সাবিরাদের জন্য ভালোবাসা

ক্লাস নাইনে আমি একটা কোচিং এ ভর্তি হয়েছিলাম। তাও বাবা মায়ের চাপে। তারপর কোন এক শুক্রবারে মান্থলি টেস্ট দিতে গিয়ে পরিচয় হয়েছিল একটা মেয়ের সাথে। আমার সহপাঠী, নিশাত। আমার জীবনের প্রথম মেয়ে বন্ধু, নিশাত। অসম্ভব সুন্দর আর নিষ্পাপ একটা মেয়ে। আমাকে দেখলেই কোমরে হাত দিয়ে বলতো, “দেখতো, আমি কি একটুও চিকন হচ্ছি ?” বলেই একগাল হেসে নিতো। হাসতে হাসতে মুখ লাল হয়ে যেত তার।

কোচিং এ কোনদিন নিজের খাতায় নোট তুলতে পারিনি। ওর খাতায় আমাকে লিখতে হত। আর আমার খাতায় ও লিখতো। সে ছিল প্রথম নারী আমি যার হাত ধরেছিলাম। একসাথে হেঁটেছিলাম। সবাই বলত আমরা হয়ত প্রেম করি। আমরা মজা করে বলতাম, “চল চল প্রেম করি”। এই বলে কত হাসাহাসি।

এস এস সি- এর পর ওর সাথে আর যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি আমার। পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ততা, বাসায় ফিরে আর সময় না পাওয়া। সবকিছু মিলে কেন জানি আর যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি। তারপর একদিন আমার এলাকার বন্ধুরা আমাকে ডেকে বললো যে তাকে নিয়ে নাকি বাজে ভিডিও বের হয়েছে। পরে ওদের কাছ থেকে শুনলাম তার প্রেমিক বন্ধুটি নাকি গোপনে তার এইসব ভিডিও করে এক ফোন থেকে আরেক ফোন এ ছড়িয়ে দিয়েছে। সে ভিডিও আমার দেখার দুর্ভাগ্য হয়নি। লজ্জায় অপমানে এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছিল সে সপরিবারে। তার প্রেমিকটি প্রকাশ্যে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াতো এলাকায় আর আমার সেই প্রথম মেয়ে বন্ধুটির নাম হয়ে গেল খারাপ মেয়ে। সবার একটাই কথা, নইলে মেয়ে ওসব করবে কেন ?

এইচ এস সি- পরীক্ষার পর পর একদিন মৌচাক এ তার সাথে দেখা হয়। আমি তাকে ডাক দেই। সেই মিষ্টি মেয়েটা ততদিনে ছাইদানিতে রূপান্তরিত হয়েছে। শুধু তার চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছিল। সেই চোখে ছিল ঘৃণা, কেবল ঘৃণা। যে মানুষটা আমার সাথে কথা বলতে গেলে হাসতে হাসতে লাল হয়ে উঠত তার মুখ তখন কেবল ছাই রঙের।

সময়ের সাথে সাথে আমিও অমানুষের মতো তাকে ভুলে যাই। আমার এলাকার বন্ধুদের সাথে মাঝে মাঝে আড্ডা দেই। তাদের গল্পের একটা বিশাল অংশ জুড়ে থাকতো প্রেমের গল্প। আর প্রেম হলে মেয়েকে বিছানায় নিয়ে যেতে হবে। সেটা যেভাবেই হোক, আর সেদিক দিয়ে যে ছেলেরাও ছলা কলাতে বেশ পটু সেটাও জানা হয়েছিল আমার। একবার এক ফ্রেন্ড জানালো সে ব্রেক আপ করে ফেলেছে এবং কারণ হচ্ছে মেয়ে কোনভাবেই বিছানায় যেতে রাজি হয়নি। এরকম প্রেম বিচ্ছেদের গল্প অনেক শুনেছি। আর কারণগুলো একই ছিল।

এইরকম হাজার হাজার গল্পের ভিতর আমি বড়ো হয়েছি। হয়তো আমার চারপাশের প্রায় সবাই। প্রেমিকাকে বিছানায় নিয়ে যাবার জন্য যতো আকুলতা আমাদের তার সিকিভাগও হয়ত তাকে ভালোবাসার জন্য নেই । প্রেমিকা আমাদের কাছে পলিথিন-এ মোড়ানো পচনশীল খাবার এর মতো। দ্রুত খেয়ে ফেলতে হবে। কখন নষ্ট হয়ে যায় বলা যায়না। আর খাওয়ার পর তো এমনিতেই নষ্ট।

গতকাল খবরে জানলাম সাবিরা নামে একজন মেয়ে আত্মহত্যা করেছে। কারণ কি? কারণ তার প্রেমিক বন্ধুটি তাকে যৌন দাসী বানিয়ে রেখেছিল। যে ভালোবাসার বাহানায় তার শরীর লুটে নিয়েছিল প্রেমিক পুরুষটি সেই ভালোবাসায় তাকে সম্মান দিতে পারেনি। হয়তো দিতেও চায়নি। যৌনদাসী প্রেমিকা হলে হয়ত সময়টা আরও উপভোগ্য হয়ে ওঠে। আর ভালোবাসার মিথ্যা গল্পে শরীরটাকে কাছে পেলেই তো হয়।

প্রেমিকাটিও ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে ওঠে। সমাজ আমাদের শেখায় ভালোবাসা অন্ধ, তারপর সমাজ নিজেই তা ভুলে যায়। শুধু আমদের প্রেমিকাদের এইসব মনে রেখে নিজেকে বিসর্জন দিতে হয়। নিজের জীবনের সমস্ত স্বপ্নটুকু হারিয়ে ফেলে যখন কোন এক প্রেমিকা নিজেকে নিজে মুক্তি দেয় মৃত্যুতে তখন আসলে মুক্তি হয় প্রেমিকের। সে ছোটে অন্য প্রেমিকার খোঁজে, আসলে প্রেমিকা নয় শুধুই কামবাসনার সঙ্গী।

আর সমাজ? আমরা?

আমরা স্বপ্নহারা স্পন্দনহীন প্রেমিকাটিকে বেশ্যায় পরিণত করি। বেশ্যার গল্প বলতে বলতে নিজেরাও একটা করে কাম-বাসনার সঙ্গী খুঁজি। সাবিরাদের প্রস্থানে কেউ কাঁদে না। কেউ মোমবাতি জ্বলায় না। কেউ ভালোবেসে তার কপাল ছুঁয়ে দিতে যায়না। কোথাও কোন প্রতিবাদ হয়না। কেন হবে? বেশ্যার জন্য প্রতিবাদ কি মানায়?

তাহলে শোনো হে প্রেমিকা,
একদিন তুমিও এইভাবে বেশ্যা হবে। তোমার গল্প বাজারে বাজারে বিকোবে। তোমার মৃত্যুতেও আকাশে শুধু কাক-শকুনেরা ডানা মেলে ঘুরে বেড়াবে। তোমার স্বপ্ন এখানে মূল্যহীনদের ভেতরেও মূল্যহীন।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “সাবিরাদের জন্য ভালোবাসা

  1. এদেশে আবার প্রতিবাদ ।ইতিহাস
    এদেশে আবার প্রতিবাদ ।ইতিহাস বিকৃতির মধ্য দিয়ে, এদেশ নিজেই এখন বেশ্যা মাতা, আর আমরা তার বেশ্যা কণ্যা সন্তান ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 9 = 10