জনকল্যাণে দেশপ্রেমিক, ত্যাগী ও নির্লোভ রাজনীতিবিদ প্রয়োজন

অহংকার প্রভাবশালী রাজনীতিবিদকেও পতনের মুখে ঠেলে দেয়। জনগনের কল্যানে যে দল রাজনীতি করে, জনগন সে দল থেকে কখনও মুখ ফেরায় না। তদ্রুপ যে রাজনীতিবিদ জনকল্যাণে তার রাজনীতি পরিচালিত করে, জনগন সে নেতাকে কখনই ভুলে যায় না। রাজনৈতিক কমকান্ড পরিচালনার জন্য যেমন নিঃস্বার্থ কর্মীবাহিনী প্রয়োজন, তেমনি নেতৃত্ব দেয়ার জন্য ও জনকল্যাণে দেশপ্রেমিক, ত্যাগী ও নির্লোভ নেতার প্রয়োজন। ইতিহাসে এমন একজন নেতাও খুজে পাওয়া যাবে না, যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ছাড়া, উড়ে এসে জুড়ে বসে নেতৃত্বকে হাইজ্যাক করে, নেতা সেজে, নেতৃত্ব দিয়ে জনমানসে স্থান করে নিতে পেরেছেন। ক্ষনকাল বাহুবলে শাসন করতে পারলেও সময়ের পরিক্রমায় ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবেই। সু্যোগ সন্ধানী নেতার কাছ থেকে উচ্ছিষ্টভোগী কিছু চাটুকার হয়তো কিছুদিন গুনগান করে। সময়ের প্রেক্ষাপটে তারাও একসময়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে বিগত দশকে সাম্রাজ্যবাদি চক্র তাদের নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় কর্মচারী অথবা রাষ্ট্রের প্রভাবশালী সেনাকর্মকর্তাদের বসিয়ে বিভিন্ন প্রলোভনের বিনিময়ে, প্রতিষ্ঠিত জননেতাদের উৎখাত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে, জনগনের কল্যানে কাজ করানোর চেষ্টা হয়েছে। কিছুদিনের জন্য সফল হলেও চুড়ান্ত পর্যায়ে সকলেই ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে জনমানস পট থেকে হারিয়ে গেছেন।

ভারত বিভাগের পর হতে, ক্ষনকাল পরপরই সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে প্রচণ্ড দাপটে শাসনকার্য পরিচালনা করলেও কেহই ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করতে পারেন নাই। আইয়ুব খান থেকে শুরু করে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত, বাংলাদেশের জিয়া-এরশাদ পর্যন্ত ক্ষমতা দখলকারী প্রত্যেক প্রতাপশালী সেনা নায়কই ধীরে ধীরে জনগনের মানসপট থেকে বিলীন হয়ে যাওয়ার পথে।

পক্ষান্তরে, এই উপমহাদেশেই, কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ থেকে শুরু করে হোসেন শহীদ সোহ্রায়ারদি, এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাষানী, মহাত্মা গান্ধী থেকে শুরু করে, বাঙালি জাতির উম্মেষকারি সর্বকালের সবশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিশ্বময় গবেষণা চলছে, চলবে; হাজারো বছর।

ভারতীয় উপমহাদেশে তৎসম নেতা সৃষ্টি হতে কতযুগ অপেক্ষা করতে হবে তা এখনই বলা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। উন্নত প্রচার মাধ্যম, যোগাযোগের উন্নত বাহন, ভিডিও, ক্যামরা, টেলিভিশন, পত্র-পত্রিকা, মেঠোফোন বিহীন, গরুর গাড়ি ঘোড়ার গাড়ির যুগে জাতির জনকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের যে সমস্ত প্রমানাদি পাওয়া যায়, বর্তমানে আধুনিক ডিজিটাল যুগেরমত সবকিছু ধারন করার সুযোগ যদি থাকতো, তাহলে শুধুমাত্র একবছরের রাজনৈতিক কর্মকান্ড বিশ্লেষন করার জন্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কয়েক যুগ সময়ের প্রয়োজন হত।

এমনি শুধুমাত্র ‘৭ই মাচের ভাষন, যা মাত্র কয়েক মিনিটের, তাহা নিয়ে যুগের পর যুগ গবেষণা করেও ইতিহাসবিদগন স্থির সিদ্ধান্তে আসতে কতযুগ সময়ের প্রয়োজন তাও বলা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। ঐ ভাষনের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি লাইন নিয়ে গবেষণা করার মত মসলা বিদ্যমান আছে। বঙ্গবন্ধু সেদিন বক্তৃতা দিলেন, নাকি কবিতা আবৃতি করলেন তাও গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নিতে যুগ পার হয়ে যাবে।

ইতিমধ্যে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকগন স্থির সিদ্ধান্তে এসেছেন, বিশ্বে কালজয়ী নেতাদের অমর ভাষনের মধ্যে, বাঙালি জাতির স্রষ্টা, বাংলাদেশের স্বাধিনতার মহানায়ক, বাঙালি জাতির অমর কাব্যের মহাকবি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষন, “সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষন”।

জনগনের দাবি আদায়ের মূল হাতিয়ার, হরতাল-অবরোধের মত মারাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচীকে বিএনপি-জামায়াত তাদের পরিবার, পারিবারিক সম্পদ রক্ষা, পরিবার এর সদস্যদের অপকর্মের সাজা থেকে রক্ষা পাওয়ার নিমিত্তে ব্যবহার করে, ভোতা করে দিয়েছেন। রাজনীতিতে নৈরাজ্যের আমদানি করে, জনগনের মাঝে ভিতির সঞ্চার করে, আন্দোলন বিমুখ করে দিয়েছেন। ব্যাক্তি স্বার্থ ও দলীয় স্বার্থ উদ্ধারে, জনগনের আন্দোলন করার হাতিয়ারকে, জনগনের নিত্য সমস্যার কারনে ব্যবহার না করে, অন্যভাবে বলতে গেলে, জনগনের বৃহত্তর দাবি আদায়ের জন্য ব্যবহার না করে, গোষ্ঠী রক্ষায় ব্যবহার করে, মুল্যবান হাতিয়ারে জং ধরিয়ে অকেজো করে দিয়েছেন।

এই মুহূর্তে, সরকারের কোন কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে আন্দোলন গড়ে তোলার আর কোন যুতসই রাজনৈতিক কমসুচি নেই, যা ব্যবহার করে সরকারকে তার নিয়মতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড থেকে সরে আসার জন্য বাধ্য করা যাবে।

পরিশেষে, রাজনতিক দল হিসেবে বিএনপি-জামায়াত তার কর্মীবাহিনী নিয়ে রাজপথে না থেকে জঙ্গি সংগঠনের মত বা সসস্র বিপ্লবী সংগঠনের আদলে চোরাগুপ্তা বিবৃতি প্রকাশ করে আন্দোলন করতে গিয়ে, জনগনের মূল আন্দোলনের শক্তিকে অকেজো করার অপরাধে একদিন না একদিন জনগনের বিচারের কাঠগড়ায় বিএনপি-জামায়াতকে জবাবদিহি করতে হবে। জনগন বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে, অজস্র কর্মীর রক্তের বিনিময়, জনগণ যুগযুগান্তরের সাধনায় একজন মহান নেতা বানান। রন্ধনশালা থেকে এসে নেতা হতে পারলে জনগনের এত ত্যাগের প্রয়োজন হতো না।

খোরশেদ আলম, লেখক ও গবেষক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “জনকল্যাণে দেশপ্রেমিক, ত্যাগী ও নির্লোভ রাজনীতিবিদ প্রয়োজন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 1 =