জ্ঞানের জ্যোতি ছড়াবে অনন্ত, অনন্তকাল

?w=535″ width=”400″ />

সিলেটের মুক্তমনা বিজ্ঞান লেখক ও জামায়াত-শিবির-সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী অনন্ত বিজয় দাসের নির্মম খুনের এক বছর ছিল গতকাল। খুনি ও পরিকল্পনাকারীরা এখনো চিহ্নিত হয়নি; তাই মামলায় অভিযোগ পত্র দাখিল করেনি পুলিশ।

গত জানুয়ারি মাসে পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছিলেন মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সম্প্রতি জানালেন বেশিরভাগ ব্লগার হত্যার ঘটনা তারা সমাধান করে ফেলেছেন।

তবে মুক্তমনা লেখকদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঢালাওভাবে দোষারোপ করার পর অনন্ত হত্যাসহ অন্য মামলাগুলো আদৌ কোনদিন সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের মুখ দেখবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

ইতিমধ্যে গ্রেপ্তারকৃত মান্নান রাহী আদালতের সামনে খুনের সাথে তার জড়িত থাকার কথা স্বীকার করলেও বাকী খুনিদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে পুলিশের কোন ইচ্ছাই নেই। উল্লেখ্য, অভিজিত রায় হত্যার উস্কানীদাতা হিসেবে নিষিদ্ধ জঙ্গি দল হিজবুত তাহরীর নেতা শফিউর রহমান ফারাবীর একান্ত আস্থা-ভাজন ছিল এই রাহী।

একসময় শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাহী পড়াশোনা শেষ করতে পারেনি। তার বাবা উগ্রপন্থী সংগঠন ওলামা লীগের নেতা।

এখন পর্যন্ত কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তিনজন উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে যায়। অদ্ভুত এক দেশ বাংলাদেশ, যেখানে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের নেতা-কর্মীরা জামিন পেয়ে স্বাধীনভাবে ঘুরে বাড়ায়।

ফটো-সাংবাদিক ইদ্রিস আলীকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ বলেছিল সে একটি জঙ্গি সংগঠনের সাথে যুক্ত এবং সরাসরি খুনের সাথে জড়িত ছিল। কিন্তু কয়েক মাস পর সে জামিন পায়। জিজ্ঞেস করলে পুলিশ জানায় খুনের সাথে তার জড়িত থাকার প্রমাণ পায়নি তারা। প্রাক্তন মাদ্রাসার ছাত্র ইদ্রিস দৈনিক সবুজ সিলেটে কাজ করতো। পত্রিকাটির মালিক জঙ্গি ও শিবিরের মদদদাতা রাগীব আলী।

গ্রেপ্তারকৃত আরো দুই আসামী মান্নান রাহীর ভাই মোহাইমেন নোমান ও আব্দুর রশীদ কিছুদিন আগে জামিন পায়। এরপর কারাগার থেকে মুক্ত হলেও পুলিশ একটি নাশকতার মামলায় তাদের আবার গ্রেপ্তার করে।

সম্প্রতি জানা যায়, সিআইডি এখন পর্যন্ত তিনজন খুনিকে গ্রেপ্তার করেছে এবং বাকি তিনজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে। একটি বাহিনীর কাছে খুনিদের ছবি ও বিস্তারিত তথ্য থাকার পরেও তাদেরকে গ্রেপ্তার করতে না পারার পেছনে কি কারণ থাকতে পারে তা অবশ্যই দুর্ভাবনার বিষয়।

অনন্তের জন্য স্মৃতিস্তম্ভ:
এদিকে অনন্ত হত্যার প্রথম বার্ষিকীতে তার সিলেটের বন্ধুরা হত্যাকাণ্ডের স্থানে একটি ভাস্কর্য উদ্বোধন করবেন আজ সকালে । মুষ্টিবদ্ধ ও সমুন্নত হাতের মাঝে কলম আকৃতির স্তম্ভে বড় করে লেখা হয়েছে “জ্ঞানের জ্যোতি ছড়াবে অনন্ত, অনন্তকাল।”

স্মৃতিস্তম্ভটির ডিজাইন করেছেন অরূপ দাশ। তিনি জানান, সকল ধরনের সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদের বিপক্ষে অনন্তের কলম হাতিয়ার হিসেবে সমুন্নত, এই কনসেপ্ট তুলে ধরা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভের ডিজাইনে।

অনন্তকে যে স্থানে হত্যা করা হয়েছিল তার এক সপ্তাহ পরেই ১৮ মে এলাকাবাসীর সহায়তায় “অনন্ত বিজয় দাশ স্মৃতি রক্ষা পরিষদ” দেয়ালচিত্র নির্মাণ করে সেখানে অনন্তের লেখাগুলোই লিখে দিয়েছিল। বছর ঘুরতে সেই দেয়ালচিত্র মলিন হয়েছে, কারা যেন সেটা মুছে দেয়ারও চেষ্টা করেছে। এবার তাই আরেকটু বড় পরিসরে স্থায়ী একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করছে এলাকাবাসী।

অবশ্য ওই সময়ই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল দেয়ালচিত্রের স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে অনন্ত বিজয় দাশ হত্যার এক বছর পালন করা হবে। সে ঘোষণা অনুযায়ী পরিষদের পক্ষে আইনজীবী মইনুদ্দিন আহমদ জালাল স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। গত বছর দেয়ালচিত্র তৈরির সময় এলাকাবাসীর যে সহায়তা ছিল, একইভাবে সে সহায়তায় স্মৃতিস্তম্ভও নির্মিত হয়েছে।

অস্পষ্ট, ভুল তদন্তের নমুনা:
যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতের বিরুদ্ধে কথা বললে, ধর্ম ব্যবসায়ীদের মুখোশ উন্মোচন করে দিলে, ধর্মের অযৌক্তিক ও কাল্পনিক বিষয়কে যুক্তিখণ্ডন করে প্রকাশ করলে এই বাংলাদেশে মরতে হবে — গত তিন বছরে খুন হওয়া ব্লগার, প্রকাশক ও শিক্ষক হত্যা সেই আভাসই দেয়। মোটাদাগে এসব ঘটনার পরিকল্পনার পেছনে জামায়াতের জঙ্গি ছাত্র সংগঠন শিবির সরাসরি জড়িত, তাতে কোন সন্দেহ নেই। আর বেহেস্তের লোভে সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য হেফাজতে ইসলামের সাথে সম্পৃক্ত উগ্রপন্থী ইসলামী দলগুলোর নেতা-কর্মীরা উদগ্রীব হয়ে আছে।

অবশ্য শিবিরের নেতা-কর্মীদের রক্ষা করার প্রবণতা নতুন নয়। এর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আ ক ম শফিউল ইসলামের খুনের পেছনেও শিবিরের জড়িত থাকার প্রমাণ পায় পুলিশ। কিন্তু পরে র‍্যাবের চাপে সেই মামলায় যুব দলের কিছু নেতা-কর্মীর নামে অভিযোগ পত্র জমা দেয় তারা।

গত মাসে খুন হওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক আ ফ ম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যার কয়েকদিনের মধ্যেই পুলিশ জানিয়েছে এটা শিবিরের কাজ। কিন্তু আশংকা এই যে, কিছুদিন পর হয়তো তারাই বলবে এর সাথে শিবিরের ছেলেরা জড়িত নয়।

ওয়াশিকুর বাবু হত্যার ঘটনায় দুই খুনিকে শিখণ্ডীরা আটক করলেও তারা হেফাজতের হাট হাজারী মাদ্রাসার ছাত্র হওয়ায় ধীরে চলো নীতিতে এগুচ্ছে পুলিশ। পরিকল্পনাকারী ও উস্কানীদাতাদের চিহ্নিত না করেই তারা তদন্ত শেষ করেছে।

এর আগে টিএসসি এলাকায় অভিজিত রায় ও বন্যা আহমেদের উপর হামলার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। পরে তদন্তে জানা যায়, সেই মুহূর্তে চারটি চেকপোস্টের সব সিনিয়র কর্মকর্তা তাদের ডিউটি এলাকায় ছিলেন না।

ব্লগার ও স্থপতি রাজীব হায়দার হত্যার ঘটনায় আদালতের রায়ে বিচারক বলেন তদন্ত কর্মকর্তারা ঠিকমতো কাজ করেনি। তারা উস্কানীদাতা জসিম উদ্দীন রাহমানীর বয়ান সম্পর্কে অডিয়ো-ভিডিও প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করেনি। সে কারণে তাকে মাত্র ৫ বছরের জেল দেয়া হয়। তাছাড়া মূল আসামী সাবেক শিবির নেতা রেদওয়ানুল আজাদ রানাকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এই রানা অভিজিত হত্যাকাণ্ডেরও প্রধান সন্দেহভাজন আসামী।

এককালে ধর্মনিরপেক্ষ ও জামায়াত-বিরোধী বলে পরিচিত আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মী এবং প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যরা যে আজকাল জঙ্গিদেরকেও মদদ দিচ্ছে তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। গত কয়েক বছরে ৫শ’র অধিক জঙ্গি আদালত থেকে জামিন নিয়ে পালিয়ে আছে। তাদের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা নেই পুলিশের।

আবার অনেক জঙ্গি নেতা, অর্থায়নকারী ও মদদদাতারা প্রকাশ্যে স্বাধীনভাবে কর্মকাণ্ড চালিয়ে গেলেও তাদের ধরতে যেন নিষেধ আছে।

এ ধরণের বে-আইনি ও আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড করে, হেফাজতের শফিসহ অন্যান্য উগ্রপন্থী নেতাদের বিচারের আওতায় না এনে আওয়ামীলীগ কি পার পাবে?

নতুন প্রজন্মের বুদ্ধিজীবী হত্যা নিয়ে ৬৮ জন ব্লগার ও সাতটি ব্লগ সাইটের বিবৃতিটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাদের হতাশ করে।

(প্রথম প্রকাশ-Norrfika.se মতামত পাতায়)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “জ্ঞানের জ্যোতি ছড়াবে অনন্ত, অনন্তকাল

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

97 − = 88