রাজাকারের মৃত্যু আমাদের ব্যথিত করেনা


তোমরা অনেকেই দেখলাম নিজামীর ফাঁসিতে ব্যথিত। কারো কারো মায়াকান্নায় ভেসে যাচ্ছে সারা শরীর। কেউবা তুলছো বয়সের ধুয়ো। কেউবা তুলছো আদর্শিক আনুগত্যের অজুহাত। কেউবা বলছো মৃত্যুদণ্ড অমানবিক। নিত্যনতুন যুক্তিতে কাপিয়ে বেড়াচ্ছো অনলাইন, অফলাইনের আকাশ বাতাস।
আচ্ছা তোমরা কি জানোনা কোন কোন অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হওয়ায় আজ তার ফাঁসি হলো?কেন একটি বয়োবৃদ্ধ লোকের ফাঁসির দাবীতে লক্ষ লক্ষ মানুষ রাজপথে নেমে আসে? কেন তারা “ফাঁসি ফাঁসি ফাঁসি চাই শ্লোগানে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে তোলে?

২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ একাত্তরে বদরপ্রধান ও জামায়াতের সহযোগী সংগঠন তৎকালীন ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামীকে ৮টি অভিযোগের মধ্যে ৪টিতে (২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর অভিযোগ) মৃত্যুদণ্ড দেন। এ ছাড়া ১, ৩, ৭ ও ৮ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আপিল বিভাগ পূর্ণাঙ্গ রায়ে বুদ্ধিজীবী হত্যা ও পাবনার সাঁথিয়ায় হত্যা ও ধর্ষণের দায়ে (২, ৪ ও ১৬ নম্বর) তিনটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। নিজামীর আপিল আংশিক মঞ্জুর করে তিনটি অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তিনটি অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- পাবনার বাউশগাড়ি, ডেমরা ও রূপসী গ্রামের সাড়ে ৪০০ মানুষকে হত্যা ও ৩০-৪০ নারীকে ধর্ষণ, পাবনার ধুলাউড়ি গ্রামে নারী, পুরুষ, শিশুসহ ৫২ জনকে হত্যা এবং পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী গণহত্যা।

সেদিন নিজামীর জিঘাংসার শিকার এই মানুষ গুলোর মধ্যেতো নারী, শিশুর পাশাপাশি অশতীপর বৃদ্ধও ছিলো। বয়সের কারণে নিজামী কি তাদের ক্ষমা করেছিলো? আর পাকিস্তান সমর্থনের নামে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের রাও ফরমান আলীর নির্দেশে নিজামীর কমাণ্ডে থাকা কালো সোয়েটার পড়া আলবদরেরা সেদিন কার্ফিউর মাঝে ধরে নিয়ে গিয়ে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে হত্যা করেছিলো তা কি আসলেই ক্ষমার যোগ্য? আর ধর্মীয় রাজনীতি করার কারণে যারা নিজমীর জন্য মায়াকান্না করছো, তাদের প্রতি বিনীত জিজ্ঞাসা, ধর্ম কি এই নির্বিচারে নিরস্ত্র মানুষের হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন করে?

কি বললে? নিজামী বদর কমাণ্ডার ছিলেন না?
ওরা। লাহোর থেকে প্রকাশিত সাইয়িদ মুতাক্কিউল রহমান ও সালিম মনসুর খালিদের লেখা ‘জাব ভুহ নাজিম-ই আলা দি’ (যখন তারা নাজিম-ই আলা ছিলেন) বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে ইরানী বংশোদ্ভূত গবেষক সাইয়েদ ওয়ালি রেজা নাসের তার The Vanguard of The Islamic Revolution : The Jamaat-i Islami of Pakistan বইয়ে লিখেছেন, একাত্তরে সরকারের অনুপ্রেরণায় ইসলামী ছাত্রসংঘ (ইসলামী জমিয়তে তুলাবা বা IJT) হয়ে ওঠে জামায়াতে ইসলামীর মূল শক্তি। আর্মির সহায়তায় এরা আলবদর ও আলশামস নামে দুটি প্যারামিলিটারি ইউনিট গঠন করে বাঙালি গেরিলাদের সঙ্গে লড়াই করার জন্য। ইসলামী ছাত্রসংঘের তখনকার প্রধান মতিউর রহমান নিজামী আলবদর ও আলশামস বাহিনী সংগঠিত করেন।

পাকিস্তানে নির্বাসিত আফগান সাংবাদিক ও গবেষক মুসা খান জালাজাই তার Secterianism and the politico-religious Terrorism in Pakistan গ্রন্থে লিখেছেন, সেনাশাসনের সঙ্গে ছাত্রসংঘকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেেত্র নিজামীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।… আল-বদর ও আল-শামস গড়ার সিদ্ধান্তটাও নিজামীর।

চলো নিজামীর মুখের কিছু কথাই শুনি তবে,
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক শাখা থেকে রাওয়ালপিন্ডিতে পাঠানো গোপন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, একাত্তরের ১৪ জুন ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহকুমায় ইসলামী ছাত্রসংঘের এক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মতিউর রহমান নিজামী বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেনাবাহিনী যেভাবে কাজ করছে তাতে আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করা সম্ভব। নিজামী বলেন, ইসলাম রায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করতে হবে। এ জন্য দলীয় নেতাকর্মীদের ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন তিনি।

নিজেদের দলীয় মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম-এ সে বছর ১৪ নভেম্বর ‘জনতার পার্লামেন্ট’ কলামে ‘বদর দিবস : পাকিস্তান ও আলবদর’ শীর্ষক এক নিবন্ধে নিজামী লিখেছিলেন, ‘আমাদের পরম সৌভাগ্যই বলতে হবে। পাক বাহিনীর সহযোগিতায় এদেশের ইসলামপ্রিয় তরুণ ছাত্রসমাজ বদর যুদ্ধের স্মৃতিকে সামনে রেখে আল-বদর বাহিনী গঠন করেছে।’ নিবন্ধে আরো বলা হয়, ‘সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন আল-বদরের তরুণ যুবকেরা হিন্দুস্তানের অস্তিত্ব খতম করে সারা বিশ্বে ইসলামের বিজয় পতাকা উড্ডীন করবে।’ ১৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক সংগ্রাম-এ মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করার বিষয়ে নিজামীর অঙ্গীকারের কথা প্রকাশিত হয়। সংগ্রামের খবরটি এ রকমÑ যশোরে রাজাকার সদর দফতরে সমবেত রাজাকারদের উদ্দেশ্য করে নিজামী বলেন, ‘জাতির এই সংকটজনক মুহূর্তে প্রত্যেক রাজাকারের উচিত ঈমানদারীর সাথে তাদের উপর অর্পিত এ জাতীয় কর্তব্য পালন করা এবং ঐ সকল ব্যক্তিকে খতম করতে হবে যারা সশস্ত্র অবস্থায় পাকিস্তান ও ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।’একাত্তরের ২৩ সেপ্টেম্বর নিজামী ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় আলবদর ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। সেখানে এক চা-চক্রে তিনি বলেন, মাদ্রাসা ছাত্ররা দেশ রায় একযোগে এগিয়ে এসেছে। কারণ তারা ইসলামকে ভালবাসে। পাকিস্তানকে ভালবাসে। (দৈনিক সংগ্রাম, ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১)

মানুষের মৃত্যু আমাদের ব্যথিত করে। কিন্তু নিরীহ নিরস্ত্র মানুষের রক্ত, বীরাঙ্গনার সম্ভ্রম, আর বুদ্ধিজীবীদের তাজা রক্ত যার হাতে লেগে রয়েছে , তাকে কি আসলেই মানুষ বলা সম্ভব? ধার্মিকতো দূরের কথা। আর অমানুষের জন্য আবার মায়াকান্না কিসের?নিজামীর ফাঁসির মধ্যে দিয়ে ৪৫ বছর ধরে বয়ে চলা একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়ের তাই হলো চির অবসান। শহীদদের আত্মা আর বীরাঙ্গনাদের হাহাকার পেল পরিতৃপ্তি। অমানুষের মৃত্যু তাই আজ আমাদের ব্যথিত করেনা।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 3 = 10