সংসদ কর্তৃক বিচারক অপসারণের সহজ বিকল্প

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪ জাতীয় সংসদে পাসকৃত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীতে বলা হয়েছিল “কোন বিচারকের অসদাচরণ বা অসামর্থ্য সম্পর্কে তদন্ত ও প্রমাণের পদ্ধতি সংসদ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিবেন।” সংশোধনীটি পাস করার পাঁচ দিনের মাথায় ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৪ রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এতে সন্মতি দেন। কিন্তু বিচারক অপসারণের পদ্ধতি সংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট আইনটি গত দুই বছরেও পাস করা হয়নি। ফলে বিলটি অনুমোদনের পর থেকে সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি ও সমমানের সাংবিধানিক পদসমূহে কর্তব্যরত ব্যক্তিবর্গকে অপসারণের প্রশ্নে একধরনের আইনগত শুন্যতা তৈরি হয়েছে। প্রায় দু’বছর পর গত ২৫ এপ্রিল ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বিচারক (তদন্ত) আইন, ২০১৬’ আইনের খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। আইনটি জাতীয় সংসদে যাওয়ার আগেই গত ৫ মে বৃহশ্পতিবার হাইকোর্ট বিভাগের একটি বৃহত্তর বেঞ্চ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছে। ফলে তৈরি হয়েছে নতুন জটিলতা। হাইকোর্টের রায়ের পর ঐদিন সংসদে যে প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়েছে তাতে অনেকেরই মনে হতে পারে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করুক সংসদ সদস্যরা তা চান না। “প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকিবেন,” সংবিধানের ৯৪ (৪) এ উল্লেখিত এই বিধানটি পছন্দ নয় বলেই কি তারা বিচারক অপসারণের ক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখতে চান? সংসদের হাতে এই ক্ষমতার অর্থ হচ্ছে, পক্ষান্তরে সংসদ নেতা অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর হাতে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা। বলা হচ্ছে এই ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে, জনগণের প্রতিনিধি সংসদের কাছে আদালতের জবাবদিহীতা তৈরি হবে।

আদালতের জবাবদিহীতা বলতে আমরা কি বুঝি? কোনও বিচারক কি তার বিচারকার্যের জন্য কারও কাছে জবাবদিহি করেন? যদি করতে হয়, তবে আর বিচার ব্যবস্থা বলে কিছু থাকে না। বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে সহস্রাব্দ সঞ্চিত জ্ঞান এবং আধুনিক বিশ্বের অধিকাংশ দেশে প্রতিষ্ঠিত বিচারিক কাঠামোসমূহ এধরণের জবাবদিহিতার ধারণাকে একবাক্যে নাকচ করে দেয়। একজন বিচারক আদালতে বসে যে সিদ্ধান্ত দেবেন, কি রায় দেবেন –এ বিষয়ে আইন এবং নিজের বিবেক ছাড়া আর কারও কাছেই তার জবাবদিহিতা নেই। থাকা উচিৎও নয়। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর প্রস্তাবনাতেও বিচারের জন্য বিচারকের জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়নি। কিন্তু একধরণের জবাবদিহিতাতো থাকতে হবে।

একজন বলছেন, আমি আদালতের কাছে গিয়ে ২৫ বছরেও বিচার পাইনি। বিচার বিভাগকে এজন্য অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। আদালতে কয়েক লাখ মামলা বছরের পর ঝুলে আছে। ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামী বছরের পর বছর কনডেম্ড সেলে মৃত্যুর প্রহর গুণছে –উচ্চ আদালত তবুও তার আপিল নিস্পত্তি করছে না বা করতে পারছে না, বিচারক আদালতে বসেন না, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত বিচার বিভাগ তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না, বিচার বিভাগ তার জন্য বরাদ্দকৃত ট্যাক্সের টাকা কিভাবে ব্যয় করছে – এরকম প্রশ্নগুলোর জবাবদিহীতা অবশ্যই নিশ্চিত করা দরকার। এ ধরণের জবাবদিহিতা সংসদে হবে, মিডিয়ায় হবে, সামাজিক মাধ্যমসমুহে হবে। গণ সমাবেশে এবং মানুষের মুক্ত আলোচনায়, অধিক কি রাজপথেও হবে। জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ অবশ্যই এসব বিষয়ে বিচার বিভাগের কাছে জানতে চাইবে। কোনও বিচারক অপরাধ করলে তার বিচারও আইনি কাঠামোর মাধ্যমে হতে হবে। এধরণের জবাবদিহীতায় কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু ষোড়শ সংশোধনী পাস করার প্রাককালে বিচার বিভাগের যেসব কর্মকান্ড নিয়ে সংসদ কিংবা সরকারকে ক্ষুব্ধ বলে মনে হয়েছে তার সবকটিই ছিল উচ্চ আদালতের বিচার সংক্রান্ত। বিচারপতি সামসুদ্দিন আহমেদ মানিক তার এজলাসে বসে জাতীয় সংসদের স্পীকার সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করেছিলেন। তাই নিয়ে সংসদে অসংযত প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়েছে। শিতলক্ষা নদী থেকে নারায়নগঞ্জের একজন সিটি কাউন্সিলর, একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবি এবং আরও ৫জনের লাস উদ্ধারের পর উচ্চ আদালত র‌্যাবে কর্মরত তিনজন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কিছু আদেশ-নির্দেশ প্রদান করেছিলেন। সেই আদেশের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেছিলেন। এর কয়েকদিন পরই ঐ আদালতে দায়িত্বরত অতিরিক্ত এ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান চাকরি হারান। পত্রপত্রিকায় এসব বিষয় এসেছে। তার কয়েকদিন পরই জানা যায় সরকার সংবিধান সংশোধন করে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে অর্পন করতে উদ্যোগ নিচ্ছে।

বাংলাদেশে জনসমক্ষে উচ্চারিত অনেক অভিযোগের একটি হচ্ছে উচ্চ আদালতে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ হয়। এধরণের দলীয় বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত কোনও বিচারক যখন এজলাসে বসে সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে তার নিয়োগকর্তার চিন্তার প্রতিকুলে অবস্থান নেন তখন ‘প্রায় সর্বশক্তিমান’ নিয়োগকর্তা ক্ষুব্ধ হন। সেটাই হয়েছে। সরকার বিচার বিভাগের প্রকৃত জবাবদিহিতা নয়- সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মধ্যদিয়ে বিচারকের চাকরিকে নিজেদের হাতের মুঠোয় নিতে চেয়েছে –এই অভিযোগ শিক্ষিত মানুষের মুখে মুখে। এর ফলে জনগণের কাছে বিচারবিভাগের জবাবদিহীতা প্রতিষ্ঠা আদতে কি সম্ভব ?

প্রথমত: ষোড়শ সংশোধনী অনুযায়ী কোনো বিচারপতির বড় ধরণের অপরাধ প্রমাণিত হলেও সংসদে শাসক দলের দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা না থাকলে সেই বিচারককে অপসারণ করা যাবে না। কারণ আমাদের দেশে কেবলমাত্র দলীয় বিবেচনায় একদল আর একদলের সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করে থাকে।
দ্বিতীয়ত: যদি কোনও দলের সংসদে দুই তৃতিয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে তাহলে কেবলমাত্র দলীয় বিবেচনায় কিংবা ‘রাজনীতিতে সর্বশক্তিমান’ ব্যক্তির ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা মন্দ লাগার কারণেও একজন বিচারকের উপর খর্গ নেমে আসতে পারে। সংসদে একজন এমপি’র বক্তব্য দলীয় হুইপিং দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। সংসদে দলীয় হুইপরা অদৃশ্য চাবুক নিয়ে এমপি সাহেবদের পিছনে বসে থাকেন। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে সংসদ সদস্যরা তাদের দলের সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেন না। যদিও আইন বিশেষজ্ঞদের কারও কারও মতামত হল ৭০ অনুচ্ছেদ দলের যে কোনও সিদ্ধান্তের পক্ষে ভোট দিতে কিংবা বক্তব্য দিতে একজন সংসদ সদস্যকে বাধ্য করতে পারে না। কেবল মাত্র সরকার গঠনের ক্ষেত্রে কিংবা সংসদে সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা চ্যালেঞ্জ হলে এমপিকে দলের পক্ষে ভোট দিতে হয়। এই ব্যাখ্যায় আইন বিশেষজ্ঞরা সবাই একমত নন।

অনুচ্ছেদ ৭০ (১) ঃ কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে।ব্যাখ্যা: যদি কোন সংসদ সদস্য যে দল তাঁহাকে নির্বাচনে প্রার্থীরূপে মনোনীত করিয়াছেন, সেই দলের নির্দেশ অমান্য করিয়া-(ক) সংসদে উপস্থিত থাকিয়া ভোটদানে বিরত থাকেন, অথবা (খ) সংসদের কোন বৈঠকে অনুপস্থিত থাকেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন।(২) যদি কোন সময় কোন রাজনৈতিক দলের সংসদীয় দলের নেতৃত্ব সম্পর্কে কোন প্রশ্ন উঠে তাহা হইলে সংসদে সেই দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের নেতৃত্বের দাবীদার কোন সদস্য কর্তৃক লিখিতভাবে অবহিত হইবার সাত দিনের মধ্যে স্পীকার সংসদের কার্যপ্রণালী-বিধি অনুযায়ী উক্ত দলের সকল সংসদ-সদস্যের সভা আহ্বান করিয়া বিভক্তি ভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের দ্বারা উক্ত দলের সংসদীয় নেতৃত্ব নির্ধারণ করিবেন এবং সংসদে ভোটদানের ব্যপারে অনুরূপ নির্ধারিত নেতৃত্বের নির্দেশ যদি কোন সদস্য অমান্য করেন তাহা হইলে তিনি (১) দফার অধীন উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদানকরিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে এবং সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে।

সে যাই হোক, দলীয় সিদ্দান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিতে এমপিদের কখনই দেখা যায় না। সেটা আইনী বাধ্যবাদকতায় হোক কিংবা এমপিদের অতিমাত্রায় দলীয় (তথা নেতৃত্বের প্রতি) আনুগত্য বোধের কারনে হোক।

তৃতীয়ত: সংসদের হাতে বিচারকদের বিচার করার ক্ষমতা থাকলে একজন অভিযু্ক্ত বিচারককে বিচার শেষে অপসারণ করা হোক বা না হোক -তুচ্ছ কারনেও একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে সংসদে অতি কথন হতে পারে। অর্থাৎ বিচার বিভাগের ভাবমুর্তি প্রতিনিয়তই প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
চতুর্থত: বিচারপতির বিচারকারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা মাত্র ৩ জন বা ৫ জন নয়; ৩৫০ জন। এদের কারও ব্যক্তিগত ক্ষোভ কিংবা জিঘাংসার কারণেও বিচারকরা সংসদে অপকথনের কিংবা হয়রানির শিকার হতে পারেন। যার নজির বিভিন্ন সময়ে তৈরি হয়েছে। সংবিধানের ৭৮ অনুচ্ছেদে সংসদ ও সদস্যদের বিশেষ অধিকার ও দায়মুক্তি দেয়া আছে। ৭৮ (৩) অনুযায়ী “সংসদে বা সংসদের কোন কমিটিতে কিছু বলা বা ভোটদানের জন্য কোন সংসদ-সদস্যের বিরুদ্ধে কোন আদালতে কার্যধারা গ্রহণ করা যাইবে না।” এই অধিকার প্রয়োগ করে মাননীয় সংসদ সদস্যগণ মাঝে মাঝে যা ইচ্ছা তাই বলেন। আদালতের রায়ে সংসদের হাতে বিচারকদের বিচার করার ক্ষমতা অবৈধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ঐদিন বিকেলের অধিবেশনে সংসদ সদস্যগণ বিচারকদের সম্পর্কে তাদের ইচ্ছামত বলেছেন। এর মধ্যদিয়ে তারা কি প্রমাণ করলেন? সংসদে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের বিচার করার মত, বিজ্ঞতা, নির্মোহ আচরণ এবং ধৈর্য তাদের আছে? দায়মুক্তি তাদেরই সাজে যারা দায়িত্বশীলতার সাথে সেই দায় বহন করতে জানেন। ক্ষমতা তাদের কাছেই নিরাপদ, যারা সংযম ও দায়িত্বশীলতার সাথে তা প্রয়োগ করতে পারেন।

ষোড়শ সংশোধনী পাসের পূর্বে বিচারপতি সামসুদ্দিন আহমেদ সম্পর্কে সংসদে যেসব ব্যক্তিগত আক্রমনাত্মক কথা হয়েছে সেগুলো সংসদীয় রুচীবোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমাদের রাজনীতিবিদরা একে অপরকে যেভাবে আক্রমণ করেন- সংসদের কার্যপ্রনালী বিধি তা থেকে কাউকেই protection দিতে পারে না। সংসদে যে ব্যক্তিটি উপস্থিত নেই তার সম্পর্কে যাচ্ছেতাই কথা বলা হয়। Rules of Procedure এসব কটুকাটব্য থেকে নাগরিকদের কতটুকু প্রতিরক্ষা কিংবা প্রতিকার দিয়েছে? নাকি দেয়ার সুযোগ আছে? এরপর সংসদে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা গেলে -বিচারক অপসারণ করতে না পারুক- এমপি সাহেবরা যখন তখন গালিগালাজ করে ঝাল মেটাবেন না -এই গ্যারান্টি কে দেবে? সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২২ অনুযায়ী “রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গসমূহ হইতে বিচারবিভাগের পৃথকীকরণ রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন৷” অথচ সংসদ সদস্যগণ উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বিচার করার কতৃত্বপূর্ণ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে চান।

পঞ্চমত: সংসদ সদস্যদের অনেকেই উচ্চ আদালতে আইন পেশায় নিয়োজিত। বিচারকদের বিচার করার ক্ষমতা পেলে বিচারপতির উপর একজন এমপি’র সাংবিধানিক সুপ্রিমেসি তৈরি হবে। এই সাংবিধানিক সুপ্রিমেসি বিচারক এবং এমপি উভয়ের মনস্তত্তকে প্রভাবিত করতে পারে। একজন বিচারপতি তার এজলাসে মামলা পরিচালনাকারী একজন এমপি’র প্রতি দুর্বলতা প্রদর্শন করতে পারেন। অন্যদিকে ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ও নীতিবান কোনও বিচারক আইন ও বিবেক দ্বারা পরিচালিত হয়ে যথাযথ রায়/আদেশ দিলেও মামলা পরিচালনাকারী এমপি তার প্রতি নাখোশ হতে পারেন। বিচারপতি তার বিচারিক সিদ্দান্তের কারনে মামলা পরিচালনাকারী একজন সংসদ সদস্যের বিরাগভাজন হতে পারেন। উকিল হিসেবে মামলা পরিচালনাকারি সংসদ সদস্যদের সাথে বিচারপতিদের বিশেষ জানাশোনা তৈরি হয় – একজনের সাথে সম্পর্কটা হতে পারে মধুর কিংবা তিক্ত। সংসদ প্রসিডিংস-এ এর প্রভাব পরতে পারে।
ষষ্ঠত: একজন এমপির সাথে কোনও বিচারপতির (যে কোনও কারণেই হোক) ব্যক্তিগত বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক থাকতে পারে। সংশ্লিষ্ট এমপি ঐ বিচারকের অপসারণ প্রকৃয়ায় অংশ নিতে পারবেন না –এরকম কোনও বিধান সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীতে যু্ক্ত করা হয়নি। একজন বিচারপতির সাথে জমিজমা সংক্রান্ত কিংবা অন্য কোনও কারণে ব্যক্তি বিশেষের বিরোধ থাকলে ঐ ব্যক্তির বিচার বিচারপতি করতে পারেন না।

সপ্তমত: জবাবদিহিতার অংশ হিসেবে যাদের (রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং স্পীকার্) সংসদ কর্তৃক অপসারণের বিধান আছে তারা সবাই গণপ্রতিনিধি কিংবা সংসদ কর্তক নির্বাচিত। বিচারপতিরা সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত নন। তারা প্রফেশনাল এবং বিশেষ জ্ঞান সম্পন্ন হিসেবে প্রধান বিচারপতির পরামর্শে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হন। সংসদ তাদের নিয়োগ না দিলেও কেবলমাত্র অপসারণ করার দায়িত্বটা কেন নিতে চায় ? সমালোচনা অন্তর ভোটাভুটির মাধ্যমে অপসারণের দায়িত্ব সংসদকে দিলে একটি ক্রাইটেরিয়া ঠিক করে বিচারক নিয়োগের/নির্বাচনের দায়িত্বটাও সংসদকে দিতে অসুবিধা কোথায়? দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার পুরোটাই সংসদের হাতে থাকুক না। যেমন রয়েছে অন্যান্য নির্বাচিত রাষ্ট্রীয় পদের। বিচারকদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পদায়ন, (স্বাস্তিমূলক কিংবা অন্য কোনও প্রয়োজনীয় কারণে) বেঞ্চ পরিবর্তন বা বদলী, ছোট অপরাধের জন্য (ভর্ৎসনা বা সতর্ক করে দেয়ার মত) স্বাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রশাসনিক পদ্ধতিতে প্রধান বিচারপতি করে থাকেন। অপসারণের মূল কাজটিও সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে মূলত: প্রধান বিচারপতি করতেন।

অষ্টমত: ষোড়শ সংশোধনীর বিধান অনুযায়ী কেবলমাত্র বিচারপতিগণ নন -প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারবৃন্দ এবং অন্যান্য অনেকগুলো সাংবিধানিক পদ (সংসদ কর্তৃক নিয়োগ প্রাপ্ত না হলেও) সংসদ কর্তৃক অপসারনযোগ্য। অর্থাৎ তাদের প্রত্যেকের অপসারণ দুই তৃতীয়াংস সংখ্যাগরিষ্ঠতা সম্পন্ন একটি সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছার অধিন হয়ে যায় । কোনও দলের পর্যাপ্ত সংখ্যা গরিষ্ঠতা না থাকলে যু্ক্তি সংগত কারণ থাকলেও (রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবে) তাদের অপসারণ করা সম্ভব হবে না।
হাইকোর্ট ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণার পর বিচারপতি অপসারণে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল গঠনের বিধান পুন: প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে এবং সরকার তা করবে বলে ইতোমধ্য অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানিয়েছেন।

সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল
সংসদে ন্যুনতম দুই তৃতীয়াংশ সদস্যদের ভোটে বিচারপতি অপসারনের যে বিধান তা ১৯৭২ সালে প্রণীত দেশের মূল সংবিধানে ছিল। এই ব্যবস্থার বিলুপ্তি সেনাশাসনের মাধ্যমে হয়নি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই বিধান রহিত করা হয়েছিল। চতুর্থ সংশোধনীতে বিচারপতি অপসারণ করার একক ক্ষমতা রাষ্ট্রপতিকে দেয়া হয়েছিল। সেনা শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে পাসকৃত পঞ্চম সংশোধনীতে বিচারপতি অপসারণে রাষ্ট্রপতির একক ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের বিধান প্রবর্তন করা হয়। এই ব্যবস্থায় সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের তদন্ত ও সুপারিসের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি সবোচ্চ বিচারালয়ের একজন বিচারককে অপসারণ করতে পারেন।
সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, এটি সেনাশাসক প্রণীত। শুধুমাত্র সেনাশাসক প্রণীত বিধায় কোনও ভাল কাজকে বাতিল করে দেয়া যুক্তিযুক্ত নয়। পাকিস্তান আমলে আয়ুবের স্বৈরশাসনের সময় মুসলিম পারিবারিক আইন সংশোধন করা হয়েছিল। এরফলে মুখের ঠুনকো কথায় তালাকের পরিবর্তে বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য নোটিশ দেয়ার বিধান চালু হয়েছে। এই আইন আযুব শাসনামলের সেরা কাজ হিসেবে সভ্য সমাজে স্বীকৃত। শুধু সামরিক শাসনের আমলে প্রণীত হয়েছে বলেই এই আইনের গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়ে যায়না।

সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী মামলার রায়ে সেনা শাসকদের সরকারসহ প্রায় সবকিছুকেই আদালত অবৈধ ঘোষণা করে বাতিল করে দিয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের ঐ রায়েই আবার সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের প্রশংসা করা হয়েছে।

আপিল বিভাগ বলছে: “It also appears that the provision of Article 96 as existed in the Constitution on August 15, 1975 provided that a Judge of the Supreme Court of Bangladesh may be removed from the office by the President on the ground of “misbehaviour or incapacity”. However clauses (2), (3), (4), (5), (6) and (7) of Article 96 were substituted by the Second Proclamation (Tenth Amendment) Order, 1977 providing the procedure for removal of a Judge of the Supreme Court of Bangladesh by the Supreme Judicial Council in the manner provided therein instead of earlier method of removal. This substituted provisions being more transparent procedure than that of the earlier ones and also safeguarding independence of judiciary, are to be condoned.”

সুপ্রীম কোর্ট রায় ঘোষনার সময় সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের বিধান অক্ষুহ্ন রাখলেও পরবর্তীতে সরকারের রিভিউ পিটিসনের প্রেক্ষিতে সর্বোচ্চ আদালত এই কনডনের সময় সীমা ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করে দেয়। ২০১৩ সালের জানুয়ারির ১ তারিখ এই বিধান আপনা আপনি বিলুপ্ত হয়ে যেত। কিন্তু এর আগেই সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদ সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের বিধান নতুন করে প্রবর্তন করে। অর্থাৎ সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের যে সর্বশেষ বিধান সেটি সেনা শাসকদের রেখে যাওয়া নয়। আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংসদ কর্তৃক প্রণীত। ৭২ এর ধর্মনিরপেক্ষ মূল সংবিধান প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াসেই আওয়ামীলীগ সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করেছিল। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ সকল বিধান পুন: প্রতিষ্ঠিত করা হয়নি। রাষ্ট্রধর্মের স্ববিরোধী গোজামিল এর মধ্যে রয়ে গেছে। তেমনি আবার সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের বিধানটিও রেখে দেয়া হয়েছিল।

সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের বিরুদ্ধে সরকারের আর কি অভিযোগ? “সেনাশাসকদের উদ্ভাবন করা” শুধুমাত্র এটাই কি অভিযোগ? নাকি এই ব্যবস্থার কার্যকরতা বিষয়েও প্রশ্ন আছে। সুপ্রীম জুডিসিয়াল সার্ভিস আসলেই কতটা কার্যকর হয়েছে সেটাও দেখা দরকার।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত চার জন বিচারপতির বিরুদ্ধে সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে তদন্তের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এরশাদের সাথে তার দুর্নীতি মামলা নিয়ে গোপন কথোপকথন ‍ও ঘুষ কেলেংকারির দায়ে বিচারপতি লতিফুর রহমানের বিরুদ্ধে সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। অবস্থা বেগতিক থেকে তিনি নিজেই পদত্যাগ করেন। সময়মত পদত্যাগ করার কারণে তিনি পরবর্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ারও সুযোগ পেয়েছিলেন। বিচারপতি ফয়সাল মাহমুদ ফয়জি’র সার্টিফিকেট জালিয়াতির অভিযোগের তদন্ত সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে শুরুর উদ্যোগ নেয়া হলে তিনিও পদত্যাগ করেছিলেন। শুধুমাত্র বিচারপতি সৈয়দ শহীদুর রহমান অপসারিত হয়েছিলেন। গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ও ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর হাতে নিহত হওয়ার পর বিচারপতি মিজানুর রহমান ভুঁইয়া তার বিরুদ্ধে প্রচারণামূলক কর্মকান্ড করছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মত তিনিও একটিভিষ্টের ভূমিকায় অবর্তীর্ণ হন বলে বিচারালয়ে এবং সংসদে কথা ওঠে। তবে সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিল তার বিরুদ্ধে তদন্তের পর তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়।

সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাইন্সিলের বিরুদ্ধে পরের অভিযোগ হল – এখানে বিচারকরাই বিচারকদের বিচার/তদন্তের কাজটি করে থাকেন। বিচারপতি বিচারপতির বিচার করবে –এটা কিভাবে হয়? নিজেই নিজের বিচার করলে সেটা আর বিচার থাকেনা –এসব কথা বলা হচ্ছে। এই অভিযোগটি একেবারেই মেধাশুণ্য অভিযোগ বলে আমার কাছে মনে হয়। এক কথায় –একটি অবান্তর বা খোড়া যুক্তি। এর মাধ্যমে একটি পেশার মানুষকে অমুলকভাবে হেয় করা হয়। একজন বিচারক যাকে আমরা “মহান আদালত” হিসেবে দেখি তার সততা, যগ্যতা ও পক্ষপাতহীনতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। সকল পেশাতেই নিজ পেশার মানুষদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যবস্থা আছে; অপসারন বা স্বাস্তিদানের ব্যবস্থা আছে। প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই এসব হয়ে থাকে। একজন আমলাই আর একজন আমলার বিরুদ্ধে স্বাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। কাজেই বিচারকরা একজন বিচারকের অপরাধ কর্মের বিচার করতে পারবেন না এই যুক্তিটিকে আমি অথর্ব যুক্তির স্থানে ফেলে দিচ্ছি।

বিচারপতি অপসারণের বিকল্প প্রস্তাব

সুপ্রীম কোর্ট তার অন্তর্নীহিত জুডিসিয়াল রিভিউ ক্ষমতা প্রয়োগ করে স্ববিরোধপূর্ণ সংবিধানিক বিধান বাতিল ঘোষণা করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইন প্রণয়ন ও সংবিধান সংশোধনের মূল দায়িত্বটি সংসদের। রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং সংশধনের মধ্যে একটি অবিরোধাত্মক ও খবরদারীমুক্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুহ্ন রেখেই বিচারপতি অপসারণের বিধান সংবিধানে থাকতে হবে। সাথে সাথে সেটা গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচিত সংসদের আওতায় হতে হবে। কেমন হতে পারে সেই ব্যবস্থা?

সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিল এর বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হল– এটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে সঙ্গতিসম্পন্ন নয়। তারা বলছেন, জনগণের পক্ষে ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য সংসদকেই বিচারপতি অপসারণের দায়িত্বটা দেয়া দরকার। সরকার যদি সদুদ্দেশ্য নিয়ে শুধুমাত্র গণতন্ত্রের স্বার্থেই সংসদের হাতে এই দায়িত্বটি অর্পন করতে চায় তবে:

এক. সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অপসারণ: দুই তৃতীয়াংশ নয় –সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতেই বিচারক অপসারণের বিধান করা উচিৎ। তবে এটা কেবল তখনই করা যাবে যখন পেশাদারিত্বের সাথে একজন বিচারকের বিরুদ্ধে তদন্ত হবে এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হবে। অর্থাৎ সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের সুপারিসের ভিত্তিতে সংসদ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সুপ্রীমকোর্টের একজন বিচারপতিকে অপসারণ করতে পারে; যদি পর্যাপ্ত সাংবিধানিক সুরক্ষা দেয়া হয়।

দুই. সাংবিধানিক কমিটির সুপারিস: ষোড়শ সংশোধনী অনুযায়ী বিচারপতির অপরাধ তদন্তের জন্য প্রস্তাবিত আইনের দ্বারা একটি কমিটি গঠনের ব্যবস্থা রাখার বিধান করার কথা। সেই কমিটিতে বিচারকরাই থাকবেন । সুপ্রীম জুডিসিয়াল কাউন্সিল না হয়ে যে নামেই তদন্ত কমিটি হোক অসুবিধা নেই। অসুবিধা অন্যখানে। কেবলমাত্র সাধারণ আইনের আওতায় গঠিত একটি কমিটি বিচারকের স্বাধীন অবস্থানকে যথেষ্ট সুরক্ষা দিতে পারবে না। এই কমিটির কাঠামো ও ক্ষমতা সাংবিধানিক হওয়া উচিৎ।এই কমিটির পরামর্শ ছাড়া সংসদ কোনও বিচারপতিকে অপসারণ করতে পারবে না- সাংবিধানিক বিধানটি এরকম সুস্পষ্ট হওয়া উচিৎ।বিচারিক কমিটি সুপারিশ করলে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংসদ একজন বিচারপতিকে অপসারণ করার সিদ্ধান্ত দেবে; দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যা গরিষ্ঠতার প্রয়োজন হবে না।

তিন: সংসদ সদস্যদের আদালতে উকিল হিসেবে মামলা পরিচালনার সুযোগ রহিত করতে হবে। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য সংসদে কোনও বিচারপতির অপসারণ প্রকৃয়ায় অংশ নিতে পারবে না।

চার: বিচারবিভাগের মহত্ত্ব ও ভাবমূর্তী রক্ষার প্রয়োজনে সংসদে বিচারকদের বিরুদ্ধে যা ইচ্ছা বলার দায়মুক্তি রহিত করতে হবে।

পাঁচ: বিচারক অপসারণের বিষয়ে বক্তব্য প্রদান কিংবা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কার্যকরতা সুস্পষ্ট বিধানের দ্বারা রহিত করতে হবে – যাতে করে এমপিরা দলীয় প্রধানের প্রভাব বলয়ের বাইরে থেকে নিজের বিবেচনাবোধ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে।

সাধারণ আইন দিয়ে এর একটিও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। কারণ বিষয়গুলো সাংবিধানিক। সংবিধান সংশোধন করেই এই বিধানগুলো যুক্ত করতে হবে। বিচারবিভাগকে মুঠিবদ্ধ করার উদ্দেশ্য না হলে নিতিনির্ধারকরা বিষয়গুলো ভাবতে পারেন। কারণ স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার জন্য বিচারকদের জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা যেমন প্রয়োজন তেমনি বিচার কার্য পরিচালনার জন্য বিচারকদের একটি স্বাধীন মুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দেয়া এবং যথাযথ সেফগার্ড রচনা করা জরুরী।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “সংসদ কর্তৃক বিচারক অপসারণের সহজ বিকল্প

  1. বিচারিক তদন্ত কমিটি একজন
    বিচারিক তদন্ত কমিটি একজন হাইকোর্ট জজের বিরুদ্ধে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ পত্র দায়ের করার পরও সংসদ যদি সরকারি দলের অনুগত একজন বিচারককে অপসারণ না করে তাহলে কি হবে? সংসদের কাছে এই ক্ষমতা দেওয়াই উচিৎ নয়। কারণ তারা দলীয় দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করবে। বিচার বিভাগ এমনিতেই দলীয়করণ হয়েছে। সংসদের হাতে বিচারকদের চাকরি খাওয়ার ক্ষমতা থাকলে তারা বিচার বিভাগকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অঙ্গ সংগঠনে পরিণত করবে।

  2. সাংবিধানিকভাবে গঠিত বিচারিক
    সাংবিধানিকভাবে গঠিত বিচারিক তদন্ত কমিটি অপরাধের প্রমাণসহ যদি অভিযোগপত্র সংসদের কাছে জমা দেয় এবং সংসদ যদি তারপরও দলীয় রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো বিচারককে অপসারণ না করে চাকুরিতে রেখে দেয় তখন কি হবে? বিচার বিভাগ এমনিতেই দলীয়করণ হয়ে গেছে। সংসদের হাতে বিচারকের চাকরি খাওয়ার ক্ষমতা দেয়া হলে তারা বিচার বিভাগকে সরকারি দলের অঙ্গ সংগঠনে পরিণত করবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 5 =