আজকের কোরান কি ওসমানের কোরান ? ইতিহাস কি বলে ?

দুনিয়ার সকল মুসলমান মাত্রই বিশ্বাস করে মুহা্ম্মদ আল্লাহর নবী, মক্কায় তার জন্ম ৫৭০ সালে, ৪০ বছর বয়সে হেরা গুহার মধ্যে কোরানের বানী শুনতে পান, তখন থেকেই ইসলাম প্রচার শুরু করেন , তারপর ৬২১/৬২২ সালে মদিনায় হিজরত করেন , সেখানে জীবনের বাকী সময় পার করে ৬৩২ সালে মারা যান। তারপর আবু বকর , ওমর , ওসমান ও আলী খলিফা হন , তাদের যুগকে বলা হয় ইসলামের স্বর্ন যুগ। কথিত আছে ওসমান কোরান সংকলন করে, আর সেই কোরানেরই নাকি হুবহু কপি আজও প্রতিটা মুমিনের ঘরে ঘরে। কিন্তু ইতিহাস থেকে প্রাপ্ত তথ্য কি বলে ?

ইসলামের মূল কিতাব হলো কোরান ও হাদিস। বলা হয়, কোরান মুহাম্মদ মারা যাওয়ার ২০ বছর পর খলিফা ওসমান কর্তৃক সংকলিত হয়। তারপর সে একটা করে কপি দামেস্কে , মক্কায় ও কায়রোতে পাঠায় আর মদিনায় একটা রেখে দেয়। এ ছাড়া বাকী সব পান্ডুলিপি ওসমানের আদেশে পুড়িয়ে ফেলা হয়। যেহেতু , দামেস্ক , মক্কা , কায়রো , মদিনা সব যায়গাই ছিল মুসলমানদের খলিফাদের দখলে ও শাসনে , আর দামেস্ক বা কায়রোতে ছিল বহু শিক্ষিত মানুষ , কারন তখন মধ্য প্রাচ্যে সেসব নগর ছিল অত্যন্ত সুসভ্য, তাই ধরে নেয়া যায়, ওসমান কর্তৃক সংকলিত এ কোরান শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় আজও সংরক্ষিত থাকবে। কিন্তু ওসমানের কোরান কি আদেৌ আছে ? যদি না থাকে কেন নেই ?

সেই কোরান যদি সংরক্ষিত না থাকে , তাহলে আজকের কোরান যে হুবহু ওসমান সংকলিত কোরান সেটা কিভাবে প্রমানিত হবে ? যদি প্রমানিত না হয় , তাহলে কিভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে যে এই কোরান সত্যি সত্যিই আল্লাহর কাছ থেকে আসছে যেখানে বলা হচ্ছে – আল্লাহই হলো কোরানের সংরক্ষক ?

বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে মাত্র ছয়টা কোরানের পুরাতন পান্ডুলিপি পাওয়া যায়। তুরস্কের ইস্তাম্বুলের Topkapi, উজবেকিস্তানের তাসখন্দের Samarkand Kufic Quran , ইয়েমেনের সানায় Sana’a manuscripts এ ছাড়া লন্ডনে, প্যারিসে ও কায়রোতে একটা করে কপি আছে। এতদিন শুনতাম এই ইস্তাম্বুলের কপি ও তাসখন্ডের কপি হলো ওসমানের আমলকার। কিন্তু অতি সাম্প্রতিক পরীক্ষা নিরীক্ষায় জানা গেছে ইস্তাম্বুলের কোরান আসলে ৮ম শতাব্দীর গোড়ার দিকের আর তাসখন্ডের কপি ৮ম শতাব্দীর শেষ থেকে নবম শতাব্দীর প্রথম দিকের। এর মধ্যে ১৯৭২ সালে আবিস্কৃত সানার কোরান সর্বাপেক্ষা পুরাতন , আর এর বয়স হবে ৬৯৫- ৭৫৫ সালের মধ্যে।

সূত্র : https://en.wikipedia.org/wiki/Early_Quranic_manuscripts
http://www.islamic-awareness.org/Quran/Text/Mss/samarqand.html
https://en.wikipedia.org/wiki/Topkapi_manuscript
http://www.islamic-awareness.org/Quran/Text/Mss/topkapi.html
https://en.wikipedia.org/wiki/Sana%27a_manuscript

রাশিদিনের খলিফাদের রাজত্বকাল ছিল নিম্নরূপ :
আবু বকর ——–৬৩২-৬৩৪ খৃ:
ওমর ————–৬৩৪-৬৪৪ খৃ:
ওসমান ————৬৪৪-৬৫৬ খৃ:
আলী—————৬৫৬-৬৬১ খৃ:

তার মানে , দুনিয়াতে যে সব কোরানকে ওসমানের আমলের কপি বলে প্রচার করা হয়, তার একটাও আসলে ওসমানের আমলকার কোরান না। প্রশ্ন হলো – তাহলে এতকাল এই ভুল প্রচারনা কেন করা হয়েছে ? উত্তর একটাই সেটা হলো সাধারন মানুষকে সত্যটা জানতে না দেওয়া। কিন্তু তার চাইতে বড় কথা হলো – পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা গেছে , এইসব কোরানের পান্ডুলিপিতে বহু বাক্য মুছে নতুন করে লেখা হয়েছে , যা পরীক্ষায় ধরা পড়েছে , বহু নতুন শব্দ ঢুকান হয়েছে ,আর এর একটা পান্ডুলিপির সাথে অন্য পান্ডুলিপির হুবহু কোনই মিল নেই , আর আজকে যে কোরান আমরা পড়ি , তার সাথে তো বহু তফাৎ। আজকের যে কোরান আমরা বাজারে পাই , তা আসলে বিংশ শতাব্দির ত্রিশের দশকে সৌদি আরব সরকারের ছাপান কোরান। এই কোরানের সাথে আগের কথিত কোরানের পান্ডুলিপির কোনটার সাথেই ১০০% মিল নেই।

সর্বশেষে ২০১৫ সালে ইংল্যান্ডের বার্মিংহামে যে তিনপাতা কোরানের পান্ডুলিপি পাওয়া গেছে পরীক্ষা করে দেখা গেছে তার বয়স হবে – ৫৬৮ থেকে ৬৪৫ খৃষ্টাব্দ। যার অর্থ এই পাতাগুলো মুহাম্মদের নবুয়ত্ব প্রাপ্তির আগের লেখাও হতে পারে। কারন মুহাম্মদের কথিত নবুযত্ব হলো ৬১০ খৃষ্টাব্দে। আর তাহলেও তো বিরাট গন্ডগোল।

কিন্তু আসল কথা হলো , ওসমানের আমলের কোন কোরানই দুনিয়াতে নেই। তার মানে কোরানের মূল পান্ডুলিপি বলে কিছুই নেই। যা পাওয়া যায়, তা উমাইয়াদের খিলাফত আমলে লিখিত কোরান, কিন্তু সেই তখনকার সময়ে যে বিভিন্ন পান্ডুলিপি আছে সেগুলো হুবহু এক না। বিশেষ করে খলিফা আব্দুল মালিকের সময়কালের কোরান , তার শাসনামল ছিল ৬৮৫ থেকে ৭০৫ খৃ:। দেখা যায়, হুবহু এক কোরানের পান্ডুলিপি পাওয়া যেতে থাকে ৯ম শতাব্দী থেকে। তার অর্থ মুহাম্মদ মারা যাওয়ার পর , যে বা যারাই কোরান সংকলন/ রচনা করতে থাকুক না কেন তারা সময়ে সময়ে তার সংস্কার করেছে , পরিবর্তন পরিবর্ধন করেছে এবং অবশেষে নবম শতাব্দীতে গিয়ে একটা আদর্শ কোরানে পরিনত হয়েছে আর সেটারই কপি আমরা বর্তমানে দেখতে পাই।

উল্লেখ্য এই উমাইয়া বংশের আদি পিতা মুয়াবিয়ার ছেলে এজিদের হাতেই মুহাম্মদের দুই নাতি নিহত হয়, তাদেরকে হত্যা করেই এজিদ খলিফা হয়। অর্থাৎ এই উমাইয়া বংশ ছিল ঘোরতর মুহাম্মদ তথা ইসলাম বিরোধী যদিও মুসলমান নাম ধারন করেই তারা খিলাফত পরিচালনা করেছে। কিন্তু ইতিহাসের তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে , ইসলাম বিরোধীদের দ্বারাই কোরান সংশোধিত , পরিবর্তিত ও সংকলিত হয়েছে। তাহলে কোন ধরনের ইসলাম তারা প্রতিষ্ঠা ও প্রচার করে গেছে ?

একটা বিষয় খেয়াল করতে হবে , ওসমান ছিল খলিফা , সে যদি সম্পূর্ন কোরান সংকলন করে বিভিন্ন নগরে পাঠিয়ে দিয়ে থাকে , যেখানে মুসলমানরাই ছিল শাসক , তাহলে সেই সব কোরান অবশ্যই শাসকের পৃষ্ঠপোষকতায় অতি সুন্দরভাবেই সংরক্ষিত থাকবে। এভাবেই সংরক্ষিত হয়ে ছিল কোরানেরও আগের হাজার বছর আগের বহু পান্ডুলিপি। কিন্তু দু:খজনকভাবে ওসমানের সেই কোরানের কোনই অস্তিত্ব নেই, অস্তিত্ব আছে উমাইয়াদের আমলে রচিত কোরানের বিভিন্ন পান্ডুলিপি , আবার তাদের পরস্পরের মধ্যে আছে বহু অমিল। তাহলে কি এটা প্রমানিত হয় না যে , ওসমান যদি কোরানের পান্ডুলিপি করেও থাকে , তাহলে উমাইয়া খলিফারা সেসব ধ্বংস করে দিয়ে , নিজেরাই নিজেদের ইচ্ছামত কোরান রচনা করেছে , যার মধ্যে ওসমানের কোরানের বেশ কিছু অংশ বিদ্যমান আছে অবশ্যই।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে , মুহাম্মদ কথিত কোরানের সাথে আজকের কোরানের বহু অমিল , যার অর্থ হলো – আমরা যেভাবে জানি বা শুনে আসছি যে গত ১৪০০ বছর ধরে কোরানের মধ্যে কোনই পরিবর্তন হয় নি , দুনিয়ার প্রতিটা কোরান একই , সেটা কিভাবে সত্য হয় ? এই মত অবস্থায় কোরান কিভাবে আল্লাহর বানী হতে পারে ?

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৬ thoughts on “আজকের কোরান কি ওসমানের কোরান ? ইতিহাস কি বলে ?

  1. ওসমানের আমলের কোন কোরানই
    ওসমানের আমলের কোন কোরানই দুনিয়াতে নেই্।ইয়েমেনে জাদুঘরে ওসমানের রক্ত মাখা যে কুরআন এর কপি আছে সেটা তাহলে কোন আমলের জানলে উপকৃত হতাম এবং উমাইয়াদের আমলে রচিত কোরান কি নিজেদের ইচ্ছামত রচনা করেছে
    https://www.youtube.com/watch?v=1dC3WzfbENA

    1. ইয়েমেনে ওসমানের রক্তমাখা কোন
      ইয়েমেনে ওসমানের রক্তমাখা কোন কোরান আছে বলে তো শুনিনি। এ ধরনের গল্প যদিও প্রচলিত আছে, কিন্তু তার বাস্তব অস্তিত্ব নেই। ইযেমেনের সানায় এক মসজিদের ধ্বংসাবশেষ থেকে কোরানের পান্ডুলিপি আবিস্কার হয় ১৯৭২ সালে, সে ব্যপারে তো বলাই হয়েছে। আর সেটা ওসমানের কোরান না।

  2. আপনি তথ্য দেখালেন যে ৬৯৫- ৭৫৫
    আপনি তথ্য দেখালেন যে ৬৯৫- ৭৫৫ সালের মধ্যে, এটাতো অনেকটাই অনুমানের উপর, আপনি কিভাবে এতো নিশ্চিত!!

    1. প্রাচীন পান্ডুলিপি নিয়ে যারা
      প্রাচীন পান্ডুলিপি নিয়ে যারা গবেষণা করে , তাদের যে কোন পান্ডুলিপির বয়স নির্নয়ের একটা পদ্ধতি আছে। আপনার কি সেই পদ্ধতির ওপর বিশ্বাস আছে ? নাকি সেই পদ্ধতি একমাত্র কোরান ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে ? কোনটা ? যাইহোক , আপনার প্রশ্নের উত্তর এখানে পেতে পারেন :

      https://en.wikipedia.org/wiki/Sana%27a_manuscript

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 2 =