হালের চলচ্চিত্র…

এই ধরুন দেশের শিল্প-সংস্কৃতিতে বিদেশী আগ্রাসন নিয়ে আপনি খুব চিন্তিত। বন্ধু-বান্ধবদের ডেকে বলেন আমরা যদি বাংলা সিনেমা-নাটক না দেখি তাহলে তো এই দুরবস্থার উন্নতি হবে না। আপনারা বেশ আট-ঘাট বেঁধে চা মুড়ি চানাচুর নিয়ে বাংলা সিনেমা দেখতে বসলেন। সিনেমা শুরু হল। ডায়নামিক পরিচিতি পর্ব শেষে সিনেমা শুরু। কিছুক্ষন যেতে পারেনি, আপনার যে বন্ধুটই বাইরের সিনেমা-টিনেমা দেখে থাকে সে পরিচালক, সংলাপ লেখক, অভিনেতা-অভিনেত্রি দের নাম তুলে খিস্তি-খেউড় আরম্ভ করেছে। সে বলা শুরু করেছে এই ছবি নাকি অমুক ছবির “ফ্রেম টু ফ্রেম” নকল । আপনি হয়ত একটা দুইটা সিনেমা দেখে এই ব্যাপার ধরতে পারবেন না। দিন যাবে , আপনিও বাইরের সিনেমা গুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে করতে দেখলেন, আপনার বন্ধুটির অভিযোগ একদম সত্য । আপনিও দেখলেন এখনকার প্রায় অনেক গুলো সিনেমা বাইরের সিনেমার হুবহু নকল।
বলে রাখছি যে, নকল আর কপিরাইট নিয়ে আনার মধ্যে একটু না অনেক পার্থক্য আছে। কোন বিষয়ের কপিরাইট নিয়ে আসলে ঐ বিষয় টা আর নকল থাকে না। আর আইনি কোন ঝামেলা তো থাকেই না।

কপিরাইট নিয়ে এসে নির্মিত ব্যাবসা সফল ছবি নেহায়েত কম নয়। উদাহরণ হিসেবে কেয়ামত থেকে কেয়ামত, দেনমোহর, কুলি ছবি গুলোর নাম আমরা বলতেই পারি। দেখছিলাম সালমান শাহ অভিনীত দ্বিতীয় ছবি “দেনমোহর” ছবিটি । শুরুতেই দেখলাম খুব স্পষ্ট করে লিখে দেওয়া হয়েছে যে, “ছবিটি বিদেশী ছবি থেকে অনুপ্রাণিত” অর্থাৎ কপিরাইট স্বত্ব কিনে আনা । কোনভাবেই এটিকে আর নকল বলা যাবেনা । ছবি দেখার পর কৌতুহলবশত জানতে ইচ্ছা করল ছবিটি কোন বিদেশী ছবির অনুপ্রেরণায় নির্মিত । খাটাখাটনি করে খুজে বের করলাম হিন্দি ছবি “সানাম বেওয়াফা”-এর কপিরাইট স্বত্ব কিনে এনে নির্মিত। এটা নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যাথা নাই। কারণ ছবির শুরুতেই ঐ একটি বাক্যই পরিচালক-প্রযোজক আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন নকল আর কপিরাইট স্বত্ব কিনে এনে ছবি তৈরী করার পার্থক্য কি ।

মজার বিষয় হচ্ছে, এই ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে একটা নিউজ এ বারবার চোখে আটকাচ্ছিল। নিউজ টা এরকম ” ‘দেনমোহর’ বনাম ‘এক টাকার দেনমোহর’ ” নিউজের শুরুটা এমন- ‘দেনমোহর’ চলচ্চিত্রের প্রযোজক শেখ কামাল বৃহস্পতিবার ঢাকার কোর্ট রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ অভিযোগ করেন।

তিনি দাবি করেন, সালমান শাহ অভিনীত ‘দেনমোহর’ ছবির দৃশ্য ও সংলাপ নকল করে ‘এক টাকার দেনমোহর’ ছবিটি নির্মাণ করা হয়েছে। এই ছবি প্রদর্শনে আদালতের নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে তা বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হচ্ছে বলে তিনি জানান।

ইউটিউবে এক টাকার দেনমোহর লিখে সার্চ করলে পুরো সিনেমা না পাওয়া গেলেও এর ট্রেইলার পাওয়া গেল। শেষমেশ অন্যপন্থা অবলম্বন করে সিনেমাটি ডাউনলোড করলাম। দেখতে বসে শুরুতেই “কেয়ামত থেকে কেয়ামত” সিনেমার প্রথম অংশটুকুর কথা মনে পড়ে গেল। একটু টেনে যখন ছবিটার মাঝামাঝি পর্যায়ে আসলাম, তখন দেখলাম নায়ক-নায়িকার পরিচয় থেকে প্রেম পর্যন্ত অংশটা ওপার বাংলার ছবি “বল না তুমি আমার” থেকে চুরি করা। নায়ক-নায়িকার বিয়ে ঠিক হওয়া থেকে শুরু করে ছবির শেষ পর্যন্ত পুরো কাহিনী সংলাপ সহ ‘দেনমোহর’ ছবিটার অনুকরণেই করা। সোজা বাংলায় চুরি। একেবারে পুকুর চুরি। এক সিনেমার মধ্যে তিন-তিনটি সিনেমার মিশ্রণ ।

তিনটা সিনেমা মিলিয়ে একটা ছবি তৈরি করার এই কৃতিত্ব দেখিয়েছেন স্বনামধন্য(!) পরিচালক এফ বি মানিক । সংলাপ লিখেছেন … দুঃখিত কপি করেছেন কমল সরকার । অবাক হইলাম সহকারী প্রযোজক এর জায়গায় যখন মিঠুন চক্রবর্তির নাম দেখলাম।

এইভাবে আমাদের চলচিত্রশিল্প যদি উদ্ভট উঠের পিঠে চলতে থাকে তাহলে এর গন্তব্য ঠিক কোথায় তা সবার অনুমেয়। আমরা যারা সাধারণ দর্শক আছি তাদের টিভিসেটের সামনে বসে ওই খিস্তি-খেউড় আউড়ানো ছাড়া কোন কিছু করার দেখছিনা, যদি না চলচিত্রের সাথে জড়িত মানুষ গুলো নিজেদের সদিচ্ছা থেকে এই পরিস্থিতি থেকে আমাদের বের করে না নিয়ে আসেন তাহলে এই শিল্পটাকে আর বাঁচিয়ে রাখা হয়তো যাবে কিন্তু গর্ব করে বলার মত সাধারণ দর্শকের মুখে কিছু থাকবেনা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

86 + = 90