অন্তর্ধান


দরজায় কলিংবেল বাজছে। টিং টং। মিসির আলী ঘড়ি দেখলেন সকাল ৮টা বাজে। তার ঘুম ভেঙ্গেছে ১০ মিনিট হল।শুয়ে আছেন তিনি।এত সকালে কারো আসার কথা না নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া। এত সকালে সাধারণত আসে কাজের বুয়া আর পেপারওয়ালা। তিনি পেপার রাখেন না আর কাজের বুয়া নেই প্রায় ২ মাস।এত সকালে কোন ভিখারিও আসে না। তাই কে এসেছে বুঝতে পারলেন না।
কলিংবেলটা একবার বেজে আর বাজল না। হয়ত ভুলে কেউ অন্য ফ্ল্যাট ভেবে এই ফ্ল্যাটের বেল বাজিয়েছে। কিন্তু একটু পর আবার বেল বাজল।মিসির আলী একটু অবাক হলেন। কোন কমবয়স্ক মেয়ে বা তরুণী হলে ঘন ঘন অস্থির ভাবে বেল বাজাত। কোন যুবক হলে ওতটা অস্থির না হলেও এতক্ষণ অপেক্ষা করে বেল বাজাত না। তিনি আরেকটু অপেক্ষা করলেন। দেখেন আবার বাজে কিনা। একটু পর আবার বেল বাজল। তিনি ঘড়ি দেখলেন আট টা বেজে আঠার মিনিট। ঠিক ৯ মিনিট পর পর বেল বাজছে।তিনি আরেকটু দেখলেন। আবারও ৯ মিনিট পর বেল বাজল। মিসির আলী এবার উঠলেন। তিনি আসলে বুঝতে পারলেন কেউ একজন ধৈর্যের সাথে তার সাথে মাইন্ড গেম খেলছে।
দরজার খুলে তিনি দেখলেন হুমায়ূন আহমেদ দাঁড়িয়ে আছেন।মুখে স্মিত একটা হাসি।
-“ভালো আছেন মিসির আলী” তিনি বললেন খুবই শান্ত গলায়
মিসির আলী অবাক হলেন আবার বেল বাজা নিয়ে তার আগের বিস্ময়ও কেটে গেলো। হুমায়ূন আহমেদের পক্ষে এরকম মাইন্ড গেম খেলা সম্ভব তাঁকে দ্বিধাগ্রস্ত করে।
-“আসুন ভিতরে আসুন” বললেন মিসির আলী।
হুমায়ূন আহমেদ ভিতরে গিয়ে বসলেন।মিসির আলীও বসলেন।সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার একটা সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস। কিন্তু আজ সিগারেট শেষ হয়ে গিয়েছে। তার অস্থির লাগতে লাগল।
তখন তিনি দেখলেন হুমায়ূন আহমেদ সিগারেটের প্যাকেট বাড়িয়ে ধরেছেন তার দিকে। গোল্ড লিফ সিগারেট।মিসির আলী শান্তভাবে সিগারেট নিয়ে ধরালেন।হুমায়ূন আহমেদও ধরালেন।
-“আপনি তো অনেকদিন ধরে অসুস্থ শুনলাম। এখন কেমন আছেন?” মিসির আলী জিজ্ঞেস করলেন।
হুমায়ূন আহমেদ হাসলেন।
-“আপনি কয়েকদিন ধরে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন” বললেন তিনি
-“হ্যাঁ। আমি দেখছি যে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে কতদিন থাকা যায় আর এটা মনের উপর কিরকম প্রভাব ফেলে”
_”হ্যাঁ এটা বেশ ভালোই পরীক্ষা। আপনার আশেপাশে জনমানব থাকবে কিন্তু আপনি তাদের মাঝে থাকবেন না”
মিসির আলী কিছু বললেন না।
-“আপনি এত সকাল বেলা নিশ্চয়ই কোন কাজে এসেছেন।“ কিছুক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলেন মিসির আলী
হুমায়ূন আহমেদ হাসলেন।ঠাণ্ডা হাসি
-“আপনাকে আমার সাথে যেতে হবে মিসির আলী”
-“কোথায়??”
-“যেখানে আমি চলে গিয়েছি। না ফেরার দেশে”
মিসির আলীর সিগারেট শেষ হয়ে গিয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ তারদিকে আরেকটা সিগারেট বাড়িয়ে ধরলেন।মিসির আলী সিগারেট ধরিয়ে ভাবতে লাগলেন।ব্যাপারটা তাহলে হল হুমায়ূন আহমেদ আর নেই। তিনি এসেছেন তাহলে তার তৈরি করা চরিত্র মিসির আলীকে নিয়ে যেতে।কিন্তু তার কি প্রয়োজন। তাঁকে কেন নিয়ে যেতে হবে?
-“মিসির আলী। মাঝে মাঝে আসলে নিজের সৃষ্টি করা চরিত্রের ছায়া অনেক বড় হয়। তখন তাকে নিয়ে যেতে হয়” হুমায়ূন আহমেদ মিসির আলীর মনের প্রশ্নের জবাবটা দিয়ে দিলেন
মিসির আলী কিছু চুপ করে থাকলেন।
“আর যদি আমি না যেতে চাই, তাহলে?”
হুমায়ূন আহমেদ কিছু বললেন না।শুধু হাসলেন।
মিসির আলী তখনি বুঝলেন যে তার না গিয়ে উপায় নেই।যে মানুষটা তাকে তৈরি করেছে, তার সকল কথা বার্তা কর্মকাণ্ড ঠিক করে দিয়েছে, তার সাথে তাকে যেতেই হবে।


আমি বসে আছি ধানমণ্ডি থানাতে।ওসির রুমে।না আমি নিজে থেকে আসি নি তাঁকে জ্বালাতে। তিনি আমাকে তলব করেছেন। খুবই অবাক হওয়ার বিষয়।আমি ছিলাম সদরঘাটে। নৌকায় করে সারাদিন বুড়িগঙ্গায় ঘুরার কথা। কিন্তু তা আর হল না। এক পুলিশ গাড়ি নিয়ে এসে বলল আমাকে যেতে হবে, স্যার তলব করেছেন।এরা যে খোঁজ কিভাবে পায় কে জানে।
যাই হোক একটু পর ওসি সাহেব আসলেন।মুখে বেশ চিন্তা। এসে চেয়ারে বসলেন। কাকে জানি ডাক দিয়ে বললেন “এই এখানে দুই কাপ চা দিয়ে যা। একটা চিনি ছাড়া”
আমি তাঁকে বললাম “স্যার, অনেক দিন সিঙ্গারা খাই না। একটু সিঙ্গারার ব্যবস্থা করেন না।“
ওসি সাহেব পাত্তা দিলেন না। একটু চুপ করে বললেন
-“হিমু। তোমাকে একটা দরকারে এখানে আনা হয়েছে।আমার তোমার সাহায্য দরকার”
এখনকার ফেসবুকিও ভাষা অনুযায়ী আমার মুখ থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল ‘লোল’
কিন্তু নিজেকে সামলালাম।
-“কি দরকার বলুন??” আমি যতটুকু সিরিয়াস করা যায় ততটুকু সিরিয়াস করে বললাম।
এর মাঝে চা আসল।ওসি সাহেব চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন “শুভ্রকে তুমি তো চিন।বিরাট বড়োলোকের শান্ত শিষ্ট নিস্পাপ এক ছেলে। কিন্তু কয়েকদিনে খুব অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে তাকে নিয়ে”
একটু থামলেন তিনি
“তার বাবার একটা পতিতালয় আছে ঢাকার কাছেই। সে কয়েকদিন আগে সেখান থেকে একটা মেয়েকে নিয়ে বের হয়। রাতের বেলা গাড়িতে করে। সেই মেয়ে আর ফিরে আসে না।পরেরদিন সে আবার ওই জায়গায় যায় আর আরেকটা মেয়েকে নিয়ে বের হয়। সেদিন সন্ধ্যায় প্রথম মেয়েটার লাশ পাওয়া যায় ডেমরার এক ডোবায়। দ্বিতীয় মেয়েটিও আর ফিরে আসে না। পরেরদিন শুভ্র এসে আবার ৩টা মেয়েকে নিয়ে বের হয়।ম্যানেজার তাকে জিজ্ঞেসও করে মেয়েগুলোর ব্যাপারে। কিন্তু সে জবাব দেয় না। তারাও ফিরে আসে না। দ্বিতীয় মেয়েটির লাশ পাওয়া গিয়েছে পরশু ধানমণ্ডিতেই।সব গুলো মেয়েই নামকরা পতিতা।“
ওসি সাহেব সিগারেট ধরালেন।
“এগুলো বড় সমস্যা না। সমস্যা যেটা হচ্ছে, শুভ্র এখন মিসিং। তাকে পরশু থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যেদিন থেকে এসব ঘটনা শুরু সেদিন থেকে সে বাসায় আর যায় নি।পরশু দিন সন্ধ্যায় শেষ দেখা গিয়েছে তাকে সিলেটের ট্রেনে করে যেতে। আরও একটা ইন্টারেস্টিং ঘটনা হল সে এ কয়দিন ব্যাংক থেকে কয়েক কোটি টাকা তুলেছে।“
-“তো সমস্যা হল যে শুভ্র মিসিং এটা। এত গুলো মেয়ে মারা গেলো সেটা না।“ আমি বললাম।
-“হ্যাঁ। তার মা এখন হাসপাতালে। আর তার বাবার অবস্থাও খারাপ। বুঝতেও পারছ যে শুভ্রের সাথে এরকম ঘটনাগুলোর সম্পর্ক খুবই অসঙ্গতিপূর্ণ। তার সাথে যায় ও না।শুভ্রকে বের করা গেলে সব ঘটনা বুঝা যাবে আমার বিশ্বাস। সর্বশেষ হল শেষ ৩টা মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে আজ সকালে।“
-“আপনারা সিলেটে খোঁজ নেন নি?”
-“হ্যাঁ নিয়েছি। সিলেট যাওয়ার পথে যেসব ষ্টেশন পড়ে, সেসব জায়গাতেও খোঁজ নেয়া হয়েছে। কিছুই পাওয়া যায় নি। মনে হচ্ছে সে উধাও হয়ে গিয়েছে ট্রেন থেকেই। দেখ আমি অবাস্তব কিছু বিশ্বাস করি না। মানুষজনের বিশ্বাস তুমি অনেক অলৌকিক কিছু পার। তাই তোমাকে ডাকা। যদি কিছু করতে পার।“
-“আমার মনে হচ্ছে ঘটনা খুব মামুলি। সে মেয়েগুলোকে মার্ডার করে এখন ভেগে গিয়েছে। সে নিস্পাপ তো কি হয়েছে? ‘জ্যাক দ্যা রিপার’- কেউ সবাই খুব নিস্পাপ ভাবত। পরে কি বের হল?”
ওসি সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। শান্ত গলায় বললেন “হিমু।এখন আমার বের হতে হবে ডিউটিতে। তুমি যেতে পার। অনেক ধন্যবাদ তোমাকে”
আমি বের হয়ে আসলাম। আসার সময় সেন্ট্রি আমার হাতে এক ঠোঙা সিঙ্গারা ধরিয়ে দিল।
আমি বের হয়ে হাঁটতে লাগলাম। তেমন ভালো লাগছে না কেন জানি। মেসের দিকে খুব যেতে ইচ্ছা করছে। এই সময়ে আমি কখনই মেসে থাকি না। আমি আসতে আসতে মেসের দিকে যেতে লাগলাম
মেসে গিয়ে আমার রুমে গিয়ে দেখি হুমায়ূন আহমেদ আর মিসির আলী বসে আছেন।

“কেমন আছ হিমু? তোমারই অপেক্ষা করছিলাম আমরা” শান্ত গলায় বললেন হুমায়ূন আহমেদ।

হিমু আর মিসির আলী পাশাপাশি হাঁটছেন।হুমায়ূন আহমেদ একটু সামনে। ধির গতিতে হাঁটছেন।
হিমু মিসির আলীকে জিজ্ঞেস করল “শুভ্রএর ঘটনা তো সব ই শুনলেন। আপনার কি মনে হয় শুভ্র এসব খুন করেছে? করে পালিয়ে গিয়েছে টাকা নিয়ে?”
মিসির আলী তখন থেকেই খুবই চুপচাপ আর মুখটা কাল করে আছেন।
তিনি জবাব দিলেন “না। আমার কাছে ঘটনাটা খুব সিম্পল”
-“কিরকম??” জিজ্ঞেস করল হিমু
-“সে পতিতালয়ের মেয়েগুলোকে বের করে মুক্ত করে দিতে চেয়েছিল। তাদের স্বাধীন করে দিতে চেয়েছিল তাদের অভিশপ্ত জীবন থেকে। ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে সে মেয়েগুলোকে দিত। বলত যে দূরে চলে যেতে।কিন্তু তাদের পিছে সবসময় লোক ছিল শুভ্রর বাবার। তারাই মেয়েগুলোকে খুন করত। “
-“কিন্তু ট্রেন থেকে উধাও হওয়াটা?”
-“সেটা মনে হয় হুমায়ূন আহমেদ বলতে পারবেন। আমাদের মত হয়ত তাকেও তিনি অন্তর্ধান করেছেন ট্রেন থেকেই”
তা হতে পারে।থাক তাকে জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। সব প্রশ্নের উত্তর জানতে হয় না।
তারা হেঁটে যাচ্ছেন বেড়িবাঁধ দিয়ে। আকাশে অদ্ভুত সুন্দর চাঁদ। হুমায়ূন আহমেদ দাঁড়িয়ে পড়লেন। আকাশের দিকে তাকিয়ে জোছনা দেখতে লাগলেন।হিমু আর মিসির আলীও দাঁড়ালেন।
হিমু হুমায়ূন আহমেদকে জিজ্ঞেস করল “আমরা আরেকটু পর এখান থেকে যাই?জোছনাটা দেখে নেই”
হুমায়ূন আহমেদ কিছু বললেন না। শুধু মাথা নাড়লেন।তার চোখের কোণায় পানি

হিমু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে জোছনার দিকে।তারা যে জগতে যাচ্ছে সেখানে কি এমন সুন্দর জোছনা থাকবে?থাকবে কি বৃষ্টি,আকাশে মেঘের খেলা। নদীতে মাতাল হাওয়া।

হিমু চোখ নামিয়ে নিল। মায়া লাগছে এই অপরূপ জোছনাতে। যাওয়ার সময় মায়া লাগানোর কোন মানে হয় না।

তারা তিনজন আবার হাঁটা শুরু করলেন…

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

29 − 28 =