‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’: এক ঐতিহাসিক বিজয়


পার্বত্য অঞ্চলের সমস্যা বাংলাদেশ সৃষ্টির পূর্ব থেকেই এ অঞ্চলে বিদ্যমান ছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে এ সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে চাকমা রাজার প্রতিনিধি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসন সম্বলিত চার দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধু তাদের এ অনৈতিক দাবী প্রত্যাখ্যান করে তাদেরকে পাল্টা বাঙালীকরনের প্রস্তাব। তারা বঙ্গবন্ধুর পাল্টা দাবী নাকোচ করে দেন। শুধু তাই নয় তারা চাকমা নেতা সন্তু লারমার নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে জনসংহতি সমিতি এবং ১৯৭৩ সালে তাদের সামরিক শাখা শান্তি বাহিনী গঠন করেন। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশা পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় সমস্যাটি এভাবেই চলছিল এবং তেমন আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে নি। কিন্তু জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখলের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম সংক্রান্ত যে সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন তা তৎকালীন পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ ও সংঘাতময় করে তোলে। দিনের পর দিন শান্তি বাহিনীর চোরাগুপ্তা হামলায় আমাদের বাংলাদেশী অনেক সৈনিক সেখানে শহীদ হয়েছেন। জিয়াউর রহমান ভেবেছিলো অস্ত্রের মুখে শান্তি বাহিনীর সকল আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিবে। কিন্তু হীতে বিপরীত হয়েছে। সেখানে, সেই গহীন অঞ্চলে দিনের পর দিন শান্তি বাহিনীর হামলায়, আমাদের প্রচুর সৈনিক প্রান হারাচ্ছিল।

জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা গ্রহনের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম নীতির কিছুটা পরিবর্তন করেন। ১৯৮৯ সালে এরশাদ সরকার তিনটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ গঠন করে তাদের হাতে কিছুটা রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদান করেন। এরপরেও তারা স্বায়ত্তশাসনের দাবীতে সশস্র আন্দোলন বন্ধ করে নি। উপজাতীয়রা কখনও স্বায়ত্ত শাসন কখনও বাঙালী খেদাও প্রভৃতি দাবীতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অবতারনা করেন। খালেদা জিয়া সরকারের আমলে ১৯৯২ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী অলি আহম্মেদের নেতৃত্বে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সাথে ৫ নভেম্বর ১৯৯২ সাল থেকে জনসংহতি সিমিতির ৭ দফা এবং উপকমিটির ৬ দফা মোট ১৩ দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে মূল সমস্যার কোন সমাধানই তারা করতে পারে নি।

১৯৯৬ সালে সুদীর্ঘ ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পর পার্বত্য সমস্যা সবাধানের লক্ষ্যে শক্তিশালী পদক্ষেপ গ্রহন করেন। চীফ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহকে প্রধান করে জাতীয় কমিটি গঠন করে উপজাতীয় প্রধানের সাথে আলোচনার পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়। এ লক্ষ্যে ১৯৯৬ সালের ২১ ডিসেম্বর থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত খাগড়াছড়িতে ১ম দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় এবং ২৬ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তির খসরা প্রণয়ন করা হয়। অবশেষে, ১৯৯৭ সালের ২ রা ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। শেখ হাসিনা সরকার তথা বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং জনসংহতি সমিতির পক্ষ থেকে জোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা দীর্ঘ কাঙ্ক্ষিত শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগে থেকেই তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের চিরশত্রু জামায়েতে ইসলামী এবং তাদের অপরাপর সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে এর বিরোধিতা করছে। তাদের এই বিরোধিতা এবং বিরোধিতা করতে গিয়ে নানাবিধ ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ এক সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক চক্রান্তের অন্তর্গত। বিএনপি ও তার সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী সহযোগীরা শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করতে গিয়ে সর্বশেষ অবস্থান থেকে জেহাদের ডাক দিয়েছে। জামাতপন্থী বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃ হাসানউজ্জামান চৌধুরী ‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি একটি আগাগোড়া প্রামাণ্য বিশ্লেষণ’ নামে একটি বই লিখেছেন। ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ সালে এ বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি, জামাত ও অপরাপর উগ্র সাম্প্রদায়িক দলসমূহের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ। ১৭ ফেব্রুয়ারি ’৯৮ দৈনিক জনকণ্ঠের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে—এই আলোচনা সভায় জামাতী লেখক হাসানুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, ‘যে কারণে আমরা নামাজ পড়ি সে কারণেই শান্তি চুক্তির বিরোধিতা করতে হবে। ইসলাম এবং পার্বত্য শান্তি চুক্তি এখন মুখোমুখি’।

এই আলোচনা সভায় শায়খুল হাদিস মওলানা আজিজুল হক বলেছেন, ‘চুক্তি হয়ে গেছে বলে কান্নাকাটি করে লাভ হবে না। জেহাদে যেতে হবে। পার্বত্য চুক্তির ইস্যুতে নবী করিম (সঃ)-এর সময়কার মতো যুদ্ধের সময় চলে এসেছে।’ ১৯৯২ সালে ভারতে বাবরী মসজিদ ভাঙার পর এই মওলানাই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলা প্ররোচিত করার জন্য বলেছিলেন ‘ইসলাম নামক বৃক্ষটির গোড়ায় পানি নয়, রক্ত ঢালতে হবে।’ এর ফলশ্রুতি হিসেবে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর তখন নজিরবিহীন নৃশংস হামলা চালানো হয়েছিল।

উক্ত আলোচনা সভায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর প্রধান সহযোগী জামাত নেতা যুদ্ধাপরাধী আব্বাস আলী খান বলেছেন, ‘চুক্তি কার্যকর হলে দেশের মানুষের ওপর লানত হবে।’ অপর যুদ্ধাপরাধী জামাত নেতা মওলানা দেলোয়ার হোসেন সাইদী বলেছেন, ‘আমাদের সামনে এর চেয়ে বড় ইস্যু কবে আসবে! আসুন জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়ি। জেহাদের সময় এসেছে। আমরা জেহাদে নেমে গেলাম।’ এই সভায় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সহযোগী বিএনপি নেতা আনোয়ার জাহিদ, জামাত নেতা কামরুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা প্রমূখ একই ধরনের বক্তব্য রেখেছেন।

যা হোক, নিঃসন্দেহে শান্তিচুক্তি শেখ হাসিনা সরকারের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। দীর্ঘদিনের জাতীয় সংকটের সমাধানের লক্ষ্যে হাসিনা সরকার শান্তিচুক্তি সম্পাদন ও বাস্তবায়নের দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহন করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংহতি সমিতি এবং তার সামরিক শাখা ‘শান্তিবাহিনী’ সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবীতে দীর্ঘকাল ধরে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে আসছিল। উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে কোন সামরিক এবং বেসামরিক সরকারই এ সমস্যা সমাধানে সাফল্য লাভ করতে পারে নি। শেখ হাসিনা সরকার এ দীর্ঘ সংঘাতময় পরিস্থিতির পরিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে যে যুগান্তকারী ও দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহন করেছেন তারা সারা পৃথিবীব্যাপী বহুল প্রশংসিত হয়েছে।

চুক্তি মোতাবেক ৪৫ দিনের মধ্যে শান্তিবাহিনীর সশস্র সদস্যদের তালিকা প্রদান করা হয়েছিল এবং ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ থেকে ৫ মার্চ ১৯৯৮ পর্যন্ত ৪ দফায় ১৯৪৭ জন সশস্র শান্তি বাহিনীর সদস্য শেখ হাসিনা সরকারের নিকট আত্ম সমর্পণ করেন। ৮৭৫ টি অস্রসহ ২ লাখের অধিক গলা বারুদ তারা জমা দিয়েছিল। ১৯৯৮ সালের ৫ মার্চ সর্বশেষ দলের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে জনসংহতি সমিতির সামরিক শাখা শান্তি বাহিনীর পুরোপুরি বিলুপ্তি ঘটে।

সর্বশেষে বলা যায় যে, বাংলাদেশের ইতিহাসে হাসিনার সরকারই পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের সাফল্যের দাবীদার। শেখ হাসিনার গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদর্শিতার কারণে সম্ভব হয়েছিল পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদন। তবুও সমস্যা সমাধানের শেষ বলতে কিছু নেই। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং এ প্রক্রিয়াকে অব্যাহত রাখার জন্য সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বকীয়সত্ত্বা সম্বলিত বিভিন্ন উপজাতীয়দেরকে পুরোপুরি বাঙালীকরনের প্রচেষ্টা সঠিক হবে না। সুতরাং সমঝোতার মাধ্যমে ঐক্য স্থাপন করে সকল শ্রেণীর স্ব-স্ব অস্তিত্ব বজায় রেখে শান্তিপূর্ণ সহবস্থানের লক্ষ্যেই ভবিষ্যতের পদক্ষেপ হওয়া উচিত।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৪ thoughts on “‘পার্বত্য শান্তি চুক্তি’: এক ঐতিহাসিক বিজয়

  1. অনেক তথ্যবহুল একটি লেখনী। পড়ে
    অনেক তথ্যবহুল একটি লেখনী। পড়ে অনেক কিছু জানলাম। ধন্যবাদ আপনাকে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

64 + = 74