নামাজ পড়ার সময় আসলে কার কাছে মাথা নত করেন আল্লাহ্‌র বান্দারা?

বিষয়টা ছোট বেলা থেকেই মাথায় ঘুরত । সেটা হলো আমরা নামাজ পড়ার সময় সবাই পশ্চিম মূখো হয়ে কেন মাথা ঠুকে কেন? তখন ভাবতাম আল্লাহ বোধ হয় পশ্চিমের কোথাও থাকে কারন আল্লাহ্‌র বান্দারা যখন নামাজ পড়ার জন্য মাথা ঠুকে সেটা তো আসলে আল্লাহর কাছেই মাথা নত করা। তাই নয় কি ? একটু বড় হওয়ার পর বিষয়টা নিয়ে নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করতে থাকি ও এর কারন অনুসন্ধান করতে থাকি। এ অনুসন্ধানে যা পাওয়া গেল। এবার সেটা বলা যাক।

প্রথমেই আমরা দেখব আল্লাহ কোথায় অবস্থান করে। এ সম্পর্কে কোরআন কি বলে ?

তিনি নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এতদুভয়ের অন্তর্বর্তী সবকিছু ছয়দিনে সৃস্টি করেছেন, অতঃপর আরশে সমাসীন হয়েছেন। তিনি পরম দয়াময়। তাঁর সম্পর্কে যিনি অবগত, তাকে জিজ্ঞেস কর। সূরা- ফুরকান-২৫:৫৯

আল্লাহ যিনি নভোমন্ডল, ভুমন্ডল ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আরশে বিরাজমান হয়েছেন। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন অভিভাবক ও সুপারিশকারী নেই। এরপরও কি তোমরা বুঝবে না?
সূরা-সাজদা, ৩২: ০৪

এছাড়া কিছু হাদিসও আছে এ বিষয়ে –

আল্লাহর আরশ হলো আসমান সমূহের ওপর অবস্থিত।
সূনান আবু দাউদ, বই-৪০, হাদিস- ৪৭০৮

জান্নাতুল ফেরদাউসের ওপর আ ল্লাহর আরশ অবস্থিত।
সহি বুখারী, বই-৫২, হাদিস-৪৮

শুরুতে কিছুই ছিল না, তারপর আল্লাহ তার সিংহাসন তৈরী করলেন যা ছিল পানির ওপর, তার তিনি তার বইতে সবকিছু লিখলেন।
সহি বুখারী, বই -৫৪,হাদিস-৪১৪

যখন সা’দ বিন মূয়াদের লাশ আল্লাহর কাছে রাখা হলো তখন তার আরশ কেঁপে উঠল। সহি মুসলিম. বই-৩১, হাদিস-৬০৩৩

এরকম আরও বেশ কিছু আয়াত ও হাদিস আছে যাতে বলা আছে যে আল্লাহ সাত আসমানের ওপর তার আরশে অবস্থান করে। অর্থাৎ দুনিয়ার কোথাও যে আল্লাহ থাকে না সেটা নিশ্চিত তবে দুনিয়া সহ সব যায়গাতে কি ঘটছে না ঘটছে সেটা সে প্রত্যক্ষ করে। তাহলে পশ্চিম দিক তথা মক্কার কাবা ঘরের দিকে মুখ করে মাথা নত করলে কিভাবে সেটা আল্লাহর কাছে মাথা নত করা হয় , কারন কাবা ঘরের মধ্যে তো আল্লাহ থাকে না?

তবে এ ব্যাপারেও আল্লাহর নির্দেশনা যা পাওয়া গেল তা হলো –

নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন। এখন আপনি মসজিদুল-হারামের দিকে মুখ করুন এবং তোমরা যেখানেই থাক, সেদিকে মুখ কর। যারা আহলে-কিতাব, তারা অবশ্যই জানে যে, এটাই ঠিক পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আল্লাহ বেখবর নন, সে সমস্ত কর্ম সম্পর্কে যা তারা করে।
সুরা বাক্কারা, ২: ১৪৪

আর যে স্থান থেকে তুমি বের হও, নিজের মুখ মসজিদে হারামের দিকে ফেরাও-নিঃসন্দেহে এটাই হলো তোমার পালনকর্তার পক্ষ থেকে নির্ধারিত বাস্তব সত্য। বস্তুতঃ তোমার পালনকর্তা তোমাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অনবহিত নন। সূরা আল বাকারা, ২: ১৪৯

এখন নির্বোধেরা বলবে, কিসে মুসলমানদের ফিরিয়ে দিল তাদের ঐ কেবলা থেকে, যার উপর তারা ছিল? আপনি বলুনঃ পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই। তিনি যাকে ইচ্ছা সরল পথে চালান।সুরা আল বাকারা, ২: ১৪২

উক্ত আয়াত সমূহে দেখা যাচ্ছে আল্লাহ নিজেই বলেছে কাবা ঘরের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তে। ভাল কথা। কিন্তু বললেই কি আমরা যখন নামাজ পড়ি ও মাথা নত করি , সেটা কি তার কাছে করা হলো ? আল্লাহ যখন নিজে কাবা ঘরের মধ্যে থাকে না তখন সে মুসলমানদেরকে কাবা ঘরের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তে বলল কেন ? সে তো জানত এতে করে তার কাছে মাথা নত করা হবে না। তাই নয় কি ? তাহলে কার কাছে আসলে আমরা মাথা নত করি ? এ ব্যপারে কিছু হাদিস দেখা যাচ্ছে-

বারা বিন আযিব বর্ণিত- আল্লাহর রসূল বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে ষোল বা সতের মাস নামায পড়লেন কিন্তু তিনি কাবা ঘরের দিকে মুখ করে নামায পড়তে ইচ্ছা পোষণ করতেন, তাই আল্লাহ নাজিল করলেন এ আয়াত – নিশ্চয়ই আমি আপনাকে বার বার আকাশের দিকে তাকাতে দেখি। অতএব, অবশ্যই আমি আপনাকে সে কেবলার দিকেই ঘুরিয়ে দেব যাকে আপনি পছন্দ করেন। এখন আপনি মসজিদুল-হারামের দিকে মুখ করুন এবং তোমরা যেখানেই থাক, সেদিকে মুখ কর। যারা আহলে-কিতাব, তারা অবশ্যই জানে যে, এটাই ঠিক পালনকর্তার পক্ষ থেকে। আল্লাহ বেখবর নন, সে সমস্ত কর্ম সম্পর্কে যা তারা করে। (২:১৪৪) ।
সহি বুখারি, বই-৮, হাদিস-৩৯২

এ থেকে বোঝা যাচ্ছে নবি নিজেই আসলে কাবা ঘরের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তে চাইতেন। এর আগে মুসলমানরা বায়তুল মোকাদ্দাসের দিকে মুখ করে সবাই নামাজ পড়ত। তাহলে হঠাৎ করে তিনি কাবা ঘরের দিকে মুখ করে নামাজ পড়তে চাইলেন কেন ? এখন অন্য আরও কিছু হাদিস দেখা যাক-

ইবনে আব্বাস বর্ণিত নবী বলেছেন-“ কাল পাথর বেহেস্ত থেকে পতিত হয়েছে।যখন প্রথম দুনিয়াতে এটা পতিত হয় তখন এর রং ছিল দুধের মত সাদা কিন্তু আদম সন্তানদের পাপ গ্রহণ করার ফলে এর রং কাল হয়ে গেছে”। তিরমিজি, হাদিস- ৮৭৭
ইবনে ওমর নবী কে বলতে শুনেছেন, “ কাল পাথর ও আর রুখ আল ইয়ামানি কে স্পর্শ করলে পাপ মোচণ হয়।তিরমিজি, হাদিস-৯৫৯

আমরা সবাই জানি কাবা ঘরের মধ্যে একটা কাল পাথর আছে যার নাম হযরে আসওয়াদ। হজ্জের সময় প্রতিটি মুসল্লি সেটাকে চুমু খাওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি করে। অনেক সময় সে হুড়োহুড়ির মাত্রা এত বেড়ে যায় যে মানুষ পদপিষ্ট হয়ে মারাও যায়। কিন্তু কেন তারা চুমু খায় ? তাও কিন্তু দেখা যাচ্চে উক্ত হাদিসে। সেখানে বলা হচ্ছে – চুমু খেলে মানুষের পাপ মোচন হয়। সেজন্যেই সম্ভবত: বলা হয় যে – যে হজ্জ করল সে যেন নতুন শিশু রূপে জন্ম গ্রহন করল অর্থাৎ তার সব পাপ মোচন হয়ে গেল। আর বলা বাহুল্য সব পাপই গ্রহন করে উক্ত কাল পাথর। এ পাথর সব সময় কাল ছিল না। বেহেস্ত থেকে এটা যখন দুনিয়াতে পড়ে তখন দুধের মত সাদা ছিল , কিন্তু মানুষের পাপ গ্রহন করার ফলে সে কাল হয়ে গেছে। বিষয়টা যে আসলেই তাই সেটা বোঝা যায় খোদ নবির আচরনে , যেমন –

আবিস বিন রাবিয়া বর্নিত- ওমর কাল পাথরের নিকট আসলেন এবং একে চুমু দিলেন, তারপর বললেন-আমি জানি তুমি একটা পাথর বৈ আর কিছু নও, তুমি কারও উপকারও করতে পার না , অপকারও করতে পার না। আমি যদি রাসুলুল্লাহকে না দেখতাম তোমাকে চুমু খেতে আমি তোমাকে চুমু খেতাম না। বুখারী, বই-২৬, হাদিস-৬৬৭

যায়েদ বিন আসলাম বর্নিত- ওমর বিন খাত্তাব কাল পাথরকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আল্লাহর কসম, আমি জানি তুমি একটা পাথর ছাড়া আর কিছু নও, তুমি না পার কারো উপকার করতে, না অপকার। নবীকে যদি আমি না দেখতাম তোমাকে চুমু খেতে আমি তোমাকে কখনও স্পর্শ করতাম না। বুখারী, বই-২৬, হাদিস-৬৭৫

সোয়াইদ বিন ঘাফালা বর্ণিত: আমি ওমরকে কাল পাথরকে চুমু দিতে ও হাত বুলাতে দেখেছি এবং বলতে শুনেছি এরকম- আমি দেখেছি আল্লাহর নবীর তোমার জন্য অনেক ভালবাসা ছিল।সহি মুসলিম, বই-৭,হাদিস-২৯১৬

উক্ত হাদিস সমূহ থেকে দেখা যাচ্ছে খোদ নবি প্রচন্ড ভাবে উক্ত পাথরকে শ্রদ্ধা করতেন ও যখনই কাবা ঘরে প্রবেশ করতেন তখনই তাকে চুমু খেতেন। আর সেটা নিশ্চয়ই এমনি এমনি না। কিন্তু তারই এক সাহাবি হযরত ওমর বিষয়টাকে সেভাবে গ্রহন করে নি আর সেটাও দেখা যাচ্ছে তার উক্ত হাদিসে তার বক্তব্যে । কিন্তু তার যুক্তিবাদী মন সেটা গ্রহন না করলেও কোন উপায় ছিল না কারন তিনি নবিজীর একজন অন্ধ অনুসারী। নবিজী যা বলেছেন ও করেছেন একজন আদর্শ মুসলমান হিসাবে তা বিনা প্রশ্নে অনুসরন করতে হবে , ঠিক সেটাই হযরত ওমর করে গেছে। কিন্তু তাতে কাল পাথরের যে অবস্থান নবিজীর কাছে তার কোন পরিবর্তন হয় না। অর্থাৎ নবিজীর কাছে কাল পাথরের এক মহা মাহাত্ম লুক্কায়িত ছিল যা হয়ত তিনি সবার সামনে কখনো প্রকাশ করেন নি কিন্তু নিজের আচরন দিয়ে সেটা বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন।

এখন সমস্যা কিন্তু জটিল আকার ধারন করল। সেটা হলো – মানুষের পাপ মাফ করা বা মোচন করার ক্ষমতা একমাত্র কার ? আমরা সবাই জানি সে ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। অথচ আমরা বিশ্বাস করি ও হাদিসেও আছে কাবা ঘরে রক্ষিত কাল পাথরেরও সেই একই ক্ষমতা বিদ্যমান। তাহলে বিষয়টা কি দাড়াল ? তাহলে উক্ত কাল পাথরই কি আল্লাহ ? আর সেকারনেই কি আমরা আমরা সবাই নামাজ পড়ার সময় কাবা ঘরের দিকে, তথা তার মধ্যে অতি সযতনে রাখা কাল পাথরের দিকে মুখ করে থাকি ও মাথা নত করি ? অর্থাৎ আমরা কি কাল পাথরকে সেজদা দেই?

বাস্তবে আমরা যারা কাবা ঘরের সামনে বসে নামাজ পড়ি না , অনেক দুরে বসে কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়ি , আমাদেরকে দেখলে আপাত: মনে হতে পারে আমরা সবাই আল্লাহর কাছেই সিজদা দিচ্ছি, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমরা আসলে কার কাছে সিজদা দিচ্ছি ? আমরা কি একবারও সেটা ভেবে দেখেছি ?

পক্ষান্তরে অন্য ধর্মের লোকদের ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান। তাই তারা যে কোন দিকে মুখ করে তাদের ঈশ্বরের কাছে মাথা নত করলে সেটাতে সমস্যা কিছু দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু আমাদের আল্লাহ সব কিছু দেখতে পায় ঠিকই কিন্তু অন্য ধর্মের ঈশ্বরের মত সর্বত্র বিরাজমান নয় যা আমরা কুরান ও হাদিস থেকে ভালমতো জেনেছি।

আল্লাহ সর্ব শক্তিমান , যা খুশী তাই করতে পারে। তাই তার পক্ষে একই সাথে সাত আসমানের ওপর তার আরশে ও কাবার মধ্যে কাল পাথর হয়ে থাকা দুইই সম্ভব। বুজছি না তো কিছু। মাথা ঘুরে যাচ্ছে এখন। আছেন কি এমন কোন ভাই বিষয়টি সুন্দর করে বুঝিয়ে দেয়ার ?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “নামাজ পড়ার সময় আসলে কার কাছে মাথা নত করেন আল্লাহ্‌র বান্দারা?

  1. সেজদা দেয়ার যে প্রক্রিয়া,
    সেজদা দেয়ার যে প্রক্রিয়া, আপনি সম্মান জানাতে মাথা নিচু করলেন, মাটিতে মাথা ঠেকালেন এগুলো আসলে পৌত্তলিকতার অনুকরণ। একজন সর্বজ্ঞানী, মহা পরাক্রমশালী আল্লাহকে সম্মান জানাতে এমন করতে হবে কেন?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 4