চিঠি (এক)

প্রিয় তুমি,
তুমি কেমন আছো গো? পত্র লিখতে বসেছি তা বেশ কয়েক বছর পর। মনে হচ্ছে কয়েকশো শতাব্দী পেরিয়ে গ্যাছে । আমি শুধু অপেক্ষাই করছি। সেই-যে তোমার বিয়ে লক্ষ্মীর সাথে হলো, সেইযে তুমি সিঁদুরে রাঙিয়ে দিলে ওঁরর কপালটা, আমি চলে এসেছিলাম সেদিন। রাঙা সিঁদুর কাউকে এতো বেশি পোড়াতে পারে,আমি ভাবিনি কখনওই। আমি জেনেছিলাম, যে মেয়েকে সিঁদুর রাঙা করে ঘরে তুলছো সে নিশ্চই চাঁদকপালিই হবে। আমার মতোন কপাল পোড়া না নিশ্চই।
তোমার সাথে সেবার দ্যাখা হলো.. তবে দ্যাখা হয়েছে বললে ভুল হবে,আমিই দেখেছি তোমায়। লক্ষ্মীর হাত শক্ত করে চেপে ধরেছিলে। কি-ভীষণ কষ্টে আমি মুখ চেপে কেঁদেছি! তা যদি তুমি দেখতে! পাছে তুমি আমায় দেখতে পেয়ে মেয়েটার হাত ছেড়ে দাও সেই ভয়ে আমি দৌড়ে পালিয়ে এসেছি। এসেই নিজেকে একশো একটা অভিশাপ দিয়েছি।
তুমি অনেক সুন্দর হয়ে গ্যাছো.. সেদিন শুনলাম বাবা হতে চলেছো তুমি! কত্ত খুশির খবর! কিন্তু.. কিন্তু আমার মরে যেতে ইচ্ছে করলো। কেন বলোতো! কারো বাচ্চা হওয়ার কথা শুনলে বুঝি মরে যাওয়ার ইচ্ছে হতে আছে! নাহ! একদম ই নেই! তবে??
দেখো বাচ্চাটা ঠিক তোমার মতো হবে। একদম নিষ্পাপ মায়া জড়ানো চোখ। যে চোখে তাকিয়ে প্রেমে পড়া যায় হাজারবার! আমি সে চোখ দেখেই প্রেমে পড়েছিলাম গো! ওইযে সেদিন ঝুম বৃষ্টির দুপুরে বিণুবাবুর দোকানে গ্যালাম, তুমি দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছিলে, আমি ভেজা শাড়ি দুহাতে ধরে মাথা গোজার ঠাঁই খুঁজছিলাম। কাঁপছিলাম ঠান্ডায়। সেই শীতের শুরুতে নাকি বৃষ্টি হয়! বেহায়া বৃষ্টি! অবশ্য সে বৃষ্টির জন্যেই তোমার দ্যাখা পেয়েছিলেম আমি। তুমি ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে এদিক ওদিক তাকাতেই হঠাৎ আমার দিকে চোখ পড়ে, তুমি চোখ জলদি সরিয়ে নাও। আমি তখন লজ্জায় মাথা নিচু করে পায়ের নখ দিয়ে মাটি খুঁটছি। আমার লজ্জার কথা টের পেয়ে তুমি ঘুরে অন্যদিকে তাকালে। আমি তখন ই প্রেমে পড়েছিলাম! আর সব ছেলেরা যখন ভেজা নারী দেহে ভাঁজ খোঁজে, এই ছেলে তখন চোখে তাকিয়ে লজ্জা পায়। বিশ্বাস করো এমন ছেলে আর দেখিনি! তারপর তো বৃষ্টি থামার নাম ই নেই। আমি সেভাবেই বাড়ির দিকে রওনা দিচ্ছিলাম। প্রচন্ড শীতে কাঁপুনি এসে যাচ্ছিলো শরীরে। তুমি ছাতা টা এগিয়ে দিলে। আমি আবার প্রেমে পড়লাম। ছাতাটা দিলেও মাথা নিচু করে। আমি ছাতা টা নিয়েই ছুটে পালিয়েছিলাম। এমন পাগল আমি! তোমার কাছে ছাতা পেয়ে উত্তেজনায় আমি ছাতা খুলতেই ভুলে যাই। বাড়িতে গিয়ে পরে দেখি এই যা! আমিতো ছাতা না খুলেই দৌড়ে এসেছি। সেদিন মা-ও খুব হেসেছিলো। মা এর উপর অভিমান করে দরজা খানা ভিজিয়ে দিয়ে বালিশ চেপে বসে ছিলাম খাটের উপর। তার সাথে ছাতাটাও। সেদিন থেকেই প্রেম! তুমি এতোবার করে বলতে তোমায় ‘তুমি ‘ করে ডাকতে, আমি কোনোদিন ই পারিনি! আপনি করেই ডেকেছিলাম। কারণ কি জানো? শুনেছিলাম বর কে তুমি বলতে নেই। আমার দিদুন, আর মা-ও আপনি করেই বলেন! পাছে তোমার অমঙ্গল হয়,সেই ভেবে আর তুমি ডাকা হয়নি। কিন্তু আজ দেখো! কি দিব্যি তুমি করে বলছি! অবশ্য তোমার সামনে গিয়ে কথা বললেও এখন আপনি বৈ তুমি বেরুবেনা মুখ দিয়ে! আমি সে-ই গোঁয়ার ই থেকে গ্যালাম।
পুরো বর্ষাজুড়ে তুমি কদম এনে দিতে রোজ আমায়। অভিমান করে থাকলে সেসব কদম কুটিকুটি করে ছিড়ে গাঙে ভাসাতাম। তুমি শহরে যেবার চলে গেলে, যাওয়ার সময় আমার কপালে চুমু দিয়ে বলেছিলে কয়েকটা দিন মাত্র! তারপর ই আমি আমার অদ্বি কে নিয়ে যাবো! তারপর থেকেই আমি প্রতিদিন পথে চেয়ে থাকতাম। তুমি কখন আসবে?!
এসেছিলে তুমি। মাস দুয়েক পর। কিন্তু.. কিন্তু তুমি আমায় আর চিনতে পারোনি। এতো বলেছিলাম যে আমি তোমার অদ্বি, তুমি উদাস মুখে তাকিয়ে উত্তর না দিয়ে চলে গিয়েছিলে।
বাড়িতে এসে শুনলাম আমার সই লক্ষ্মীর বিয়ে ঠিক হয়েছে তোমায় সাথে। আমার পৃথিবী তখন উল্টোদিকে ঘুরছিলো! আমি এক দৌড়ে চলে যাই আলতা দের বিলে। শাপলা তুলি। তারপর কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে যাই সেখানেই। পরে আর কিছু মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরলো, আমি সেগুন দের পোড়াবাড়িটায়। মেঝেতে শুয়ে আছি। আর তুমি ভাঙা জানালার উপর বসে সিগারেট ফুঁকছো। আমি জেগে গ্যাছি দেখে তুমি সিগারেট ফেলে দিলে। কাছে এসে আমার হাত দুটো ধরে বললে, তোমার আর কিছুই করার ছিলোনা । তোমার বাবা… আমি আর কিছু শুনিনি। তোমার হাত থেকে আমার হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে এসেছিলাম। তুমি চিৎকার করে বলেছিলে আমায় মাফ করে দিও অদ্বি। সেটা শুনে একবার থমকে দাঁড়িয়েছিলাম। তুমি দেখতে পেয়েছিলে?
পরদিন সানাই বাজলো, শুভ দৃষ্টি, মালা বদল, সব ই হলো। লক্ষ্মীর সই হওয়ায় ওর বিয়েতে আমাকেও যেতে হয়েছিলে। তোমার সাত পাকে আমিও সাক্ষী নিয়েছিলাম। কোনোদিন তোমাদের সামনে আসবোনা।
আমি রেখেছি আমার কথা! আমি যাইনি সামনে। তুমি কথা রাখলেনা কেন?
অনেক সুখী হও তুমি। তোমার বিয়ের পরদিন ই মামার সাথে জাফলং এ চলে আসি আমি। আর থাকতে পারিনি সে গ্রামে। তোমার স্মৃতিগুলো…!
আমি ভালো নেই। এখন ও যে কিছুই ভুলতে পারিনি! ছয়টা বছর! প্রতিটা দিন আমি তোমার কথাই ভেবেছি! আর আজ..
আমি ভেবেছি তোমার স্মৃতি বুকে আঁকড়েই থাকবো আজীবন। আয়ু যতোদিন! তুমি ভালো থেকো…
ইতি,
অদ্বিতীয়া

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

34 − = 29