বেঁচে থাকুক সাবিরা’রা

আচ্ছা জীবনের মূল্যের চেয়ে কষ্টের তীব্রতা বেশি ভয়ঙ্কর হয় কি করে? কষ্ট তো ক্ষনস্থায়ী। আজ আছে কাল নাও থাকতে পারে। হয়তো বছরের পর বছরও থাকতে পারে তাই বলে বেঁচে থাকার আনন্দের চেয়ে কষ্টের তীব্রতা বেশি ভয়ঙ্কর হবে? আমি তা মনে করি না। আমি মনে করি নতুন কোন সুখ এসে কষ্টকে মুছে দিতে বাধ্য। হয়তো সুখের জন্যে অপেক্ষায় থাকতে হবে। সুখ দিয়ে কষ্টকে অতিক্রম করার অপেক্ষা।

সাবিরার মৃত্যুর পূর্ববর্তী ভিডিওটি আমি সম্পূর্ণ দেখতে পারিনি। আসলে দুই তিন মিনিট চলার পর স্ক্রিনে চোখ আটকে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। বারবার মনে হচ্ছিলো এই বুঝি পেটের মধ্যে ছুরি চালিয়ে রক্তাক্ত হয়ে মৃত্যুর জন্যে ছটফট করবে। কিভাবে সম্ভব একটা মানুষের আত্মহত্যা করার দৃশ্য লাইভ দেখা? শুধু মানুষ না, বোঝ হবার পর থেকে আমি কখনো কোরবানীর মাঠে গিয়ে পশু জবাই দেখিনি। আসলে আমি পারিনা এসব দেখতে।

সাবিরা যখন তার পেটে ছুরি চালিয়ে দিতে চাইছিলো তখন তার মস্তিষ্কের একটি অংশ তাকে বাধা দিচ্ছিলো এই বলে যে, তুই ব্যথা পাবি, তুই মরে যাবি! ছুরি চালাবি না। সাবধান! কিন্তু সাবিরার মানে মস্তিষ্কের অন্য আরেকটি অংশের ইচ্ছে করছিলো মরতে, ছুরি চালাতে! সে পারেনি। কারণ মানসিক কষ্টের চেয়ে তার শারীরিক কষ্ট তখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছিলো। কিন্তু সে মরেছিলো, তবে ছুরি চালিয়ে নয় গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাস নিঃশ্বাস বন্ধ করে! তখনো তার মস্তিষ্কের একটি অংশ তাকে বাধা দিয়েছিলো, মরতে নিষেধ করেছিলো, কিন্তু ছুরি চালিয়ে রক্তাক্ত হয়ে মরার মতো প্রাথমিক কষ্ট ফাঁস নিয়ে মরার চেষ্টায় ছিলোনা বলে মস্তিষ্কের সেই অংশ তেমন তীব্র বাধা দিতে পারেনি। ফলে মস্তিষ্কের আবেগীয় অংশের কাছে মস্তিষ্কের জীবন বাঁচিয়ে রাখার অংশ পরাজিত হয়। গলায় ফাঁস লেগে যাবার পর সবার মতো তারও বেঁচে থাকার ইচ্ছে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছিলো, মানে মস্তিষ্কের জীবন বাঁচিয়ে রাখার অংশ চাইছিলো যেকোন উপায়ে বেঁচে থাকতে কিন্তু তা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। বেঁচে থাকার সব উপায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো!

মানুষ কেন আত্মহত্যা করে? কেন চিন্তা করে যে মরে যাই? মরে গেলেই কি কোন সমস্যার সমাধান হয়? আমার অন্তত মনে হয় না। বরং সমস্যার সৃষ্টি হয়। আমি তোমাকে পেলাম না, তুমি আমাকে অপমান করছো, তাকে ছাড়া আমার জীবন অর্থহীন, লজ্জা, অপমান, হতাশা, ব্যর্থতার মতো ঘটনাগুলোও অন্য আরো দশটা ঘটনার মতো জীবনের একটা অংশ। একে মেনে নিতে হবে। জীবন কোন সামান্য ঠুনকো বিষয় নয় যে এই সাধারণ ঘটনাগুলো তাকে অতিক্রম করবে।

প্রভার যখন সেক্স স্ক্যান্ডাল বের হয় তখন চারদিক থেকে মানুষ তার সমালোচনা করতে থাকে। অপমান, ঘৃণা করতে থাকে। তখন কি তার লজ্জা কম হয়েছিলো? কম অপমানিত হয়েছিলো? কম হতাশ হয়েছিলো? মানুষতো মনে করেছিল এই অপমানে প্রভা নিশ্চিত আত্মহত্যা করবে। সত্যি কথা বলতে কি মানুষ অপেক্ষা করছিল তার আত্মহত্যার খবর শোনার জন্যে। কিন্তু সে বেঁচে ছিলো। জীবনের সাথে মানে মস্তিষ্কের একটি অংশের সাথে যুদ্ধ করে সে বেঁচে ছিলো। যদি সে অপমান, লজ্জায় মরে যেতো তবে বাকি এই জীবন কোথায় পেতো? তার বর্তমানের জীবন, অভিনয়, আনন্দ উচ্ছ্বলতা, মানসিকতা দেখে কেউ কি কল্পনা করতে পারবে যে তার ভয়ঙ্কর একটা অতীত ছিলো? প্রভা নিজেও হয়তো পারবে না। মরে যাবার আগে অন্তত বেঁচে থাকার স্বপক্ষের কারণগুলো চিন্তা করা উচিৎ। সেই মূহুর্তে বেঁচে থাকার স্বপক্ষে কোন কারণ খুঁজে না পেলেও বেঁচে থাকা উচিৎ। এই কারণে বেঁচে থাকা উচিৎ যে, যে কারণে মরতে চাচ্ছে সে কারণকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখানো।

সাবিরার আত্মহত্যার জন্যে অবশ্যই তার প্রেমিক দায়ী। দিনের পর দিন একটা মানুষকে মানসিক যন্ত্রণা দেয়া, প্রতারণা করা, বিশ্বাস ভঙ্গ করা, বিয়ের প্রলোভন দেখি শরীর ভোগ করা কোন ছোট অপরাধ নয়। একটা মানুষকে মেরে ফেলার জন্যে এই কারণগুলোই যথেষ্ট। সাবিরা আত্মহত্যা করেছে কিন্তু তার প্রেমিক আত্মহত্যা করার জন্যে মানসিক শক্তি যুগিয়েছে, সাহস দিয়েছে। এটাও একটা হত্যা। এই হত্যারও সর্বোচ্চ বিচার কাম্য। বিচারের চেয়ে বেশি কাম্য সুস্থ, মানবিক সমাজ তৈরি করা। নচেৎ সাবিরা’রা প্রতিনিয়ত এভাবেই নিজেদের মেরে ফেলার মতো মানসিকতা তৈরি করবে। মরে যাবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 3