মানবতা বিরোধী অপরাধীরা ঘৃণ্য পশুর সমতুল্য

আমি রাজাকারদের ঘৃণা করি। আমার দৃষ্টিতে রাজাকারেরা পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রাণী। তাদের আমি মানুষ বলে মূল্যায়ন করবো না, কারন মানুষ হচ্ছে আশরাফুল মাখলুকাত (সৃষ্টির সেরা জীব)। রাজাকারেরা মানুষ জাতির মধ্যে পড়ে না, এদের মানুষ বললে সমস্ত মানব জাতির অপমান করা হবে। তারা পশুর চাইতেও অধম। কিছু পশুর মাঝে বিবেক আছে কিন্তু তাদের (রাজাকারদের) মাঝে মনুষ্যত্ব এবং বিবেকবোধ কিছুই নেই।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী যখন আমাদের বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে, শহরে এবং বিভিন্ন স্থানে নিরীহ নারী পুরুষের উপর আক্রমণ চালিয়েছিল এবং মানুষ হত্যা করেছিল তখন এই রাজাকারেরাই বাংলার পথঘাট, গ্রাম, শহরের রাস্তা সব কিছু হানাদার বাহিনীকে দেখিয়ে দিয়েছিল। আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বরতা এবং অপরাধ যতটা ছিল তার চেয়েও অধিক অপরাধ ছিল এই রাজাকার নামক সেসব নিকৃষ্ট জীবদের। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ) এর টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ার পথঘাট পাক হানাদার বাহিনীর পরিচিত ছিলো না। কারন তারা এসেছে পশ্চিম পাকিস্থান থেকে এদেশে তাদের বর্বরতা চালাতে। যদি রাজাকারেরা তাদের সহযোগিতা না করতো তাহলে লক্ষ লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করতেন না। এই রাজাকারদের কারনেই বাংলার বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার এবং বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ শহীদ হয়েছেন। মায়ের বুক খালি হয়েছে, স্বামী এবং সন্তানহারা হয়েছেন অনেকে। বাংলার অনেক নিরীহ নারী হয়েছেন ধর্ষিতা।

পৃথিবীর বুকে ছোট একটি দেশে স্বাধীনতা যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ নিহত হবার ঘটনা শুধুমাত্র আমাদের বাংলাদেশেই হয়েছে। এইসব মানবতাবিরোধী কার্যকলাপ এর সাথে রাজাকার, তৎকালীন পাকিস্তানী শাসক এবং পাক হানাদার বাহিনী ছিল সরাসরি সম্পৃক্ত। আজ যারা পাকিস্তানের প্রতি সহমর্মিতা দেখায় ধর্মের কথা বলে তাদের বোঝা উচিৎ ধর্ম কখনো নিরীহ মানুষকে হত্যা করতে শেখায়নি। ধর্ম শান্তির কথা বলে কিন্তু ওই পাকিস্তানিরা এবং রাজাকারেরা ইসলাম ধর্মের কথা বলে নিরীহ হিন্দু নরনারী এবং মুসলমানদের হত্যা করেছিলেন।

এরা কি কেউ আদৌ প্রকৃত মুসলমান ছিলেন? এরকম মুসলমানদের আমি ঘৃণা করি (পাকিস্তানী শাসক এবং জনগন যারা তৎকালীন সময়ে ১৯৭১ সালে আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলেন)। আমি সেসব ভণ্ড মুসলমানদের ঘৃণা করি, যারা ধর্মের কথা বলে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে (বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশ) পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পৃথক করার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। আমি ওই মুসলমানদের ঘৃণা করি, যারা বর্তমানে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশকে মেনে নেয় না। এরা হচ্ছে নতুন প্রজম্মের রাজাকার। নতুন প্রজম্মের রাজাকারদের (জামায়াত/শিবির) রক্তে ১৯৭১ সালের রাজাকারদের রক্ত মিশে আছে তাই স্বাধীন বাংলাদেশে বসবাস করেও তাদের মাঝে পাকিস্তান প্রেম বিরাজ করে।

একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার ছেলে অথবা মেয়ে কখনো জামায়াতে ইসলামী অথবা ইসলামী ছাত্র শিবিরে যোগদান করে না। যারা আজ বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেন তারা যদি প্রকৃত দেশপ্রেমিক হয়ে থাকেন তাহলে তাদের বিএনপিকে সমর্থন না করাই উচিৎ বলে মনে করি। কারন বিএনপি জামায়াতে ইসলামী নামক একটি রাজনৈতিক দলের সাথে আঁতাত করেছে বহু পূর্ব থেকেই। সুতরাং সকল দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীদের উচিত ছিল বিএনপিকে জামায়াতে ইসলাম সহ বয়কট করা। কারন জামায়াতে ইসলামী হচ্ছে রাজাকারদের সংগঠন। তারা মুখে যতই ইসলাম ধর্মের বাণী বলেন না কেন তারা যুদ্ধাপরাধী এবং রাজাকার দ্বারা পরিপূর্ণ একটি তথাকথিত রাজনৈতিক দল।

এই রাজাকারের দলের সাথে যারা আঁতাত করে বর্তমানে রাজনীতি করছেন তাদের বয়কট করা উচিত বাংলার স্বাধীনতা প্রেমী প্রত্যেকটি মানুষদের। মানুষ (যারা জামায়াতে ইসলামীকে সমর্থন করেন) কি বুঝতে পারেন না সামান্য এই কথাটি, যে লক্ষ প্রানের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশ? এই স্বাধীন বাংলাদেশকে যারা কখনো স্বাধীন দেখতে চায়নি, যারা আমাদের স্বাধীনতার শত্রু পাকিস্তানীদের সাথে তৎকালীন সময়ে আঁতাত করেছিল, সেই কুলাঙ্গার রাজাকারদের তৈরি রাজনৈতিক দলকে কেন আমরা সমর্থন দিবো? আমাদের বিবেক বুদ্ধি কি সব লোপ পেয়েছে? তারা ধর্মে তথাকথিত মুসলিম তাই আমি তাদেরকে সমর্থন দিবো তাদের বর্বরতা দেখার পরেও?

একজন প্রকৃত মুসলমান কখনো বর্বরতা চালাতে পারেন না নিরীহ মানুষের উপর। ইসলাম হচ্ছে শান্তির ধর্ম। ইসলাম ধর্মে অথবা অন্য কোন ধর্মে বর্বরতা অথবা নিরীহ মানুষ হত্যাকে সমর্থন দেয় নাই। আজ ধর্মকে ঢাল বানিয়ে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন তৈরি হয়েছে। তারা নতুন নতুন ফতোয়া দিচ্ছেন। মুসলমান সাইনবোর্ডধারী জঙ্গিরা তাদের ইচ্ছে মত ধর্মের নামে ফতোয়া দিচ্ছেন। হিন্দু বা সনাতন ধর্মের সাইনবোর্ড ধারী জঙ্গিরা তাদের মতো করে মতবাদ দিচ্ছেন। খ্রীষ্টান, শিখ অথবা বৌদ্ধ ধর্মের সাইনবোর্ডধারী জঙ্গিরা তাদের মনমত মতবাদ দিয়ে তাদের আশেপাশের পরিবেশকে দুষিত করছেন এবং সুযোগ পেলে করেই যাবেন।

আসলে ধর্ম একটি পবিত্র শব্দ। ধর্মকে সবার উপরে স্থান দেওয়া উচিত। যার যার ধর্ম বিশ্বাসকে তারা মনে প্রানে পালন করে যাবেন, এটাই হচ্ছে শান্তিপূর্ণ সমাধান। কিন্তু আমরা দেখছি, সেই অতীতকাল হতেই কিছু মানুষ জঙ্গি তৎপরতা চালিয়ে আসছে ধর্মের দোহাই দিয়ে! আর এইসব ধর্ম ব্যবসায়ীরা মানুষের মাঝে মিথ্যা ধর্মীয় মূল্যবোধ জাগ্রত করে তাদের আখের গুছিয়ে আসছেন। এরা মানুষকে ধর্মের কথা বলে খুব সহজেই হাতের নাগালে নিয়ে আসেন। তারপর এরা ধর্মকে ঢাল বানিয়ে মানবতা বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়ে পড়েন। এরা কি আসলেই কোন ধর্মের খাঁটি অনুসারী? না, এরা কোন ধর্মের অনুসারী নন। এরা হচ্ছে শয়তানের অনুসারী এক শ্রেণীর নরপশু। আর সেই নরপশুর দলের বহু নাম রয়েছে এই পৃথিবীর আনাচে কানাচে। আর সেই নরপশুর দলদের আরেকটা নাম হচ্ছে ‘রাজাকার’। আর সেই নরপশুর দল রাজাকারের তৈরি রাজনৈতিক দল হচ্ছে- জামায়াতে ইসলামী, যা বর্তমানে বাংলাদেশে আত্মপ্রকাশ করেছে একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দল হিসেবে ইতিমধ্যেই। আর তাদের সাথে (জামায়াতে ইসলামী) অন্য যেসব রাজনৈতিক দল রাজনৈতিক জোট করেছেন তাহলে তাদেরকে আমরা কি বলে সম্বোধন করতে পারি? আমার এই সোজা প্রশ্নের উত্তর আপনাদের কাছেই ছেড়ে দিলাম।

এখন আসি আরেক প্রসঙ্গে। অনেকে বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারনে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের যুদ্ধাপরাধী বলে গ্রেফতার করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করার রাজনৈতিক কৌশল চালাচ্ছেন। আসলে জামায়াতে ইসলামীর যে সকল নেতাদের নাম রয়েছে রাজাকারদের তালিকায় এরা কেউ যুদ্ধাপরাধী নয়! এরা সবাই ইসলামের সেবক! আমি তখন তাদের মন্তব্য অথবা কথা শুনে খুবই অবাক হই। জামায়াতের আমির গোলাম আযম কি সম্পূর্ণ নির্দোষ ব্যক্তি ছিলেন? বর্তমানে যারা মানবতাবিরোধী অপরাধের কারনে জেলে বন্ধী এবং যারা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত তারা কি সবাই নির্দোষ ছিলেন? তারা স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন ১৯৭১ সালে এরকম কোন প্রমান তারা কখনো দেখানে পেরেছেন কি? না তারা কখনই কোন প্রমান দেখাতে পারেন নাই এবং পারবেনও না। কারন তারা ছিলেন রাজাকার। তারা যুদ্ধাপরাধী। একটা প্রবাদ আছে, পাপ কখনো তার বাপকেও ছাড়ে না। তাদের অপরাধের মাত্রা এতোই নিকৃষ্ট ছিল যে, তাদের ক্ষমা করে দিলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত সকল শহীদ মানুষের আত্মাকে অসম্মান করা হবে।

আসুন এবার আমরা জেনে নিই, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধী কারা এবং এদের বিরুদ্ধে কি আইন রয়েছেঃ-

জেনেভা কনভেনশন, বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধ আইন ও যুদ্ধাপরাধীঃ
১৯৪৯ সালে জেনেভা কনভেনশনে যুদ্ধ অপরাধের বিচার সম্পর্কে সাধারণ যে নীতিমালা গৃহিত হয়- ১৯৭২-৮৪ সালে বেশ কিছু বিষয় সংযোজনের মাধ্যমে এই বিষয়টি স্পষ্টতর হয়ে ওঠে যে, কোন দেশের অভ্যন্তরে যদি কোন জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্যোগ নেয়া হয় সেটি যুদ্ধ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। যুদ্ধ অপরাধের বিচারের যাবতীয় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে ১৯৯৮ সালের ১৭ই জুলাই রোমের ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত) প্রতিষ্ঠার সংবিধি পাশের মাধ্যমে। বাংলাদেশসহ জাতিসংঘের সদস্যভুক্ত ৮৯টি দেশের সমর্থক সূচক স্বাক্ষর ও সম্মতিদানের মাধ্যমে এই সংবিধান পাশ হয়।

বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে হত্যা, লুট, ধর্ষণ, অগ্নিকান্ড এবং বিভিন্ন ধ্বংসযজ্ঞের সাথে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে যারা এসব অপরাধের সাথে জড়িত ছিল এবং দেশের স্থানীয় অধিবাসী, যারা পাক বাহিনীর সহযোগী হিসেবে এসব কর্মকান্ডে অংশ নিয়েছিল তারা উল্লেখিত আইনে যুদ্ধাপরাধী।

রাষ্ট্রের দায়ঃ
আমাদের সংবিধানে ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিল আকারে উত্থাপনের সময় তৎকালীন আইনমন্ত্রী মনোরঞ্জন ধর বলেছিলেন, “জেনেভা কনভেনশনের এমন কোন ধারা নেই, যেটা পাকিস্তানী সৈন্যরা ভঙ্গ করেনি: জেনেভা কনভেনশনের আইনগুলো বিশ্বের সমগ্র রাষ্ট্র, এমনকি পাকিস্তানও গ্রহণ করেছে। বিশ্বে গৃহিত এই যে নীতি, সমগ্র বিশ্বে এই যে নীতি, এই নীতিমালা ভঙ্গ করা যে অপরাধ সেই অপরাধে তারা অপরাধী। সংবিধানের এই এ্যাট বা আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন ১৯৭৩ অবিক্রিত ও কার্যকর থাকলেও এর পরিপ্রেক্ষিতে কোন ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়নি। এ কারণেই আজ পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার অপরাধে অভিযুক্তদের বিচার করা সম্ভব হয়নি। বরং পুনর্বাসনের চেষ্টা হয়েছে। এদেশের গণহত্যা ও যুদ্ধ অপরাধ প্রসংগে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন ১৯৭৩ সালে জেনেভায় ২৯তম অধিবেশনে কিছু নীতিমালা প্রস্তাবনা ঘোষনা করেছিল। তাতে উল্লেখ করা হয়, “যে হাজার হাজার বাঙ্গালী নির্যাতন কক্ষে যন্ত্রনা ভোগ করেছেন, নির্যাতনে যারা প্রাণ হারিয়েছেন তাদের লাখ লাখ বিধবা ও এতিম সন্তান এবং যারা বেঁচে গেছেন তাদের এটা আশা করার অধিকার রয়েছে যে, বিভিন্ন অপরাধের জন্য যারা দায়ী (রাজাকার), তারা যেন বিচার থেকে রেহাই না পায়” অধিবেশনে গৃহিত প্রস্তাবনা তৃতীয় অনুচ্ছেদ একটি ন্যায় সঙ্গত দায়িত্ব ও কর্তব্যকে সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে অপরাধীদের বিচার করার অধিকার এবং কর্তব্য বাংলাদেশের রয়েছে।

যুদ্ধাপরাধ আইনঃ
বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য প্রথম আইন পাস হয় ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির ঘোষণা দ্বারা, প্রবর্তিত দালাল আইনটির প্রয়োগ শুরু হয় ফেব্রুয়ারী মাস থেকে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করার মাধ্যমে। একই বছরে আইনটি তিন দফা সংশোধনী হয়। এই আইনের অধীনে ৩৭ হাজারেরও বেশি ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। এবং বিভিন্ন আদালতে তাদের আইনে আটক যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ নেই, তাদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণায় আটক ৩৭ হাজারের অধিক ব্যক্তির ভেতর প্রায় ২৬ হাজার ছাড়া পেয়ে যায়। কিন্তু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার ৫নং ধারার (ক) অনুচ্ছেদে যে বিধান রাখা হয় তাতে কোন অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধী ক্ষমা পেতে পারে না। কারণ, এতে বলা হয়েছে-

“যারা বর্ণিত আদেশের নিচের বর্ণিত ধারা সমূহে শাস্তিযোগ্য অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত অথবা যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে অথবা যাদের বিরুদ্ধে নিম্নোক্ত ধারা মোতাবেক কোনটি অথবা সবকয়টি অভিযোগ থাকবে। ১। ১২১ (বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর চেষ্টা), ২। ১২১ক (বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানোর ষড়যন্ত্র); ৩। ১২৮ক (রাষ্ট্রদ্রোহিতা); ৪। ৩০২ হত্যা, ৫। ৩০৪ (হত্যার চেষ্টা); ৬। ৩৬৩ (অপহরণ) ৭। ৩৬৪ (হত্যার উদ্দেশ্যে অপহরণ); ৮। ৩৬৫ (আটক রাখার উদ্দেশ্যে অপহরণ); ৯। ৩৬৮ (অপহৃত ব্যক্তিকে গুম ও আটক রাখা), ১০। ৩৭৬ (ধর্ষণ). ১১। ৩৯২ (দস্যুবৃত্তি); ১২। ৩৯৪ (দস্যু বৃত্তিকালে আঘাত) ১৩। ৩৯৫ (ডাকাতি), ১৪। ৩৯৬ (খুনসহ ডাকাতি), ১৫। ৩৯৭ (হত্যা অথবা মারাত্মক আঘাতসহ দস্যুবৃত্তি অথবা ডাকাতি); ১৬। ৪৩৫ (আগুন অথবা বিস্ফোরনের দ্রব্যের সাহায্যে ক্ষতিসাধন); ১৭। ৪৩৬ (বাড়ি ধ্বংসের উদ্দেশ্যে আগুন)”।

এসব অপরাধী কোনভাবেই ক্ষমার যোগ্য নয়। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার পরও ১১ হাজারেরও বেশি মানবতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী এসব অপরাধের দায়ে কারাগারে আটক ছিল এবং তাদের বিচার কার্যক্রমও চলছিল।

বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যার পরে ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কখনো রাজাকার/ যুদ্ধাপরাধীদেরকে পুরোপুরি ক্ষমা ঘোষণা করেন নাই। তিনি ছোটখাট রাজাকারদের সাধারন ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি যদি ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট নিহত না হতেন, তাহলে এতদিনে বাংলার মাটিতে রাজাকার নামের কোন মানবতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী থাকতো না। এবং জামায়াতে ইসলামী নামের কোন রাজনৈতিক দল (ধর্ম ব্যবসায়ী) বাংলার মাটিতে রাজনীতি করার সাহস দেখাতে পারতেন না।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সেই রাজাকারের দোসরেরা আবার নতুন করে বাংলাদেশকে লুটপাট করে দেশে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। তারা মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করেছিল এবং এখনো মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসকে বিকৃত করার নোংরা কজে লিপ্ত রয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক নিয়ে তারা মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি সেটা রাজাকারের দোসরেরা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। তারা প্রচার করেছিল রক্ষী বাহিনী এবং ভারতীয় বাহিনীর নামে মিথ্যা অপপ্রচার (সেইসব বীর ভারতীয় সৈনিক যারা আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সাথে একসঙ্গে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছিলেন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে)। তারা আমাদের বীর মুক্তিবাহিনীকে কলঙ্কিত করার জন্য এখনো অপপ্রচার চালিয়ে আসছে সেই ১৯৭১ সাল থেকে আজ অবধি। তারা কারা? কারা আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্রু? কারা আমাদের বাংলাদেশের শত্রু? কারা ইসলাম ধর্মের শত্রু? আপনারা কি সেটা জানেন? যারা পশ্চিমা শাসকদের পা চাঁটে, যারা দেশকে অশান্ত দেখতে চায়। যারা ধর্মকে ব্যাবহার করে রাজনীতির স্বার্থে। যারা মিথ্যা ধর্মীয় ফতোয়া দেয়। যারা জঙ্গিদের সাথে আঁতাত করে। যারা বাংলাদেশকে তালেবান আফগানিস্তান বানাতে চায়। যারা গোপনে আমেরিকা/ইসরাইলের আর্থিক সহায়তায় মুসলিম দেশগুলোতে দাঙ্গা লাগিয়ে দেয়। যারা ‘আইএসআইএস’ নামক সন্ত্রাসী জঙ্গি সংগঠনের অনুকরণ করে বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের অনুসরণকারীরা হচ্ছে জামায়াতে ইসলা্মী। আর এই জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যারা আঁতাত করেছে আমার দৃষ্টিতে এরাও জঙ্গিদের মদদদাতা।

সুতরাং, প্রত্যেক বিবেকবান দেশপ্রেমিক জনগণের উচিত, আবেগে না পড়ে, না বুঝে এইসব জঙ্গি রাজনৈতিক দল (জামায়াতে ইসলামীসহ) এর ফাঁদে পা না দেওয়া। বরং প্রত্যেক বিবেকবান দেশপ্রেমিক জনগণের উচিৎ এদেরকে বয়কট করা। জামায়াতে ইসলাম বাংলাদেশে মুসলিম আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে কখনো ক্ষমতায় গেলে! এরকম আশা যারা করছেন তাদের উদ্দেশ্য করে আমি বলতে চাই- আপনারা আপনাদের বিবেককে জাগ্রত করুন। সবকিছুর মাঝে ধর্মকে টেনে আনবেন না। ধর্ম আমাদের নীতিবান মানুষের মত মানুষ হয়ে বাঁচতে শেখায়। আমরা যেন ভালো কাজ সমাজে করতে পারি এবং মন্দ কাজ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারি সেই শিক্ষা আমরা ধর্ম থেকে অর্জন করতে পারি কিন্তু যখন আমরা দেখবো কেউ রাজনীতির ময়দানে ধর্মকে সাইনবোর্ড বানিয়ে ব্যাবহার করছেন তখনি বুঝে নিতে হবে এরা ভণ্ডের দল।

জামায়াতে ইসলামী মানে এই নয় যে, তারাই শুধু ইসলাম এর রক্ষক এবং তারাই ইসলাম সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন এবং বাকীরা সবাই মূর্খ। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এ লক্ষ লক্ষ ধার্মিক সমর্থক রয়েছেন যারা ইসলাম সম্পর্কে এবং অন্য ধর্ম সম্পর্কে অনেক ভালো জ্ঞান রাখেন। দেশরত্ন শেখ হাসিনা নিজেও ধার্মিক। তার মন্ত্রী সভায় যারা রয়েছেন তারাও ধার্মিক। কেউ মুসলিম কেউবা সনাতন ধর্মের অথবা কেউ অন্য ধর্মের অনুসারী, যার যার ধর্ম সে সে পালন করে আসছেন সুতরাং এরা সবাই ধার্মিক। যারা আল্লাহ্‌ অথবা ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেন তাদের আমরা বলি আস্তিক যারা ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না তাদেরকে আমরা বলি নাস্তিক। কেউ যদি নাস্তিক হয়ে থাকেন সেটা তার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু কোন নাস্তিক (যিনি আল্লাহ্‌/ঈশ্বরকে বিশ্বাস করেন না) যদি কোন ধর্মের নামে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ধর্ম বিদ্বেষী লেখালেখি করে কোন ধর্ম অনুসারীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে থাকেন বা দিয়ে যাচ্ছেন তাহলে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সরকার ঘোষণা দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে আইনগত ব্যবস্থা নিবেন এবং যারা ধর্মের নামে মানুষ হত্যা করছেন তাদেরকেও আইনের আওতায় এনে কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ইতিমধ্যে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে। আওয়ামী লীগ সরকার ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রেখেছেন। কারন বর্তমান সরকার ধর্মকে ঢাল বানিয়ে পুঁজি করে চলেন না।

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের হৃদয় জয় করেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রয়েছেন। উন্নয়নের জোয়ারে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশকে আবার ৫০ বছর পেছনে টেনে নেওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র চালাছে সেই স্বাধীনতার বিরোধী শত্রুরা। আমাদের জনগণের উচিৎ তাদের শক্ত হাতে দমন করা।

কিছু ব্যাপার আমাদের খুবই হতাশ করে, আজ এতবছর পর যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চূড়ান্ত করেছেন এবং ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন তখন কিছু দেশ যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ সরকারের বিরুদ্ধে। যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়েছিলেন, লক্ষ লক্ষ বাংলার নারী তাদের ইজ্জত সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন, লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষকে রাজাকারেরা হত্যা করেছিলেন নির্মমভাবে তখন কোথায় ছিলেন এইসব দেশ? তারা (রাজাকার) যখন আমাদের দেশের মানুষদের নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন তাদের প্রভুদের সাথে (পাকিস্তানি) তখনতো কেউ এগিয়ে আসেন নাই? আজ যখন যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায় হল তখন তাদের দরদ উথলে উঠলো?

কেউ কি চিন্তা করে দেখেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য কিছু দেশের শাসক গায়ে পড়ে বার্তা পাঠায় যেন তাদের বিচার প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়! ১৯৭১ সালে হানাদার বাহিনীর সাথে যখন রাজাকারেরা তাণ্ডব চালিয়েছিলেন তখন কোথায় ছিলেন তারা? তারা কি ১৯৭১ সালের সেই ধ্বংসযজ্ঞ দেখেননি? আজ কেন সেই নিষ্ঠুর বর্বর রাজাকারদের প্রতি কিছু মানুষের আলগা দরদ? তাদের আসল উদ্দেশ্য কি?

আজ আমরা দেখছি পশ্চিমা বিশ্বের কিছু দেশ জঙ্গিদের একদিকে মদদ দিচ্ছেন গোপনে, আবার আরেক দিকে জঙ্গি উৎখাত করার ঘোষণা দিয়ে বিভিন্ন মুসলিম দেশগুলোতে সন্ত্রাস/জঙ্গি দমনের নাম করে নিরীহ মানুষদের হত্যা করে যাচ্ছেন। ইরাকের পর আফগানিস্থান, লিবিয়ার পর সিরিয়া। টার্গেট এ আছে ইরান। এরকম করে মুসলিম দেশগুলোতেই তাদের হামলার লক্ষ্যস্থল বানিয়েছেন পশ্চিমারা। আর এই পশ্চিমাদের দোসর হচ্ছে ইসরায়েল। যারা গোটা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে রেখেছে তাদের প্রভুদের সাথে আঁতাত করে। আসলে যারা জঙ্গিদের সৃষ্টি করেন তারাই আবার জঙ্গিদের নির্মূল করার ঘোষণা দিয়ে অন্য রাষ্ট্রে আক্রমন করেন। এদেরকে আমরা দস্যু রাষ্ট্র বলে সম্বোধন করতে পারি। আর এইসব দস্যু রাষ্ট্রের অনুসরণকারী হচ্ছে বাংলাদেশের একটি ধর্ম ব্যবসায়ী দল জামায়াতে ইসলামী।

পরিশেষে বলতে চাই, আমরা যারা দেশকে ভালোবাসি, যারা দেশের উন্নতি দেখতে চাই, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি, যারা নিজ নিজ ধর্মকে ভালবাসেন, যারা শান্তিপ্রিয়, যারা চান বাংলাদেশকে জঙ্গিমুক্ত দেখতে, যারা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন এখনো তাদের মনের মাঝে ধরে রেখেছেন। যারা রাজাকারদের ঘৃণা করেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর অবদানকে যারা স্বীকার করেন, যারা বাংলাদেশকে আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে কল্পনা করেন। যারা ধর্মান্ধ নন। যারা বিবেকবান এবং শিক্ষিত তাদের উদ্দেশ্য করে আমি আহ্বান করছি; দয়া করে, জামায়াতে ইসলামীসহ এর সহযোগী সংগঠনগুলোকে বয়কট করুন। যারা এদের সাথে হাত মিলিয়ে রাজনীতি করছেন বর্তমানে অথবা ভবিষ্যতে করবে এদেরকেও আপনারা বয়কট করুন আমাদের সমাজ থেকে।

অপরদিকে, যে জাতির মাঝে দেশপ্রেম কাজ করে তারাই পৃথিবীর সভ্য এবং উন্নত জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। যে জাতির মাঝে দেশপ্রেম নেই; তারাই দুর্নীতিবাজ হয়, দেশদ্রোহী হয় এবং ফলস্বরূপ সেই দেশ অন্য দেশের তুলনায় অনেক পিছনে পড়ে থাকে। দারিদ্রতা তাদের পুরো গ্রাস করে ফেলে। তারা অন্ধকার জগতে নিক্ষিপ্ত হয়।

সুতরাং; আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার যারা শত্রু ছিলেন অতীতে, সেইসব শত্রুদের আমরা ঘৃণা করবো। নিজ দেশকে ভালোবেসে, সবাই এক হয়ে উন্নয়নমূলক কাজ করে দেশটিকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবো। এই দেশ আপনার, আমার এবং আমাদের সকলের। আগামী প্রজন্মের যারা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হবেন তারা যেন গর্ববোধ করে বলতে পারেন যে তাদের পূর্ব পুরুষরা ছিলেন দেশপ্রেমিক এবং পরিশ্রমী। তারা কখনো বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধী শক্তির সাথে কখনও আঁতাত করেননি। তারা ছিলেন নির্ভীক বীর।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “মানবতা বিরোধী অপরাধীরা ঘৃণ্য পশুর সমতুল্য

  1. রাজাকারেরা এবং দেশদ্রোহীরা
    রাজাকারেরা এবং দেশদ্রোহীরা নরপশুর চেয়েও খারাপ। একমাত্র মৃত্যুদণ্ডই তাদের প্রাপ্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 11 = 18