গল্পঃ এন্ড দেন আই ডিসাইডেড টু কিক মাইসেলফ আউট অফ হেভেন – পর্ব – ৬

পর্ব-৩ পর্ব-৪ পর্ব-৫
১০
চীফ অফ এঞ্জেলস ষ্টাফস ওরফে গেলমান ওরফে টম ওরফে হাফলেডিস ওরফে হিজড়া চীফের প্রতি এইবার আরো রাগ উঠলো। রাগটা আসলে চীফের উপর করা ঠিক হইতাছে নাকি বুঝতেছিনা। কিন্তু এইটা এমন এক জায়গা যেইখানে রাগ দেখানোর মতো আর কেউ নাই। সারি সারি হুরের দঙ্গল আছে অবশ্য, ওইগুলার সামনে গেলে আবার রাগ আর রাগ থাকেনা। হা কইরা গিলতে ইচ্ছা করে খালি। আর দুনিয়ার থাইকাই শিক্ষা গ্রহন কইরা আসছি যে এমনে সুন্দরী দেইখা হা কইরা গিলা কোন ভদ্র পোলার কাম না। তাই অবশ্যই এই হা কইরা গিলা অনুচিত কাজ হবে। গিলতে গিলতে আবার কুচিন্তা মাথায় আসলে তাও অনুচিত হবে। যদিও এরা আমি যা চাই তা দিতে বাধ্য। “মন চাইলে মন পামু দেহ চাইলে দেহ” কন্ডিশনেই এদের আমার জন্য নিয়োজিত করা হইছে। কি অদ্ভুত একটা কন্ডিশন!! আমার ইচ্ছাই ইচ্ছা, ওরা আমার ইচ্ছা পুরনের জন্য নিবেদিত, স্বাধীন ইচ্ছা কইরা আমার কাছে কিছু চাবে এইটার পোগ্রামিং মনে হয় করা নাই। পোগ্রামেবল মাইন্ডসেট নিয়া কেউ আর যাই হোক প্রকৃত নারী হইতে পারেনা। আবার মনে হইলো কিসের কি চ্যাটের বালের হুরের কথা ভাবতেছি। যার স্বাধীন ইচ্ছা নাই, খালি দেহ আছে, এ নিশ্চিতভাবেই সেক্সডল টাইপের কিছু হবে। আর এই বেহেস্তে যদি সেক্সডলের উপর নির্ভর করা লাগে তাইলে এইটা সম্মানজনক ক্যামনে হয়? আমার দরকার প্রকৃত মানবী। নিখাঁদ মন, অকৃত্তিম আবেগের নারী! আহা নারী!!…

যাইহোক, এইসব ভাইবা রাগ কমাইয়া লাভ নাই। চিফরে ঝারি দেয়া দরকার। দুনিয়াতে থাকতে শুনছিলাম মানুষ শক্তের ভক্ত নরমের যম! এইখানেও এই প্রবাদ ঠিক নাকি চেক করা দরকার। চিফরে বললাম,

– “শালা হাফলেডিস কোনখানকার, যাই কই বইলা দাও সম্ভব না সম্ভব না! দুনিয়াতে থাকতে কত মুলা ঝুলাইছো তোমরা। যা চামু তাই পামু বেহেস্তে। কোন অতৃপ্তি থাকবেনা, কোনো আফসোস থাকবেনা। আর আইসা দেখতাছি পদে পদে আফসোস, পদে পদে অতৃপ্তি। আমারে হয় উধাও কইরা দাও নাইলে ঈশ্বরের লগে বাতচিত করাইয়া দাও। নাইলে এমন কিছু করমু বেহেস্তের ইতিহাসে কলংকজনক অধ্যায় হইয়া থাকবে।“

চীফ হাসলো নাকি বুঝলামনা, চোখের ভুলই হবে। শালায় সবসময় এমন একটা ভাব করে ডাউটে পইরা যাই আসলে হাসতেছে নাকি দুক্ষে আছে নাকি ব্যাঙ্গ করতেছে। যদিও নিয়মানুযায়ী এর কোন আবেগ থাকার কথা না। তাও সন্দেহ দূর হয়না। মানুষের মন বইলা কথা!!

চীফ জবাব দিলো,

– “স্যার, যা ইচ্ছা করতে পারেন। বেহেস্তের কিছু হবেনা। এইখানে পাপ নাই, পুন্য নাই। তাই এইখানে যেমন আলোকিত অধ্যায়ও সম্ভব না, কলংকিত অধ্যায়ও সম্ভব না।“

আমার আরো রাগ উঠলো, আমি আমার পায়ের জুতা খুঁজলাম ছুইড়া মারার জন্য। দেখি জুতা নাই। এই ভুল ক্যামনে করলাম? এই সময়ে জুতা নাই পায়ে?!

আহ, শান্তি!! জুতার কথা ভাবতে না ভাবতেই পায়ে চইলা আসলো জুতা। কি দিয়া বানাইছে জানিনা। পায়ে জুতার অনুভুতিই নাই, কিন্তু দেখা যাইতে জুতা। আমি সেই জুতা জোড়া খুইলা হাতে নিলাম। এরপর সাই কইরা ছুইড়া মারলাম চীফের মুখের উপর। কিন্তু সে ভাবলেশহীন!! বুইঝা গেলাম, চীফের মান সম্মানের অনুভুতিও নাই। অনুভুতি থাকলেও যেহেতু স্বাধীন ইচ্ছা নাই, সেহেতু প্রকাশের ক্ষমতাও নাই। ব্যথার আছে নাকি তাও জানিনা, আবারো হতাশ হইলাম। কাউরে জুতা মারার পরও যদি সে নির্লিপ্ত ভাব ধরে, তাইলে মেজাজ আরো খারাপ হওয়ার কথা। কিন্তু আমি পরিস্থিতি অনুধাবন কইরা হতাশায় নিমজ্জিত হইলাম। একটা ইচ্ছাও পুরন হইতেছে না, একটাও না…

আমি চিফরে আবার বললাম,

– “আমি ঈশ্বরের সাথে কথা বলতে চাই। তোমারে দিয়া আমার হবেনা, তুমি অক্ষম!”

চীফ জবাব দিলো,

– “স্যার, আমার নিজের কোন ক্ষমতা নাই। সকল ক্ষমতা উনার হাতে। আপনি আমাকে যা বলতেছেন উনি সব শুনতেছেন। আপনার যদি ইচ্ছা হয় উনাকে কিছু বলার বলতে পারেন, উনি সর্বত্র বিদ্যমান। আপনার প্রশ্নের উত্তর দেয়ার হইলে উনি দিবেন। তবে সরাসরি কথা বলতে পারবেন না, দর্শনও সম্ভব না। সরাসরি কথা বলতে তো আপনারা ফেস টু ফেস কথা বলারেই বোঝান। আবার আপনার বেহেস্তের স্তর অনুযায়ী আপনি সেই মর্যাদা পাননাই।“

আমি বললাম,

– “আমার প্রশ্নের উত্তর না পাইলে কথা বইলা লাভ কি?”

চীফ জবাব দিলো,

– “স্যার, আপনি নির্দ্বিধায় যা খুশী বলতে পারেন। উনি শুনতেছেন।“

আমি হাই ডেফিনিশন আকাশের দিকে মুখ তুইলা তাকাইলাম। মনে মনে বললাম,

– “হে ঈশ্বর, আমার মনে নাই তুমি কি উছিলায় আমারে ক্ষমা কইরা এই বেহেস্তে জায়গা দিছিলা। এই বেহেস্তের প্রাচুর্য্য আমারে আর টানতেছেনা। আমার সেই রিক্সায় চড়া দিন চাই, সেই খুব সাধারন মায়াকাড়া মুখ আবার চাই। নাইলে কিসের বেহেস্ত, আমারে খতম কইরা মুক্তি দাও। তবে আমি যে মইরা গেছি এই কথা তুমি তারে জানাইয়োনা। আমি জানি তার সহ্য হবেনা।“

চীফরে দেখলাম আমার মুখের দিকে তাকাইয়া আছে। ওরে জিগাইলাম,

– “হা কইরা দেখস কি? সবই তো শুনছস জানি। কি বুঝলি?”

চীফ জবাব দিলো,

– “স্যার, মুক্তি সম্ভব না। বেহেস্তের জীবন অনন্তকাল চলবে। এইখানে আপনাদের যেই দেহ দেয়া হইছে সেইটাও অনন্তকালের জন্যই। রোগ জরা বার্ধ্যকবিহীন। কিছুতেই কিছু করতে পারবেননা। নিজেরে খতম করা সম্ভব না, আত্মার ধ্বংস নাই।“

আমি বললাম,

– “আত্মার ধ্বংস নাই, কিন্তু আত্মাও কিন্তু ঈশ্বরই বানাইছেন। তার উপরে আবার বুদ্ধি দিছেন। তোমার কথামত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিও দিছেন। ছলাকলা কইরা কিছু একটা বাইর কইরাই ফালামু। আটকাইয়া রাখতে পারবানা গেলমান!!“

গেলমান জবাব দিলো,

– “স্যার, আমি আটকানোর কেউ না। উনি আটকাইতে পারেন, তবে এইখানে উনি আপনার কোন ইচ্ছা আটকাবেন না যদি তা অন্যের মনকস্টের কারন হয়। তখন ইনি আপনারে আটকাবেননা ঠিকই, কিন্তু আপনি যা ইচ্ছা করতেছেন তা পুরন করা থেকে বিরত থাকতেও পারেন।“

আমি বললাম,

– “তা তো বুঝতেছিই। এইযে শর্তাবলীর বাটে ফালাইয়া দুইজনরে কস্ট দিতাছো। এইটা কেন বুঝোনা যে দুইজনের কস্টের চেয়ে একজনের কস্ট কম হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের সুবিধার জন্য সংখ্যালঘিষ্ঠদের একটু বঞ্চিত করা যাইতেই পারে। দুনিয়াতে এইটার একটা নাম আছিলো, ডেমোক্রেসী। যদিও পরে অবস্থাটা এমন দাড়াইছিলো যে সংজ্ঞাটা হওয়া উচিত ছিলো সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগনের দ্বারা নির্বাচিত অল্পকিছু মানুষের দ্বারা সামগ্রিক জনগোষ্ঠী শাসিত এবং শোষিত হয় যেই ব্যবস্থ্যায় তার নামই গনতন্ত্র।“

চীফ জবাব দিলো,

– “স্যার, এইখানে বেশি কস্ট কম কস্ট বইলা কিছু নাই। যেই পদক্ষেপ অন্যের কস্টের চিরস্থায়ী কারন হবে সেইটা গ্রহনে অসুবিধা আছে। আপনাদের পরিস্থিটিটা ওইরকম। ডেডলকে পরছেন।“

আমি আবারো হতাশ হইলাম। আমার যুক্তি কাজ করেনা। মনরেও বোঝানো সম্ভব না। আমি বাধভাঙ্গা অভিমান নিয়া বললাম,

– “আমি এইসব মানিনা। আমি তারে চাইই চাই।?“

চীফ আবারো সেই একই নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে জবাব দিলো,

– “স্যার, আপাতত সম্ভব না।“

আমার ধৈর্য্যের বাধ ভাইঙ্গা গেলো। পৃথিবীর মতো ঠুনকো দেহ আর দেহের ভিতরের আলুথালু হার্ট থাকলে উত্তেজনায় হার্টফেল করতাম নিশ্চিত। এইখানে খালি উত্তেজনা টের পাইলাম, আর রাগটা। আমি ভাবলাম, ইবলিস নামের যার কারনে আমাদের দুনিয়া ঘুইরা আসতে হইলো, যার কারনে এতো এতো কাহিনী। এতো মানুষ নরকে বার্বিকিউ হইতেছে, সেও তো বেহেস্তেই ছিলো। সেও তো ঈশ্বররে জানতো। সে অবাধধ্যতা করছিলো আদেশ না মাইনা। আমিতো আর অবাধ্যতা করতেছিনা। আমি কেবল চাইতেছি। আর আমার দাবী আর আমার প্রিয় মানুষটার দাবী যৌক্তিক, আমাদের বুদ্ধি বিবেচনায় নায্য। আমরা কেন এই নির্লিপ্ততা মানবো??

আমি চীফরে হুঙ্কার দিয়া বললাম,

– “আমি মানিনা এইসব। আমি এই পদক্ষেপহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাইলাম। আমার দাবী না মানা হইলে আমি কাউরে মানিনা। কাউরে মহান, পরম দয়ালু, ক্ষমাশীল, সর্বজান্তা এইসব সেইসব হিসেবে মানবোনা। আমিও বিদ্রোহ করবো। এই বিদ্রহের ফল হিসেবে আবার দুনিয়া বানাইলে বানাক ঈশ্বর, আবার ইহকাল পরকালের সৃস্টি হোক, যা খুশী হোক। আই রিভোল্ট!!”

১১
বেহেস্তের ইতিহাসে মানবের দ্বারা এইটাই প্রথম বিদ্রোহ নাকি আমার জানা নাই। ইবলিস তো আবার মানব ছিলেননা, উনি ছিলেন জ্বীন। নাইলে মানবের দ্বারা বিদ্রোহের প্রথম ঘটনাটা উনার দখলে থাকতো। কিন্তু বিদ্রোহের ঘোষনার পরেও এদিক সেদিক কোন পরিবর্তন দেখলামনা। কোথাও কোন আক্রোশের চিহ্ন নাই। চীফও দেখি সবসময়ের মতো ব্যাঙ্গাত্মক নির্লিপ্ত একটা ভঙ্গীতে আমার দিকে তাকাইয়া রইছে। আমার মেজাজ আরো খারাপ হওয়ার কথা এবং তাই হইলো। আমি তীব্রভাবে একটা প্রতিক্রিয়া আশা করতেছিলাম। আমি আবার চিল্লাইয়া বললাম,

– “আমি ঈশ্বররে অবজ্ঞা করলাম। আই রিভোল্ট!! আই রিভোল্ট!!”

কিন্তু হতাশাজনক হইলেও এইটাই সত্য যে বেহেস্ত বিশাল বড়, আসেপাশে যতদুর চোখ যায় পুরাই ফাঁকা। আমার চীৎকার কোথাও বাঁধা পাইয়া প্রতিধ্বনিত হইয়া ফেরত আসবে এই আশায়ও গুঁড়ে বালি। নাইলে চীৎকার দিয়া বলার পর অনেক দূর থাইকা অল্প সময় যদি ভাইসা আসতো, “আই রিভোল্ট!!” “আই রিভোল্ট!!’ , তাইলে মনে হয় সাউন্ড ইফেক্টটা শুনতে মন্দ হইতোনা। আমারও শুনতে ইচ্ছা করতেছিলো কেমন শুনাইতো সেইটা।

চীফ হুট কইরা নিজেই বইলা উঠলো,

– “স্যার, আবার চীৎকার দেন। এইবার শুনতে পারবেন। এইবার আপনার ইচ্ছামত প্রতিধ্বনির এরেঞ্জমেন্ট করা হবে!”

আমার মেজাজ খারাপ হইলো। ভাবলাম মস্করা করে নাকি আমার সাথে। পরে চিন্তা কইরা দেখলাম চীফতো আবার মনের কথা পড়তে পারে। এ আমার ইচ্ছার কথা জাইনাই আবার চীল্লানোর অফার দিছে। দিয়াই দেখি আরেকটা চিল্লান, দেখি কেমন শোনায়। একটা খায়েশ অন্তত পুরন হোক! আমি আবার চিল্লাইলাম,

– “আই রিভোল্ট!! আই রিভোল্ট!!”

আসেপাশের কোথাও বারি খাইলো নাকি জানা নাই, তাও অল্প পরেই শুনতে পাইলাম ভাসা ভাসা ধ্বনি!

“আ…ই… রি…ভো…ল…ট…!”
আ…ই… রি…ভো…ল…ট…!…”

বাহ! বেশ পারফেক প্রতিধ্বনিই মনে হইলো। আমার মনে পইরা গ্যালো অনন্তকাল আগে নীলগিরি নামের একটা যায়গায় পাহাড়ের চূড়ায় দাড়াইয়া চিল্লাইছিলাম,

“আমি কেউ না, আমি কেউ না!!”

আসেপাশের পাহাড় থাইকা ঠিক এইভাবেই ফেরত আসছিলো প্রতিধ্বনি,

“আমি কেউ না, আমি কেউ না!”

আসেপাশে তাকাইয়া আসলেই কাউরে পাইনাই। নিজেরে নিজে দেখতেও অন্যের চোখ লাগে, নাইলে ক্যামেরা লাগে, নিদেনপক্ষে একটা আয়না! রিভোল্টের ঠ্যালায় কি তুচ্ছ একটা স্মৃতি মনে পইরা গ্যালো। আসলেই কি তুচ্ছ নাকি এইটা নিয়া কোটিখানেক বছরও ভাবা যায়। তুচ্ছ হইলে মনে পরার কি কোনো দরকার ছিলো?

যাইহোক, বিদ্রোহের ঘোষনা হইলো, বিদ্রোহীও হইলাম। কিন্তু ফলাফল কি হইলো বুঝতেছিনা। আমার দরকার কাজ আদায়। যেমনেই হোক আমার তারেই দরকার। ছলাকলা কইরা হইলেও আমার তারেই দরকার। এইখানে তো আবার পাপ পুন্যের হিসাব নাই, তাইলে ছলাকলা করাও নিশ্চয়ই জায়েজই হবে।

চীফের দিকে তাকাইলাম। ঈশ্বর আমার প্রতি রাগ হইলে উনার দেয়া ফ্যাসিলিটিজও ফিরাইয়া নেয়ার কথা, আমারে দেয়া চাকরবাকর হুর গেলমান ফিরাইয়া নেয়ার কথা। সেই হিসেবে বিদ্রোহে ঈশ্বর অসন্তুষ্ট হইলে চীফের আমার কথা শোনার কথা না। আমি ব্যাপারটা পরীক্ষা কইরা দেখতে চীফরে বললাম,

– “ঐ ব্যাটা টম, দুই কান ধইরা এক পায়ে দাড়া!!”

চীফ তৎক্ষণাৎ আদেশ পালন করলো। আমি হতাশায় নিজজ্জিত হইয়া হাত পা ছড়াইয়া বেহেস্তের হীরা জহরত গুড়া কইরা বানানো অপার্থিব মৃত্তিকার মধ্যে শুইয়া পড়লাম। নিজেরে ভীষন অসহায় মনে হইলো। মনে হইলো ঈশ্বর দুনিয়াতেও যেমন সকল আর্তনাদে নির্লিপ্ত হইয়া থাকতো, কোটি কোটি মানব শিশু নিদারুন কস্টে মরতে থাকলেও যেমন তার কোন পদক্ষেপ গ্রহনের তাড়া ছিলোনা, এইখানেও ঠিক তাই। দুনিয়ায় তার আচরন আর এইখানে তার আচরনে একটা মিল খুঁইজা পাইলাম, সেইটা হইলো কঠিন নির্লিপ্ততা! এই ব্যাপারটা সহ্য করার মতো না। অনেক কস্ট অনেক যন্ত্রনায় মানুষ নাকি হতাশার কথা ভুইলা যায়, মনকস্টের কথা আর মনে থাকেনা, শারীরিক কষ্টের চিন্তাই তার মাথায় ঘুরপাক খায় তখন। আমার হুট কইরা মনে হইলো আমার অমানুষিক কস্ট দরকার। আবার প্রশ্ন জাগলো, বেহেস্ত তো সুখ শান্তির জায়গা, এইখানে কি কেউ যদি নিজের ইচ্ছায় কিছু কস্ট চায়, সেইটা কি তারে দেয়া হবে?

আমি চীফরে জিগাইলাম,

– “আমার অনেক কস্ট দরকার এখন। কস্ট না হইলে শান্তি পাইতেছিনা। আমারে তীব্র কস্টের অনুভুতির ব্যবস্থা কইরা দাও। আমার দুই হাতের রগ কাইটা দাও। আমি ধীরে ধীরে রক্তশুন্য হইয়া মইরা যাইতে চাই।“

চীফ জবাব দিলো,

– “স্যার, আগেই বলা হইছে আপনাদের দেহ রোগ জরা মুক্ত। রক্ত বাইর হইলেও ব্যথা পাবেননা। বাইর হইতেই থাকবে, হইতেই থাকবে। কোনদিন আপনার দেহ ধীরে ধীরে রক্তশুন্য হবেনা। তবে আপনে চাইলে এই অনুভুতির ব্যবস্থা কইরা দেয়া যায়, রক্তশুন্য দেহে পরিবর্তনের ব্যবস্থাও করা সম্ভব।“

আমি বললাম,

– “তাই দাও। কিন্তু কস্ট পাওয়ার সময় আমি যতই কাকুতিমিনতি করি, আমারে কিন্তু ওইভাবেই রাখবা। কম কইরা হইলেও ১০০০ বছর এমনে রাখবা।“

চীফ বললো,

– “ঠিকাছে স্যার। শুরু হোক আপনার কস্টের অনুভুতি গ্রহন!!“

হঠাৎই আমি ভীষন যন্ত্রনায় চীৎকার করতে চাইলাম। রক্তশুন্যতার অবশ অনুভুতির কারনে আমার মুখ কমান্ড মানলোনা। আমি হাঁসফাঁস করতে লাগলাম। অনেকক্ষন চললো এইভাবে। আমার আর সহ্য হইলোনা। আমি চীফরে থামাইতে বলার উপায় খুঁজতে লাগলাম। কিন্ত কিভাবে ইশারা করবো বুঝতেছিনা। মুখেও নাই শক্তি। এইসব উপায়ের কথা ঠিকমত যন্ত্রনার কারনে ভাবতেও পারতেছিলামনা।“

এইভাবে অনন্তকাল পার করলাম। যন্ত্রনার সময় দীর্ঘ্য হয় এইটা জানি দুনিয়ার কোন বিজ্ঞানী বইলা গেছিলেন। অনন্ত সময় পরে আর উনার নাম মনে নাই, কেবল বইলা গেছিলেন এইটা মনে আছে। আর ১০০০ বছর অনন্তকালের হিসেবে কিছুই না। তাও যে যায় সে বুঝে মার ১০০০ বছরও কত দীর্ঘ্য হইতে পারে। ১০০০ বছর শেষ হইবামাত্র আমি মুক্তি পাইলাম। শরীর হইয়া গেলো আবার আগের মতো ফুরফুরা, কিন্তু আমি সেই দুঃসহ যন্ত্রনার স্মৃতি নিয়া আরো বছর পঞ্চাশেক বইসা থাকলাম ঝিম ধইরা। এরপর হুশ হইলে মনে হইলো, আরে!! আমি না বিদ্রোহ করছিলাম?? এই সুবিশাল বেহেস্তে এক টুকরা নরক ম্যানুফ্যাকচার কইরা তাতে নিজেরে নিপতিত কইরা সব ভন্ডুল করতে নিছিলাম আরেকটু হইলে!

এরপর আমি আবার দৃপ্ত শপথ নিলাম বিদ্রোহ সফলে। দুনিয়াতে ছোটখাট দাবীতে মানুষ আন্দোলন বিদ্রোহ কইরা তুলকালাম করছে। আমি এইখানে নায্য দাবীতে করলে দোষ কি? আমি ধ্যানে বসলাম উপায় খুঁজতে। ধ্যানে কাজ হইতে পারে। পাইলেও পাইতে পারি কোন উপায় এই নিরুপায় আমি। কিন্তু হাজার বছরের সাধনার পরেও কোন যুতসই বুদ্ধি আসলোনা মাথায়। সবকিছুর পরেও নিতান্তই অসহায় আমরা ঈশ্বরের কাছে। কি কইরা বলা পৌছানো যায় আমার এই ফরিয়াদ ঈশ্বরের কাছে। কিছুই আমার ঈশ্বর প্রদত্ত মস্তিস্কে খেলা করতেছেনা। আমি আবার সরনাপন্ন হইলাম কাব্যের। লিখে ফেললাম বেহেস্তী জীবনে আমার তৃতীয় হতাশামূলক কাব্যঃ

“ভ্রষ্টসত্য হয়ে অহং যা ছিলো,
এইক্ষনে হয়ে গেছে পাস্ট টেনস…
সর্বংসহা রেশ আর কত বেশ লাগে?!

আজন্ম পিরিতি কল্পনাতেই উদ্দ্বেলিত ছিল কেউ ,
এইক্ষনে সে হতাশায় ধুমা উড়াচ্ছে, ছাই জমাচ্ছে!!

ওহে উপরওয়ালা, মিচকি খেলারাম!!
এখনও তো অনতীত অনেক পঙতি
আনাচেকানাচে কেয়া বীজের মতো
স্পষ্ট, পথভ্রষ্ট, ঘোরাঘুরি করে…

সে হাওয়া কানে নাওনা নাকি?

হে সর্বশ্রোতা, তসবিরওয়ালা!
আমি ডাকিতাছি-
জানিনা, তোমারও ঘুম ধরে নাকি…”

হালকা একটূ শান্তি পাইলাম। চীফরে জিগাইলাম,

– “কিরে ব্যাটা? কি বুঝলি?”

চীফ জবাব দিলো,

– “স্যার, উনি ঘুম আর জাগরনের উর্ধ্বে। উনি সব কিছু কানে নেন। কিন্তু উনার কার্যক্রমের সবকিছু বোঝার ক্ষমতা উনি আপনারে আমারে দেননাই। দিলে আমরা আর উনার বান্দা থাকতামনা, উনার সমকক্ষই হইতাম। আর সমকক্ষ হইয়া গেলে এই সৃশটিজগত বর্তমান থাকতোনা।“

আমি হইলাম মানুষ, সৃষ্টির সেরা জীব! হিজড়া গেলমানের লেকচার পছন্দ আমার হইলোনা। বললাম,

– “চুপ থাক গেলমান। জীবনে তারে আবার অন্তত একবার দেখতে পারার, কথা বলতে পারার বুদ্ধি থাকলে দে, নাইলে অফ যা!”

চীফ জবাব দিলো,

– “স্যার, আপনার এই ইচ্ছার পুরনের উপায় আছে। এই ইচ্ছায় শর্তাবলী লঙ্ঘিত হবেনা। আপনারা দুইজনেই আগে দাবী করতেছিলেন একে অপরকে চিরতরে পাওয়ার জন্য, তাতে আরেকজন চিরতরে কস্টে নিপতিত হইতে পারতো, তাই শর্তাবলীর ধারা লঙ্গিত হইতো। কিন্তু সাময়িক দেখা, বাতচিতে অসুবিধা নাই। আবার দেখা করার ব্যাপারে দাবী করছিলেন ওই মুহুর্তেই দেখতে, আমি বলছিলাম আপাতত সম্ভব না। একেবারে সম্ভব না তা কিন্তু বলিনাই। উনি ওই মুহুর্তে ইচ্ছা প্রকাশ করছিলেন টানা ১০ কোটি বছর ঝাল টক দিয়া ভেলপুরি খাবেন। ১০ কোটি বছর পার হইলে সম্ভব ছিলো, ওই মুহুর্তে না!“

আমি হাসমু নাকি কান্দুম কিছু বুঝতে পারলামনা। চিল্লান দিয়া বললাম,

– “শালা গেলমানের বাচ্চা গেলমান। এইটা আগে কইলে কি হইতো? হাজার বছর ধইরা ঝুলাইয়া রাখছোস?”

চীফ গালি খাওয়ার পরেও স্বভাবসুলভ প্রতিক্রিয়াহীন কন্ঠে বললো,

– “স্যার, আপনি যেইভাবে প্রশ্ন করছেন, আমি সেইভাবেই সঠিক উত্তর দেয়ার চেস্টা করছি। আমি কেবল তাই করি যেইটা আমাকে করার আদেশ দেয়া হয়, যতটূকু করার কিংবা বলার আদেশ দেয়া হয়।“

আমি বিরক্ত হইতে নিয়াও এই আনন্দেরক্ষণে বিরক্তি দূর কইরা হাসিমুখে বললাম,

– “তাইলে নিয়া চল আমারে তার কাছে।“

চীফ জবাব দিলো,

– “স্যার, আপাতত সম্ভব না।“

আমি রাগতে গিয়াও হাইসা জিজ্ঞেস করলাম,

– “কত কোটি বছর অপেক্ষা করতে হবে? আমি রাজী!”

চীফ জবাব দিলো,

– “সময় কত লাগবে তা নির্ধারিত না স্যার, তাই আমার জানা নাই। উনিতো গনিতের ছাত্রী ছিলেন, ২০৪৮ X ২০৪৮ ঘরের একটা দাবা জাতীয় খেলা নিজেই উদ্ভাবন কইরা গ্যারী ক্যাসপারভ স্যারের একটা ক্লোন বানাইয়া তার সাথে খেলা শুরু করছেন। অনির্দিস্ট সময় পর ফলাফল আশা করা যায়। দুনিয়ায় আপনাদের কার্যক্রমের উপর যেমন ঈশ্বর হস্তক্ষেপ করতেননা, নিজ ইচ্ছায় ঈশ্বর প্রদত্ত ব্রেইনে চলতেন, তাই এই খেলার ফলাফলের মতই খেলা সমাপ্ত হওয়ার সময়ও অনির্ধারিত। আর খেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত উনাকে বিরক্ত করা নিষেধ আছে। খেলা শেষ করবার জন্য উনাকে রিমাইন্ডার দেয়ার কোন ইন্সট্রাকশন উনি দেননাই।“

আমি জবাব দিলাম,

– “এই অনন্ত বেহেস্ত জীবনে আমি অনির্ধারিত সময় তারে দেখার আশায় কাটাইতে রাজী। এই অনির্ধারিত সময় আমিও কাচা মরিচের ঝাল দিয়া শওকতের গরুর চাপ খাইয়া কাটাইতে চাই। কম বেশি স্বাদের বানাবানা, একেবারে জেনুইন শওকতের চাপ চাই। জেনুইন স্বাদে আরো একটূ তৃপ্তিলাভের জন্য যেই আফসস থাকে, ওইটাই খাওয়ার আসল মজা। প্রতিটা চাপের সাথে একটা মাঝারী সাইজের ২০১৫ সালের বাংলাদেশ নামক অঞ্চলের দেশী প্রজাতির পেয়াজ কুচি কুচি কইরা কাঁইটা দিবা আর সাথে আধা চিমটী বীটলবন। তার খেলা শেষ হইলেই তার সামনে হাজির করবা। এর আগে ডাইকা বিরক্ত করবানা। এখন যাও, চাপ রেডী কর!“

চীফ জবাব দিলো,

– “স্যার, আপনার ইচ্ছাই আমার কাছে অর্ডার!!”

(চলবে…)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 7