আতরের শিশিতে বিষ রাখলে কি তা আতর হয়ে যায়?

ফরহাদ মজহার এর একটা লেখা দেখলাম মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের সমালোচনা করেছেন ধর্ম ও মার্ক্সবাদ বিষয়ে। তার নিজের পত্রিকায় ছাপিয়েছেন লেখাটা। এই লেখাটি মজহারের সেই লেখা পাঠের একটি প্রতিক্রিয়া, নিতান্তই একজন পাঠকের প্রতিক্রিয়া। এই ব্লগপোস্ট এর পাঠক যারা তাদেরকে একমত হতে হবে এমন কোনও কথা নেই।

ফরহাদ মজহারের দুইটা গুন।
১ — তিনি খুব ভালো কবিতা লিখতে পারেন।
২ — তিনি কবিতার মতো করে মিথ্যা বয়ান গুলো লিখতে পারেন দিনের পর দিন

মার্কস লিখেছিলেন ধর্ম হচ্ছে আফিমের মতো, ফরহাদ মজহার ও তার শিষ্যরা ব্যাখ্যা করেন, না না মার্কস সাহেব তো নেশা অর্থে আফিম বলেন নাই, তিনি বলেছেন ঔষুধ অর্থে। আচ্ছা ঠিক আছে ঔষুধই ধইরা নিলাম, কিন্তু আফিম কিসের ঔষুধ? চেতনা নাশক বা বেদনা নাশক ঔষুধ। এই ঔশুধ কি বেদনার মুল কারন দূর করে? যন্ত্রণার মুল কারন দূর করে? নাকি শুধু কিছু সময়ের জন্যে যন্ত্রণা কে ভুলিয়ে রাখে? এখানে কবি ও তার শিষ্যরা নিরব।
ধর্ম মানুষের মূল সমস্যার সমাধান করেনা, বরং মানুশকে পরকালের আরাম আয়েশের নামে বর্তমান যন্ত্রণার কথা ভুলিয়ে রাখে, ঠিক যেভাবে আফিম বেদনার মূল কারন কে কখনই সমাধান করেনা, কেবল ক্ষণিকের জন্যে ঝিম ঝিম ভাব তৈরী করে বেদনার অনুভব কে লঘু করে। ধর্মের প্রলোভনে মানুষ পরকালের আঙ্গুর – খোরমা – খেজুর এর লোভে, বর্তমান কালের যন্ত্রণাকে মেনে নেয়। তো ধর্ম কি আফিমের মতো কাজ করে?

মার্কস সাহেব লিখেছিলেন – “For Germany the criticism of religion is in the main complete, and criticism of religion is the premise of all criticism” অর্থাৎ “জার্মানিতে ধর্মের সমালোচনা মোটামুটি ভাবে শেষ হয়েছে, এবং ধর্মের সমালোচনা হচ্ছে সকল সমালোচনার শুরু” …

কিন্তু এখানে আমাদের কবি হয়ে যান এক অন্যরকমের কবি অর্থাৎ মার্কস সাহেবের মূল কথাকে নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে মার্কস সাহেবের নামে চালানোর মতো প্রতারনা। উপরের ইংরাজী বক্তব্যটির বাংলা অনুবাদ জনাব মজহার এবং তার শিষ্যরা করেন এভাবেঃ

“জর্মন দেশে ধর্মের পর্যালোচনা মোটামুটি সম্পূর্ণ, আর ধর্মের পর্যালোচনা আর সব কিছু পর্যালোচনার পূর্বশর্ত”। (সূত্রঃ চিন্তায় মজহার সাহেবের লেখা এবং মোকাবিলা পুস্তক)

বলুন তো কোন অভিধানে Criticism শব্দটার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় “পর্যালোচনা” ? আমরা জানি Criticism শব্দটির বাংলা অর্থ হচ্ছে সমালোচনা, কিন্তু মজহার ও তার শিষ্যদের অভিধানে এই শব্দটির অনুবাদ হয়ে যায় পর্যালোচনা, সমালোচনা নয়। কারন মার্কস কি ধর্মের সমালোচনা করতে পারেন? কখনই নয়, তাই না? Criticism এই শব্দটির অর্থ এইভাবে বিকৃত করার মধ্যে দিয়েই মজহার ও তার শিষ্যদের ধর্ম ও মার্কস বিষয়ে বাকি সকল লেখা দাঁড়িয়ে আছে।

হাতের কাছে একটা ইংরাজি থেকে বাংলা অভিধান আছে, একটু দেখে নিলাম, Criticism শব্দটির অর্থ কি আছে, আসেন আমরা সবাই একটু দেখে নেই।

সংসদ অভিধান, ষষ্ঠ সংস্করণ (সংশোধিত), ২০১৫ পৃষ্ঠা ৩১১ঃ Criticism – কারও বা কোনও কিছুর অবহিত ত্রুটি বিচ্যুতির জন্যে অননুমোদন বা সমালোচনা বা নিন্দা (The expression of disapproval of someone or something on percieved faults or mistakes)।

Criticism কে খুব সুদুরতম অর্থে হয়তো পর্যালোচনা বলা যেতে পারে, যেমন Critical Analysis বা Critical review এই শব্দগুলোর অর্থ হয়তো পর্যালোচনার কাছাকাছি কিছু একটা। কিন্তু Criticism শব্দের মূল বা প্রধান অর্থ সমালোচনার বদলে “পর্যালোচনা” ব্যবহার করার পেছনের উদ্দেশ্যটা সৎ নয়, বরং মূল অর্থকে টুইস্ট করাই হচ্ছে এর উদ্দেশ্য। সমালোচনার বদলে “পর্যালোচনা” ব্যবহার করলে অর্থটা বেশ একটু নরম সরম হয়, সুতরাং মার্কস সাহেবের ধর্ম বিরোধিতার বিষয়টিকে আড়াল করাটা সহজ হয়। ভাগ্যিস বেচারা কার্ল মার্কস সাহেব অনেক আগেই গত হয়েছেন, নইলে মজহার সাহেব ও তার শিষ্যরা হয়তো দাবীই করতেন যে কার্ল মার্কস সাহেব মজহার সাহেবের কানে কানে আসল কথাটি বলে গিয়েছিলেন যে Criticism শব্দের অর্থ সমালোচনা নয় “পর্যালোচনা” !

মজহার সাহেবের এক নব্য শিষ্য আবার আরেক কাঠি সরেস, তিনি মূল জার্মান শব্দ ”KritiK” যা মার্কস তার মূল লেখায় ব্যবহার করেছিলেন, সেই শব্দটির অনুবাদ করেছেন ইংরাজি Critique হিসাবে, Criticism হিসাবে নয়, তার পরে সেই Critique শব্দটিকে বাংলায় করেছেন “পর্যালোচনা”। সমালোচনা কে “পর্যালোচনা” বানানোর কি কষ্টকর প্রচেষ্টা মজহার এবং তার শিষ্যদের, হাসিই পেয়েছে আমার যতবার মজহার সাহেবের লেখা পড়েছি ততবারই।

আমি মজহারের সেই নয়া শিষ্য বেচারাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম ”Kritik” শব্দটির ইংরাজি অর্থ কোনও একটা জার্মান থেকে ইংরাজী অভিধানের রেফারেন্স দিয়ে প্রমান করতে পারবেন কিনা। অন্তত ”Kritik” শব্দটির প্রধান বা মূল অর্থ যে সমালোচনা নয়, এই বিষয়টি প্রমান করতে পারবেন কিনা? তিনি বলেছিলেন অপেক্ষা করুন, প্রমান আসছে। আমি আজও অপেক্ষায় আছি, নাদের আলী আর আসলেন না শব্দটির সত্যিকারের অর্থ ও রেফারেন্স নিয়ে। কারন গুগোল অভিধান যাদের ভরসা, তাঁরা কোনও রেফারেন্স বইয়ের ভার নিতে পারেন না। কি আর করা। আমার কাছে দুটি জার্মান টু ইংরাজি অভিধান আছে, যেখানে ”Kritik” শব্দটির প্রথম অর্থটিই হচ্ছে ইংরাজি Crtiticism বা বাংলায় সমালোচনা, “পর্যালোচনা” নয়।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেনও মজহার ও তার শিষ্যদের এই রকমের শব্দ নিয়ে খেলা করতে হয়। মার্কস কি সরাসরি লেখেন নি, ধর্ম হচ্ছে মানুষের তৈরী, মানুষ ধর্মের তৈরী নয়। মার্কস কি লেখেন নি যে ধর্ম হচ্ছে সেই মানুষের বোধ যে নিজেকে কখনই খুঁজে পায়নি অথবা যে নিজেকে আবারো হারিয়ে ফেলেছে? মজহার ও তার শিষ্যদের শব্দ নিয়ে খেলতে হয়, শব্দের মানে বদলে ফেলতে হয়, কারন মার্কস নিজে যা বলেছেন, নিরেট সেই কথা গুলো দিয়ে মজহার ও তার শিষ্যদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা যাবেনা। সুতরাং মার্কসের কাধে বন্দুক রেখে হেফাজতি এজেন্ডাকে বাস্তবায়ন করতে হলে “আফিম” কে চেতনা নাশক না বলে “ঔশুধ” বলতে হয়। কে Crtiticism কে সমালোচনা না বলে “পর্যালোচনা” বলতে হয়।

কিন্তু ভাইয়া, আফিম কে “ওষুধ” বললে কি আফিমের চরিত্র বদলে দেয়া যায়? ধর্মকে নরম সরম শব্দ দিয়ে ব্যাখ্যা করে কি ধর্মের চরিত্র – চেহারা বদলে দেয়া যায়? যায়না।

আতরের বোতলে বিষ রাখলে কি তা আতরে পরিনত হয়? হয়না !

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “আতরের শিশিতে বিষ রাখলে কি তা আতর হয়ে যায়?

  1. আতরের বোতলে বিষ রাখলে যেমন
    আতরের বোতলে বিষ রাখলে যেমন আতরে পরিণত হয় না, তেমনি ভণ্ড মার্কসিস্ট ও হিন্দু ভণ্ড এক্টিভিস্ট দিয়ে ইসলাম ধর্মও রক্ষা করা যাবে না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 81 = 89