দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে দুইজন গার্মেন্ট (সুইং অপারেটর) শ্রমিক’র সাক্ষাৎকার

‘দেশে কোনো বিচার আচার নাই’
– শাহিনুর বেগম

শাহিনুর বেগম, বয়স ২২, গার্মেন্ট শ্রমিক, সুইং অপারেটর। থাকেন রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে। ঢাকা এসেছেন গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ থানার ধনিয়ারকুড়া গ্রাম থেকে। সাম্প্রতিক দিনকাল কেমন যাচ্ছে, রোজগার কেমন জানাতে গিয়ে এই নারী শ্রমিক বলেন, ‘আছে মোটামুটি। কাজ তো করি, কিন্তু চলে না তো। আটটা থেইকা পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করি। ওভারটাইম হয় না কারখানায়। বেতনে যা আসে, তা দিয়া হয় না। সাত হাজার টেকা যদি নিম্ন বেতন হয়, তাইলে একটু চলা যায়।’

দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি কেমন দেখছেন জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘দেশে তো সমস্যা নাই, আবার আছেও। আলাদা কইরা কিছু বুঝি না।’
সমাজে সাম্প্রতিক অপরাধপ্রবণতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘খুন, ধর্ষণ তো বাড়তেছে। আমিও তো একতা মেয়ে মানুষ, না? সমস্যা তো আমাগোও হইতে পারে। টেনশন তো আছেই। ধরেন, কারখানায় তো আমাগোরে গালি দেয়, পানি খাওয়ার সময় দেয় না। ঘণ্টায় ১২০ পিস কমপ্লিট করা লাগব। একটা কম হইলেও মেশিন থেইকা উঠায়া দেয়।’

সাম্প্রতিক ইউপি নির্বাচনে ভোট দিতে গেছেন কিনা, ভোটের খবর কী পাচ্ছেন জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, ‘ভোট দিতে কেমনে যামু। ভোটের খবর রাখি না। আমরা কাজ কইরা খাই। আমাগো ভোটের কী আছে।’
পুলিশ বাহিনীর তৎপরতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘পুলিশের অত্যাচার তো এখন বেশি। গরিব মানুষের উপর দিয়া বেশি যাইতেছে।’

দেশের এই অবস্থা পরিবর্তন করতে কী করণীয় জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি তো কোনো দিশা দেখতেছি না।’
সরকারের ভালো-খারাপ মূল্যায়ন করতে বলা হলে তিনি বলেন, ‘আগে তো সন্ত্রাস ছিল বেশি। এই সন্ত্রাস কমছে, এইটা সরকার ভালো করছে। আর খারাপ হইল যে ধরেন দেশে কোনো বিচার আচার নাই। সাত বছরের মাইয়ারাও ধর্ষণ হইতাছে। এই রকম আগে দেখি নাই, শুনিও নাই।’

আপনার কারখানা কি কমপ্লায়েন্স সুবিধা দেয়, সরকার আপনাদের জন্য কী করেছে এমন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বনানীর ম্যাডোনা ফ্যাশনে কর্মরত এই নারী শ্রমিক বলেন, ‘কমপ্লায়েন্স তো অনেক কিছু থাকে। শ্রমিকের মাথা থেকে পা পর্যন্ত ফুল ড্রেস, কিন্তু এইগুলা নাই। তারপর ধরেন অসুখে চিকিৎসা দিব। কিন্তু আমরা পাই জ্বর হইলেও নাপা, পাতলা পায়খানা হলেও নাপা, নার্সরে জিগাইলে কয়, কোম্পানি এইটাই দেয় আমি কি বাড়ির থন আইনা দিমু? যখন বায়ার আসে, বায়িং কিউসি আসে, তখন তারা মাইকে বলে দেয় যে বায়ার আসলে কী কী বলা লাগব। গ্লাভস পরতে হইব, সুপার ভাইজররা গালি দেয় এইটা বলা যাইব না। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখে, নার্স সবসময় আসে, বেতন এক থেকে সাত তারিখের মধ্যে হয়, নাইট হয় না, দশটা পর্যন্ত ডিউটি হয় না, এইগুলা বলা লাগব। আসলে এইগুলা সবই মিথ্যা। সরকারের লোক আসে, অ্যাকর্ডের লোক আসে, আমাগো তো মনে হয় তারা ঘুষ খাইয়া যায়।’

‘দেশের অবস্থা তো সদরঘাটের মতো’
– মোহাম্মদ রেজাউল

মোহাম্মদ রেজাউল, বয়স ২১,গার্মেন্ট শ্রমিক, সুইং অপারেটর। থাকেন রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে। ঢাকা এসেছেন গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জ থানার ধনিয়ারকুড়া গ্রাম থেকে। সাম্প্রতিক দিনকাল কেমন যাচ্ছে জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার তো গরিব মানুষগো দেখতে পারে না। যাগো টাকা পয়সা আছে সবখানে তাগোই সুবিধা। এখন ধরেন গার্মেন্টসে কাজ করতেছি। এইখানে তো কোনো রেস্ট নাই। একজন লোক না থাকলে তার কাজ বাকি লোকগো মাথায় ভাগ কইরা দেয়। এইভাবে ধরেন যে কষ্ট বাড়ে। আয় রোজগার বাড়ে না, কিন্তু আবার খরচা ঠিকই বাড়তাছে।’

দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এই শ্রমজীবী বলেন, ‘দেশের অবস্থা তো সদরঘাটের মতো। যে যেমনে পারতাছে খাইতাছে। আইন টাইন কিছু নাই। কেমনে দেশ চলতাছে কে জানে।’
সমাজে সাম্প্রতিক অপরাধপ্রবণতা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘খুন ধর্ষণ বাড়তাছে, কারণ সরকারে দেখতাছে না তো। বিচার তো নাই, যদি থাকেও টেকা থাকলেই হইল। টেকা থাকলে তার আর কোনো সমস্যা নাই।’
সাম্প্রতিক ইউপি নির্বাচনে ভোট দিতে গেছেন কিনা, ভোটের খবর কী পাচ্ছেন জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, ‘মানুষ ভোট দিতে পারে না তো। যারা পারে তাগো ভোট দেয়া লাগে নেতাগো কথা মোতাবেক। নইলে খবর আছে। অত্যাচার চালায়। আমি তো গার্মেন্টে কাম করি, আমাগো ভোটের জইন্য ছুটি দেয় না।’

পুলিশ বাহিনীর তৎপরতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘পুলিশ থাকলেও কোনো কামের না। যদি পঞ্চাশ হাজার টেকা পকেটে ঢুকাইয়া দেয়া যায়, তাইলে ধরেন যে, দুই-চাইর-দশটা পুলিশরে এক জায়গা থেইকা সরাইয়া দিয়া একটা কাম করা কোনো ঘটনা না। তারপর ধরেন যে, পুলিশ তো গরিব-গুরারে দেখতেই পারে না। গালাগালি ছাড়া কথাই কয় না। রিশকাআলারা তো বিশ-পঞ্চাশ টেকা না দিতে পারলে গদি খুইলা রাইখা দেয়, পাছার উপরে বাড়ি দেয়, এই হইল পুলিশের আইন। টেকাঅলা লোক হইলে আবার পুলিশ ঠিকই হাইসা হাইসা কথা কয়, এক লগে বইসা চাও খায়। কিন্তু গরিবে কিছু না করলেও দোষ।’

দেশের এই অবস্থা পরিবর্তন করতে কী করণীয় জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘পরিবর্তন হইব কেমনে? দুই সরকার তো ঠিকমতো বয় না, কথা কয় না। এখন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ দিয়াই দেশ চলতাছে। কিন্তু সুষ্ঠুভাবে ইলেকশন হইলে কিন্তু এরকম কিছু হইত না।’

সরকারের ভালো-খারাপ মূল্যায়ন করতে বলা হলে তিনি বলেন, ‘রাস্তাঘাট ঠিক করে, ব্রিজ বানায়। কিন্তু খারাপ কামের তো শেষ নাই। ধরেন এই যে আমরা বস্তিতে থাকি, দিন আনি দিন খাই, কোনো রকমে দুইটা রোজগার করে আছি। এখন বলতেছে যে, ২০১৮ সালের মইধ্যে নাকি এই বস্তি উচ্ছেদ হইব। সরকার তো আমাগো জন্য কিছু করতাছে না। এই রকম মানুষের জমি দখল হইয়া যাইতাছে, গরিবের পেটে পাড়া দিতাছে তবু সরকার কিছু করে না। কিন্তু আমরা যখন কোনো মিছিল টিছিল করি তখন ঠিকই সরকার হাজির হয়।’

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 3