ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনে আরবদের ভূমিকা

সময়টা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন। অটোমান সাম্রাজ্য যুদ্ধে যোগদান করেছে। তখনকার অটোমান সাম্রাজ্যের আকার-আয়তন ছিলো বিশাল। একদিকে ছিলো ইরান আর রাশিয়া। অন্যদিকে মিসর। মাঝখানে ওমান, ইয়েমেন বাদে পুরো আরব উপদ্বীপ। অপরদিকে ইউরোপে তার সীমানা হাঙ্গেরী পর্যন্ত। এতো বড় ভূখণ্ড সরাসরি পরিচালনা করা কখনো কখনো সম্ভব ছিলো না। অটোমান সাম্রাজ্যে তাই জায়গীর প্রথা ছিলো। কেউ পাশা, কেউ আমির বা কেউ শরিফ হিসেবে, অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে নিজ নিজ এলাকা পরিচালনা করতেন। শুধু জুম্মার নামাজে খলিফার নাম নেয়া লাগতো, খলিফার নামে প্রচলিত মুদ্রা এলাকায় চলতো, আর বাৎসরিক সামান্য ট্যাক্স।

সেই সময়ে হেজাজ (মক্কা, মদিনা, জেদ্দা ও তায়েফ এবং তৎসংলগ্ন এলাকা; বর্তমান সৌদি আরবের পশ্চিম পাশ) এর শরিফ ছিলেন- হাশেমি বংশের ‘হুসাইন বিন আলি’। পার্শ্ববর্তী নাজদ (রিয়াদ, হাইল ও হাসা এবং তৎসংলগ্ন এলাকা; বর্তমান সৌদি আরবের পূর্ব পাশ) এর আমির ছিলেন- সৌদ গোত্রের ‘আব্দুল আজিজ বিন সৌদ’। এদের দুজনের সাথেই বৃটিশ সরকারের ভালো সম্পর্ক ছিলো। এছাড়া সাম্রাজ্যের বাকি আরব অঞ্চলগুলো, যেমন- সিরিয়া, ইরাক, প্যালেস্টাইন, বৈরুত (বর্তমানে লেবানন) প্রাদেশিক গভর্নরের মাধ্যমে সরাসরি পরিচালনা করা হতো। জর্দান নামে সাম্রাজ্যে কোনো প্রদেশ ছিলো না।

যুদ্ধের মাঝখানে, ১৯১৬ যিশুসনে সাম্রাজ্যে শুরু হয়, ‘আরব বিদ্রোহ’। হেজাজ ও নাজদ নিজেদের স্বাধীন রাজ্য দাবী করে। বৃটিশরা তাতে সমর্থন ও দেয়। দুই রাজ্যই বৃটিশদের সমর্থনে, অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণ করে। ১৯১৮ যিশুসনে যুদ্ধ শেষ হলে, সাম্রাজ্যের উপর নেমে আসে- ‘সেভরেস চুক্তি’। সাম্রাজ্য তার আরব অঞ্চলগুলো সম্পূর্ণ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। জাতিপুঞ্জ (লীগ অব নেশন্স) হেজাজ ও নাজদ কে রাজ্য হিসেবে মেনে নেয় এবং বাকি আরব অঞ্চলগুলো ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের মধ্যে ভাগাভাগি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পুঞ্জ এর নাম দেয় ‘ম্যান্ডেট’। ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের ‘সাইকোস-পিকো এগ্রিমেন্ট’ মোতাবেক দাগ টানা হয়। ফ্রান্সের ম্যান্ডেট হয় সিরিয়া আর লেবানন। ইংল্যান্ডের ভাগে পরে ইরাক আর প্যালেস্টাইন। [‘সেভরেস চুক্তি’ ও ‘সাইকোস-পিকো এগ্রিমেন্ট’ নিয়ে গল্প জমা থাকলো।]

এরই মধ্যে ১৯১৭ যিশুসনে ‘হিজ ম্যাজেস্টি ইংল্যান্ড সরকার’ প্যালেস্টাইন অঞ্চলে ‘ইহুদিদের জন্য একটি জাতীয় আবাস তৈরী’ সংক্রান্ত ঘোষনা দেয়; বেলফোর ঘোষনা।

অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর হুসাইন বিন আলি, আব্দুল আজিজ বিন সৌদ এর চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন। একে তার বংশ হাশেমি, তার উপর তিনি মক্কা-মদিনার শাসনকর্তা। অপরদিকে সৌদ বংশ বেদুইন, রিয়াদ ও শহর হিসেবে গরিব। ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যপারে বৃটিশ সরকার হুসাইন বিন আলি কে রাজি করান। তখন ১৯২০ যিশুসন। হুসাইন বিন আলি বৃটিশদের শর্তে রাজি হন। শর্ত ছিলো- হুসাইন বিন আলির তিন সন্তান, আলি, আবদুল্লাহ ও ফয়সাল; যথাক্রমে হেজাজ, প্যালেস্টাইন ও ইরাকের রাজত্ব পাবে। বিনিময়ে প্যালেস্টাইন অঞ্চলের ২৩% জমি তিনি ছেড়ে দিবেন, ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য। বাকি ৭৭% জমির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে জর্দান রাজ্য। অর্থাৎ, প্যালেস্টাইন নামে কোনো দেশ থাকছেনা, থাকছে জর্দান আর ইসরাইল। তবে জেরুজালেম তিনি পুরোটা ছাড়তে রাজি না হওয়ায়, বৃটিশরা জেরুজালেমকে পূর্ব ও পশ্চিম দুই ভাগে ভাগ করে। পশ্চিম পাবে ইসরাইল আর পূর্ব নিবে জর্দান।

১৯২১ যিশুসনেই বৃটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে ইরাকে ফয়সাল বিন হুসাইন এবং জর্দানে আবদুল্লাহ বিন হুসাইনকে রাজা হিসেবে বসিয়ে দেয়া হয়। ১৯২৪ যিশুসনে হুসাইন বিন আলিও হেজাজের রাজত্ব বড়পুত্র আলি বিন হুসাইনের হাতে ছেড়ে দেন।

শেষ পর্যন্ত হুসাইন বিন আলি এতো ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেন যে, ১৯২৪ যিশুসনে অটোমান সাম্রাজ্যের প্রকৃত ভগ্নাংশ ‘তুরস্ক’ খিলাফত পদ বিলুপ্ত করলে, হুসাইন বিন আলি নিজেকে খলিফা ঘোষনা করেন। নাজদ রাজ্য এতে নাখোশ হয়। হেজাজের রাজধানী মক্কা আক্রমণ করে নাজদের সেনাবাহিনী। ১৯২৫ যিশুসনের ১৯ ডিসেম্বর নাজদের সেনাবাহিনীর কাছে মক্কার পতন হয়। ১৯২৬ যিশুসনের ৮ জানুয়ারি আব্দুল আজিজ বিন সৌদ নিজেকে ‘হেজাজ ও নাজদ এর রাজা’ ঘোষনা দেন। ১৯৩২ যিশুসনে রাজ্যের নাম পাল্টিয়ে সৌদি আরব রাখা হয়।

ক্ষমতায় বসার পর জর্দানের রাজা আবদুল্লাহ বিন হুসাইন, ইহুদিদের জন্য জমি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। এর মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়, শেষ হয়। জাতিপুঞ্জ ভেঙে যায়, জাতিসংঘ গঠিত হয়। জাতিসংঘ প্যালেস্টাইন অঞ্চলে সংঘাত ঠেকাতে, ইহুদি ও আরব দুই জাতির জন্য দুই দেশ গঠনের প্রস্তাব দেয়। জেরুজালেম থাকবে নিরপেক্ষ, আন্তর্জাতিক শহর। প্রস্তাব জাতিসংঘে পাশ হয়। সে মোতাবেক ১৯৪৮ যিশুসনের ১৪ মে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরু হয় আরব ইসরাইলের প্রথম যুদ্ধ। জর্দান, ইরাক, সিরিয়া ও মিসর একসাথে ইসরাইল আক্রমণ করে। জর্দান প্যালেস্টাইনের পশ্চিম তীর ও মিসর গাজা দখল করে নেয়। ইসরাইল এর প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শুরু হয়, প্যালেস্টাইনের জাতীয় বিপর্যয়। আবদুল্লাহ বিন হুসাইন পরবর্তীতে নিজেকে প্যালেস্টাইনের রাজা ঘোষনা দেন। ১৯৬৭ যিশুসনে আরব ইসরাইলের দ্বিতীয় যুদ্ধে ইসরাইল, জর্দানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর, মিসরের কাছ থেকে গাজা ও সিনাই উপত্যকা এবং সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমি ছিনিয়ে নেয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে সিনাই উপত্যকা মিসরকে ফিরিয়ে দিলেও, বাকি অঞ্চলগুলো ফিরিয়ে দেয় নি ইসরাইল।

এখনো শান্তি আসেনি প্যালেস্টাইনে, এখনো রক্তপাত থামেনি। প্যালেস্টাইনের আরবরা তাদের নিজেদের জন্য স্বাধীন প্যালেস্টাইনের দাবী এবং সংগ্রাম করে আসছে বহুদিন যাবৎ। সর্বশেষ ২০১২ যিশুসনে, প্যালেস্টাইন জাতিসংঘের ‘অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ এর মর্যাদা পায়। ইসরাইলের ভাষ্যমতে, ইহুদি রাষ্ট্রের যে ডিজাইন বৃটিশ সরকার ও হুসাইন বিন আলি করেছিলো, তাতে পশ্চিম তীর ও গাজা তাদের অধিকারে থাকার কথা।

সমাপ্ত।।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “ইসরাইল রাষ্ট্র গঠনে আরবদের ভূমিকা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

16 − 7 =