আইনজীবীরা আদালতকে বিতর্কিত করলে আইনের শাসন মুখ থুবড়ে পড়বে

নির্যাতিত মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল হচ্ছে আদালত। কোথাও বিচার না পেয়ে মানুষ হতাশাগ্রস্থ হয়ে শেষ ভরসা হিসেবে মহান আদালতের শরণাপন্ন হয়। সভ্য সমাজে তাই আদালতের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কিন্তু আমাদের দেশে সেই আদালতের পরিবেশ দিন দিন কলুষিত হচ্ছে কিছু রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত আইনজীবীদের কারণে।

২০১৩ সালের ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর বিরোধীদলের কর্মসূচিকে ঘিরে সুপ্রিম কোর্ট অঙ্গনে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। সেজন্য অনেকক্ষেত্রে আইনজীবীরা নিজেরাই দায়ী বলে আমি মনে করি। প্রথম দিন সরকার দলীয় লোকজন আদালতের মূল ফটকের তালা ভেঙে আদালত প্রাঙ্গণে গিয়ে বিস্ফোরিত বিএনপি-জামায়াত সমর্থক আইনজীবীদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় হামলার কবল থেকে নারী আইনজীবীও রেহাই পাননি। বিএনপি-জামায়াত সমর্থক আইনজীবীরাও হামলাকারীদের দিকে ইটপাটকেল ছুড়ে মারেন। দ্বিতীয় দিন মহিলা লীগ ও বিএনপি-জামায়াত সমর্থক আইনজীবীরা পরস্পরের প্রতি ঢিল ছুড়ে মারেন। আদালত প্রাঙ্গণে হামলার জন্য বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা সরকার দলীয় কর্মী সমর্থক ক্যাডারদের দায়ী করেছেন। অন্যদিকে, সরকার সমর্থকরা বলছে, বিএনপি-জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা পূর্ব অনুমতি না মিলা সত্ত্বেও বহিরাগতদের নিয়ে আদালত প্রাঙ্গণে সভা-সমাবেশ ও মিছিল করছিল। আইনজীবীদের এসব নোংরা, অপ্রিতিকর কর্মকাণ্ড সারা দেশের সাধারন মানুষেরা টিভি ও বিভিন্ন মিডিয়াতে সরাসরি দেখেছে এবং ধিক্কার দিয়েছেন দায়ী সেসব আইনজীবীদেরকে।

বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীদের বিরুদ্ধে আদালত প্রাঙ্গণকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করার যে অভিযোগ উঠেছে সেটাও প্রকৃতপক্ষেই গুরুতর অভিযোগ। তারা কেবল নিজেরাই সেখানে রাজনীতি করেননি। আইনজীবী নন এমন অনেক ব্যক্তিকেও সেখানে রাজনীতি করার অপ-সুযোগও তৈরি করে দিয়েছেন। আদালত ন্যায়বিচার প্রদানের স্থান, সেখানে বিচারপ্রার্থীরা যান, বিচারপ্রার্থীদের সহায়তা করেন আইনজীবীরা। কোন আইনজীবী কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকতেই পারেন। তবে তাকে রাজনীতি করতে হবে রাজনৈতিক ময়দানে গিয়ে, আদালতে নয়। মনে রাখতে হবে, আদালত কোন রাজনৈতিক ময়দান নয়।

আদালতকে বিতর্কিত করলে আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত হবে। আদালতের প্রতি আস্থা হারালে মানুষ হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেরা আইন হাতে তুলে নেয়। এতে সমাজ হয় পশ্চাৎমুখী। আদিম বর্বরতায় আবার ফিরে আসে ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতি। এমনটাই মনে করেন সমাজবিজ্ঞানীরা। এসব কারণে আদালতের সম্মান রক্ষা করা খুবই জরুরি। এজন্য বিচারক থেকে শুরু করে আইনজীবী, আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষ সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। প্রত্যাশিত আদেশ না পেয়ে প্রায়ই আদালতের ওপর চড়াও হচ্ছেন আইনজীবীরা। ব্যবহার করা হচ্ছে অশালীন ভাষা। দিন দিন বাড়ছে এ প্রবণতা। এ পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে উদ্বিগ্ন সবাই।

প্রসঙ্গত, পুলিশ আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের ওপর কর্তৃত্ব দেখায় না। বাধা দেয় না মিটিং-মিছিলে। এমনকি ওয়ান-ইলেভেনের সময় সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও আইনজীবীদের এহেন কাজে বাধা দেয়নি। ফলে যে কোনো সরকারের সময়েই সরকারবিরোধী আন্দোলনে সব সময় সোচ্চার থাকে আদালত প্রাঙ্গণ। আর এ সুযোগটিরই অপব্যবহার করছে রাজনৈতিক দলগুলো। কখনো খোদ আইনজীবীরাই অবতীর্ণ হচ্ছেন দলীয় ক্যাডারের ভূমিকায়। যা আইনজীবীদের নিকট মোটেও কাম্য নয়।

মহলবিশেষের বিশেষ স্বার্থে আদালত বর্জন, মিছিল, এজলাসের মধ্যে স্লোগান, আইনজীবীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, ভাঙচুরসহ নানা ধরনের নৈরাজ্য ও সহিংসতা চলছে। দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলনের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে আদালত অঙ্গনকে। সাম্প্রতিক সময়ের নানা নেতিবাচক ঘটনা বিশ্লেষণ করলে অবস্থার ক্রমাবনতিটা সহজেই টের পাওয়া যায়। এমনকি আদালতের বাইরের রাজনৈতিক ইস্যুকে কেন্দ্র করেও আদালত প্রাঙ্গণকে উত্তপ্ত করা হচ্ছে। দশম সংসদ নির্বাচনের তফসিল প্রত্যাখ্যান করে ১৮-দলীয় জোট সমর্থিত আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টের এক এজলাসে বিচার চলাকালে বাইরে বিক্ষোভ করেন। এ সময় এজলাসের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলে তারা দরজা-জানালা ধরে ধাক্কাধাক্কি করেন। বিভিন্ন মিডিয়া থেকে দেখা গিয়েছে, দরজায় লাথি মারার মত ঘটানাও ঘটেছে। একই দিন ঢাকার নিম্ন আদালতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আ স ম হান্নান শাহর রিমান্ড ও জামিন শুনানিতে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের ২৮ নম্বর এজলাসের ভেতরে ও বাইরে স্লোগান দিয়েছেন বিএনপি ও জামায়াত সমর্থক আইনজীবীরা। ম্যাজিস্ট্রেট পরে আদেশ দেবেন জানালে ম্যাজিস্ট্রেটের উদ্দেশে অশালীন ভাষা ব্যবহার ও নানা কটূক্তি করেন তারা। ২০১০ সালের ৭ জুন দৈনিক আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের রিমান্ড ও জামিন শুনানিতে ঢাকার সিএমএম আদালতের এক ম্যাজিস্ট্রেটকে লক্ষ্য করে জুতা নিক্ষেপ ও ফাইল ছুড়ে মারেন বিএনপি ও জামায়াত সমর্থক আইনজীবীরা।

২০১০ সালের ২ আগস্ট মুফতি ফজলুল হক আমিনীর বিরুদ্ধে সংবিধান নিয়ে কটূক্তির শুনানিকালে হাইকোর্টের এক এজলাসে হইচই ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দেন বিএনপি ও জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা। এ সময় তারা আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীদের সঙ্গে হাতাহাতিতে লিপ্ত হন। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি মামলাও হয়েছিল। ২০১২ সালের ২২ মে আদালত বর্জন কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বিএনপি ও জামায়াতপন্থী আইনজীবীরা বিচার চলাকালে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের দরজায় লাথি মারেন, আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও নাজিরের কক্ষের জানালা ভাঙচুর করেন। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় একটি মামলাও হয়েছিল।

২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান মানি লন্ডারিং মামলায় খালাস পাওয়ায় বিচারকক্ষের দরজায় লাথি মারেন ও জানালার গ্লাস ভাঙচুরের চেষ্টা চালান তারা। তারা এজলাসের বাইরে স্লোগান দিতে থাকেন এবং বিচারকের উদ্দেশে গালিগালাজ করতে থাকেন।

ঢাকা বারের সিনিয়র আইনজীবী সৈয়দ রেজাউর রহমান বলেন, আইনজীবীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে বিচার বিভাগ নামের প্রতিষ্ঠানটির মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষা করা। বিচার বিভাগের প্রতি আইনজীবীরা সম্মান প্রদর্শন করলে সাধারণ বিচারপ্রার্থী মানুষের আইনের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা অটুট থাকবে। আমি মনে করি না কোনো আইনজীবী এ রকম বিশৃঙ্খলা করতে পারেন। মুষ্টিমেয় কিছু আইনজীবী চেষ্টা করছেন বিচার অঙ্গনকে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশের দিকে নিয়ে যাওয়ার। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে সব রাজনৈতিক দলকে এ বিষয়ে সচেতন থাকা উচিত বলেও মনে করেন সিনিয়র এই আইনজীবী। ঢাকা বারের সিনিয়র আইনজীবী, সাবেক মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এহসানুল হক সমাজী বলেন, আইনজীবীরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। এটি তাদের অধিকার। কিন্তু আদালত হচ্ছে একটি পবিত্র স্থান। আদালতের পবিত্রতা রক্ষায় আইনজীবীদের দায়িত্ব অনেক বেশি। আদালতের সম্মান ও পরিবেশ নষ্ট হয় এমন কাজ থেকে সবার বিরত থাকা উচিত।

সাম্প্রতিককালের ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক ও অপ্রত্যাশিত বলে মনে করেন তিনি। আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক, মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আবদুল্লাহ আবু বলেন, এ ধরনের কাজ কোনো আইনজীবী করতে পারেন না। এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আদালত অবমাননার শামিল। আদালত এ ক্ষেত্রে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদালত অবমাননার মামলা করতে পারেন। আদালতের প্রতি আইনজীবীদের এহেন আচরণ বিচার ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ঢাকা বার শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, কোনো দলের আইনজীবীরই আদালতের প্রতি এ ধরনের আচরণ কাম্য নয়। এতে সাধারণ মানুষ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা হারাবে। বিচার বিভাগ সুদূরপ্রসারী ক্ষতির শিকার হবে।

ঢাকা মহানগর আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর শাহ আলম তালুকদার বলেন, এ প্রবণতা আদালত ও বিচারব্যবস্থার প্রতি অশনি সংকেত। এসব ঘটনা যাতে কখনই আর না ঘটে সে জন্য আদালতকে আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে। তারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদালত অবমাননার মামলা করতে পারেন। আবার যে কোনো আইনজীবীও এ মামলা করতে পারেন। একই সঙ্গে বিজ্ঞ আইনজীবীরা শুনানিতে আরও সহনশীল হবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

দেশের সর্বোচ্চ আদালতে অতীতেও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। এর পেছনে দুই পক্ষের আইনজীবীদেরই দায় রয়েছে। সমস্যা হচ্ছে, আদালতে ঘটা অপ্রীতিকর ঘটনাগুলোর কোন প্রতিকার কখনোই করা হয় না। অতীতের ঘটনাগুলের সুরাহা হলে হয়তো আজ বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা বহিরাগতদের নিয়ে আদালত প্রাঙ্গণকে রীতিমতো রাজনৈতিক সমাবেশস্থলে পরিণত করতেন না, আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকরা হামলা চালাত না, আর পুলিশও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করত না। আমার কথা হচ্ছে, প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসে দু’পক্ষের আইনজীবীরা একমত হয়েছেন যে, আদালতকে রাজনীতিমুক্ত রাখবেন। আশা করি, তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রাখবেন।

দেশের বৃহত্তর স্বার্থে নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত সকল আদালতকে অবশ্যই রাজনীতির কবল থেকে রক্ষা করতে হবে। আদালত প্রাঙ্গণে হামলার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আদালতের মর্যাদা রক্ষায় দায়িত্বরত পুলিশের ভূমিকাও খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। আদালত অঙ্গনে মিছিল মিটিং নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও যেসব আইনজীবী ও বহিরাগত ব্যক্তি সেখানে রাজনৈতিক সমাবেশ করেছেন তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া অত্যন্ত জরুরী।

পরিশেষে বলতে চাই, আইন পেশা একটি স্বাধীন ও মহান পেশা। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এবং মানবাধিকার রক্ষায় আইনজীবীদের ভুমিকা অনেক। আইনজীবীদের রাজনীতি করতে কোন বাঁধা নেই। কিন্তু সে রাজনীতি তারা যেন রাজনৈতিক অঙ্গনে গিয়েই করেন। আদালাত প্রাঙ্গণে নয়। আদালতের পবিত্রতা এবং আদালত পাড়ার শালীনতা রক্ষা করা সকল আইনজীবী, আইনজীবী সহকারী (মুহরী) থেকে শুরু করে কর্তব্যরত পুলিশ সকলেরই পবিত্র দায়িত্ব। সুতরাং, আদালতের মর্যাদা ও পরিবেশের শালীনতা রক্ষায় সরকারের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “আইনজীবীরা আদালতকে বিতর্কিত করলে আইনের শাসন মুখ থুবড়ে পড়বে

  1. সমসাময়িক একটি লেখনী। ভাল
    সমসাময়িক একটি লেখনী। ভাল লিখেছেন। বাংলাদেশের এমন কোন পেশা নেই যেখানে রাজনীতি ডুকে সেই পেশাকে কলঙ্কিত করেনি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

81 − 80 =