তুরস্ক বা পাকিস্তান কেন গনহত্যা সমর্থন করে ? আসুন আসল কারন ভালভাবে জানি

তুরস্কে ১৯১৫ সালে আর্মেনিয়ায় গনহত্যা চালায় , যাতে মারা যায় প্রায় ১৫ লক্ষ আর্মেনিয়ান। তারা সবাই খৃষ্টান ছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার যুদ্ধে বাংলাদেশে ৩০ লক্ষ লোক মারা যায়। তারা ছিল মুসলমান, হিন্দু , খৃষ্টান ইত্যাদি। মজার বিষয় হলো তুরস্ক বা পাকিস্তান কেউই কিন্তু এই গনহত্যাকে স্বীকার করে না। কেন এই গনহত্যাকে তারা স্বীকার করে না , সেটা বুঝতে গেলে আপনাকে ইসলাম সম্পর্কে জানতে হবে। তাহলেই সেটা বোঝা যাবে।

প্রথমত : ইসলাম সমগ্র অমুসলিম তথা খৃষ্টান , ইহুদি, মুনাফিক , মুর্তাদ , কাফের ইত্যাদির বিরুদ্ধে চিরকালীন যুদ্ধ তথা জিহাদ জারী করে রেখেছে। কোরান বলছে-

সুরা তাওবা – ৯: ৫: অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে বসে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

অর্থাৎ মুহাম্মদের সময় একটা নিষিদ্ধ মাস ছিল, সেই মাস অতিক্রান্ত হয়ে গেলে , মুশরিকদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে , পাকড়াও করে হত্যা করতে হবে। আর এই বিধান চিরকালীন , এটা শুধুমাত্র মুহাম্মদের সময়কালের জন্যে প্রযোজ্য না। খেয়াল করতে হবে , সুরা আত তাওবা কোন যুদ্ধের প্রেক্ষিতে নাজিল হয় নি। মুহাম্মদের মক্কা বিজয়ের এক বছর পর এই সুরা নাজিল হয়, অর্থাৎ তখন কোন অমুসিলম গ্রুপ মুহাম্মদকে আক্রমন করতে যাচ্ছিল না , বরং মক্কা মদিনা ও তার আশ পাশের সকল অমুসলিম গোষ্ঠি হয় তার পদানত ছিল অথবা তার সাথে যে কোন রকম বন্ধুত্বপূর্ন চুক্তিতে আবদ্ধ ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই কোরানে বলছে –

সুরা তাওবা -৯: ১: সম্পর্কচ্ছেদ করা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে।

অর্থাৎ কোন কারন ছাড়াই মুহাম্মদ অমুসলিমদের সাথে সব রকম চুক্তি বাতিল করে দিচ্ছে। এখানে বলছে না যে , অমুসলিমরা মুহাম্মদকে আক্রমন করতে যাচ্ছিল আর তাই তাদের সাথে সকল চুক্তি বাতিল করা হচ্ছে। সুতরাং ৯:১ অনুযায়ী সকল রকম বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক বাতিল করে দিয়ে ৯: ৫ আয়াতে চিরকালীন যুদ্ধের বিধান জারী করা হচ্ছে , আর বলা হচ্ছে , মুশরিকদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে , সেখানেই হত্যা করতে হবে। ইবনে কাসিরের তাফসির সহ অন্যান্য সকল প্রসিদ্ধ তাফসিরকারের বক্তব্যও তাই। এছাড়া আরও একটা আয়াত দেখা যাক –

সুরা তাওবা – ৯: ২৯: তোমরা যুদ্ধ কর আহলে-কিতাবের ঐ লোকদের সাথে, যারা আল্লাহ ও রোজ হাশরে ঈমান রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রসূল যা হারাম করে দিয়েছেন তা হারাম করে না এবং গ্রহণ করে না সত্য ধর্ম, যতক্ষণ না করজোড়ে তারা জিযিয়া প্রদান করে।

এই আয়াত দ্বারা বলা হচ্ছে , মুসলমানরা ইহুদি ও খৃষ্টানদের ওপর চিরকালীন যুদ্ধ জারি রাখবে , যতক্ষন না তারা ইসলাম কবুল করবে অথবা জিজিয়া কর প্রদান করে নত মস্তকে মুসলমানদের কাছে অবস্থান করবে। এই দুই আয়াতের বিধান খুব সুন্দরভাবে বর্নিত আছে সহিহ হাদিসে , যেমন –

সহিহ মুসলিম :: খন্ড ১ :: হাদিস ৩০
আবু তাহির, হারমালা ইবন ইয়াহইয়া ও আহমাদ ইবন ঈসা (র)……আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন,আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই – এ কথার সাক্ষ্য না দেওয়া পর্যন্ত লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আমি আদিষ্ট হয়েছি । সূতরাং যে কেউ আল্লাহ ছাড়া ইলাহ নেই স্বীকার করবে, সে আমা হতে তার জানমালের নিরাপত্তা লাভ করবে; তবে শরীআতসম্মত কারণ ব্যতীত । আর তার হিসাব আল্লাহর কাছে ।

সহিহ মুসলিম :: খন্ড ১ :: হাদিস ৩৩
আবু গাসসান-আল মিসমাঈ মালিক ইবন আবদুল ওয়াহিদ (র)……আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে,রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, লোকদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি, যতক্ষন না তারা সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল এবং নামায কায়েম করে, যাকাত দেয় । যদি এগুলো করে তাহলে আমা থেকে তারা জানমালের নিরাপত্তা লাভ করবে, তবে শরীআতসম্মত কারন ছাড়া । আর তাদের হিসাব-নিকাশ আল্লাহর কাছে ।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে , অটোমান খিলাফত ১৯১৫ সালে যে খৃষ্টান আর্মেনিয়ানদের ওপর গনহত্যা চালিয়েছিল , সেটা ছিল ১০০% কোরান হাদিস তথা ইসলাম সম্মত। অটোমান খিলাফতে এই খৃষ্টান আর্মেনিয়ানরা জিজিয়া কর দিয়ে নত মস্তকে বাস করত। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় খলিফা ও তুরস্কের মুসলমান নেতারা সন্দেহ করে যে , এই যুদ্ধের ফাকে , আর্মেনিয়ার খৃষ্টানরা স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারে অথবা রাশিয়ার সাথে যোগ দিতে পারে , সেই সন্দেহে , তাদেরকে চিরতরে দুনিয়া থেকে উচ্ছেদ করে দেয়ার চেষ্টা করা হয় ও প্রায় ১৫ লক্ষ আর্মেনিয়ানকে হত্যা করা হয়, বাকী থাকে মাত্র ৩.৫ লক্ষের মত আর্মেনিয়ান খৃষ্টান। বর্তমানে আই এস ঠিক একই ভাবে সিরিয়া ইরাকে তাদের ইসলামী খিলাফতে বসবাসরত খৃষ্টান ও ইয়াজিদিদেরকে চিরতরে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিচ্ছে অর্থাৎ তারাও তুরস্কের দেখান পথে গনহত্যা চালাচ্ছে।

এ তো গেল তুরস্কের কথা , কিন্তু পাকিস্তানীরা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে কিভাবে গনহত্যা চালাল যাতে অধিকাংশই ছিল মুসলমান ? এখানে খেয়াল করতে হবে , আমরা বাঙ্গালীরা যাদেরকে তখন মুসলমান বলতাম, পাকিস্তান অথবা আরব বা তুরস্কের চোখে তারা কখনই প্রকৃত সহিহ মুসলমান ছিল না। সবার জন্যে জানা দরকার , সেই ১৯৭১ সালে এক ইরাক ছাড়া আর কোন আরব দেশই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল না। তেমনি ছিল না তুরস্কও। কেন তারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিল না ? কারন একটাই , তারা মনে করত তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানে যারা নিজেদেরকে মুসলমান পরিচয় দেয় , তারা আসলে প্রকৃত মুসলমান ছিল না, ছিল মুনাফিক। এরা মুসলমান নাম ধারন করে , হিন্দুয়ানী বাঙ্গালী সংস্কৃতি অনুসরন করত , – একুশে ফ্রেব্রুয়ারীতে শহিদ মিনারে ফুল দিত , পয়লা বৈশাখ সহ অন্যান্য অনেক উৎসব পালন করত। আর এসব সংস্কৃতির সাথে ইসলামের কোনই সম্পর্ক নেই। আর তা ছাড়া , এরা এটাও জেনেছিল , তলে তলে তৎকালীন আওয়ামী লিগের নেতারা মুশরিক ও কাফির ভারতের সাথে বন্ধুত্ব করে পূর্ব পাকিস্তানকে বিভক্ত করে আলাদা রাষ্ট্র করতে চায়। যেমন – আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা কোর্টে প্রমানিত না হলেও , ঘটনা কিন্তু সত্য ছিল। অর্থাৎ শেখ মুজিবুর রহমান সত্যি সত্যি মুশরিক ভারতের সাথে বন্ধুত্ব করে ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তানকে বিভক্ত করতে ষড়যন্ত্র করছিলেন। অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের কথিত মুসলমানরা ছিল আসলে সবাই মুনাফিক। আর মুনাফিকের শাস্তি কি ? সোজা মৃত্যুদন্ড।

ঠিক সেই কারনে , পাকিস্তান যখন নির্বিচারে নিরস্ত্র বাঙ্গালীদের ওপর গুলি চালিয়ে কীট পতঙ্গের মত তাদেরকে হত্যা করছিল, তখন তুরস্ক সহ সকল আরব দেশই পাকিস্তানকে সেই কাজে সমর্থন করছিল ও উৎসাহ দিচ্ছিল। তারা এই ভেবে আনন্দ করছিল যে, পাকিস্তান কর্তৃক কিছু মুনাফিক নিধন করা হচ্ছে।

সুতরাং তুরস্ক যেমন কোরান হাদিসের বিধান মেনে খৃষ্টান নিধন করে গনহত্যা চালিয়েছিল , তেমনি পাকিস্তান বাংলাদেশে মুনাফিক হত্যা করে গনহত্যা চালিয়েছিল। অমুসলিমরা ইসলামী দৃষ্টিতে মুসলমানদের কাছে প্রকৃত মানুষ হিসাবে গন্য নয়। বরং নিকৃষ্ট জীব হিসাবে গন্য । এ ধরনের নিকৃষ্ট জীবকে গনহারে হত্যা করলে তাকে গনহত্যা বলা যাবে না কোন মতেই। ঠিক সেই কারনেই তুরস্ক বা পাকিস্তান কেউ ই তাদের দ্বারা কৃত গনহত্যা স্বীকার করে না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 27 = 28