একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়ঃ প্রবেশিকা

“পূর্ব পাক ইসলামী ছাত্র সংঘের নবনিযুক্ত সাধারণ সম্পাদক মীর কাশেম আলী তার বক্তৃতায় বলেন, পাকিস্তানীরা কোন অবস্থাতেই হিন্দুদের গোলামি করতে প্রস্তুত নয়। তিনি বলেন আমরা শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে হলেও দেশের ঐক্য ও সংহতি অক্ষুন্ন রাখবো। সমাবেশ শেষে এক জঙ্গি মিছিল বাহাদুর শাহ পার্কে শেষ হয়।” (দৈনিক সংগ্রাম, নভেম্বর ০৮ ১৯৭১) [পৃষ্ঠা ১২১]

“ছাত্র শিবিরের প্রতিষ্ঠাতা মীর কাশেম আলী ছিলেন আলবদর হাই কমান্ড সদস্য, চট্টগ্রাম শহর ইসলামী ছাত্র সংঘ সভাপতি এবং চট্টগ্রাম জেলা রাজাকার ও শহর আলবদর বাহিনী প্রধান। ‘পুনর্বাসিত রাজাকার, আলশামস ও অন্যান্য সন্ত্রাসবাদী সংগঠন’ অধ্যায় কিভাবে তিনি শান্তি কমিটির সভায় বক্তব্য পেশ করেন তা উল্লেখিত হয়েছে। বর্তমানে তিনি ঢাকা মহানগরী জামাতের নায়েবে আমীর এবং রাবিতা-ই-আলম আল ইসলামীর বাংলাদেশ শাখার পরিচালক।” [পৃষ্ঠা ১২৭]

উল্লিখিত উদ্ধৃতিদ্বয়ে যে পৃষ্ঠাসংখ্যা দেখতে পাচ্ছেন, সেটি নির্দেশ করছে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে লেখা সবচেয়ে আনএপোলোজেটিক গ্রন্থ ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’-কে (চতুর্থ সংস্করণ পঞ্চম মুদ্রণ, ১৯৯২/১৯৮৭)। এটি প্রকাশিত হয়েছিলো ঢাকার শান্তিনগরস্থ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশ কেন্দ্র থেকে, এর সম্পাদক মণ্ডলীতে ছিলেন তিনজন, ডঃ আহমদ শরীফ, কাজী নূর-উজ্জামান ও শাহরিয়ার কবির। যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আওয়ামি লিগ সরকারের মধ্যে মৌখিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও আন্তরিকতার অভাব ছিলো কতোটা, সেটা এই বইয়ের প্রথম অধ্যায় ‘পুনর্বাসনের সাধারণ পটভূমি’ থেকে জানতে পারা যায়, অতিসংক্ষেপে কিছু উদ্ধৃতি দেয়া যাক।

“বাঙ্গালী জাতির জন্য এটা অতঃন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, স্বাধীন বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যতগুলো সরকার গঠিত হয়েছে, প্রত্যেকে একাত্তরের ঘাতকদের পুনর্বাসনের জন্য কম বেশী দায়ী। শেখ মুজিবর রহমান ঘাতক ও দালালদের বিচার না করে ক্ষমা করেছিলেন, জিয়াউর রহমান তাদের রাজনীতি করার অধিকার দিয়ে নিজের মন্ত্রীসভায়ও ঠাঁই দিয়েছেন এবং বর্তমানে হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ একই নীতি নিষ্ঠার সাথে পালন করছেন।…ফলে এটা খুবই স্বাভাবিক যে এই সব সরকারের আমলে মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস সরকারীভাবে রচিত হবে সেখানে সত্য গোপন করা হবে, ঘাতকদের আড়াল করা হবে।” [পৃষ্ঠা ১১-১২]

“ক্ষমতাসীন আওয়ামি লীগ সরকারের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য সদস্য এই হত্যাযজ্ঞকে নজিরবিহীন বর্বরতা বলে উল্লেখ করে এর বিচারের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন। এই ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের জন্য দায়ী ব্যক্তিরা জেনেভা কনভেনশনের সুবিধা পাওয়ার অধিকার হারিয়েছে বলেও তাঁরা মত প্রকাশ করেন। কিন্তু এর ভেতরে চলছিল ভিন্ন আর এক খেলা। স্বাধীনতাবিরোধী কুখ্যাত খুনী দালালদের জনরোষ থেকে বাঁচানোর জন্য আওয়ামী লীগ সরকার ১৬ ডিসেম্বর থেকেই প্রচেষ্টা চালানো শুরু করে। ১৬ ডিসেম্বর বিকাল থেকে কুখ্যাত খুনী এবং দালালদের জন্য একমাত্র নিরাপদ স্থল হয়ে দাঁড়ায় জেলখানা। কুখ্যাত দালালদের কাছ থেকে সে সময় আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে ১১ হাজার লিখিত আবেদনপত্র জমা পড়েছিলো, তাদেরকে জেলখানায় সরিয়ে নেয়ার জন্য। এদের বিচারের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার কালক্ষেপন নীতি গ্রহণ করেন।” [পৃষ্ঠা ১৭]

“বিভিন্ন মহল থেকে দালালদের বিচারের জন্য সংক্ষিপ্ত আদালতের দাবীকে উপেক্ষা করে ২৪ জানুয়ারী জারী করা হয় ‘বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) অধ্যাদেশ ১৯৭২’। দালালদের বিচারের জন্য এই আইনে দুবছরের জেল থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়। এই আদেশ অনুযায়ী আসামীর ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপীল করার অধিকার থাকলেও ফরিয়াদীকে ট্রাইব্যুনালের বিচার্য অপরাধের জন্য অন্য কোন আদালতের বিচার প্রার্থনা করার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। গণহত্যাকারী ও দালাল নেতাদের সুকৌশলে রক্ষা করার জন্যই প্রণীত হয়েছিল এই আইন। কারণ আইনের ৭ম ধারায় বলা হয়েছিল, থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি যদি কোন অপরাধকে অপরাধ না বলেন তবে অন্য কারো কথা বিশ্বাস করা হবে না, অন্য কারো অভিযোগের ভিত্তিতে বিচার হবে না ট্রাইব্যুনালে। অন্য কোন আদালতেও মামলা দায়ের করা যাবে না। দালালদের আত্মীয়-স্বজনের ওসিকে তুষ্ট করার মত আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল, স্বজন হারানো নির্যাতিত দরিদ্র জনসাধারণের তা ছিল না।” [পৃষ্ঠা ১৯]

“দালাল আইন কুখ্যাত খুনী দালালদের জন্য রক্ষাকবচ হিসাবে দেখা দেয়। যে শান্তি কমিটির মূল কাজ ছিল নিরপরাধ বাঙ্গালীদের হত্যা তালিকা প্রস্তুত করা এবং তাদের হত্যার জন্য পাকসেনাকে সহায়তা করা, তার সদস্যরা সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড পেয়ে নিস্তার পেয়ে যায়।…৩০ নভেম্বর ১৯৭৩ তারিখে তথাকথিত সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আগে ৩১ অক্টোবর ১৯৭৩ পর্যন্ত দালাল অধ্যাদেশে অভিযুক্ত মোট ৩৭ হাজার ৪ শত ৭১ জনের মধ্যে ২ হাজার ৮ শত ৪৮ জনের মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল। এর মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছিল ৭ শত ৫২ জন, বাকী ২ হাজার ৯৬ জন বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। এর মধ্যে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয় মাত্র এক জন রাজাকারকে। সুতরাং সহজেই প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কি গণহত্যাযজ্ঞের সেই ভয়াবহ দিনগুলিতে দালালরা কোন মানুষকে হত্যা করে নি, নির্যাতিত লক্ষ কোটি মানুষের জবানবন্দী কি সবই মনগড়া গল্প ছিল? নারকীয় বধ্যভূমিতে প্রাপ্ত বহুবিধ নৃশংস নির্যাতনের চিত্রসহ বিকৃত লাশগুলির সবই কি ছিল শুধু পাক সেনার শিকার? দালাল আইনের অধীনে ট্রাইব্যুনালের বিচারও ছিল প্রহসন মাত্র। একটি দৃষ্টান্ত এ প্রসঙ্গে দেয়া যেতে পারে। সাংবাদিক সাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সারের অপহরণকারী আল বদরটির বিরুদ্ধে হত্যার উদ্দেশ্যে শহীদুল্লা কায়সারকে অপহরণের অভিযোগ সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছিল, কিন্তু তবু তাকে মাত্র ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। গণহত্যার উদ্দেশ্যে শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল বদর ইত্যাদি দলে যোগদানকারী ব্যক্তিদের এভাবে লঘু শাস্তি দিয়ে কিছু দিনের জন্য কারাগারে রেখে বিক্ষুব্ধ জনতা এবং তাদের হাতে নির্যাতিত রোষানল থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। দালাল রক্ষার এই ষড়যন্ত্র কুখ্যাত দালালদের তথাকথিত বিচার হওয়ার পূর্বে জনসাধারণের কাছে চোখে পড়ে নি। তবে সচেতন বুদ্ধিজীবী শ্রেণী প্রথম থেকেই এই চক্রান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন।” [পৃষ্ঠা ২০]

“এ ছাড়া দালাল আইন সম্পর্কেও কিছু বক্তব্য রয়েছে আইন বিশেষজ্ঞদের। তাঁরা বলেছেন, দালাল আইন করা হয়েছে একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে সংঘটিত অপরাধের বিচার করার জন্য। কাজেই অপরাধে প্রমাণের জন্যে থাকতে হবে সাক্ষ্য প্রমাণের বিশেষ ধরণ। কিন্তু বর্তমান আইনের সাক্ষ্য প্রমাণের জন্য অনুসরণ করতে হয় একশ বছরের পুরনো ‘এভিডেন্স অ্যাক্ট’। এই অ্যাক্ট হয়েছে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য। কাজেই বিশেষ পরিস্থিতির অপরাধের প্রমাণের জন্য প্রণীত এভিডেন্স অ্যাক্ট অনুসরণ করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে নানা জটিলতা। ফলে অপরাধ প্রমাণ করা হয়ে উঠেছে অনেক ক্ষেত্রে দুঃসাধ্য।” (দৈনিক বাংলা, জুলাই ২৩ ১৯৭২) [পৃষ্ঠা ২০-২১]

“১৯৭৩ সালের ৩০ নভেম্বর একটি আকস্মিক সরকারী ঘোষণায় দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্ত এবং বিচারাধীন সকল আটক ও সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রতি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। ইতিপূর্বেকার সমস্ত প্রতিশ্রুতি, জনসভায় ক্রন্দন, মানব সমাজ ও ইতিহাসের কাছে দায়ী থাকার ভীতি প্রকাশ করে দেয়া বক্তব্য প্রতিজ্ঞা ইত্যাদি বিস্মৃত হয়ে শেখ মুজিবর রহমান ব্যক্তিগতভাবে বিশেষ নির্দেশ দেন যেন এক সপ্তাহের মধ্যে সমস্ত দালালকে ছেড়ে দেয়া হয়, যাতে তারা দেশের তৃতীয় বিজয় দিবস পালন করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী এই দালালদের দেশ গড়ার কাজে সামিল হওয়ার আহবান জানান। সাধারণ ক্ষমা ঘোষনার এক সপ্তাহের মধ্যেই ‘মালেক মন্ত্রীসভার সদস্যবর্গ, কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি এবং শান্তি ও কল্যান পরিষদের নেতৃবৃন্দ এবং বুদ্ধিজীবী হত্যার চক্রান্তকারী দালালসহ মূল স্বাধীনতাবিরোধীরা জেল থেকে বেরিয়ে আসে। এভাবেই মানবেতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড পরিচালনাকারী উন্মাদদের আবার স্বজন হারানো জনতার মাঝে ছেড়ে দেয়া হয়। এই সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরও সরকারী গেজেটে আত্মগোপনকারী দালালদের নাম ঠিকানাসহ আদালতে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ এবং অন্যথায় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার হুঁশিয়ারী জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারী করা সমন প্রকাশিত হতে থাকে, কারণ ইতিমধ্যেই তা মুদ্রিত হয়ে গিয়েছিল। একাত্তরের ঘাতক ও দালালদের কেন ক্ষমা করা হল এ নিয়ে আওয়ামী লীগ মহল ও বিরোধী মহলের ধারণা সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। আওয়ামী লীগের আবেগাক্রান্তরা মনে করেন দালালদের ক্ষমা করাটা ছিল ‘বঙ্গবন্ধুর মহানুভবতা’, দালালদের পুনর্বাসনের জন্য তাঁকে কোনো ভাবেই দায়ী করা যাবে না। অপেক্ষাকৃত যুক্তিবাদীদের বক্তব্য- পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙ্গালীদের উদ্ধার করার জন্য নাকি দালালদের ক্ষমা করতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। বিরোধী পক্ষ অবশ্য এ যুক্তি খণ্ডণ করে বলেছেন, আটকে পড়া বাঙ্গালীদের মুক্তির জন্য ৯৬ হাজার যুদ্ধবন্দী পাক বাহিনীই যথেষ্ট ছিল।…এ কথা অস্বীকার করা উপায় নেই, ব্যক্তিগতভাবে শেখ মুজিবর রহমান দালালদের ক্ষমা করার ক্ষেত্রে মহানুভবতা দেখাতে পেরেছেন শ্রেণীস্বার্থ অভিন্ন বলে। ’৭১ এর এই নৃশংস ঘাতকদের সঙ্গে এক যুগ পরেও আওয়ামী লীগের সৌহার্দ্যমূলক সম্পর্কের অবনতি যে ঘটেনি গত কয়েক বছরে তাদের কার্যকলাপই সেটা প্রমাণ করেছে। সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার নামে আওয়ামী লীগ জামাতে ইসলামের মতো ঘাতকদের দলকে শুধু রাজনৈতিক মর্যাদাই প্রদান করে নি, জামাতের নতুন করে শক্তিবৃদ্ধির পথও প্রশস্ত করেছে।” [পৃষ্ঠা ২২]

শহিদ পরিবারগুলো সাধারণ ক্ষমাকে ঠিক কিভাবে দেখেছিলেন?

“স্বাধীনতা যুদ্ধে শহিদ তরুণ মুক্তিযোদ্ধা রুমির মা লেখিকা জাহানারা ইমাম বলেছেন, ‘গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যায় যাদের ভূমিকা সুষ্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছিল, স্বাধীনতার পর পরই তাদের ফাঁসি দেয়া উচিত ছিলো। কিন্তু সাধারণ ক্ষমার জন্য সেটা হয় নি। তৎকালীন সরকারের সাধারণ ক্ষমার সিদ্ধান্ত ছিল মারাত্মক একটি ভুল। সেদিন ক্ষমা ঘোষণা করা না হলে ঘাতকরা নিজেদের সমাজে পুনর্বাসিত করার সুযোগ পেতো না।” (সাপ্তাহিক বিচিত্রা, স্বাধীনতা দিবস ’৮৭ বিশেষ সংখ্যা) [পৃষ্ঠা ২২-২৩]

“প্রখ্যাত সাংবাদিক শহীল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার বলেন, বর্তমানে রাজাকার, আল বদরদের যে দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছে তা শেখ মুজিবের সাধারণ ক্ষমারই ফল। ওই ক্ষমা ছিল বিচার-বুদ্ধি হীন। সেদিন সরকার যদি ঘাতকদের বিচার করে সাজা দিত, তাহলে আজ এ অবসথা হত না।” (ঐ) [পৃষ্ঠা ২৩]

“স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রারম্ভে হানাদার বাহিনীর দোসরদের হাতে নিহত, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী’ গানের অমর সুরকার শহীদ আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী সারা মাহমুদ বলেন, সাধারণ ক্ষমা ঘোষনা কোনো ভাবেই উচিত হয় নি।” (ঐ) [পৃষ্ঠা ২৪]

“স্বাধীনতাযুদ্ধের শুরুতে নিহত জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতার স্ত্রী বাসন্তী গুহ ঠাকুরতা সাধারণ ক্ষমা সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রথমেই প্রশ্ন তোলেন যে, ১শ’ ৯৫ জন যুদ্ধ অপরাধী পাক সামরিক অফিসারদের কেন বিচার হল না? শেখ মুজিব তো বহুবার বললেন, যুদ্ধ অপরাধী পাক সামরিক অফিসারদের বিচার করবেন। কিন্তু পারলেন না। আবার তিনি এ দেশীয় ঘাতকদেরও ক্ষমা করে দিলেন। আর এই ক্ষমাটাই সব এলোমেলো করে দিলো। সেদিন যদি ক্ষমা না করে অন্তঃত দু’একজন ঘাতকেরও যদি সাজা হতো তাহলে অনেক শহীদ পরিবারই শান্তি পেতেন। তাছাড়া ঘাতকরাও আজ আর মাথাচারা দিয়ে উঠতে পারতো না।” (ঐ) [পৃষ্ঠা ২৪]

যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনে ও সামাজিক প্রতিষ্ঠায় জিয়া এরশাদদের মতো সামরিক শাসকদের ভূমিকা এতোটাই জানা যে তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার প্রয়োজন দেখি না। কিন্তু এই ঘৃণ্য কাজে আওয়ামি লিগের ভূমিকাটা অনেকেরই অজানা, কেননা ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার’ আফিম গিলিয়ে গিলিয়ে জনগণকে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের ব্যাপারে নির্লিপ্ত করে রাখা হয়েছে, আর যাঁরা নির্লিপ্ত হন নাই তাঁদেরকে বুঝ দেয়ার জন্য ঠিকাদার ইতিহাসবিদ দিয়ে কল্পকাহিনী রচনা করা হয়েছে। শহিদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবীতে আপোসহীন আন্দোলন যদি শুরু না হত, আমার সন্দেহ আছে, আওয়ামি লিগ আদৌ নতুন করে এই বিচার শুরু করতো কিনা। নতুন করে বিচার শুরু হওয়ার পরেও যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার রায় নিয়ে জামাতের সাথে আওয়ামি লিগের গোপন আঁতাত হয়েছে এই সন্দেহ থেকেই শাহবাগ আন্দোলনের সূত্রপাত হয় ২০১৩ সালে। ‘বয়সের বিবেচনায়’ গোলাম আযম মৃত্যুদণ্ড পান নাই, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার পালিয়ে গেছেন, এখনো ফেরারী। তবে কাদের মোল্লা, কামারুজ্জামান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী আর আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, আর মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে; জনগণের প্রাপ্তি এখন পর্যন্ত এটুকুই। জামায়াতে ইসলামীর যাবতীয় আর্থনীতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান পুরোধা মীর কাশেম আলীর ফাঁসির রায় হয়েছে।

কিন্তু ২০১৩ থেকে এই বিচারকে কেন্দ্র করে জামাত-শিবিরের তাণ্ডবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংখ্যাহীন মানুষ মর্মান্তিক অত্যাচারের শিকার হয়েছেন। পাঁচজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে, ধর্মীয় ফ্যাশিস্তদের হাতে খুন হয়েছেন ছয়জন ব্লগার-প্রকাশক। রাজীব, অভিজিৎ, বাবু, নিলয়, অনন্ত, আর দীপন। যেনো সরকার ডিল করছে যুদ্ধাপরাধীদের জ্ঞাতিগোষ্ঠীদের সাথে, আমরা একটা করে যুদ্ধাপরাধীকে ঝোলাবো, তোমরা পাল্লা দিয়ে ব্লগার-প্রকাশক কোপাও। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আওয়ামি লিগ সরকার যদি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অতি দ্রুত সম্পন্ন করতো তাহলে আজকে অন্ধকারের শক্তির হাতে বাংলাদেশকে এভাবে তার কিছু মেধাবী প্রাণবান সন্তানকে হারাতে হতো না। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে আওয়ামি লিগের আপোসকামী গণবিরোধী রাজনীতিই এই দেশে যুদ্ধাপরাধীদের এতো বছর ধরে বেচেবর্তে থাকার এবং যাবতীয় গণবিরোধী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার জমিন তৈরি করার জন্য মূলত দায়ী। এই সহজ কথাটা যদি কারো মাথায় না ঢোকে, আমি শব্দের হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে, তার মাথায় ঢোকাবো।

ইতিহাস হচ্ছে ক্ষমতার ইরেজারের বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম। চেক রিপাবলিকের রেবেল রাইটার মিলান কুণ্ডেরা লিখেছিলেন। সেই স্পিরিটেই এই লেখাটা তৈরি করা হল, জনগণের জানা দরকার, আওয়ামি লিগের আদি পাপের এই এপোক্রাইফাল ইতিহাস।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়ঃ প্রবেশিকা

  1. .
    ইস্টিশনবিধি পড়ে ব্লগিং করার জন্য অনুরোধ করা হল। নীচে ইস্টিশনবিধি-৫ নীচে কোড করা হল:

    ৫. প্রথম পাতায় একজন যাত্রী’র দুই’য়ের অধিক পোস্ট এলে ফ্লাডিং বলে গণ্য করা হবে। কোন যাত্রী’র প্রথম পাতায় দুই’য়ের অধিক পোস্ট দেখা গেলে পুর্বের পোস্টের গুরুত্ব বিবেচনায় যে কোনও দুইটি রেখে অন্য পোস্টগুলো প্রথম পাতা হতে সরিয়ে দেয়া হবে। যে কোনো ধরনের স্প্যামিং, কোডিং মুছে দেয়া হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

2 + 7 =