শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আমার রসিকতা !!

প্রতিবছর এসএসসি , এইচএসসি কিংবা সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রদ্ধেয় আল্লামা হাসিনা বেশ করে কিছু কমন ডায়লগ পাঠ করেন | যেমন ধরুন যেবার শিক্ষার্থীদের ফলাফল ভালো হয় সেবার বলেন যে দেশে শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের ফলেই আজকের এই ফলাফল সম্ভব হয়েছে | আর যখনি ফলাফল খারাপ হয় , তখনি অতি বিষ্ময়ের সাথে বলেন শিক্ষাব্যবস্থার এতো উন্নয়ন এতো সুবিধা দেয়ার পরও কেন শিক্ষার্থীরা ফেল করে ! কিংবা ফেল করা ছাত্রদের দিকে নজর দিতে হবে | টিভির পর্দায় এসব ডায়লগবাণী শুনলেই কেন যেন আমার চিৎকার করে হাসতে ইচ্ছে হয় | কখনো আবার হাসতে হাসতে চোখ থেকে দুফোটা জলও ঝরে পড়ে | যাহোক প্রধানমন্ত্রীর কথানুসারে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি এবং সরকার কতৃক শিক্ষার্থীদের দানকৃত সুবিধাগুলি নিয়ে একটু আলোচনা করি আজ |

শিক্ষাব্যবস্থার কথা আলোচনা করতে গেলেই প্রথমে আমি একটা বিষয় সচরাচর বলে থাকি যে , বর্তমান বাংলাদেশে বিভিন্ন বোর্ড পরীক্ষার ফলাফল পরীক্ষার্থীদের থেকে সরকারের মন মর্জির উপর বেশী নির্ভর করে | কেন তা জানতে হলে একটু ফিরে তাকাতে হবে পূর্ববর্তী সালগুলোর বোর্ড পরীক্ষাগুলোর ফলাফলের দিকে | চলুন এক নজরে দেখে নেয়া যাক ২০০৩ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার এবং জিপিও পাচ এর সংখ্যা |

২০০৩ সালে মোট পরীক্ষার্থী ৯,২১,০২৪ জন,পাসের হার ৩৫.৯১% ,জিপিএ ৫ পেয়েছে ১৩৮৯ জন |

২০০৪ সাল থেকে চতুর্থ বিষয়ের মার্ক সংযুক্তি শুরু হওয়ায় এপ্লাসের সংখ্যা বেড়ে যায় | মোট পরীক্ষার্থী ৭,৫৬,৩৮৭ জন,পাসের হার ৪৮.০৩%,জিপিএ ৫ পেয়েছে ৮৫৯৭ জন |
২০০৫ সালে মোট পরীক্ষার্থী ৭,৫১,৪২১ জন ,পাসের হার ৫২.৫৭%,জিপিএ ৫ পেয়েছে ১৫,৬৪৯ জন |

২০০৬ সালে মোট পরীক্ষার্থী ৭,৮৪,৮১৫ জন,পাসের হার ৫৯.৪৭% ,জিপিএ ৫ পেয়েছে ২৪,৩৮৪ জন |

২০০৭ সালে মোট পরীক্ষার্থী ৭,৯২,১৬৫ জন,পাসের হার ৫৭.৩৭%,জিপিএ ৫ পেয়েছে ২৫,৭৩২ জন |

২০০৮ সালে মোট পরীক্ষার্থী ৭,৪৩,৬০৯ জন,পাসের হার ৭০.৮১% ,জিপিএ ৫ পেয়েছে ৪১,৯১৭ জন |

২০০৯ সালে মোট পরীক্ষার্থী ৭,৯৭,৮৯১ জন,পাসের হার ৬৭.৪১% ,জিপিএ ৫ পেয়েছে ৪৫,৯৩৪ জন |

২০১০ সালে মোট পরীক্ষার্থী ৯,১২,৫৭৭ জন,পাসের হার ৭৮.৯১% , জিপিএ ৫ পেয়েছে ৬২,১৩৪ জন |

২০১১ সালে মোট পরীক্ষার্থী ৯,৮৬,৬৫০ জন ,পাসের হার ৮২.১৬ % ,জিপিএ ৫ পেয়েছে ৬২,৭৮৮ জন |

২০১২ সালে মোট পরীক্ষার্থী ১০,৪৮,১৪৪ জন,পাসের হার ৮৬.৩২% ,জিপিএ ৫ পেয়েছে ৬৫,২৫২ জন |

২০১৩ সালে মোট পরীক্ষার্থী ১২,৯৭,০৩৪ জন পাসের হার ৮৯.০৩% , জিপিএ ৫ পেয়েছে ৯১,২২৬ জন |

২০১৪ সালে বিনা নির্বাচনে আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর হঠাৎ মেধার ব্যাপক উন্নয়ন কিংবা বিষ্ফোরন ঘটে | এসময় মোট পরীক্ষার্থী ১৪,৩২,৭২৭ জন,পাসের হার ৯১.৩৪%,জিপিএ ৫ পেয়েছে ১,৪২,২৭৬ জন |

২০১১-১৪ এর শিক্ষাব্যাবস্থার উন্নয়ন আর একটু সহজে বুঝতে গ্রাফটি লক্ষ্য করুন |

?w=640″ width=”400″ />

এবার একটু ভাবুন তো কী করে হঠাৎ মেধার বিপ্লব ঘটলো ? হ্যা ব্যাপারটা হলো ২০০৯ সালে সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির মাঝে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করার কথাও বলে | এখন বাস্তবে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন করা বিশাল ব্যাপার | কিন্তু তার থেকে যদি কিছু অসৎ কৌশল প্রয়োগ করে পাসের হার বাড়ানো যায় , তো পাবলিকে খুব সহজেই শিক্ষার উন্নয়ন হচ্ছে তা বোঝানো যাবে | সরকারের কিছু উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কৌশল সম্পর্কে বলি |

প্রথমত বোর্ড থেকে শিক্ষকদের বলে দেয়া হয় যে শিক্ষার্থীদের খাতায় ভূল থাকুক কিংবা যাই হোক লিখলেই নম্বর দিতে হবে | নম্বর কম দিলে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে | শিক্ষার্থীদের ফেল করানো যাবে না | নম্বর কম থাকলে বাড়িয়ে দিয়ে পাস করাতে হবে | পাস করানোর কারণ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম ওরফে সেল্ফি নাহিদ সাহেবের ভাষায় হলো শিক্ষার্থীরা কেউ ফেল করার জন্য পড়াশোনা করে না , তাই পাস নম্বর তাদের অধিকার | এছাড়া নকলের ব্যবস্থা তো আছেই |

তবে ২০১৫ সালের দিকে এসে সময়ে অসময়ে বিরোধী দলীয় বিভিন্ন কর্মসূচী পড়ায় সরকার কতৃক অবশ্য বর্তমানে খাতা দেখায় জালিয়াতিটা একটু কমানো হয়েছে | কারণ সামান্য খারাপ ফলাফল না হলে তো আর বড় পর্দায় বলা যাবে না যে খারাপ ফলাফলের জন্য বিরোধী দল দায়ী | বিরোধী দলের প্রতি মানুষের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে দেয়ার এত বড় সুযোগ টা কী ছেড়ে দেয়া যায় ! তাই মাঝে মাঝে ফেলের সংখ্যা বাড়িয়ে ফলাফল খারাপও করাতে হয় | সবই নেত্রীর মন মর্জি আর উন্নয়নের প্রভাব বাপু |

তবে খাতা দেখায় সুবিধা কমলেও উন্নয়ন থেমে নেই | প্রশ্নফাসের মত শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তো বাংলাদেশে এখন স্বাভাবিক বিষয় | শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই জানতে পারে যে পরীক্ষার আগেই তাদের হাতে প্রশ্ন থাকবে | ফলে একদল পড়ালেখা না করেই প্রশ্নপত্র ফাস করে এ প্লাস পাচ্ছে , আর একদল সারা বছর বইয়ের মধ্যে ডুবে মরেও ভালো করতে পারছে না | ইদানিং একটা বিষয় বেশ লক্ষণীয় যে বিভিন্ন বোর্ড পরীক্ষার দিন পরীক্ষার্থীদের ভীর জমে তাদের নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে | সেখানে প্রশ্নপত্র এবং তার উত্তর দিয়ে দেয়া হয় | বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্নপত্র যে এখন কতটা সহজলভ্য তা নিচের ছবিটি লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন |

?w=355&h=590″ width=”400″ />

অবাক হচ্ছেন ? অবাক হওয়ার কিছু নেই | প্রশ্নপত্র এখন নিজেদের টাকা খরচ করে স্পন্সর করেই অন্যের হাতে পৌছে দেয়া হয় | এ সবই শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের প্রভাব |

বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থা বর্তমানে কতটা উন্নত তার আরও প্রমাণ পাওয়া যায় এবারের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার দিকে তাকালে | কতটা উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা পেলে গরু গাধা সবাই মেডিকেলে চান্স পায় বোঝেন ? উন্নয়নের জোয়ার বইছে চারিদিকে !!

তবে হ্যা মাঝে মাঝে প্রধানমন্ত্রীর মতো আমারও খুব অবাক লাগে এই ভেবে যে এত সুবিধা , অর্থাৎ প্রশ্ন পাওয়ার পরও কী করে শিক্ষার্থীরা ফেল করে ! ওহ আচ্ছা তাহলে মনে হয় প্রশ্ন সবার হাতে পৌছায় না | নাহ ,খুবই দুঃখের বিষয় এটা | প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানাই উন্নয়ন আর একটু বাড়িয়ে প্রশ্নটা যেন সবার হাতে পৌছায় তার নিশ্চয়তা দেয়া হোক | তাহলেই সব সমস্যার সমাধান এবং শিক্ষাব্যবস্থার সর্বোচ্চ উন্নয়ন সাধন হবে |

(বিঃ দ্রঃ এসকল কর্মকাণ্ডের পরও যদি বলা যায় শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতি হচ্ছে , তবে হেজাফ পরার কারণে মিয়া খলিফাকেও নিঃসন্দেহে একজন ধার্মিক বলা যাবে )

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

59 − 53 =