গল্প অথবা বাস্তব……………….

আজকাল আমার সর্বক্ষনের সঙ্গী এই জানালার গ্রিলটা। অদ্ভুদ এক ভালোবাসা জন্মে গেছে এই প্রানহীন জিনিসটার প্রতি। অথচ আমি একেও ভালোবাসতে চাই নি। সামনের ঐ ধানক্ষেতটার জন্যও মায়া জন্মে গেছে। অথচ আমি এটাও চাই নি। সকালের উদিয়মান সূর্যের মৃদু লাল আভা খুব গায়ে মাখতে ইচ্ছে করে। প্রতিদিন সূর্যাস্ত দেখি আর ভাবি- কোন একদিন আমিও ডুব দেব কালের অতল গহ্বরে। কিন্তু আমি ভালোবাসতে চাই নি কাউকে, এমনকি নিজেকেও না। তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়াই ছিল একমাত্র উদ্দেশ্য। একেবারে শূন্যে মিলিয়ে যেতেও চেয়েছিলাম কিন্তু পারিনি। হয়তোবা আত্মহত্যা করার মতো সাহসও আমার নেই। অথচ মৃত্যুই আমার একমাত্র লক্ষ্য। হ্যাঁ আমি বাঁচতে চেয়েছিলাম, বাঁচার জন্য লড়েছিও, কিন্তু হেরে গেছি। মাঝে মাঝে মনে হয়- এখুনই এই দুঃসহ পৃথিবীটাকে ছুটি দিয়ে দেই। কেউ তো চায় না আমি বেঁচে থাকি। আমার জন্মদাত্রি মাও একদিন বলেছিল- তুই এখনো বেঁচে আছিস মুখপুড়ি। তুই মরিস না ক্যান? বাবার বাহুতে মাথা রাখার ইচ্ছাটা মাঝে মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। কিন্তু বাবা আমার মুখ দর্শনও করতে চায় না। তবু মাঝে মাঝে বাঁচতে প্রবল ইচ্ছা করে। পাশের ঐ ধানক্ষেতের আলে শিশির সিক্ত ঘাসে নগ্ন পায়ে হাঠতে ইচ্ছা করে। ইচ্ছে করে পুকুর ঘাটে শিতল পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে, মায়ের কোলে মাথা দিয়ে ঘুমাতে। আমার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ঘুমাতে। ও তো এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। এখন সে পাকা পাকা কথা বলতে পারে। এইতো সেদিন তাকে কোলে চাইলে সে বলে উঠল- আমি তোমাকে ঘৃনা করি। তুমি খুব খারাপ। শত চেষ্টাতেও তাকে আদর করতে পারি নি। অথচ একসময় আমিই ছিলাম তার সব। ওর বাবার কাছেও সে যেতো না। মা-ই ছিল তার পৃথিবী। এখন আমি তার কাছে হয়তোবা ধূষর হয়ে যাওয়া কিছু স্মৃতি বৈ কিছু না।
এই বাড়ীর চিরচেনা উঠানটাও এখন অচেনা। শুধুমাত্র চার দেয়ালের এই ছোট কক্ষটাই আমার আপন। একটা শোয়ার খাট, টেবিল, আলনা আর কিছু কাপড় চোপড়। অথচ একদিন আমার পৃথিবীটাও অনেক বড় ছিল। অনেক স্বপ্ন, আশায় ভরপুর ছিল আমার দুনিয়া। সেটাই কাল হলো আমার জন্য। পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে- এই প্রবাদ বাক্যটা কিংবা “সুখে থাকতে ভূত কিলায়”- বাক্যটা যেন আমার জীবনেরই সমার্থক।
ও মানে আমার স্বামী আমাকে কোন কিছুরই অভাব বুঝতে দেয় নি। ছয় বছরের সংসার জীবনে ছিল সুখ স্বাচ্ছন্দ্য। বিয়ের দুই বছরের মাথায় আমার সন্তান কোল আলোকিত করে এসেছিল। সেই হয়ে উঠেছিল আমার আনন্দের ভুবন। সে যখন প্রথম কথা বলা শিখেছিল, সারাদিন তার কথা শুনতে ইচ্ছে হত। তাকে সবসময় আমার কাছে রাখা চাই। সেও ছিল মা ন্যাওটা। সারাক্ষন মায়ের আঁচল ধরে ঘুরে বেড়াতো। ওর বাবার কোলেও সে যেতে চাইতো না। ওর বাবা তাই একদিন মজা করে বলেছিল- ওর জন্ম শুধুমাত্র তোমার ডিম্বানু থেকেই হইছে, আমার শুক্রানু মনে হয় কোন কাজে আসে নাই। আমি শুধু মুচকি হেসেছিলাম।
কিন্তু কথায় আছে- অতি সুখ মানুষের কপালে সয় না। আমার কপালেও সহ্য হয় নি। এক নিমিষেই সবকিছু নরম মাটির দলার মতো ভেঙ্গে গেছে। এক মুহূর্তের একটা ভুল সিদ্ধান্তের জন্য জীবনটা নরকের অগ্নিকুন্ডে পরিনত হয়েছে। যে আগুন প্রতিনিয়ত আমাকে পোড়াচ্ছে। তুষের আগুনও হয়তোবা একসময় নিভে যায়, কিন্তু এই আগুনের শেষ কোথায়?
জীবন রেখাচিত্রের অধঃগমন শুরু হয়েছিল সেদিন থেকেই, যেদিন এক অপরিচিত নাম্বার ভেসে উঠে মোবাইল স্ক্রিনে আর সেটা ছিল সেই অমানুষটার। ওর সাথে দেখা হয়েছিল বড় আপার বিয়েতে। তখন আমি মাত্র নাইনে পড়তাম। সেখান থেকেই পরিচয় ও প্রনয়। তখন সে ছিল অমায়িক ও সুদর্শন। তার লম্বা চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমে আসত। কথা বলার ভঙ্গি ছিল অসাধারন। তার মুখের কথাই সবসময় শুনতে ইচ্ছা করত। ও যখন কথা বলত, আমি নিশ্চুপ বসে তার দিকে চেয়ে থাকতাম। সত্যি বলতে কি? তার এই বাগ্মিতাই তার প্রতি মুগ্ধতার প্রথম কারন। সেই আমাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছিল। চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় সেই আমাকে স্নান করতে শিখিয়েছে। বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের সুমধুর সুর সেই আমাকে চিনিয়েছিল। জীবনের প্রতিটি ক্ষনে রস আস্বদন করতে শিখিয়েছিল সেই। সে সময় জীবনের ছিল স্বর্গীয় সুখের স্বাদ। কিন্তু ঐ যে বলেছিলাম- বেশি সুখ আমার কপালে সয় না। ওর সাথে আমার সম্পর্ক ছিল চার বছরের। এই সময়ই ছিল আমার জীবনের সোনালী সময়।
তারপর একদিন হঠাৎ শুনি- আমাকে নাকি আজকে বরপক্ষের লোকজন দেখতে আসবে। আমার জন্য এটা ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। কি করব? কিছুই ভেবে পাই নি। বাড়ীতে বলেছিলাম, বাবা মেনে নেয় নি? মা শুধু আমাকে সাত্ত্বনা দিয়ে বলত- সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে বিয়ের পর।
ভেবেছিলাম- পালিয়ে বিয়ে করব। ওকেও বলেছিলাম। কিন্তু সে সাহস তার কিংবা আমার, কারো ছিল না। খাওয়া দাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলাম। রাত জেগে জেগে চোখের নিচে কালি জমে গিয়েছিল। সে সময় একমাত্র সাহস ছিল আমার মা।
তারপর হঠাৎ একদিন ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল। সবার হাসির মাঝে চাপা পড়ে গিয়েছিল আমার অসহায় কান্না। আমি প্রবেশ করলাম আমার দ্বিতীয় জীবনে।
কিছুদিনের মধ্যেই আমার মুখের চিরচেনা হাসিটা ফিরে এসেছিল। সম্পূর্ন কৃতিত্বটা আমার স্বামীর। ওকে বাসর রাতেই সবকিছু খুলে বলেছিলাম। ও বলেছিল- তোমার অতীত জীবন ছিল শুধুই তোমার কিন্তু এখন জীবনটা আমাদের দুজনের। তোমার অতীত সম্পর্কে আমার কোন মাথাব্যথা নেই।
আমিও নিয়তিকে মেনেই নিয়েছিলাম। বাঁচতে চেয়েছিলাম নতুন করে। সবকিছুই ভুলে, চেয়েছিলাম নতুন করে জীবনটাকে গড়তে। সেদিকেই ধীরে ধীরে এগুচ্ছিলাম। যদিও তাকে ভুলে থাকাটা আমার জন্য অসম্ভবই ছিল।
এরপর আমার কোল জুড়ে এসেছিল আমার সন্তান। যার মুখের দিকে তাকিয়ে সব কিছু ভুলে থাকতাম। আমার সুখের আধার ছিল আমার সন্তান। আমার স্বামী বেশিরভাগ সময় থাকত বাড়ির বাইরে। সময়গুলো কাটাতাম ছেলেকে নিয়ে।
তারপর একদিন বেজে উঠল মুঠোফোনটা। স্ক্রিনে ভেসে উঠল অপরিচিত নাম্বারটা। তখন আমার ছেলের বয়স দুই বছর। কি ভেবে যেন কলটা রিসিভ করেছিলাম। আর সেটাই কাল হলো আমার জন্য। ও দিক থেকে ভেসে আসল চিরচেনা সেই কন্ঠস্বর। তার সাথে কথা বলতে চাইনি কিন্তু তাকে অবজ্ঞা করার মতো শক্তিও ছিল না। সেখান থেকে শুরু। তখন সে রীতিমতো এলাকার ত্রাস, নেশাখোর, যেটা পরে জেনেছিলাম। আস্তে আস্তে সম্পর্কটা আগের রুপে ফিরে যেতে শুরু করল। হয়তোবা ভুলটা আমারই ছিল। কিন্তু তাকে তো মন থেকেই ভালোবাসতাম। তাকে আমি শুধু আলোর পথে আনার জন্য সাহায্য করতে চেয়েছি। তার করুন আকুতি অবজ্ঞা করার শক্তি আমার নেই।
তারপর আস্তে আস্তে পুরোপুরি তার উপড় দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম। আর এটাই সে চেয়েছিল। এক পর্যায়ে তারজন্য আমি আমার সংসার ত্যাগ করতে রাজি ছিলাম এবং করেছিলামও। এক দুপুড়ে ছেলেকে ঘুমিয়ে রেখে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছি। আর ফেরা হয় নি। এটা ছিল আমার জীবনের বিরাট ভুল। আমি চেয়েছি তাকে আবারও আগের জীবন ফিরিয়ে দেবো। আবারও আমরা চাঁদের জ্যোৎস্নায় স্নান করব। কিন্তু এই ভাবনাটা ছিল আলেয়ার পিছে ছোটার মতো অর্থহীন। দুজনে মিলে একটা ছোট ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম। শত কষ্ট হলেও তার জন্য মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে রাখতাম। তাকে কক্ষপথে ফিরিয়ে আনাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। প্রথম প্রথম ভালোই চলছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আমাকে সে গালাগালি মারধর শুরু করে। তারপরেও তার প্রতি কোন ঘৃনা ছিল না। ভেবেছিলাম- পারব, তাকে পুর্বের জীবন ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু আমি পারিনি। ছেলের শোক তার ভালোবাসায় ভুলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ততদিনে সে একটা অমানুষে পরিনত হয়েছে। সেই দিনগুলোতে ছেলের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠত। সাত্ত্বনা দেয়ারও কেউ ছিল না। দিনে দিনে অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে লাগলো। প্রতিবাদ করতাম কিন্তু একটা নেশাগ্রস্ত, বন্য পশুর সাথে পেড়ে উঠতে পারতাম না। এক পর্যায়ে এটাকেই নিয়তি মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু এভাবে কতদিন চলা যায়? আমি শেষ পর্যন্ত হাল ছাড়তে চাই নি। কিন্তু সবকিছুরই তো একটা সমাপ্তি আছে।
তারপর একদিন দুপুড়ে এক মুহূর্তেই সবকিছু শেষ হয়ে গেল। খুব বেশি অবাক হই নি। এই সম্পর্কের এটাই ছিল শেষ পরিনতি। সেদিনেই ছিল আমার সেই দুর্বিষহ জীবনের শেষ দিন। সেই অত্যাচারের সাক্ষী আমার সারা শরীর। চুলগুলো আজও আগের রুপ ফিরে পায় নি, স্তনের ক্ষতটা আজও শুকিয়ে যায় নি। তবে সেদিন আমি এক অসহ্য যন্ত্রনাময় জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম।
তারপর ফিরে এসেছিলাম আমার শৈশবের সেই বাড়ীতে। আসতে চাই নি, সবাই আমাকে খোজাখুজি করে এখানে নিয়ে এসেছে। সেদিন ছিল আমার বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার ঠিক এক বছর পুর্তি। আমি মুক্তি চেয়েছিলাম চিরদিনের জন্য। কিন্তু সেই সৌভাগ্য হয় নি। আজও প্রতি সেকেন্ডে তাই নরক যন্ত্রনা ভোগ করতে হচ্ছে।
মাঝে মাঝে মনটা খুব প্রতিশোধপরায়ন হয় উঠে। কিন্তু কার উপড় প্রতিশোধ নেবো? ভুলটা তো আমারই ছিল।
ভাবি, পৃথিবীতে বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয়তা আমার নেই। তারপরও বাঁচতে ইচ্ছে করে, খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে। এই জানালার গ্রিলটা কিংবা পাশের ঐ সজিনা গাছটার জন্যও বাঁচতে ইচ্ছে করে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

21 − 18 =