সেনাবাহিনী’র বাণিজ্য, বাণিজ্যর সেনাবাহিনী, পর্ব-২

তো প্রশ্নটা মনে করিয়ে দেয়াটা জরুরী। শুধূ ঘরের খেয়ে বনের মেষ তাড়ানোর জন্য এই ব্লগ না। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ কোনভাবেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী’র প্রোডাকশন না এটা বোঝাটা খুবই জরুরী। দশগুন লাভের গুড় ফেলে দেশ মুক্তির যুদ্ধে যাবার কোন মানসিকতা তাদের যে ছিলো না তা মৃুক্তিযুদ্ধে সেনাবাহিনী’র শহীদ এবং অংশগ্রহনকারীদের তালিকা দেখলেই বোঝা যায়।

যুদ্ধের পরপরই ফৌজি ফাউন্ডেশন বিনিয়োগ করে ফেীজি পাটকল, ফেীজি ময়দা,বহুজাতিত ফিলিপস বাতি, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোতে (খেয়াল করলে দেখবেন ঢাকার সেনানিবাসে সাধরন জনগনের প্রবেশধিকার নাই কিন্তু বিদেশী কোম্পানী বগল বাজাচ্ছে)। ১৯৭১ সালের পর ফৌজি ফাউন্ডেশন হয়ে যায় আজকেরে সেনা কল্যান সংস্থা।

যুদ্ধে ভেঙ্গচেুড়ে যাওয়া দেশ-ই ছিলো শেখ মুজিবর রহমানের মোস্ট প্রায়োরিটি কোনভাবেই সেনাবহিনী না। শেখ মুজিবর রহমান স্বভাবতই পশ্চিম পাকিস্তান এবং তার অার্মির ব্যাপারে ভীত ছিলেন। তার সামগ্রিক অভিজ্ঞতা কখনোই সেনাবাহিনী’র ব্যাপারে সুবিধার ছিলো না। সেনাবাহিনী এবং তাদের সেনানিবাসের পূর্নগঠনের ব্যাপারে উনার খুব একটা মাথা ব্যাথা যে ছিলো না তা স্বাভাবিক। ১৯৭৩-৭৪ সালের বাজেট ব্যায়ের ১৬% ছিলো সামরিক খাতে।১৯৭৪-৭৫-৭৬ সালে যা ছিলো যথাক্রমে ১৫% এবং ‌১৩%।১৯৭৫ সালের ঘটনা দেখলে বোঝাই যায় এই বাজেট সংকোচন নিতী কোনভাবেই সামরিক বাহিনী তথা সেবাহিনীর পছন্দ ছিলো না। যদিও অনেকের ধারণা রক্ষী বাহিনী গঠন এবং তাদের সকল কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রী’র কার্যালয়ের অধীনে রাখা এবং ১৯৮০ সালের মাঝে ১২০,০০০ রক্ষীবাহিনী তেরী করার পরিকল্পনা ১৯৭৫ সালের মুজিব হ্ত্যার অন্যতম কারন। প্রফেসর এমাজউদ্দিন তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, সেনাসদস্যরা ১৯৭৫ সালের পূর্ববতী সময়ে বুঝতে পারছিলেন যে তাদের কোর্পরেট স্বার্থ রাজনৈতিক নেতাদের হাতে নিরাপদ নয়। শুনতে যতোই খারাপ লাগুক ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড এবং সামরিক ক্যু ছিলো বাংলাদেশ সেনাবহিনী’র আজকের বিশাল বাণিজ্য গড়ার পথে প্রথম রক্তাক্ত পদক্ষেপ। শেখ মুজিব হত্যার পর ক্ষমতায় আসেন জেনারেল জিয়া। জিয়া’র শাসনামলে সামরিক বাহিনী’র সদস্যরা সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেসন-এ আসতে থাকে। এটা ছিলো বেসমারিক খাতকে সামরিক খাতে নিয়ে যাবার প্রথম ধাপ।নথি ঘেটে দেখা যায় ১৯৭৯ সালে’র ১মার্চ পর্যন্ত সচিবালয়ে নিতীনির্ধারনী ৬২৫জন সরকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে ২৫জন ছিলেন সামরিক বাহিনী’র সদস্য।১৯৮০ সালের ২রা জুনের হিসাব অনুযায়ী ১০১টি পাবলিক কর্পোরেশনের ৪২টির চেয়ারম্যান অথবা এমডি ছিলেন সামরিক বাহিনী’র বর্তমান অথবা সাবেক সেনা কর্মকর্তা।১৯৮১ সালের হিসাব মতে ৪১জেলার মাঝে ২২ জেলার পুলিশের এসপি এবং এএসপি ছিলেন সেনাকর্মকর্তারা।সেই সময়ে ৫০০’র মতো সেনাকর্মকর্তা(অব:)’রা ছিলেন সরাকারী আয়ত্বাধীন বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।একই সময়ে সামরিক কর্মকর্তারা বিভিন্ন সরকারী জমি, হাউস বিল্ডিং কর্পোরেশনের লোন এবং বিভিন্ন বিদেশী দূতাবাসে নিয়োগ পাওয়া শুরু করেন।সেনাবাহিনী’র এই ভোগ বিলাস চরম আকার ধারন করে এই সময়ে। ১৯৭২-১৯৮১ সাল,এই সময়ে সেনাখাতে ব্যয় বাড়ে ১৮৬%।

জিয়ার হত্যার পর এরশাদের শাসনামলে সেনাবাণ্যিজ্য পায় নুতন মাত্রা।সেনা কল্যাণ সংস্থাকে পুরোপুরি বাণিজ্যিকীকরণ করা এবং জাতিসংঘ শান্তি মিশনে অংশ নেয়া এ ছিলো বাণিজ্যের আরেক মাত্রা।একই সময়ে সামরিক ব্যয় বাড়ে ১৮% মতো এবং মোট বাজেটের ১৪% ছিলো সামরিক ব্যয়।এ সময়ে সামরিক গোয়েন্দা উন্নয়ন, সামরিক বাণ্যিজ্যে রাস্তা-ঘাট নির্মান, ক্যান্টনমেন্ট তৈরী এসব খাতে ব্যয হতে থাকে রাষ্ট্রীয় অর্থ। হিসাবে দেখা যায় ১৯৮২ সালে’র বাজেটের ২৫% ছিলো সামরিক ব্যয়।১৯৮৫ সালে সিভিল সার্ভিস হোল্ডারদের তুলনায় সামরিক সদস্যদের বেতন বাড়ে, বাড়ে সুবধিাদি্, ফ্রি চিকিতসা, ভর্তুকি রেশন, চাকর ভাতা সহ মোট বেতনের ১১.৫% বেতন বাড়ে সামরিক সদস্যদের।সামরিক বাহিনী’র নিন্ম পর্যায়ের সদস্যদের বেতন বাড়ে ২০%,তার পার সন্তানদের অবৈতনিক শিক্ষা,বিনামূল্যে বাসস্থান,ইত্যাদি।মোটকথা এরশাদ সেনাবাহিনী’র চাকুরীকে লোভনীয় পদমর্যাদা দান করেন। এখানে দান না বলে বলা উচিত বাংলাদেশের সাধারন মানুষের কাছ থেকে ডাকাতি করেন।

বিএনপি সবসময়ই আর্মির কোলে চড়ে ক্ষমতায় আসীন হয়েছে এবং তাদের অনেক মন্ত্রী-ই সাবেক সেনা সদস্য। ঠিক এ তুলনায় আওয়ামীলীগ মোটেও পিছিয়ে নেই। শুধুমাত্র শৃংখলা’র নামে তারা মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি,খুলনা শিপ ইয়ার্ড,যমুনা সেতুর ব্যবস্থাপনা তুলে দিয়েছেন আর্মির হাতে।

বিএনপি, অাওয়ামীলীগ দু-দলই সেনাখাতে অনেক অর্থ বরাদ্দ দিয়েছে।১৯৯৬ সালে সামরিক ব্যয় ছিলো ৫৭৯মিলিয়ন ইউএস ডলার যা কিনা ২০০৬ সালে গিয়ে দাড়ায় ৭২০ মিলিয়ন ডলারে।

চলবে…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 85 = 89