মুর্দাফরাশের ফসফরাস

অ্যাট দ্য জেনিথ। নরোম কয়েকটা ধ্বনি।

আনমনে অনেকবার, এই ধ্বনিগুলোয় মিশিয়ে দিয়েছি নিজেকে। অ্যাট দ্য জেনিথ। পল ক্রান্তৎজ বলেছিলো।

People are only truly happy once in their life. Just once. Then they are punished for it. For the rest of their life. The punishment is, they can never really forget that one moment.
I think its best to say goodbye at the right time. Namely when you’re the happiest. At the Zenith.

পল ক্রান্তৎজের বইগুলো পুড়িয়ে ফেলেছিলো নাৎসিরা। হুমায়ুন আজাদের প্রবচনে লেখা আছে প্রতিটি দগ্ধ গ্রন্থ সভ্যতাকে নতুন আলো দেয়। সভ্যতার পাহারাদারেরা তাই আজকাল ঘন ঘন বই পোড়াতে ব্যস্ত, সভ্যতাকে আলোর বন্যায় ডুবিয়ে দিতে! যা আলো আছে তাতে হচ্ছে না, আরও আলো চাই! হুমায়ুন আজাদ তো বলেই গ্যাছেন বই পোড়ালেই আলো পাওয়া যায়!

কিন্তু আমি ওই ধ্বনিগুলোয় তাও বহুবার চুমুক দিয়েছি। ধ্বনিগুলোকে পান করেছি। অ্যাট দ্য জেনিথ!
পল ক্রান্তৎজের বইগুলো পড়া হয়নি আমার। কোনওদিনও চেষ্টাও করিনি খুঁজবার।

শর্টকাট জেনারেশনের সদস্য আমি, এটা নিয়ে পরিতাপেরও কোনও প্রয়োজন দেখি না। ডায়ানা আরবুসের ছবিগুলো গুগল খুলেও দ্যাখবার চেষ্টা করিনি, সিনেমাটাই দেখেছি কেবল। পল ক্রান্তৎজের সাথেও সাক্ষাৎ হয়েছিলো সিনেমাতেই। দশ বছর আগে।

দশ বছর আগেকার সেই রাশভারি ডেস্কটপে, সেদিন ইউটিউব ছিলো না, ডিভিডি প্লেয়ারে ডিস্ক চালিয়ে জোর করে যাকে তাকে বসিয়ে দিতাম সিনেমা দ্যাখাতে। সিনেমা’র ইমপ্রেশন সাহিত্যের চে’ অনেক তীব্র, আত্মায় সেই বিশ্বাস ছিলো বলে।

সিনেমা বলতে এখন সাধারণত হাবিজাবিই বোঝায়, হাবিজাবিই বাঙালির কাছে সিনেমা ছিলো চিরদিন। মেইনস্ট্রীম নিয়ে শুচিবায়ুতায় ভুগতাম আমরা যখন, যেদিন আমরা স্বপ্ন দেখতে জানতাম – সেইসব দিন ইতিমধ্যে মুর্দাফরাশের ফসফরাস হয়ে গ্যাছে।

সবকিছুই তো মুর্দাফরাশের ফসফসার! জুলহাজ ভাই জিগ্যেস করেছিলো, সবকিছুতে এত আর্ট খোঁজো ক্যানো?

উত্তরই দেয়া হয়নি। এড়িয়ে গিয়েছিলাম প্রশ্নটা। জুলহাজ ভাই খুন হয়ে গ্যাছে, আর কেউ জিগ্যেস করবারও নেই, ক্যানো সবকিছুতে এত আর্ট খুঁজি।

আর্ট ফিল্মই দেখি এখনও, কিন্তু কই, আজকে তো আর আর্ট খুঁজছি না! রক্তের বন্যায় অন্যায় দূর হয়ে যাচ্ছে। আজকাল প্রতিদিন সকাল শুরু হতে না হতেই রক্তের বন্যা শুরু হয়, সন্ধ্যা হতে না হতেই সমস্ত অন্যায় সেই বন্যায় বেমালুম ফুরুৎ হয়ে যায়! এত ন্যায়নিষ্ঠার ভজনের মধ্যে আর্ট যে ঢুকবে, সেই খিড়কি কই?

আর্ট ফিল্ম দেখতে বসলেও এখন আর কোনও প্রতীকের রহস্যে বুকে একটুও কাঁপন লাগে না। শুধু দৃশ্যগল্প দেখে যাই। মাঝে মাঝে ঝিমুনিও চলে আসে।

তনয় ভাই সেই দেবদাসের চন্দ্রমুখীর মার ডালা গানটার সাথে কি তুমুল নেচেছিলো সেইদিন! আরেকটা গান, কি যেন ছিলো? আল্লা আমার চক্ষে তুমি দাও না একটু ঘুম? এরকমই হবে কিছু একটা! জুলহাজ ভাইয়ের ড্রয়িংরুমটা সেদিন বাঈজীর নাচঘর। কেউ কল্পনাও করতে পেরেছিলো সেইদিন, ওই ঘরটায় একদিন রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়?

বাঙালির শ্লোগানবাজি তাও শেষ হয় না। কানের কাছে ভনভন করতে থাকে বস্তাপঁচা শ্লোগানগুলো, দুনিয়ার মজদুর এক হও এক হও, ভাই সব ভয় নাই রাজপথ ছাড়ি নাই, জালাল মিয়ার চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র!

কিন্তু অন্যায়গুলো তো রক্তের বানে ভেসেই গ্যালো। বাক্সভর্তি অন্যায় বোঝাই করা ছিলো জুলহাজ ভাইয়ের ড্রয়িংরুমে। কোথায় যে ভেসে গ্যাছে ওই অন্যায়ের বাক্স আর স্যুটকেসগুলো, উদ্ধার করার কোনও উপায় নেই!

এখন ল্যাপটপের স্ক্রীনে মুর্দাফরাশের ফসফরাস। জ্বলছে, চকমকি পাথর থেকে, কবরের গন্ধ থেকে, ল্যাপটপে। ওয়ালপেপারের কাশফুলে জুলহাজ ভাই। এই কাশফুলগুলো কি জার্মান? নাৎসি আক্রমণের অপেক্ষা করছে? পল ক্রান্তৎজের মতো?

পল ক্রান্তৎজের বন্ধু, গ্যুণ্টার – তার প্রেমিককে খুন করেছিলো। তারপর নিজের মাথায় গুলি চালিয়ে দিয়েছিলো। অবলীলায়।

গ্যালো অক্টোবরে দীপনের মৃত্যু’র পর থেকেই আমি সিনেমাটা দেখছি। আর ওই গানটা, প্রিন্সেস ক্রোকোডাইল!

Heart Full of Bells
Rings In Your Moon
Wherever you go, I see it all in you
Princess Crocodile!

সিনেমাটা তিন বছর আগেও খুঁজেছি, সীমান্ত স্ক্যয়ারে। সেদিন সন্ধ্যায়ও আমার ঘরে অন্ধকার। শুধু এক ফাঁকে মুঠোফোনটা জ্বলে উঠলো। দেখলাম মেসেজ এসেছে, স্যরি ফর দ্য ইনকনভেনিয়েন্স। উই আর ওয়ার্কিং টু ডেভেলপ আওয়ার নেটওয়ার্ক।

যেদিন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও অস্কার পেলো, সেদিনই ফেসবুকে পোস্ট করেছিলাম টোটাল এক্লিপসের কয়েকটা স্টিল। লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও, কাঁচা শরীরে যেদিন সমকামী কবির অভিনয় করেছিলো নগ্ন দেহে!

টাইটানিক ছাড়া লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও’র আর কোনও প্রেমের সিনেমা নেই? কে বলেছে? ক’টা বাঙালি টোটাল এক্লিপস দেখেছে?

শুধু কেট উইনস্লেটের স্তন! লিও’র ওই নিখুঁত নিতম্বের কি হবে? সূর্যগ্রহণ, টোটাল এক্লিপস!
র‍্যাঁবো’র বইগুলোও আমার পড়া হয়নি। কারণ, আমি শর্টকাট সময়ের বাসিন্দা। হুমায়ুন আজাদ অবশ্য র‍্যাঁবোর একটা বইয়ের বাঙলা নামটা দিয়ে গিয়েছে, নরকে অনন্ত ঋতু।

দু’একবার র‍্যাঁবো’র কোট সার্চ করেছি গুগলে। ওইটুকুই আমার র‍্যাঁবোপাঠ। কিন্তু, র‍্যাঁবো তো সমকামী ছিলো! ১৮৭১ সালে শুরু হয়েছিলো টোটাল এক্লিপসের গল্প।

১৮৭১। আর আজ ২০১৬। অথচ এখনও সমকামী হতে ভয় পায় কবিরা, বাংলাদেশে।
আর কবিতা তো এখন মাখন মাখানো রুটি! কবিতা আর কাবাবে এখন কোনও পার্থক্যরেখা নেই। কাবাবগুলো দাঁতে ছেঁড়া গেলে, কবিতা যারা ভাজি করে বিক্রি করে ফেসবুকের ফুটপাতে, ভ্যানে ভ্যানে, যে কাবাবওয়ালারা- তারা পকেটভর্তি বখশিস পায়! কবিতার সঙ্গে এখন এস্ট্যাবলিশমেন্টের ঘনিষ্ঠতা। আর ক’টা দিন পরে কবিতার অফিস খুলবে মতিঝিলে আরিচায়, সাইনবোর্ডে ল্যাখা থাকবে আমাদের কোনও শাখা নেই!

র‍্যাঁবোকে কোনও দরকার নেই আপাতত। এসবের মধ্যে। বাংলাদেশে তো নয়ই! র‍্যাঁবোকে কোপানোর ইচ্ছে নেই আমার। কারুরই হয়তো নেই।

তারপরও পূর্ণ সূর্যগ্রহণ। আর সেই পুরোনো রাহুগ্রাসের গল্প।

জুলহাজ ভাই খুন হয়ে গ্যালো। জুলহাজ ভাই র‍্যাঁবো ছিলো কি না, সেটা পরের প্রশ্ন। কিন্তু জুলহাজ ভাই স্বপ্নের পান্নাগুলো মেরামত করতো। প্রায়ই।

আপাতত স্বপ্ন-টপ্ন সব নিভে গ্যাছে।

এখন আর টোটাল এক্লিপস দ্যাখার দরকার নেই। লাভ ইন থটসও না দেখলেও চলবে।
গ্যুন্টার তাও বলেছিলো,
Dear Universe, When we have cease to exist, we don’t anyone to miss us or shed a single tear for us. If anyone wants to keep us in his memory, let him do so in joy.
For you see, we’ve did the only right thing. We lived.

ভিএলসি প্লেয়ার ক্লোজ করে দিয়েছি। আর্ট ফিল্ম আজকাল আর দ্যাখা হয় না। আফসোসও করি না।
এখন টোয়াইলাইট সাগা দেখতে যাচ্ছি, ওই ভ্যাম্পায়ারের গল্প। প্রেমিক আর প্রেমিকা, প্রত্যেকেই ভ্যাম্পায়ার। রবার্ট প্যাটিনসন ছেলেটা দেখতে সুন্দর, মেয়েটাও সেইরকম – দুই ভ্যাম্পায়ারের চুমোচুমিটাও জমে ভালোই। তাই এখন ভ্যাম্পায়ারের গল্প।

শুধু আর্ট দিয়ে চলে না যেহেতু, এন্টারটেইনমেন্টও যেহেতু দরকার।

যেহেতু খুনের বীভৎসতা, খুন দেখে কাতরে ওঠা, ঘড়ঘড় শব্দে জবাই হতে থাকা গলা দেখে চিৎকার করে ওঠাটাও- যেহেতু এখন ছেলেমানুষি! যেহেতু খুনের লাবণ্য খুঁজতে এখন বাধ্য সকল লোক, আমরা প্রত্যেকেই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

21 + = 28