। বৃষ্টি ভেজা মেয়েটি এবং কল্পনায় ভালোবাসা ।। – পর্ব – ২ (পরিশেষে )

সবার মতো আরিশা ও এক গাদা স্বপ্ন নিয়ে দেশের সেরা বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল । কোর্সের মাঝামাঝি এসে বেশীরভাগ স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে । গত কয়েকমাস ধরে উদয় হয়েছে নূতন বিপদ , বাবা বলছেন বিয়ে করতে । আরিশা না পারতে মা বাবার মতের বিরুদ্ধে কথা বলেনা , এবারো সে বাবার কথা মেনে নিল । মা বাবার একমাত্র মেয়ের জন্য পাত্র খুঁজার ধুম পরল ।

কয়েক দিন আগে সবাই রাতের খাবার খেতে বসেছিল , এমন সময় আরিশা একটি ছেলের বায়োডাটা পেলো ।

” আমার বন্ধুর ছেলে , প্রাইভেট থেকে অনার্স মাস্টার্স শেষ করে এখন একটা ভালো কোম্পানি তে আছে, চাকরী করছে । তোমার মার কাছে বায়োডাটা রাখা আছে , দেখে নিও একটু ।” – খেতে খেতে বাবা বললেন ।

খাওয়া শেষে মা নিজেই আরিশার ঘরে বায়োডাটা নিয়ে আসলেন । আরিশা মার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো , মা ভয় পাচ্ছেন , আর ভয়ের কারণ হল এর আগে আরিশা ৭ জন কে না করে দিয়েছে । একে না করলে হবে ৮ জন । আরিশা মা কে দেখেও না দেখার ভান করলো , মা কতক্ষণ ছেলেটার প্রশংসা করলেন , তারপর মেয়ের নিরবতার কাছে হার মেনে বিদায় নিলেন রুম থেকে ।

পরদিন শুক্রবার । ঘুম থেকে উঠেই আরিশার চোখ পরল টেবিল এর উপর , আরও ভালো করে বলতে গেলে টেবিল এর উপর রাখা বায়োডাটার উপর । তার মনে মনে জেদ ধরল , দেখবেনা সে বায়োডাটা । চোখ বুজে আরও কতক্ষণ পরে রইল বিছানায় । অবশেষে জেদের পরাজয় হল কৌতূহলের কাছে । আরিশা বায়োডাটা টা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে লাগলো । ছেলেটির জীবন বৃত্তান্ত পড়তে পড়তে বায়োডাটার ছবিটা পরিচিত মনে হল আরিশার কাছে , ছেলেটাকে কোথায় যেন দেখেছে । জায়গাটা মনে পরতেই হাসি ফুটে উঠল আরিশার ঠোঁটে , হুম , আর কেউ নয় , সেদিনের সেই ছেলেটি । আরিশা ঠিক করলো, ইফতি কে সে পরখ করে দেখবে ।

কয়েকদিন পরেই মিলল সুযোগ , এবং প্রথম দেখাতেই ইফতি কে ভালো লেগে গেল আরিশার ,বুঝতে পারল এই সহজ সরল মানুষটার উপর নিশ্চিন্তে নির্ভর করা যায় ।

ক্রিসেন্ট লেকে আজ মানুষের মেলা বসেছে যেন । মানুষের ভিড় আমার একদম ভালো লাগেনা , কিন্তু আরিশার খুব পছন্দের জায়গা ক্রিসেন্ট লেক । বলতে ভুলে গেছি , আরিশা আর ইফতি এখন প্রায়ই অবসর সময় ঘুরতে বের হয় । আরিশা যদিও বলে এটা বন্ধুত্ব ছাড়া আর কিছুই নয় ,কিন্তু ইফতি জানে সে আরিশা কে ভালোবাসে । কিন্তু এখনো বলতে পারেনি । আমার সবচে অবাক লাগে এই ভেবে যে মানুষের জীবন কত অনিশ্চিত, এই যেমন ইফতির সাথে আরিশার পরিচয় । হাঁটতে হাঁটতে তারা লেকের পাঁড়ে এসে বসলো ।

” একটা গল্প শুনবে ? ” আরিশা বলল । ইফতি হ্যাঁসূচক মাথা নাড়লাম ।

” তার আগে এক প্লেট চটপটি খাওয়াতে হবে । ” আরিশা বায়না ধরল ।

ইফতি ঝটপট চটপটি কিনে আনলও , স্বল্প মেয়াদি বন্ধুত্ব কে দীর্ঘ মেয়াদি করার চেষ্টা আরকি !

আরিশা শুরু করল –

” আমার মা বাবা বিয়ের জন্য পাত্র খুঁজছে । ”

কেনও জানি ইফতির গলা শুকিয়ে গেলো । ” তারপর ? ” ইফতি শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করলাম ।

” ৭- ৮ টা বায়ো ডাটা দেখা হয়ে গেছে ইতোমধ্যে , ৮ নাম্বারটা আমার পছন্দ হয়েছে । ” আরিশা মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল । ইফতিও হাসার চেষ্টা করলও , কিন্তু কেনও যেন হাসির বদলে গলা দিয়ে কাশির আওয়াজ বের হল ।

” ছেলেটা কে আমি দেখিনি ঠিকভাবে কারণ সে ব্যাস্ত থাকে অনেক ”

ইফতি নিরব হয়ে আরেকদিকে তাকালো । আরিশা কথা বলে চলল –

” জানোই তো আমাদের সমাজের অবস্থা । মেয়েরা একটু বয়স হলেই বাপের বাড়ি ছাড়তে হয় । তাই ঠিক করলাম , যাকে নিয়ে ঘর সংসার করবো তাকে পরখ করে দেখব , কয়েকদিন ধরে ছেলেটাকে অনুসরণ করলাম , একদিন সুযোগ পেয়ে গেলাম কথা বলার । ছেলেটা না খুব বোকা , আমি তার মোবাইল নাম্বার নিলেও সে আমার মোবাইল নাম্বার নিতে ভুলে গেলো ! ” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামল আরিশা ।

” ব্যাপার নাহ , বিয়ের পর মোবাইলের আর দরকার হবেনা । ” ইফতি কথা খুঁজে না পেয়ে বললও , বুঝতে পারলো ইফতির প্রথম ভালবাসার সমাপ্তি হতে চলেছে । আরিশা আবার শুরু করল –

” তারপর বোকাটা রাতে আমাকে কল করলো , তখন অবশ্য আর ভুলেনি আমার নাম্বার নিতে ! আমার তো আবার প্রেম করে বিয়ে করার খুব শখ , ভাবছি ছেলেটার সাথে কয়েকদিন প্রেম করব , তারপর একদিন হাতে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিবো । চিরকুটে লেখা থাকবে “I Love You! ”

” বাহ চমৎকার আইডিয়া … ” বলেই ইফতি উঠে দাড়ালো ,মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেলো ।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে , আরিশা কে বাসায় পৌঁছে দিয়ে ইফতি কে আরেক কাজে যেতে হবে । আরিশাও উঠে দাঁড়ালো । কিছুদূর হাঁটার পর ইফতি বললও –

” আরিশা , তুমি খুব বুদ্ধিমতি মেয়ে , তোমার জীবনসঙ্গী অনেক ভাগ্যবান , আমার জন্য দোয়া কোরও , যাতে আমার বউটা তোমার মতো হয় । ”
আরিশা হাসল ও শুধু , কিছু বলল না । একটা রিকশা ডেকে তাতে উঠে পরলও দুজন । অন্য দিন রিকশায় বসলে কথার মেলা বসতো , কিন্তু আজকে ইফতি চুপ করে থাকলো , আরিশাও খুব একটা কথা বলল না । দেখতে দেখতে আরিশার বাসা এসে গেলো । দুজনে নেমে গেলো রিকশা থেকে ।
আরিশা বললও , ইফতি ,আগামী কয়েকদিন আমার হবু বরের সাথে ঘুরে কাটাবো , কেমন হবে বলতো ?” আরিশার চোখের তারা হেসে উঠল । ইফতি চুপ করে রইলও ।

“তোমার সাথে অবশ্য এই কয়দিন আর দেখা হচ্ছেনা । এই নাও এটা তোমার , আমাদের বন্ধুত্বের উপহার ! আসি তাহলে , শুভ সন্ধ্যা ! “ইফতির হাতে এক টুকরো কাগজ ধরিয়ে আরিশা বাসার ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেলো । ইফতিও দাঁড়ালও না আর । কবে এক বন্ধু বলেছিল Love is Loss of Valuable Energy. কথাটা খুব মনে পরল । হাঁটতে হাঁটতে নজর গেলো আরিশার দেয়া কাগজটার দিকে । একবার ভাবলও ফেলে দিবে , তারপর ঠিক করলও ফেলার আগে ছিঁড়ে কুটি কুটি করবে । ভাবতেই কাগজটা খুললও এবং ছিঁড়তে গিয়ে থমকে গেলও ইফতি , গোটা গোটা অক্ষরে লেখা ” I love You” লেখাটা জ্বলজ্বল করছে কাগজে !

মুহূর্তে তার সব কষ্ট কোথায় যেন চলে গেলো । বিস্ময় কাটতে না কাটতেই কে যেন আমার নাম ধরে ডাকল । তাকিয়ে দেখলও আরিশা দাঁড়িয়ে আছে । সামনে এগিয়ে আসলো আরিশা। বলল ও –

” বায়োডাটার ৮ নম্বর ছেলেটা আজ সারাদিন আমার সাথে ঘুরলো আর আমার হবু বরের সাথে প্রেম করা এখনো অনেক বাকি , এতো দ্রুত চলে যেওনা । ” বলেই আরিশা হাত বাড়িয়ে দিল ।

ইফতি ও ওর বাড়িয়ে দেয়া হাতটা ধরলও , ছেলেটির চোখে তখন আনন্দাশ্রু !

অবশেষে , ছেলেটির বৃষ্টি ভেজা কল্পনা বাস্তবে পরিণত হল আজ <3

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1