‘আমাদের সংস্কৃতিতে পেটানোকে খুব বীরত্বের কাজ মনে করা হয়’

ডা. মেখলা সরকার, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ, সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট। সম্প্রতি একের পর এক শিশুহত্যার মতো বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক ঘটনা নিয়ে কথা বলেছেন। তার সঙ্গে আলাপচারিতায় উঠে এসেছে শিশুর প্রতি সহিংসতা ও হত্যার বিষয়ে সামাজিক মনস্তাত্ত্বিক কারণগুলো।

আমরা দেখছি ধারাবাহিকভাবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আপনি এই ঘটনা কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

আমাদের সমাজে শিশুমৃত্যুর ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। শিশুদের প্রতি সহিংস আচরণের সংস্কৃতি আমাদের পরিবার ও সমাজে বেশ ভালোভাবেই রয়েছে। সামাজিক অস্থিরতা, মূল্যবোধের অধঃপতন, বিভিন্ন ধরনের মানসিক চাপ, হতাশা, বঞ্চনা, নিপীড়ন এর জন্য দায়ী। আমাদের বেড়ে ওঠার মধ্যে সমস্যা, বিচ্ছিন্ন জীবনযাপনÑএই সবকিছুর প্রতিফলন হিসেবে শিশুমৃত্যুর ঘটনাগুলোকে ব্যাখ্যা করা যায়। কাজেই শিশুদের প্রতি নৃশংস যে আমরা হঠাৎ করে হয়েছি, সেটা বলা যাবে না। এটা আগে থেকেই ছিল। তবে এখন মিডিয়ার কারণে বিষয়গুলো সবার সামনে আসছে। ফলে সমাজের সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।

আপনি বলছেন, ‘শিশুদের প্রতি সহিংস আচরণের সংস্কৃতি আমাদের আগেই ছিল’-কীভাবে এটা ছিল? আর কেন এটা হয়েছে? এর উৎস কী?

আমাদের বাবা-মায়েরা যখন রেগে যান, তখন বাচ্চাদের ভয়ংকরভাবে মারেন। এটা বাবা-মাসহ অভিভাবকদের ভুল আচরণ। একটা সময় মনেই করা হতো বা এখনো হয়তো অনেক স্থানেই এটা মনে করা হয়, শিশুদের মারলে তারা সঠিকভাবে চলবে। আগে স্কুল বা মাদ্রাসায় শিশুদের প্রচ-ভাবে মার দেওয়া হতো। এভাবে অনেক শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। তবে আগের চেয়ে এটা অনেক কমেছে, কিন্তু একেবারে বন্ধ হয়নি। একসময় বউ পেটানোকে খুব বীরত্বের কাজ বলে মনে করা হতো। আমাদের সংস্কৃতিতেই এটা রয়েছে। এখনো এটা নেই এমন বলা যাবে না। এটা থেকে শিক্ষিত-অশিক্ষিত কেউ মুক্ত নন। এখনো আমরা মাঝেমধ্যে খবরের কাগজে দেখি কোনো নারীকে গ্রামের সবার সামনে নির্যাতন করা হয়েছে। সবাই এটা দেখে একধরনের মজা পায়। অন্যদিকে, শহরের একজন লোক হয়তো এটাতে মজা পাবে না, কিন্তু সে আবার টেলিভিশনে রেসলিং দেখে মজা পাচ্ছে। এই দুই প্রবণতা একই সংস্কৃতি থেকে উৎসারিত।

কিন্তু শিশুদের প্রতি সহিংতা কেন হচ্ছে? মানুষ একজন দুর্বল শিশুকে কেন বেছে নিচ্ছে যে কোনো প্রতিরোধ করতে পারে না?

শিশুদের প্রতি সহিংসতার আরও কারণ হলো, মানুষের মনে যখন অবদমিত রাগ, হতাশা, শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনা প্রভৃতি জমতে থাকে, তখন সে এটা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে তার চেয়ে দুর্বল কাউকে বেছে নেয়। যেমন অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের ওপর শারীরিক বা মানসিক নিপীড়ন চালান। একইভাবে গৃহকর্তা হয়তো গৃহকর্ত্রীর ওপর নির্যাতন করেন। গৃহকর্ত্রী আবার চাকরদের ওপর নির্যাতন করেন। এভাবেই কোনো এক সময় শেষ স্তরে শিশুর ওপর নির্যাতনটা চলে আসে। তবে সহিংসতার ঘটনা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। কারণ, আগেই বলা হয়েছে সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার যে কারণগুলো- যেমন মানসিক চাপ, হতাশা, বঞ্চনা, নিপীড়ন, শোষণ-বঞ্চনা-অভাব প্রভৃতি আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। সমাজে স্বার্থপরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা, মাদকাসক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সবকিছু মিলে সমাজে সৃষ্টি হয়েছে অস্থিরতা। যার প্রতিফলন হিসেবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংতার ঘটনাগুলো ঘটে।

এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের পথ কী?

আমাদের নিজেদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে হবে। মানুষের স্বভাবিক প্রবণতা হলো সে নিজের রাগ-ক্ষোভকে প্রশমিত করার জন্য দুর্বল কাউকে বেছে নেয়। সাধারণত তার চেয়ে শক্তিশালী কাউকে বেছে নেয় না। খুব অল্প কিছু মানুষ আছে যাদের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি, কেবল তারাই এই প্রবণতা থেকে মুক্ত। এখন নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা কোনো অলৌকিক ব্যাপার নয়, এটা অর্জন করতে হয়। পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা, একাডেমিক শিক্ষা এই সবকিছু যখন একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশে সাহায্য করে, তখনই কেবল তার মধ্যে এই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। তখন সে ন্যায়-অন্যায় বোধ বা মূল্যবোধ দ্বারা চালিত হয়। যেমন কোনো শিশু যদি দেখে তার বাবা তার মাকে মারছেন, তাহলে সেও একদিন বড় হয়ে বউ পেটাবে। এটাই হলো পারিবারিক শিক্ষা। আগে শিশুরা যৌথ পরিবারে মানুষ হতো, তখন একাডেমিক উচ্চশিক্ষা এতটা না থাকলেও মূল্যবোধের শিক্ষা যথেষ্ট পরিমাণ ছিল। তাদের শেখানো হতো অন্যকে আঘাত কোরো না, প্রাণী হত্যা কোরো না, দুর্বলদের প্রতি দয়া কোরো, বড়দের প্রতি সম্মান কোরো প্রভৃতি। এই মূল্যবোধের শিক্ষাটা পরিবার থেকেই আসে। যখন এই শিক্ষাটা থাকে, তখন খারাপ কোনো প্রবণতা বিকশিত হতে পারে না। ধরা যাক, একটি শিশু ছবি আঁকতে পছন্দ করে। কিন্তু এই ছবি আঁকার জন্য সে পরিবার বা কাছের কারও থেকে কোনো ধরনের উৎসাহ পেল না বা কারও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারল না। তখন তার এই ছবি আঁকার প্রতিভা নষ্ট হয়ে যাবে। কিন্তু উৎসাহ পেলে তার এই প্রতিভার বিকাশ হবে। একই কথা খারাপ প্রবণতার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।মানুষ জন্মগতভাবেই বেশ কিছু প্রবণতা নিয়ে জন্ম নেয়। তার মধ্যে আছে রাগ ঘৃণা লোভ ভালোবাসা মায়া মমতা স্নেহ ইত্যাদি। এই প্রবণতাগুলো নিয়ন্ত্রিত হয় মূল্যবোধ আর পরিস্থিতির দ্বারা।

রাষ্ট্র এই ক্ষেত্রে কী ভূমিকা নিতে পারে?

শৈশবে আমাদের বেড়ে ওঠার মধ্যে মূলত ১৮ বছরের মধ্যেই আমাদের ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। এই সময় যদি সঠিকভাবে শিশুকে মূল্যবোধের বা নীতিনৈতিকতার শিক্ষা না দেওয়া হয়, তাহলে সেটা আর কখনোই সম্ভব হবে না। এই সময় আমাদের চিন্তাভাবনা, আচরণ, যুক্তিবোধ, আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রভৃতি তৈরি হয়। ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার এই দায়িত্ব যেমন পরিবারের রয়েছে, তেমনি রাষ্ট্রেরও রয়েছে। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের অনেক কিছু করার আছে। এ ক্ষেত্রে মিডিয়া একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মিডিয়া এই অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা নিতে পারে। এর মধ্য দিয়ে মানুষকে সচেতন করে তোলা সম্ভব হবে। রাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এর মধ্যে আমরা দেখছি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিশুহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। অপরাধীরা ধরা পড়ছে। রাষ্ট্র জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব নিতে পারে।

সাম্প্রতিক দেশকাল

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 4