে। এত ব্লগার খুন হচ্ছে, প্রতিবাদ করতে করতে একটা সময় মনে হতে শুরু করেছিলো, আর কি লাভ? যা হবার, সেটা তো হবেই!
এভাবেই দিনানিপাত করছিলাম। হঠাৎ এপ্রিলের তিন তারিখে, বিডিনিউজে একটা খবর পড়ে চমকে উঠলাম। মুখোশ আর ভুভুজেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
খবরটা চমকে ওঠার মতো কিছু নয়। নিষিদ্ধ হতেই পারে মুখোশ। এটা কি এমন ব্যাপার?
কিন্তু ব্যাপারটা ছিলো অন্যখানে। ওই নিউজে যে ছবিটা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা গত বছরের রূপবানের রংধনু যাত্রার। ইংরেজিতে যাকে বলে গ্যে প্রাইড।
এখান থেকেই শুরু হয়েছিলো নাটকের শ্যুটিং।
জানিনা বিডিনিউজের ফটোগ্রাফার কে। কে ওই ছবিটা তুলেছিলো। কি করে ওই ছবিটা পৌঁছে গ্যালো নিউজে।
এরপর সারা পৃথিবীতে এই ছবিটাই ছড়িয়ে পড়লো, এপ্রিলের পঁচিশে। খুন হওয়ার পর পর।
মাঝখানে বাইশটা দিন চলে গ্যাছে।
কতগুলো জঙ্গি – এই বাইশ দিন যাবত, হয়তো ওই ছবিটা হাতে নিয়েই ঘুরে বেরিয়েছে ঢাকা শহরে ছবির পাত্র পাত্রীদের সন্ধানে।
আর ওই ছবির মাঝখানের যে মধ্যমণি মধ্যজন, হলদে শাড়ি পরে আছেন পুরুষ হয়ে, সেই মাহবুব তনয়, নিউজটা প্রকাশ হওয়ার বাইশ দিন পর খুন হয়ে গ্যাছেন।
আমি জানি না একে কি বলে। এটাই কি হলুদ সাংবাদিকতা? ইয়েলো জার্নালিজম? হলুদ শাড়িতে হলুদ রঙের সংবাদ?
নাকি এটা মগের মুল্লুক?
গত বছরের পয়লা বৈশাখে, ঢাকা শহরে কি আর কেউ মুখোশ পরেনি, সমকামীদের মিছিলের মানুষগুলো ছাড়া?
এরকম একটা স্পর্শকাতর ম্যাটেরিয়াল, জনসম্মুখে প্রচার করবার কি দরকারটা ছিলো?
কিন্তু, যা হওয়ার তো হয়েই গ্যাছে।
এখন আর এপ্রিলের তিন তারিখ আর এপ্রিলের পঁচিশ, এসব ঘেঁটে কি লাভ?
আমার দেশ বলে একটা পত্রিকা ঠিক এই একই কাজ করছিলো। ব্লগারদের ছবি হাইলাইট করছিলো পাতায় পাতায়। দেখামাত্র লোকে যেন তাদের খুন করে ফ্যালে।
একবারও কি বিবেচনা করা উচিত ছিলো না বিডিনিউজের, ওই ছবিটা ছাপানোর আগে, ছবিটার চরিত্রগুলো মমিন সকলের স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর?
আজকে আর কার কাছে জবাব চাইবো? জবাবদিহির আর সময় নেই। যা হওয়ার হয়েই গ্যাছে।
আমাদের বাংলাদেশী মিডিয়া, আমাদের চাপাতির হালচাল, আমাদের চাপাতির উল্লাস, মৌজ মাস্তি – সবকিছুই তো! কোথাও কোনও ত্রুটি হয়নি। মাখনের মতো মসৃণ, এইসব খুনখারাবির দিন।
কিন্তু ছবিটা রয়ে যাবে। মৃত্যুর আগে, মৃত্যুর আয়োজনে। তখনও যারা বেঁচে ছিলো। আজও যারা আছি। কাল যারা থাকবো না।
বৈশাখও ফুরিয়ে আসছে। এরপর আমাদের বৈশাখ বর্জন। প্রাণ অর্পণে।

http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article1130424.bdnews

/ALTERNATES/w640/02_Boishakh_Mongol+Sovajatra_140415_0032.jpg” width=”500″ />

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 12 = 17