আমার সময়কে আমি উলটো পায়ে হেঁটে যেতে দেখেছি

২০১৪ সালের ঘটনা।পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে ধর্ম অবমাননার কথিত অভিযোগে সংখ্যালঘু খ্রিস্টান দম্পতিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।শুধু পিটিয়ে হত্যা করে ধর্মোন্মত্ত জনতা সেদিন ক্ষান্ত হয় নি।উত্তেজিত জনতা প্রবল আক্রোশে ঐ দম্পতির নিথর দেহ ইটভাটার জ্বলন্ত চুল্লিতে ছুড়ে ফেলে দেয়। শামা ও শেহজাদ নামের ওই খ্রিস্টান দম্পতি স্থানীয় একটি ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করতেন। ছাইয়ের মধ্যে কোরআনের পোড়া পৃষ্ঠা পাওয়ার পর ওই দম্পতির বিরুদ্ধে এসব পৃষ্ঠা পোড়ানোর অভিযোগ তোলা হয়। এর জেরে ইটভাটার একটি ঘরে তাঁদের তালাবদ্ধ করে রাখেন মালিক ইউসুফ গুজ্জর। পরে জানা যায় ওই দম্পতির সঙ্গে ধারের টাকা নিয়ে ইউসুফের বিবাদ চলছিল বহুদিন ধরে।

ধুর্ত ইউসুফ গুজ্জর ব্যাক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য কোরান পোড়ানোর মিথ্যা অভিযোগ তুলে সাধারণ জনতাকে শামা ও শেহজাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে। অতঃপর ধর্মোন্মাদ পাবলিক যা করার তাই করল। পিটিয়ে মেরে , লাশ পুড়িয়ে বিভৎস উল্লাস প্রকাশ করল। পাকিস্তানে এইসব ঘটনা হামেশাই ঘটে। ক্ষমতাবানরা ব্যাক্তিগত প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কিংবা সংখ্যালঘুদের জমি-জিরাত দখল করার জন্য গুজব রটিয়ে পাবলিককে ক্ষেপিয়ে তোলে, ব্লাসফেমি আইনে মিথ্যা মামলা দিয়ে হেনস্তা করে। পাকিস্তানে এইসব হৃদয়বিদারক এবং নিষ্ঠুর ঘটনার অজস্র নজির আছে। এইসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি না করে আমরা বরং আমাদের দেশের দিকে একটু নজর দিই।সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর ইউনিয়নের পিয়ার সাত্তার লতিফ হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে স্থানীয় এমপি সেলিম ওসমান, ইউএনও এবং পুলিশ মিলে প্রকাশ্যে সবার সামনে কানে ধরে উঠ-বস করায় এবং তাঁকে উপস্থিত জনতার সামনে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়।এর আগে অবশ্য উত্তেজিত জনতা শ্যামল কান্তি ভক্তকে মারধর করে।সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে শিক্ষক লাঞ্চনার এই ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায় মুহুর্তে। প্রত্যেকটা বিবেকবান মানুষ শিউরে ওঠে এই দৃশ্য দেখে।শ্যামল কান্তি ভক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিল তিনি নাকি ক্লাসে ‘ইসলাম ধর্মের’ বিরুদ্ধে কটুক্তি করেছেন। কিন্তু কি কটুক্তি তিনি করেছেন তার কোন সুর্নিদিষ্ট প্রমাণ ধর্মোন্মাদরা হাজির করতে পারে নি।

এবার আসল ঘটনা তলিয়ে দেখা যাক। প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে সরানোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করছিল স্থানীয় এমপি, ইউএনও এবং ম্যানেজিং কমিটির একাংশ। শ্যামল ভক্তের দৃঢ়তা এবং সাহসিকতার কারণে তা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে শ্যামল ভক্তের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হয় সেই অব্যার্থ পাকিস্তানি ব্রহ্মাস্ত্র। স্বয়ং এমপি সেলিম ওসমান মসজিদের মাইকে গুজব রটিয়ে ধর্মোন্মাদ জনতাকে ক্ষেপিয়ে তোলেন শ্যামল স্যারের বিরুদ্ধে। যথারীতি বিকারগ্রস্ত জনতা হামলে পড়ে শ্যামল স্যারের উপর এবং এর পরবর্তী ঘটনা সবারই জানা।

আগেই বলেছি এইভাবে গুজব রটিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর পরিকল্পিত আক্রমণের ঘটনা পাকিস্তানে অহরহ ঘটে। বাংলাদেশও কি খুব দ্রুত গতিতে সেই পথ ধরে হাঁটছে? শ্যামল কান্তি স্যারের ঘটনাটি প্রথম কিংবা নতুন ঘটেছে তা কিন্তু নয়। আমরা দেখেছি ২০১২ সালে রামুতে বৌদ্ধ বিহারে একই কায়দায় সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয়েছে। জনৈক উত্তম বড়ুয়ার ফেইসবুক ওয়ালে অন্যজনের ট্যাগকৃত “ইসলাম বিরোধী” ছবিকে ইস্যু বানিয়ে স্থানীয় আওয়ামী মৎস্য লীগের সভাপতির নেতৃত্বে বৌদ্ধ পল্লীতে পরিকল্পিত আক্রমণ করা হয়েছে।বেশ কিছুদিন আগে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জের হাইস্কুলের শিক্ষিকা সঞ্চিতা রাণী সাহার বিরুদ্ধেও কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে তাঁকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়। সর্বশেষ সিলেটের গোলাপগঞ্জে জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে মসজিদের মাইকে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিয়ে সদলবলে হিন্দু পরিবারের উপর আক্রমণ চালানো হয়েছে।

পাকিস্তানি কায়দায় উন্মাদনা ছড়িয়ে স্বার্থ হাসিলের এইরকম নির্ভুল পথ বোধ হয় আর একটিও নেই। আমাদের দেশের ক্ষমতাবান গোষ্ঠীটি এই বিষয়টি বেশ ভালোমতই উপলদ্ধি করতে পেরেছে। এবং এই অস্ত্রের নিশানা যে অব্যর্থ সেটা কয়েকটা ঘটনার মাধ্যমে প্রমাণ হয়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এদেশের সংখ্যাগুরু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, বিদ্বেষ এবং উগ্রতা কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে তা আর সবিস্তারে বলার দরকার নেই। উগ্রবাদীদের হাতে একের পর এক মুক্তমনা লেখক-প্রকাশক-অধ্যাপক খুন এবং তাঁর পেছনে সমাজের একটা বিরাট অংশের আদর্শিক এবং মৌন সমর্থন , ফ্যসিস্ট সরকারের নির্বিকারত্ব, বিচারহীনতা সমস্ত কিছুই পরিস্থিতিকে ক্রমশ জটিল করে তুলেছে। সাম্প্রদায়িক নির্যাতন বেড়েছে উদবেগজনক হারে। এই ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের জন্য একদল তো সবসময় ওঁৎ পেতে আছে। এই সুযোগসন্ধানীরা কখনো সেলিম ওসমান, কখনোবা স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা, কখনোবা জামাতের স্থানীয় আমির কখনোবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।এদের দলীয় পরিচয় ভিন্ন কিন্তু এরা সবাই লুটেরা ,অগণতান্ত্রিক,সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের ক্ষমতাকাঠামোর ছোট বড় অংশীদার। এদের দ্বারা সমাজের বিশাল জনগোষ্ঠীর ধর্মানুভুতি ব্যবহৃত হয় অত্যন্ত অশ্লীলভাবে।দুঃখের বিষয় আফিমখোর ধর্মোন্মাদরা বুঝতেই পারে না কার হীন উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার হিসেবে তারা করুণভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

১৯৭১ সালে এদেশের মানুষ পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকাঠামোর জোয়াল ঘৃণাভরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে উদার, গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিল, বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি বাংলাদেশ আবার সেই পাকিস্তানের পথে হাঁটা আরম্ভ করেছে। তারিক সুজাত লিখেছিলেন “আমার সময়কে আমি উলটো পায়ে হেঁটে যেতে দেখেছি”। হ্যাঁ। বাংলাদেশ উলটোপথে হাঁটছে শাসক আওয়ামী লীগের হাত ধরে।মুখে পাকিস্তান বিরোধী স্লোগান দিয়ে,উগ্র জাতীয়তাবাদের আফিম খাইয়ে সেই আওয়ামী লীগ কার্যত পাকিস্তানি কায়দায় দেশ শাসন করছে। স্বৈরশাসন, বাকস্বাধীনতা হরণ,৫৭ ধারার নামে ব্লাসফেমি আইন প্রবর্তন, বিচারহীনতা এবং দায় অস্বীকারের সংস্কৃতি চালু ,মোল্লাতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতা, সীমাহীন লুটপাট, নেতা-কর্মীদের দ্বারা সংখ্যালঘু নির্যাতন ,অব্যাহত গুম-খুন-ধর্ষণ অর্থাৎ যা যা উপাদান একটা দেশকে পাকিস্তান বানানোর জন্য যথেষ্ট তার সমস্ত কিছু একসাথে মিশিয়েই আওয়ামী লীগ তার রামরাজত্ব পরিচালনা করছে। যুগপৎভাবে মোল্লাতন্ত্র আর লুটপাটতন্ত্রের কাঁধে ভর দিয়ে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে নিয়ে অতল অন্ধকারের দিকে দ্রুত গতিতে হাঁটছে। এক অপ্রতিরোধ্য গতিতে পেছনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। থামানোর কেউ নেই। প্রতিরোধ করার মত কোন শক্তি নেই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

38 − 29 =