আতার্তুক কামাল পাশা: জিহাদের সমাধান অথবা অনুপ্রেরণা

আধুনিক তুরস্কের রূপকার হিসেবে ইতিহাসখ্যাত কামাল আতার্তুক পাশা এই আধুনিক, গণতান্ত্রিক, সেক্যুলার, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধির যে তুরস্ক গড়েছিলেন, সবচেয়ে বড় কথা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ হিসেবে আরবের ইসলামী দেশগুলোর মত মধ্যযুগীয় শাসনে যে বাধা থাকেনি- তার জন্য তিনি কিছু পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। আজকাল ইসলামী জঙ্গিবাদ, মোল্লাতন্ত্রের অবসানের কথা শুনি খোদ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মুখ থেকেই। এর নিদর্শন হিসেবে আরো বেশি করে মসজিদ-মাদ্রাসায় অনুদান বাড়িয়ে দেওয়া হয়। সবচেয়ে কৌতুককর হচ্ছে, জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণের জন্য আলেম-ওলামাদের সাহায্য প্রার্থনা করা হয়! এসব কারণেই মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রে ইসলামী সন্ত্রাসীদের নিয়ন্ত্রণ শূন্যের কোঠায়। অথচ এর থেকে বাঁচতে হলে তাদের নিজেদেরই এর জন্য কাজ করতে হবে। এই সমস্ত ইসলামী বা মুসলিম রাষ্ট্রগুলো আদৌ এদের নিয়ন্ত্রণে আন্তরিক কিনা সেটি অবশ্য একটি বড় সন্দেহের বিষয়। তবু যদি ধরে নেই তাদের মধ্যে কেউ আগ্রহী, ধরা যাক বাংলাদেশ বিশেষভাবে আগ্রহী, তাহলে তাদের যা করণীয়, ইতিহাসে কামাল আতার্তুক পাশা সেই সমাধানগুলো দেখিয়ে গিয়েছেন। নিম্নে তার কয়েকটি যুগান্তরী কার্যক্রম উল্লেখ করা হলো-

কামাল আতার্তুক জানতেন তুরস্করের মত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে সবচেয়ে বড় আপদ আর বিপদের নাম আলেম-ওলামারা যারা আধুনিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্রের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। মধ্যযুগীয় ইসলামী আইন-কানুন চাপিয়ে দেয়া, রাষ্ট্রীয় কাজে নক গলানো ইত্যাদি থেকে এদের সরানোর জন্য রাষ্ট্রীয় অথনৈতিক সহায়তা দান বন্ধ করে দেন। ১৯২৪ সালে ওয়াকফ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে ওলামাদের চূড়ান্তভাবে অর্থনৈতিক বিপর্যস্ত করে ফেলেন। আগামী প্রজন্মকে ধর্মের কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস থেকে দূরে রাখতে ১৯২৫ সালে স্কুলে ধর্মশিক্ষা বাতিল করে দেন। ধর্ম শিক্ষা শেখানো দায়িত্ব এরপর কেবল অভিভাবকদের উপর থাকল।

একটি দেশের দ্বৈত শাসন, দ্বৈত আইন গড়ে উঠে অনেক সময় পীরের দরগায়, খানকায়, শায়েখ, শাইখুল হাদিস ইত্যাদি পদবীধারীদের ছত্রছায়ায়। দৃষ্টান্তর ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার বড় হুজুর কিংবা হাটহাজারী আল্লামা আহমদ শফি। কামাল পাশা তাই ১৯২৪ সালে এইরকম প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দিয়েছিলেন। শায়েখ, পীর, শাইখুল হাদিস ইত্যাদি উপাধী গ্রহণ এবং তাদের বিশিষ্ট পোশাক পরিধানও দন্ডনীয় বলে ঘোষণা করেন।

খিলাফত যুগে হিযরি বর্ষপঞ্জিকা চালু ছিল যা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগের পরিপন্থি। ১৯২৫ সালে আরবী পঞ্জিকা বাতিল করে ইংরেজি বর্ষপঞ্জি চালু করা হয়। আমরা যেমন রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি করতে পারছি না যা বিশ্বের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের একটি অন্তরায়। শুক্রবার মসজিদ কেন্দ্রিক রাজনীতিতে লোক জমায়েত করতে ছুটির দিন জুম্মার নামাজকে টার্গেট করা হয়। বাংলাদেশের বড় ধরণের হাঙ্গামা রাজপথে হুজুররা করতে সমর্থ হয়েছে শুক্রবার মসজিদকে কেন্দ্র করে। শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যে সুফল পেতে নয়, জঙ্গিবাদে বড় ধরণের সুফল পেতে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করতে হবে এসব কারণেই।

তুরস্কের শিল্প-ভাস্কর্য নির্মাণ ইসলাম বিরোধী বলে খিলাফত যুগে এসব নিষিদ্ধ ছিল। একটি জাতির ক্রিয়েটিভ সক্ষমতা প্রকাশে রাষ্ট্রীয় সহায়তা আসলে জাতিকে মননকে সর্বচ্চ বিকশিত করে। সেই লক্ষে কামাল পাশা তুরস্কের সরকারিভাবে ভাস্কর্য নির্মাণ শুরু করেন। অথচ আমাদের দেশে মতিঝিলে বকের ভাস্কর্য হুজুররা ভেঙ্গে ফেললে সরকারিভাবে এইসব জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হযনি। সেদিন এর ব্যবস্থা নেয়া হলে লালন ভাস্কর্যের উপর হামলা হতো না। হজযাত্রীরা লালনের ভাস্কর্য দেখলে ক্ষুব্ধ হবেন- এ্ই যুক্তি কোন সভ্য সমাজের হতে পারে না।

তুরষ্ক যুগান্তকারি কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিল যা বর্তমান ইসলামী জঙ্গি তৎপরতায় আক্রান্ত মুসলিম দেশগুলো অনুসরণ করতে পারে। ইসলামী পারিবারিক আইন বলতে আর কিছু রাখা হলো না তুরস্কে। এর মধ্যে দিয়ে ফতোয়া জারি বা মোল্লাদের খবরদারী বন্ধ করা হলো। রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে বাতিল করা হলো। ১৯২৮ সালে শাসন বিধি থেকে এটা বাদ দেওয়া হয়। আগে সরকার প্রধানরা আল্লাহ’র নামে শপথ নিতো, ধর্মাশ্রায়িত ও বিশেষ ধর্মের ঈশ্বরকে প্রাধান্য দেয়া এই বিধান বাতিল করা হলো। সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটি ছিল, প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিক ধর্মান্তকরণ করার অধিকার পাস করা হলো। অর্থ্যাৎ অন্যধর্ম সহ ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করতে পারবে নাগরিকের স্বাধীন সিদ্ধান্তে।

আরবী ভাষা ও জাতীয়তাবাদের উপনিবেশের শিকার হয় ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা। সবচেয়ে জঘন্ন হচ্ছে ইসলাম অনারব মুসলিমদের শেখায় তাদের সংস্কৃতি বিদাত, কুফরি, শিরক ইত্যাদি। এসব বলে আরবী সংস্কৃতি ও ভাষাকে চাপিয়ে দেয়। অথচ কথিত বড় শিরক তো হজের সময়ই মুসলমানরা করে থাকে। শয়তানকে পাথর ছুড়ে মারা, কালো পাথরকে চুমু খাওয়া পৌত্তলিকতার বড় নিদর্শন। আতার্তুক কামাল পাশা তুর্কিদের আরবী উপনিবেশ থেকে রক্ষা করতে ১৯৩৪ সালে আইন করে আগা, পাশা, হানুম, এফেন্দি প্রভৃতি আরবী-ফারসী পদবি ও আহমদ, মুস্তফা প্রভৃতি আরবী নাম বাদ দিয়ে প্রাচীন তুর্ক নাম ও উপাধি গ্রহণ করার নিয়ম পাস করলেন। কামাল পাশা নিজে তার নাম থেকে ‘মুস্তফা’ ও ‘গাজি’ উপাধি ত্যাগ করেন। তুরস্ক সরকার কামালকে তার অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ “আতার্তুক” (তুর্কিদের পিতা) উপাধিতে ভূষিত করেন। একই বছর ইমাম, মুফতিদের পাগড়ি, জুব্বা পরা নিষিদ্ধ করা হয়। ক্ষেত্র বিশেষ শুধু ইমামতি করার সব এই উদ্ভট পোশাক পরার অনুমতি দেওয়া হলো। আমাদের দেশে মসজিদের ইমামরা প্রচন্ড গরমে আরবদের পোশাক পরে বসে থাকেন। দাবী করেন এসব ইসলামী পোশাক!

মসজিদ ভিক্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু ছিল। এসব শিক্ষা কার্যক্রম আসলে মৌলবাদের চর্চা ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। আমাদের বাংলাদেশ সরকারও এইরকম কার্যক্রম চালু রেখেছে। একমুখি শিক্ষা ছাড়া কোন জাতির শ্রেণী বৈষম্য ঘুচার নয়। মাদ্রাসা-মক্তব শিক্ষা সন্ত্রাসী ফিলাফতবাদী তৈরিতে সহায়তা করে। তুরস্কার সরকার শুধু ইস্তাম্বুলেই ৬০০ মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষাকার্যক্রম বন্ধ করে দেন। মাদ্রাসা-মক্তব উঠিয়ে দেন।

১৯২২ সালে নভেম্বরের ১ তারিখে জাতীয় পরিষদে বিল এনে আনুষ্ঠানিক খিলাফত বাতিল করা হয়। সমাপ্ত হয় ইসলামী ইতিহাসে খলিফাদের খিলাফতী যুগের। শুরু হয় প্রজাতন্ত্র এবং জনগণই সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী তুরষ্কের যাত্রা। এর মধ্য দিয়ে খুলাফায়ে রাশিদীনের হতে ৬৩২ সাল হতে দীর্ঘ তের শতাব্দী পর খিলাফত নামের মধ্যযুগীয় শাসনতন্ত্রের অবসান ঘটে আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু হয়। আফসোস, আজো মুসলিম দেশগুলো আধুনিক গণতন্ত্রকে হত্যা করে মধ্যযুগীয় খিলাফতের দিকে যাত্রা করতে ধাবিত হয়।

আধুনিক তুরস্কের রূপকার, বলা যেতে পারে মুসলিম বিশ্বের মুক্তির পথ দেখানো এই মহান নেতা ১৯৩৮ সালে ১০ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। আতার্তুক কামাল পাশাকে নিয়ে কবি নজরুলও কবিতা লিখেছিলেন। সে কবিতাও কেমন ইসলামী চেতনা সমৃদ্ধ! বাংলাদেশের বহু সন্তানের নাম কামাল পাশা রাখা হয়েছিল “মুসলিম জাতীয় বীর” হিসেবে গর্ববোধ করে। বাংলাদেশের রাস্তাঘাটের নামও রাখা হয়েছে তার নামানুসারে। নিঃসন্দেহে এমন অনুকরণীয় ব্যক্তির জন্য এসব বর্হিপ্রকাশ খুব স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের এখানে কামালের আদর্শটা কখনই আসেনি, কামাল এখানে “মুসলিম নেতা” হিসেবে হাজির হয়েছেন। জামাত যেমন “কাফের” ইবনে শিনার নামে হাসপাতাল বানায়। শিয়া মুসলিম বিজ্ঞানী আবদুস সালামের জন্য গর্ব অনুভব করে সুন্নী মুসলমান বাংলাদেশীরা। যারাই কিনা হররোহ শিয়াদের ইসলামের দুশমন বলে গালি দেয়। আমাদের তাই আতার্তুক কামাল পাশাকে সেক্যুলার গণতান্ত্রিক একজন নেতা হিসেবে তার কর্মকে জানা উচিত। কিছু বাড়াবাড়ি বা সময়ের আগে কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত চাপানোর সমালোচনা তার উপর আছে, কিন্তু যেটি গুরুত্বপূর্ণ তিনিই প্রথম মুসলিমদের মুক্তির পথ দেখিয়ে ছিলেন। মুসলিমদেরকে ইসলামের ভাইরাস থেকে দূরে রাখতে হবে- এটিই ছিল আতার্তুক কামাল পাশার শাসনের সারমর্ম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১০ thoughts on “আতার্তুক কামাল পাশা: জিহাদের সমাধান অথবা অনুপ্রেরণা

  1. বাংলাদেশ থেকে ইসলাম ধর্মকে
    বাংলাদেশ থেকে ইসলাম ধর্মকে ঝাড়ুপেটা করে বিদায় করতে হলে কামাল আতাতুর্কের কোন বিকল্প নেই। তার কারন–

  2. প্রখ্যাত টাইমস পত্রিকায় কামাল
    প্রখ্যাত টাইমস পত্রিকায় কামাল আতাতুর্কের ইহুদী চরিত্র উন্মোচন করে একটা সংখ্যা প্রকাশ করা হয়–

    যেখানে বলা হয়-
    “One of the most significant developments in recent Middle East affairs is the close relationship which now exists between Turkey and Israel in military, political, economic and intelligence matters. This change in the power structure is usually attributable to the old Arab maxim “the enemy of my enemy is my friend.” Since both Turkey and Israel count Syria and Iraq as their strongest threats, the close ties between Turkey and Israel are quite logical.

  3. ধর্ম কিন্তু এইদেশের সমস্যা নয়
    ধর্ম কিন্তু এইদেশের সমস্যা নয়, এইদেশের প্রধান ও একমাত্র সমস্যা হচ্ছে ভারতের দালালরা এদের জন্যই এদেশে যত ঘন্ডগোল এইদেশের মানুষের দু:খ কষ্টের কারন তারা

  4. আধুনিক তুরস্কের জনক কামাল
    আধুনিক তুরস্কের জনক কামাল আতাতুর্ক ছিলেন প্রচন্ড মদ্যপ আর পোকার খেলায় আসক্ত। অতিরিক্ত মদ পানের কারনে তিনি লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হন। শেষে তিনি প্রচন্ড মানুষিক অবসাদ আর গায়ে ব্যাথায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। আফসোস তার করুন পরিনতির জন্য।

  5. আপনাদের জন্য কামাল আতাতুর্ক
    আপনাদের জন্য কামাল আতাতুর্ক হবার খোয়াব না দেখাই ভাল। ব্লগে নিজের নাম পরিচয়ে লিখার সাহস অর্জন করুন আগে, তারপর না হয় ক্ষমতায় এসে মসজিদ-মাদ্রাসা ভাংগার স্বপ্ন দেখবেন। খাটের তলায় লুকিয়ে থেকে রকেটে চড়ে চাদে যাবার স্বপ্ন দেখাটা নিতান্ত হাস্যকর।

  6. কামালপাশা সম্পর্কে উপরের
    কামালপাশা সম্পর্কে উপরের মন্তব্যগুলো পড়লেই বুঝা যায় আরবের অন্ধকার যুগই এই দেশের মুসলমানদের পছন্দ।

  7. ইসলাম মানলে দেশ ধ্বংস হবে আর
    ইসলাম মানলে দেশ ধ্বংস হবে আর না মানলে উন্নতির শিখড়ে উঠবে বিষয়টা তা নয়।। ইশলাম এ ধারনার উল্টোটাই বিশ্বাস করে।।। কামাল আতাতুর্ক তুরস্ককে ইসলাম মেনে উন্নত করলে লেখক কি মানতেন? তখন আতাতুর্ক হতেতন মৌলবাদি।।।।

    1. উন্নয়ন আর জঙ্গিবাদ কি এক
      উন্নয়ন আর জঙ্গিবাদ কি এক জিনিস? আর রাষ্ট্রের উন্নয়ন নির্ভর করে অথনৈতিক পলিসির উপর। পৃথিবীতে এমন কোন ইসলামী দেশের নজির দেখান যেখান কুরআনকে অর্থনীতি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

  8. আশার কথা , বর্তমান তুরস্কের
    আশার কথা , বর্তমান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান তুরস্ককে আবার সপ্তম শতাব্দীতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। আবার ইসলামের জয় আসন্ন। নারায় তাকবির , আল্লাহু আকবর।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + = 9