মণিপুরী জাতি

মণিপুরী জাতি ভারত ও বাংলাদেশের একটি ক্ষুদ্র ও
বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নাম। এদের আদি নিবাস
ভারতের মণিপুর রাজ্যে। মণিপুরীদের নিজস্ব ভাষা,
বর্ণমালা, সাহিত্য এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি রয়েছে।
ভারতের মণিপুর রাজ্যে ও বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের
বিভিন্ন এলাকায় মণিপুরী সম্প্রদায়ের লোক বাস করে। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের গণনায় দেখা যায়
বাংলাদেশে এদের সংখ্যা ২৪,৯০২ এবং ভারতে ১২৭,০২১৬
জন। বার্মাতেও এদের বসবাস রয়েছে। দেহের আকার
মধ্যমাকার। মুখমণ্ডল গোলাকার, নাক চ্যাপ্টা, গণ্ডদেশ
উন্নত।
.
বাংলাদেশে মণিপুরী জাতির
অভিবাসন
.
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর
প্রথমভাগ পর্যন্ত সংঘটিত বিভিন্ন সামাজিক,
রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের শিকার হয়ে এবং যুদ্ধজনিত
কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মণিপুর রাজ্যের
অধিবাসীরা দেশত্যাগ করে পাক-ভারত উপমহাদেশের
বিভিন্ন অঞ্চলে আশ্রয় গ্রহণ করে। পার্শ্ববর্তী
আসাম রাজ্যের কাছাড় জেলায়, ত্রিপুরা রাজ্যে এবং
বাংলাদেশে ব্যাপক সংখ্যক মণিপুরী অভিবাসন ঘটে।
বার্মা-মণিপুর যুদ্ধের সময় (১৮১৯-১৮২৫) তৎকালীন
মণিপুরের রাজা চৌরজিৎ সিংহ, তার দুই ভাই মারজিৎ
সিংহ ও গম্ভীর সিংহসহ সিলেটে আশ্রয়গ্রহণ করেন।
যুদ্ধ শেষে আশ্রয়প্রার্থীদের অনেকেই স্বদেশে ফিরে
যায়, কিন্তু বহু মণিপুরী তাদের নতুন স্থানে স্থায়ী
বাসিন্দা হয়ে যায়। বাংলাদেশে আসা মণিপুরীরা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা, ময়মনসিংহের দুর্গাপুর, ঢাকার
মণিপুরী পাড়া এবং প্রধানত বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন
স্থানে বসতি গড়ে তোলে।
বর্তমানে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার , সিলেট ,
সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায় মণিপুরী জনগোষ্ঠীর
লোক বাস করে।
.
মণিপুরী জাতির শাখাসমুহ
ভাষাগত এবং ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে বাংলাদেশের
মণিপুরীরা তিনটি শাখায় বিভক্ত এবং স্থানীয়ভাবে তারা
(১) বিষ্ণুপ্রিয়া, (২) মৈতৈ ও (৩) পাঙন নামে পরিচিত ।
.
মণিপুরের অধিবাসীদের মধ্যে এই তিনটি
সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের
শিকার হয় এবং তারা বাংলাদেশে এসে পাশাপাশি বসতি
স্থাপন করে।
বিষ্ণুপ্রিয়ারা ককেশয়েড মহাজাতির আর্য-ভারতীয়
উপপরিবারের অন্তর্গত এবং তাদের ভাষার নাম
বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা । মৈতৈরা মঙ্গোলয়েড
মহাজাতির তিব্বতী-বর্মী উপ-পরিবারের অন্তর্গত এবং
তাদের ভাষার নাম মৈতৈ। পাঙনরা আর্য বংশদ্ভুত
হলেও মৈতৈ ভাষায় কথা বলে এবং ধর্মীয়ভাবে তারা
মুসলিম। বাংলাদেশের মণিপুরীদের মধ্যে বিষ্ণুপ্রিয়ারা
সংখ্যাগরিষ্ঠ।
.
মৈতেয় মণিপুরী
.
মৈতেয় মণিপুরীদের ভাষা হল মৈতেয় পুরনো একটি ভাষা।
অন্য দিকে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা ইন্দো-ইউরোপিয়
পরিবারভুক্ত বাংলা ও অহমিয়া ভাষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ
সম্পর্কিত। এই ভাষাভাষীরা তাদের ভাষা প্রাচীন দাবী
করলেও এ বিষয়ে কোন প্রমাণ নেই । পূর্বে মণিপুরী ভাষার
নিজস্ব হরফ ছিল। অধিকাংশের মতে মৈতেয় লিপি ব্রাহ্মী
লিপি থেকে উদ্ভূত। ভারতের মণিপুর রাজ্যে এই লিপির
প্রথম প্রচলন হয় মহারাজ পাংখংবা-র আমলে (৩৩-১৫৪
খ্রিষ্টাব্দ)। তখন মৈতেয় ভাষার বর্ণমালা ছিল মোট ১৮টি,
পরবর্তীতে মহারাজ খাগেম্বা-র শাসনামলে (১৫৯৬-১৬৫১
খ্রিষ্টাব্দে) আরো ৯টি বর্ণযুক্ত হয়ে মোট বর্ণ সংখ্যা
হয় ২৭টি। কিন্তু সপ্তম শতকে এক ব্রোঞ্জ মুদ্রার উপর
মৈতেয় বর্ণমালার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কার হয়।
ফলে মৈতেয় বর্ণমালার প্রাচীননত্ব প্রমাণিত হয়। তবে এই
বর্ণমালায় রচিত কোন প্রাচীন পুস্তকের সন্ধান পাওয়া যায়
নি। তবে ধারণা করা হয় যে দশম শতাব্দীতে সর্বপ্রথম
মণিপুরী ভাষায় হাতে লেখা যে পুস্তক বের হয়েছিল তা ছিল
বাংলা হরফের। মৈতেয় ভাষায় এবং বাংলা হরফে লিখিত দুটি
প্রাচীনতম পুস্তক হল পুইরেইতন খুনথক এবং নুমিত কাপ্পা।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে রাজা গরীবে নেওয়াজ এর সময়ে বৈষ্ণব
ধর্ম রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পর থেকে মৈতেয় মণিপুরী ভাষা
বাংলা লিপিতেই নিয়মিত ভাবে লিখিত হয়ে
আসছে। মণিপুরী লিপির একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল যে,
এগুলি মানুষের একেকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নামানুযায়ী বর্ণের
নাম। যেমন: বাংলা ‘ক’ এর মণিপুরী প্রতিবর্ণ কোক, যার
অর্থ মাথা, আবার বাংলা ‘স’-এর মনিপুর প্রতিবর্ণ হচ্ছে
‘সম’ যার অর্থ চুল। ভারতের মনিপুর রাজ্যের বাক-ভাষা
হিসেবে মনিপুরী সরকারি ভাবে স্বীকৃত।
.
বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী
.
বাঙালির ভাষার নাম বাংলা।
ইংরেজি : Bishnupriya ।
এটি একটি পূর্ব-ভারতীয় ভাষা
বিশেষ। এর অন্য নাম ইমার ঠার
(Imar Thar) । উল্লেখ্য মণিপুরী
‘ইমার ঠার’ শব্দের অর্থ হলো ‒
মায়ের ভাষা। {ইমার (মায়ের) ঠার
(ভাষা)}। এই ভাষার লোকেরা
নিজেদেরকে মণিপুরী নামে অভিহিত
করে থাকেন। পক্ষান্তরে প্রাচীন
মণিপুরের রাজধানী বিষ্ণুপুরের ভাষা
হিসাবে এর নাম হয়েছে বিষ্ণুপ্রিয়া। এর দুটি আঞ্চলিক রূপ
রয়েছে। এই দুটি রূপ হলো ‒ রাজার গাঙ এবং মাদাই গাঙ।
এই ভাষার লোকেরা ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, মণিপুর,
বাংলাদেশের সিলেট জেলা, মায়ানমার এবং অন্যান্য দেশে
বসবাস করে। এদের সংখ্যা আনুমানিক ৫ লক্ষ। এই ভাষার
বিকাশ ঘটেছিল প্রাচীন ভারতের মনিপুর রাজ্যের লোকতাক
(Loktak Lake) হ্রদ-সংলগ্ন অঞ্চলে । এর সর্বপ্রাচীন
নমুনা পাওয়া যায় অষ্টাদশ শতাব্দীতে পণ্ডিত নভকেন্দ্র
শর্মার রচিত খুমল পুরাণে । বর্তমানে এই ভাষার কোন
নিজস্ব বর্ণমালা পাওয়া যায় না। লেখালেখির ক্ষেত্রে এঁরা
বাংলা হরফ ব্যবহার করে থাকেন।
.
পাঙ্গান
.
মণিপুরীদের মধ্যে ইসলাম ধর্মের অনুসারী সম্প্রদায়টি
“পাঙন” বা “পাঙ্গান” বা মণিপুরী মুসলিম হিসাবে পরিচিত।
বাংলাদেশের সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও
সুনামগঞ্জ
জেলার নানান স্থানে প্রায় পঁচিশ হাজার মণিপুরী মুসলিম
বাস করে। ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও পাঙনরা
তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ঠ্য ও ঐতিহ্য আজো
বজায় রেখেছে। তাদের ঘরবাড়ি, পোষাক-পরিচ্ছেদ,
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা স্বতন্ত্র এবং বৈচিত্রে ভরপুর।
পাঙনরা সুন্নী মুসলিম। ধর্মীয় বিশ্বাস এক হলেও স্থানীয়
বাঙালী মুসলিম জনগোষ্ঠির সঙ্গে পাঙনদের সামাজিক
কোন সম্পর্ক নেই বললেই চলে। তাদের ধর্মাচরন,
সমাজব্যবস্থা ও রীতিনীতির সাথে বাঙালী মুসলমানদের
যথেষ্ঠ পার্থক্য রয়েছে। পাঙনরা প্রচন্ড ধর্মভীরু ও
রক্ষনশীল। পাঙন মেয়েরা কঠোর পর্দপ্রথা মেনে চলে।
নিজেদের সম্প্রদায়ের বাইরে বৈবাহিক সম্পর্ক পাঙন সমাজ
অনুমোদন দেয়না। পাঙনদের মসজিদগুলোতে কেবল পাঙন
ইমামরাই ইমামতি করতে পারেন। নানান সামজিক ধর্মীয়
অনুষ্ঠানে তারা মাতৃভাষা ও ঐতিহ্যকে গুরুত্ত্ব দিয়ে থাকে।
তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা বিয়ের
অনুষ্ঠানগুলোতে কোরান শরীফের তর্জমা ও তাফসীর,
বিভিন হাদিসের পাঠ ও ব্যাখ্যা সবকিছু মাতৃভাষায় করা হয়ে
থাকে। এছাড়া বিয়ের দিনে “কাসিদা” নামে পরিচিত এক
ধরনের লোক ঐতিহ্যবাহী বিয়ের গান ও নাচের অনুষ্ঠান
থাকে যা পাঙনদের একান্ত নিজস্ব।
ঈদ পাঙনদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। ঈদের দিনে গোত্র
বংশ নির্বিশেষে সব শ্রেণীর পাঙন এক কাতারে সমবেত হয়
এই বিশেষ দিনটিকে উদযাপন করার জন্য। ঈদের জামাতও
নির্দিষ্ঠ স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। বলাই বাহুল্য ঈদের জামাতে
ইমামতির ভার থাকে যথারীতি পাঙন সম্প্রদায়েরই কোন
মৌলভীর উপর। মসজিদে, দোকানে, হাটবাজারে, খেয়াঘাটে
সবখানে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পালা চলে। আত্মীয় স্বজন ও
পরিচিত জনদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো হয়। পরিবারের
সবার জন্য নতুন জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করা হয়। এদিন
মেয়েদের জন্য পর্দা কিছুটা শিথিল থাকে। ঈদের দিনে পাঙন
মেয়েদের ঐতিহ্যবাহী পোষাক পড়ে দল বেঁধে আত্মীয়
স্বজনের বাড়ী বেড়াতে যাওয়ার দৃশ্য চেয়ে দেখার মতো।
পাঙন জাতির নৃতাত্ত্বিক বিবর্তনের ইতিহাস মণিপুরীদের
অপরাপর শাখা বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈদের থেকে আলাদা যদিও
তিনটি জনগোষ্ঠিই অষ্টাদশ শতাব্দিতে আদিভূমি মণিপুর
ত্যাগ করে বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন স্থানে
বসতি গড়ে তোলে। মণিপুরে মুসলমানদের সর্বপ্রথম এবং
সর্ববৃহৎ অভিভাসন ঘটে মুঘল আমলে। সে কারনে
ইতিহাসবিদদের ধারনা “পাঙন” শব্দটি এসেছে “পাঙ্গাল”
শব্দ থেকে যার উৎপত্তি “মুঘল” থেকে
(পাঙ্গাল>মুঙ্গাল>মুগাল এভাবে)। অনেকে আবার পাঙ্গাল
শব্দটিকে “বাঙ্গাল” শব্দের বিবর্তিত রূপ বলেও মনে
করেন। পাঙনদের শারীরিক গঠন ও দেহাবয়ব মণিপুরী
বিষ্ণুপ্রিয়াদের মতোই মিশ্র আর্য-ভোটব্রহ্মী। তাদের
মাতৃভাষা মণিপুরী মৈতৈ ভাষারই একটি রূপ।
পাঙনরা প্রচন্ড পরিশ্রমী জাতি। ভিক্ষাবৃত্তিকে এরা
মনুষ্যজন্মের নিকৃষ্ট পেশা বলে মনে করে। কৃষিকাজ ছাড়াও
তারা বাঁশ ও বেত দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কৃষি যন্ত্রপাতি ও
আসবাব তৈরীতে দক্ষ। পাঙন মেয়েরা কৃষিকাজে পুরুষের সমান
পারদর্শী। এছাড়া কোমর তাঁতে কাপড় বোনা এবং সুচীকর্মে
পাঙন মেয়েদের অসাধারন দক্ষতা রয়েছে। মণিপুরীদের
পরিধেয় ফানেক বা চাকসাবির উপর পাঙন মেয়েদের সুঁই সুতার
সুক্ষ কারুকাজ দেখলে বিষ্মিত হতে হয়।

.
এসআইএল ইন্টারন্যাশনালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৩
সাল নাগাদ বাংলাদেশে মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া জনসংখ্যা
৪০ হাজার এবং মণিপুরী মৈতৈ জনসংখ্যা ১৫ হাজার ।।
.
ভাষাগত ভিন্নতা বাদ দিলে বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈদের
মধ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে তেমন
পার্থক্য নেই।
.
মণিপুরীদের সংস্কৃতি
.
মণিপুরীদের সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও ঐতিহ্যবাহী।
মণিপুরী সংস্কৃতির উজ্জ্বলতম দিক হলো মণিপুরী
নৃত্য যা বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।
মণিপুরীদের মধ্যে ঋতুভিত্তিক আচার অনুষ্ঠান বেশি।
বছরের শুরুতে হয় মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়াদের বিষু এবং
মৈতৈদের চৈরাউবা উৎসব। আষাঢ় মাসে জগন্নাথদেবের
রথযাত্রা ও কাঙ উৎসবের সময় প্রতিরাত্রে মণিপুরী
উপাসনালয় ও মন্ডপগুলোতে বৈষ্ণব কবি জয়দেবের
গীতগোবিন্দ নাচ ও গানের তালে পরিবেশন করা হয়।
কার্ত্তিক মাসে মাসব্যাপী চলে ধর্মীয় নানান গ্রন্থের
পঠন-শ্রবন। এরপর আসে মণিপুরীদের বৃহত্ম উৎসব
রাসপূর্ণিমা। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মণিপুরের রাজা
মহারাজ ভাগ্যচন্দ্র প্রবর্তিত শ্রীকৃষ্ণের
রাসলীলানুকরন বা রাসপুর্ণিমা নামের মণিপুরীদের
সর্ববৃহৎ অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশে প্রায় দেড়শত বছর ধরে
(আনুমানিক ১৮৪৩ খ্রী: থেকে) পালিত হয়ে আসছে।
কার্ত্তিকের পুর্ণিমা তিথিতে দুরদুরান্তের ল ল ভক্ত-
দর্শক মৌলবীবাজার জেলার সিলেটের কমলগঞ্জের
মাধবপুর জোড়ামন্ডবের এই বিশাল ও বর্ণাঢ্য উৎসবের
আকর্ষনে ছুটে আসেন।
বসন্তে দোলপূর্ণিমায় মণিপুরীরা আবির উৎসবে মেতে
উঠে। এসময় পালাকীর্ত্তনের জনপ্রিয় ধারা “হোলি”
পরিবেশনের মাধ্যমে মণিপুরী তরুণ তরুণীরা ঘরে ঘরে
ভিক্ষা সংগ্রহ করে। এছাড়া খরার সময় বৃষ্টি কামনা করে
মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়ারা তাদের ঐতিহ্যবাহী বৃষ্টি ডাকার
গান পরিবেশন করে থাকে।
.
মণিপুরীদের ধর্ম
.
মণিপুরীদের নিজস্ব লৌকিক ধর্মের নাম “আপোকপা”
যা অত্যন্ত প্রাচীন, আধ্যাত্মিকতায় গভীর ও
দার্শনিকভাবে উচ্চস্তরের। প্রাচীন ধর্মবিশ্বাস
অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তা নিজের প্রতিকৃতি থেকে মানব
জাতিকে সৃষ্টি করেছেন এবং প্রতিটি মানুষ সৃষ্টিকর্তার
একেকটি ছায়া। এখনো মণিপুরী মৈতৈদের অনেকে এই
ধর্মের অনুসারী। মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়াদের একাংশের
মধ্যের “আপোকপা” পূজার প্রচলন রয়েছে। অষ্টাদশ
শতাব্দীতে মণিপুরীরা বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হয।
.়
মণিপুরীদের ভাষা
.
মণিপুরী জনগোষ্ঠীর প্রধান দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে
ভাষার পার্থক্য রয়েছে, যেমন –
মৈতৈ
বিষ্ণুপ্রিয়া
.
মণিপুরী মৈতৈ ভাষাকে তিব্বতি-বর্মী উপ-পরিবারের
কুকি-চিন দলে এবং বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষাকে ইন্দো-আর্য
উপ-পরিবারের বাংলা-অসমীয়া দলে অন্তর্ভুক্ত করা
হয়, যদিও এই শ্রেণীকরণ নিয়ে ভাষাতাত্ত্বিকদের মধ্যে
যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। অনেকে বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষাকে
মহারাষ্ট্রী-সৌরসেনী ভাষাশ্রেণীর আবার কেউ কেউ
একে ইন্দো-মঙ্গোলয়েড উপশ্রেণীর তালিকাভুক্ত করা
সমিচীন মনে করেন। উৎস ও বিকাশের ক্ষেত্রভুমি
অভিন্ন হওয়ায় উভয় ভাষার মধ্যে ব্যাকরণগত
সামঞ্জস্য রয়েছে। উভয় ভাষাতেই পার্বত্য নাগা ও
কুকিভাষার প্রভাব পরিলতি হয়। শব্দভাণ্ডারের দিক
থেকে উভয় ভাষাতেই ব্যবহৃত হয় এমন শব্দসংখ্যা চার
হাজারেরও বেশি।
১৮৮৯ সনে প্রকাশিত ভারতবর্ষের ভাষা শ্রেণীবিভাগের
প্রধান ভিত্তি স্যার জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সনের
Linguistic Survey of India -তে মৈতৈ ভাষার
পাশাপাশি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষাকে মণিপুরের
অন্যতম ভাষা হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে [৪] । দুইটি
ভাষাই ভারতে স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং আসাম ও
ত্রিপুরা রাজ্যের স্কুলগুলোতে মণিপুরী মৈতৈ ও
বিষ্ণুপ্রিয়া উভয় ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ করে
দিয়েছে। মণিপুরি (মৈতৈ) ভাষা ভারতের অন্যতম
রাস্ট্রভাষা এবং মণিপুর রাজ্যের রাজ্যভাষা। মণিপুর
রাজ্যে মণিপুরী মৈতৈ ভাষায় স্নাতকোত্তর পর্যায়
পর্যন্ত শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তবে বিষ্ণুপ্রিয়া
ভাষায় মণিপুরে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ নেই।
১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্র থেকে
প্রতি সপ্তাহে “মণিপুরী অনুষ্ঠান” শিরোনামে
পর্যায়ক্রমে বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচার
শুরু হয় এবং এই অনুষ্ঠানের সম্প্রচার এখনো অব্যাহত
রয়েছে।
.
মণিপুরী সাহিত্য
.
সূর্যদেবতার উদ্দেশ্যে রচিত গীতিকবিতা ঔগ্রী মণিপুরী
মৈতৈ সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন, যা খ্রীস্টিয় ৩৩
অব্দে রচিত। ঐছাড়া অনেক প্রেমগীতি ও লোকগাথা
মণিপুরী মৈতৈ সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। মণিপুরি (মৈতৈ)
সাহিত্যের লিখিত অস্তিত্ব পাওয়া যায় খ্রিষ্টীয় অষ্টম
শতাব্দী থেকে। অপরদিকে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষারও
প্রাচীন সাহিত্যেভাণ্ডার রয়েছে। বরন ডাহানির এলা
(বৃষ্টি ডাকার গান / ১৪৫০-১৫০০ খ্রী:), মাদই সরাহাল
এলা (বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী লোকগান / ১৬০০-১৭০০
খ্রী:),খাম্বাথৈবীর প্রেমকাহিনী(১৫০০-১৬০০ খ্রী:),
আপাঙর য়্যারী (লোককথা), পৌরেই (প্রবচন) ইত্যদি
বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী লোকসাহিত্যর অমূল্য সম্পদ।
উনিশ শতকের মধ্যভাগে তৎকালীন বৃটিশ ভারতের
রাজনৈতিক এজেন্ট Colonel McCullock তাঁর Valley
of Manipur and Hill Tribes গ্রন্থে ইংরেজি,
মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া ও মণিপুরী মৈতৈ ভাষার তুলনামুলক
সংক্ষিপ্ত অভিধান প্রণয়ন করেন।
.
মণিপুরী হস্তশিল্প
.
হাতে বোনা কাপড় তৈরীতে মণিপুরীরা খুবই দক্ষ।
নিজেদের কাপড় তারা নিজেরাই তৈরি করে থাকে। প্রায়
প্রতিটি ঘরেই তাঁত রয়েছে। মণিপুরী হস্তশিল্প বিশ্বময়
সমাদৃত। মণিপুরীদের বোনা তাঁতের শাড়ি, গামছা , চাদর ,
ব্যাগ ইত্যাদি অন্যান্য জাতির মধ্যেও সমান জনপ্রিয়।
.
ভানুবিল কৃষক-প্রজা আন্দোলন
বৃটিশ শাসনামলে মণিপুরী কৃষকদের সংগ্রামের ইতিহাস
সর্বজনবিদিত। ১৯৪৩ সনে জমিদারী ও সামন্তবাদের
বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল তৎকালীন
মৌলবীবাজার মহকুমার ভানুগাছ পরগনার ভানুবিল
গ্রামের মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়া ও মণিপুরী মৈতৈ স
¤প্রদায়ের কৃষকরা।
.
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মণিপুরী
সম্প্রদায়
১৯৭১ সনে মণিপুরী জনগণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে
প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। বিষ্ণুপ্রিয়া
ও মৈতৈ সম্প্রদায়ের অসংখ্য মণিপুরী তরুণ
মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করেন।
.
সূত্র : উইকিপিডিয়া

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 1