শরৎচন্দ্র ও সমকালিন হিন্দু-মুসলমান ধর্মানুভূতি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি লিট উপাধি প্রদান করেছিলো ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে। অথচ নিজে বিশ্ববিদ্যালয় দূরে থাক, কোন মতে স্কুলের গন্ডি পেরিয়েছিলেন মাত্র। সেই তাকেই যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডি লিট প্রদান করলো, সাহিত্য কাগজ ‘শনিবারের চিঠি’ পরিহাস করতে ভুলেনি। ‘অশিক্ষিত’ ভেবে তার লেখাকে যারা খেলো ভাবত তাদের মুখে চুনকালি পড়েছে’-শনিবারের চিঠি তার নিজস্ব ঢংয়ে এভাবেই প্রকাশ করেছিল। ধর্ম, সমাজ, বিশ্বাস, ঐতিহ্য, লোকাচারকে চাবুক মেরে মেরে রক্তাক্ত করে ফেলা এই মানুষটি তার সময়ে ছিলেন প্রথাবিরোধী। তার লেখা পড়ে কুলিন বংশ গৌরব আঘাত প্রাপ্ত হতো। সমাজ ‘রসাতলে’ চলে যেতো। অন্তপুরের নারীরা তার লেখা পড়লে বেশ্যা হয়ে যাবে। তার লেখায় হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা বিশ্বাস আর অনুভূতি প্রবলভাবে কেঁপে উঠেছিল বলে অশিক্ষিত ধার্মীকই শুধু নয়, সমসাময়িক লেখক সুশীল সমাজও ‘ঐতিহ্যে আর ভারতীয় সংস্কৃতিকে’ আঘাত দেয়ার জন্য এই ‘অশিক্ষিত’ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রীহীন মানুষটির প্রতি ক্ষুব্ধ ছিলেন। হ্যাঁ, তিনি আর কেউ নন, বাংলা সাহিত্যের ‘চরিত্রহীন’ শ্রী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

বাঙালী মুসলমানদের প্রথম শিক্ষিত পূর্বপুরুষ হিসেবে কাজি মোতাহার হোসেন চৌধুরীদের প্রজন্মকে ধরার যথেষ্ঠ তথ্য প্রমাণ আছে। ড. আহমদ শরীফের মতে, ১৮৯০-এর পরে যেসব বাঙালী নিম্নবিত্ত মুসলমানের জন্ম তাদেরই কেউ কেউ শিক্ষিত হয়েছিল। আমাদের সেই প্রথম শিক্ষিত পূর্বপুরুষদের মননে পাশ্চত্য লেখাপড়া শেখার কারণে নিজেদের আত্মপরিচয় সম্পর্কে একটা সচেতনতা গড়ে উঠেছিল। তারাই তাই ‘শ্রীকান্তে’ ‘বাঙালী ও মুসলমান ছেলেদের মধ্যে ফুটবলা খেলা’ লাইনটি পড়ে ক্ষুব্ধ হয়ে শরৎচন্দ্রকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি আমাদের বাঙালী ভাবেন না? শরৎ উত্তর করেছিলেন, মুসলমান বলতে তিনি হিন্দুস্তানী অবাঙালী মুসলমানদের বুঝিয়েছিলেন…। ১৮৯০ থেকে ধরে ১৯৩৬ পর্যন্ত ধরলে বাঙালী মুসলমানদের শিক্ষিত শ্রেণীর প্রগতিশীলতার একটা প্রচেষ্টা বলে মনে হয়। ১৯৩৬ সালে ঢাকায় এসে শরৎচন্দ্র সুধি সমাবেশে ঘোষণা করেছিলেন তিনি মুসলমান সমাজ নিয়ে উপন্যাস লিখবেন। সেদিন হলভরা দর্শকদের আসন থেকে মিজানুর রহমান নামের একজন লেখক শরৎচন্দ্রকে (পরে প্রবন্ধ আকারে লিখে) আহবান জানিয়েছিলেন, আপনি হিন্দু সমাজকে চাবুক মেরে যেভাবে কশাঘাত করছেন প্রতিকারের আশায় একইভাবে মুসলিম সমাজকে কশাঘাত করুন…। শরৎচন্দ্র কথা দিয়েছিলেন তিনি মুসলিম সমাজকে নিয়ে লিখবেন। কাজি মোতাহার হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে দাবা খেলার সময়ও একই মত দিয়েছিলেন। কিন্তু ‘মহেশ’ ছাড়া শরতের কলমে মুসলিম সমাজ বিষয়ে আর কোন লেখা নেই। কেন থেমে গেলো? মহেশে মুসলিম সমাজের কোন ত্রুটি নিয়ে কথা নেই। বরং বর্ণহিন্দু জমিদার ও ব্রাহ্মণ সমাজের হাতে নিপীড়িত হওয়ার করুণ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। শরৎ জীবিত থাকাকালে এই গল্প পাঠ্য হয়েছিল স্কুলে। কিন্তু মহেশ গল্পে এক মুসলমানের হাতে গোমাতাকে হত্যার মত জঘন্ন পাপাচারের কাহিনী থাকাতে হিন্দু সমাজের মানহানী হযেছে এই যুক্তিতে ‘সনাতন হিন্দু সমাজের’ দাবীর মুখে গল্পটি পরে পাঠ্য পুস্তক থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। যে চাবুক শরৎ হিন্দু সমাজের উপর প্রয়োগ করেছিলেন, সেই একই চাবুক যদি মুসলিম সমাজের দিকে উত্থিত করতেন তাহলে আজকের সেই মিজানুর রহমানদের উত্তর পুরুষরাই কি শরচৎচন্দ্রকে মুসলিম বিদ্বেষ কিংবা ইসলাম বিদ্বেষী বলতেন না? ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে দেয়া ডি লিট উপাধির প্রতিবাদ জানিয়েছিল মুসলিম ছাত্ররা। অভিযোগ শরৎ মুসলমানদের হেয় করেছিলেন। তাকে সংবর্ধনা জানাতে অস্বীকৃতি জানায় মুসলিম ছাত্রদের পরিচালিত সংগঠনগুলো। আসছি সেকথায় পরে।

বঙ্কিমচন্দ্রকে “মুসলিম বিদ্বেষী” হিসেবে আমাদের দেশে উপস্থাপন করা হয়। এর কারণ সম্ভবত ‘আনন্দ মঠ’ লেখা। মুসলিম শাসনামলকে সমালোচনা করাকে বাঙালী মুসলমান তাদের ‘পূর্বপুরুষকে’ সমালোচনা হিসেবেই দেখে। তুরষ্ক বা মধ্য এশিয়া থেকে আসা হানাদার মুসলিম শাসকদের এখানকার কনভার্ট মুসলমান নিজেদের পূর্বপুরুষ বলে ধরে নিয়েছে। নিজেদের তারা রাজার জাত বলে মনে করত। রিকশা চালানো উর্দু কি বাংলা ভাষি মুসলমান সে-ও মনে করত বৃটিশ আমাদের রাজ্য কেড়ে নিয়ে পথের ভিক্ষিরি বানিয়েছে! সেই আত্মপ্রসাদ পাঠশালায় পড়া রহিম শেখ করিম শেখের অন্তরেও বহমান ছিল। তাই শরৎচন্দ্রের সামনে তারা ‘শ্যলক বঙ্কিমের রচনাবলী’ নামের একটা বই রাখার সাহস করেছিল। শরৎচন্দ্র তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, অপমান করতে এসেছো? কাজি মোতাহার হোসেন চৌধুরী মুসলিম সমাজ নিয়ে লেখার জন্য বার বার তাগাদা দিচ্ছেলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘আপনারা কি আমাদের একঘরে করে রাখবেন?’ কিন্তু কোলকাতায় তখন কয়েকটি ঘটনা ঘটে গেছে। বাংলা সাহিত্যে সূর্যের মত দীপ্তিমান যিনি, সেই রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং তখন মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিয়ে বসে আছেন! তার কবিতাকে সেন্সর করতে দাবী করেছে মুসলমান সমাজ। ‘কথা ও কাহিনী’ কাব্যগ্রন্থের মানি কবিতায় ‘আরঙজেব ভারত যবে/ করিতেছিল খান খান’ লাইনটি এদেশের ধর্মান্তরিত মুসলিমরা তাদের “পূর্বপুরুষদের” অপমানিত করা হয়েছে বলে দাবী করে রবীন্দ্রনাথকে ক্ষমা চাইতে বলেছিল। বলেছিল, ঐ লাইন তুলে নিতে হবে…। একই সময় কোলকাতায় বিখ্যাত বইয়ের দোকান ‘সেন ব্রাদার্স’-এর মালিক ভোলানাথ সেনকে তার দুইজন কর্মচারী সমেত ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে দুইজন মুসলিম যুবক নৃশংসভাব খুন করে। ‘প্রাচীন কাহিনী’ নামে তৃতীয় ও চর্তুথ শ্রেণীর পাঠ্য হিসেবে একটি বই ভোলানাথ তার প্রকাশনি থেকে প্রকাশ করেছিলেন। বইটির লেখক স্বয়ং ভোলানাথ সেন। এটি সরকার পাঠ্য পুস্তক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। সেই বইতে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হযরত মুহাম্মদের নামে যে চ্যাপ্টার ছিল সেখানে ভাল ভাল কথা বলে তাকে সম্মান করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে একটা ছবি ছাপা হয়েছিল যেখানে মসজিদে মুহাম্মদ দাঁড়িয়ে আছেন আর তার সামনে জিব্রাইল উপস্থিত। এই ছবিটি বৃটিশ মিউজিয়াম থেকে অনুমতি নিয়ে বইতে প্রকাশ করা হয়েছিল। অর্থ্যাৎ, এই ছবিটি বৃটিশ মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে। কিন্তু ঢাকার একজন মুসলমান জমিদারের ধর্মানুভূতিতে প্রচন্ড আঘাত লাগে এই ছবি দেখে। সে কোলকাতায় এসে দুজন পাঞ্জাবী মুসলমান যু্বককে উদ্বুদ্ধ করে এর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য। জমিদারের কথামত দুই যুবক ভোলানাথকে খুন করে যায় তার দুই কর্মচারী সমেত। বিপ্লবী নগেন্দ্রনাথ দত্ত এই সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করেছিলেন, ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে আমরা যখন স্বদেশী করে আলীপুরে প্রেসিপেন্সী জেলে ছিলাম তখন ঐ যুবক দুটিও এই জেলে ছিল। দেখতাম তাদের দেখতে মুসলমান নারী-পুরুষ এসে ভীড় করত। তারা তাদের ভক্তিশ্রদ্ধা জানিযে যেতো। পরে মুসলিম সমাজের কাছে তারা শহীদের মর্যাদা পেযেছিল। ইসলামের নবীকে নিয়ে সুখ্যাতি করেও খুন হতে হযেছিল লেখক ও প্রকাশক ভোলানাথ সেনকে। শরৎ শ্রীকান্তে গহর নামের একটা চরিত্র তৈরি করে মুসলিমদের কাছ থেকে মিশ্র অনুভূতির শিকার হযেছিলেন। মহেশে গফুর আর আমিনাকে হিন্দু বর্ণবাদীদের হাতে নিগৃহিত হওযার চিত্র এঁকেছিলেন। কিন্তু যখন গফুর আর আমিনাকে নিজ সমাজ ও ধর্মের হাতে নিপীড়িত হওয়ার চিত্র আঁকবেন তখন তার কি প্রতিক্রিয়া হবে সেটা শরৎ বুঝতে পেরেছিলেন। মুখল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মন্দির ভাঙ্গার ইতিহাস বর্ণনা করাকে যেখানে ‘মুসলিম বিদ্বেষ’ হিসেবে বিবেচিত হয় সেখানে শরৎ মসুলিম সমাজকে চাবুক মেরে কশাঘাত করবেন! শরৎচন্দ্রের হাতে ‘বঙ্কিম দুহিতা’ নামের একটি বই এসেছিল যেটির লেখক মুসলিম সমাজেরই কেউ। নোংরা নোংরা কথা সেই বইতে লেখা ছিল। অথচ মুসলিম রাজশক্তির তীব্র (কখনো কখনো একপেশে) সমালোচনা করলেও ন্যায্য কথা বলতে তো বঙ্কিম ছাড়েননি। তিনিই লিখেছিলেন, ‘হিন্দু হইলেই ভাল হয় না-মুসলমান হইলেই মন্দ হয় না, অথবা হিন্দু হইলেই মন্দ হয় না-মুসলমান হইলেই ভাল হয় না। ভাল-মন্দ উভয়ের মধ্যেই তুল্যরূপেই আছে। বরং উহাও স্বীকার করিতে হয় যে, যখন মুসলমান এত শতাব্দী ভারতবর্ষের প্রভু ছিল, তখন রাজকীয় গুণে মুসলমান সমসাময়িক হিন্দুদিগের অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ছিল’। শরৎচন্দ্রকে ধোপানাপিত বন্ধ করে দিয়েছিল সনাতন হিন্দু সমাজ। শরৎ থোড়াই কেয়ার করেছেন তার। কিন্তু মুসলিম সমাজের প্রকৃত চিত্র আঁকতে গেলে শরৎচন্দ্রকে ভোলানাথ সেনের ভাগ্য বরণ করতে হবে- এটি বিলক্ষণ সে-যুগেও শরৎ অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই বোধহয় তিনি মত বদলে ছিলেন। কিন্তু এই মত বদল যে নিজের জীবনের ভয়ে তা মনে হয়নি, বরং তিনি যে ভয়টি পেয়েছিলেন, হিন্দুর কলমে মুসলমান সমাজের চিত্র আঁকতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে। সে-চিত্র আঁকতে হবে মোতাহার হোসেনদের মধ্য থেকেই কাউকে। এ কথাগুলোই শরৎ জাহানারা চৌধুরী সম্পাদিত ‘বর্ষবাণী’ (১৩৪২ বঙ্গাব্দ) সংখ্যায় লিখেছেন, ‘…প্রশংসার সঙ্গে তিরস্কার, ভাল কথার সঙ্গে মন্দ কথাও গল্প উপন্যাসের অপরিহার্য অঙ্গ। কিন্তু এ তো তোমরা না করবে বিচার, না করবে ক্ষমা। হয়ত এমন দন্ডের ব্যবস্থা করবে যা ভাবলেই গা শিউরে উঠে!

/250px-Rabindranath_Tagore_in_1909.jpg” width=”400″ />

রবীন্দ্রনাথকে মুসলিম বিরোধী, বাংলাদেশ বিরোধী প্রমাণ করতে যতরকম আমড়াগাছি প্রয়োজন তার সবটাই কাজি মোতাহার হোসেন চৌধুরীদের উত্তর পুরুষরা এখন করে চলেছেন। শরৎচন্দ্রের জন্মের দশ-পনেরো বছর পর অথ্যার্ৎ শরৎ যখন নেহাত বালক তখন ‘গোজীবন’ লিখে মীর মোশাররফ হোসেনকে মুসলমানদের ধর্মানুভূতিতে আঘাত লাগার দরুণ জেলে যেতে হয়েছিল। মহামারিতে কৃষিকাজের অন্যতম মাধ্যম গরুর সংখ্যা হঠাৎ হ্রাস পাওয়ায় মুসলিমদের গরু জবাই না করতে আহবান জানানোই হয়েছিল কাল। কিন্তু মীরের সাহিত্য ইসলামী মিথ ও গৌরব কেন্দ্রিক ছিল। তার ‘বিষাদ সিদ্ধু’ এক সময় মুসলিমদের কাছে ধর্মীয় বই হিসেবে বিবেচিত হতো। অর্থ্যাৎ মীর মোশারফ হোসেন মুসলিম সমাজের জন্য শরৎচন্দ্র হতে পারেননি। নিজ সম্প্রদাযের আত্মসমালোচনা তিনি করেছিলেন ভিন্ন ভাষায়। তার আত্মজীবনী ‘আমার জীবন’- এ তিনি লিখেন, “বঙ্গে মুসলমান কী রুপ শোচনীয় দশা ছিল তা ভাবিলে অঙ্গ শিহরিয়া ওঠে। আমি সেই দুর্ঘটনা যাহা স্বচক্ষে দেখিয়াছি তাহাই জীবনীতে সন্নিবেশিত করিব। জাতীয় বিদ্যা শিক্ষায় শৈথিল্য, জাতীয় ভাব রক্ষায় শৈথিল্য, শাসন, বিচার, রাজ্য বিভাগ, সমগ্র বিভাগেই মোসলমান শূন্য। বিজাতীয় ভাষার কল্যাণে রাজপুরুষদিগের সহিত মাখামাখি ভাব। কাজেই নির্জীব নিরক্ষর বঙ্গীয় মুসলমান কার্যে তাহাদেরই আদর্শ গ্রহণ করিয়াছিলেন। অনেক বড় বড় জমিদার ধনী মুসলমান জোড়া জোড়া প্রতিমা তুলিয়া আশ্বিন মাসে প্রতিমা কল্যাণে হাজার হাজার বাহবা গ্রহণ করিয়াছিলেন।’… আরেক জায়গায় হিন্দু বিদ্বেষ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে মোশাররফের কন্ঠে, “আমি সেই সময়ের কথা বলিতেছি। পঠন পরিচ্ছেদ হিন্দুয়ানী, চালচলন হিন্দুয়ানী, রাগ ক্রোধ হিন্দুয়ানী, কান্নাকাটি হিন্দুয়ানী, মুসলমানদের নামও হিন্দুয়ানী। যথা- সামসুদ্দিন – সতীশ, নাজমুল হক-নাজু, বোরহান-বীরু, লতিফ-লতু, মশাররফ-মশা, দায়েম-ডাশ, মেহেদি-মাছি, ফজলুল করিম-ফড়িং এই প্রকার নামে ডাকা হয়’।

বিষাদ সিদ্ধু মোশাররফ কথিত সামসুদ্দিন আর নাজমুলদের আত্মপরিচয়ের শিকড়কে কারবালাতেই প্রথিত করেছিল যেখানে বঙ্গে শরৎ ‘বামুনের মেয়ে’ লিখে সনাতন হিন্দুদের বর্ণবাদের মূলে কুঠারাঘাত করে স্তব্ধ করে দিচ্ছেন। কি রূপ কুখ্যাতি পেয়েছিলেন এইসব লিখে শরৎচন্দ্র তার একটা নজির বাণী দেবীর বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে গিয়ে বুঝা গিয়েছিল। বাণী দেবী সে সময়ের একজন লেখিকা ছিলেন। তার বাড়ির নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে অবশ্য শরৎচন্দ্রকে শেষতক যেতে হয়নি। তার আগেই বাণী দেবী শরৎচন্দ্রের কাছে গিয়ে তার অপারগতার কথা জানিয়ে আসেন। বাণী দেবীর শশুড়বাড়িতে যখন জানতে পারল, শরৎ চাটুজ্যে নামের এক ‘চরিত্রহীন’ লোককে বাড়িতে ডেকে আনা হচ্ছে নিমন্ত্রণ খাওয়াতে তখন বাড়ির সবাই বেঁকে বসে। না, এরকম পাপিষ্ঠ লোককে কিছুতে বাড়িতে ডেকে আনা যাবে না…।

/220px-Mir_mosharraf_hossain.jpg” width=”400″ />

এসব আসলে একজন লেখকের শেরপা। যদি সমকালের সঙ্গে না-ই বিরোধ হলো তো আপনি কিসের লেখক! গলায় পদক ঝুলিয়ে, সমাজের প্রত্যেকটা অনুভূতির মূর্তিকে ঠুরে ঠুরে নমস্কার করে দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকার ধান্দা যারা করে তারা চিরকাল শরৎ চাটুজ্যেদের ঘোর সমালোচক হন। আমাদের সময়ে যেমন দেখি হুমায়ূন আজাদ, তাসলিমা নাসরিনদেরকে তাদের সমকালিন লেখকদের বিষেদাগারের লক্ষ্যবস্তু হন। অভিজিৎ রায়ের বইগুলো কখনো রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক পুরষ্কার পাবে না এটিই পদক প্রাপ্ত বইগুলোর লেখকদের তার প্রতি শত্রু বানাবার জন্য যথেষ্ঠ। তারা জানেন, জলের উপরই দাগ কাটেন তারা। এই স্বঅর্জিত অক্ষমতা তাদেরকে প্রথাবিরোধীদের বিপরীত মেরুতে নিয়ে গিয়ে ফেলে। কখনো কখনো তাদের বিরুদ্ধে নিজের অজান্তে মুখর হয়ে উঠেন। সব কালে, সব যুগেই তাই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মত লেখকরা তাদের সহলেখকদের হাতেই সবচেযে বেশি অরক্ষিত ছিলেন।

শরৎচন্দ্র মনে করতেন লেখকদের কোন জাত নেই ধর্ম নেই। কাজি মোতাহার হোসেন চৌধুরীকে তিনি বলেছিলেন, তারা (লেখকরা) সকলেই মূলে এক ও অভিন্ন। মুসলমান সমাজকে এই অবাঞ্চিত ব্যবধান ভু্লে যেতে হবে। এই কাজটি মুসলিম সমাজকেই করতে হবে। অর্থ্যাৎ বাঙালী মুসলমানকে তার আত্মপরিচয়কে মেনে নিতে হবে। তার শিকড়কে স্বীকার করে নিতে হবে। শরৎচন্দ্র বিশ্বাস করতেন এটিই সমাধানের পথ। হিন্দু সমাজ ও ধর্মকে গল্পে উপন্যাসে শরৎচন্দ্র এমনভাবে কষাঘাত করতে লাগলেন যা তার পাঠকদের উপর একটি প্রভাব ফেলতে বাধ্য করেছিল। তার কাহিনী নিযে সিনেমা তৈরি হয়েছিল। কুলিন ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজের উপর সেই ছবিচিত্রগুলো ছিল সামাজিক আন্দোলনের মত। মানিক, তারাশঙ্কর, বিভূতিদের মত শ্রেষ্ঠ কথা সাহিত্যিকদের সঙ্গে শরতের বিচার কেউ করবেন না। বিদগ্ধ সাহিত্য সমালোচকরা শরতকে কখনই তাদের কাতারে রাখবেন না। কিন্তু শরৎ অনন্য এ কারণে যে তিনি তার সমকালকে চাবুক মেরে বুঝিয়ে ছিলেন, এ অন্যায়, এ ঘোরতর অন্যায়। সমাজ তাকে মোক্ষম জবাব দিয়েছিল, একঘরে করে রেখেছিল। নিম্নবর্ণের নারীকে বিয়ে করেছিলেন। কিংবা বিয়ে করেননি, এই অজুহাতে তাকে একঘরে করে রাখা হয়। সেকথা শরৎচন্দ্র নিজেই তার প্রকাশক হরিদাস চট্টপাধ্যায়কে এক চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন। ভাগ্নীর বিয়েতে চারশো টাকা লাগবে। পুরো টাকাটা শরৎচন্দ্রকেই দিতে হবে। যদিও একঘরে হওয়ার কারণে সে বিয়েতে শরতের উপস্থিত থাকাও চলবে না। স্ত্রী হিরণ্মীয় দেবী ব্রাহ্মণ কন্যা নন। তার পরিচয়ও রহস্যে ঘেরা। জোর গুজব ইনিই শ্রীকান্তের রাজলক্ষ্মী! সমাজকে একদম রসাতলে ফেলার জন্য তিনি ‘চরিত্রহীন’ লিখেছিলেন বলে সেযুগের যুব সমাজ বাড়ি এসে চরিত্রহীনের এক কপি পুড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল। আরো বলে গিয়েছিল, এসব লিখলে এ পাড়ায় আপনার থাকা চলবে না। এটা ভদ্রপাড়া। লোকে বউ-ঝি নিয়ে ঘর করে… ইত্যাদি। শরৎচন্দ্রের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ ছিল তিনি সনাতন হিন্দু সমাজকে নিন্দা করেন, হাজার হাজার বছর ধরে চরে আসা প্রথাকে হেয় করতে কটুক্তি করেন। ছোটজাতের পাতে খান। শরৎচন্দ্র তার ভবঘুরে জীবনে হাড়ি-বাগদি শ্রেণীর বাড়িতে খেয়েছেন। তাদের সঙ্গে মিশিছেন। নিজের লেখায় এইসব সমাজচুত্যা ও পতিতাদের প্রতি দরদ দেখিয়ে ভদ্র সমাজের বাঁধন তিনি খুলে দিতে চান বলে ধর্মবাদী ভদ্র সমাজ তার উপর ফতোয়া জারি করে একঘরে করে দেন। যতীন্দ্রমোহন সিংহ তার ‘সাহিত্যের স্বাস্থরক্ষা’ বইতে সমাজকে রসাতলে নিয়ে যাবার অভিযোগ তুলে শরতচন্দ্রকে আক্রমন করেন। শুধু তাই নয়, সভা ডেকে শরতচন্দ্রকে বয়কটের আহবান জানানো শুরু হয়েছিল। শরৎচন্দ্র সেকথা নিজেই বলেছেন এভাবে, ‘আমার মনে পড়ে বয়স যখন অল্প ছিল, এ ব্রতে যখন নতুন ব্রতি, তখন আমন্ত্রণ পেয়েও কত সাহিত্য সভায় দ্বিধায় সংকোচে যেতে পারিনি।…আমার লেখায় দেশ দুনীর্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে এল, এবং সনাতন হিন্দু সমাজ জাহান্নামে গেলো বলে…’। যতীন্দ্রমোহন সিংহ অভিযোগ করেছিলেন ‘পল্লীসমাজ’ পাঠ করলে সনাতন হিন্দু সমাজের কোন বিধবাই আর থাকবে না। এ তো সমাজের ঘোর অধঃপতন!

শরৎচন্দ্র সচেতনভাবেই এই সমাজকে ভাঙ্গতে চেয়েছিলেন। লেখকদের সমকালের প্রতি মোহ কতখানি বিপদজনক সেটি বুঝাতে গিয়ে মুন্সিগঞ্জে অনুষ্ঠিত সাহিত্য সভায় শরৎচন্দ্র বলেছিলেন, বিদ্যাসাগর যখন বিধবা বিবাহ নিয়ে আন্দোলন করছেন তখন বঙ্কিমচন্দ্র ও তার সমসাময়িক সাহিত্যিকরা যদি তাকে সমর্থন করতেন তাহলে হিন্দু সমাজের চেহারা আজকে অন্যরকম হতো…। ব্রাহ্মণদের জাতাভিমানকে ধূলায় মিশিয়ে দিয়ে তিনি যখন ‘বামুনের মেয়ে’ লিখলেন তখন তিনি জনপ্রিয়তায় কিংবদন্তিতম। ব্রাহ্মণদেরকে নিচুজাতের হিন্দুরা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণেই মান্য করে থাকে। তাই এরকম একটা বিষয় নিয়ে তিনি লিখতে গেলেন কাদের খুশি করার জন্য? কিংবা ‘গৃহদাহ’ লিখে শিক্ষিত ব্রাহ্মসমাজকে চটাতে গেলেন কেন? প্রধাবিরোধী শরৎ কারুর মুখ চেযে লিখতেন না। জনপ্রিয়তার অসুখেও তিনি আক্রান্ত হননি। যে মুসলমান সমাজ নিয়ে লিখতে তিনি বদ্ধপরিকর হয়েছিলেন তারাও ‘মহেশ’ পড়ে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। শরৎচন্দ্র যখন সবে লেখালেখি শুরু করেছিলেন, একদিন ছেলেবেলার মাস্টার মশাই ডেকে বলেছিলেন, নিজে যা না দেখেছো, যা বিশ্বাস করো না, তা কখনো লিখো না। জবাবে শরৎ জানিয়েছিলেন, তাই হবে। শরৎ সাহিত্য পড়লেই বুঝা যায় শরৎ তার গোটা জীবন ভর সেকথাই অনুসরণ করেছিলেন। ৫৭তম জন্মদিনের ভাষণে সেকথার পুনরাবৃত্তি করতে তিনি ভুলেন নাই। ভাষাহীনের মুখে ভাষা দেয়ার কথাই তিনি বলেছিলেন। তাই যা সত্য বলে নিজের কাছে মনে হযেছে তিনি তাই লিখেছেন। তাতে কে অসন্তুষ্ঠ হবে সে ভাবনা তার ছিল না। এ কারণেই ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডিগ্রী প্রদান করলে এর বিরোধীতা করেছিল মুসলমান ছাত্ররা। আনন্দবাজার পত্রিকা লিখেছিল, স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সভায় মুসলমান ছাত্ররা বলেছিল, যদি বিশ্ববিদ্যালযের এই পদবী দেয়ার বিষয়ে মুসলমান ছাত্রদের কোন হাত থাকত তাহলে তারা কিছুতে শরৎ বাবুকে এই পদবী পেতে দিতেন না। সাহিত্যিক কাজি আবদুল ওদুদ এ বিষয়ে বলেন, ১৯২৬ সালে শরৎচন্দ্র লিখিত ‘বর্তমান হিন্দু-মুসলমান সমস্যা’ প্রবন্ধটির কারণে মুসলমান ছাত্ররা তার বিরোধীতা করেছিলো। কি লিখেছিল শরৎ সে প্রবন্ধে? তিনি লিখেছিলেন, ‘খিলাফৎ আন্দোলন হিন্দুর পক্ষে শুধু অর্থহীন নয় অসত্য। কোন মিথ্যাকে অবলম্বণ করিয়া জয়ী হওযা যায় না। এবং যে মিথ্যার জগদ্দল পাথর গলায় বাঁধিয়া এত বড় অসহযোগ-আন্দোলন শেষ পর্যন্ত রসাতলে গেল, সে এই খিলাফৎ। স্বরাজ চাই, বিদেশী শাসন-পাশ হইতে মুক্তি চাই, ভারতবাসীর এই দাবীর বিরুদ্ধে ইংরাজ হয়ত একটা যুক্তি খাড়া করিতে পারে, কিন্তু বিশ্বের দরবারে তাহা টিকে না। পাই বা না পাই, এ জন্মগত অধিকারের জন্য লড়াই করায় পুণ্য আছে, প্রাণপাত হইলে অন্তে স্বর্গবাস হয়। এই সত্যকে অস্বীকার করিতে পারে জগতে এমন কেহ নাই। কিন্তু খিলাফৎ চাই- এ কোন কথা? যে-দেশের সহিত ভারতের সংস্রব নাই, যে-দেশের মানুষ কি খায়, কি পরে, কি রকম তাদের চেহারা, কিছুই জানি না, সেই দেশ পূর্বে তূর্কী শাসনাধীন ছিল, এখন যদিচ তূর্কী লড়াইয়ে হারিয়াছে, তথাপি সুলতানকে তাহা ফিরাইয়া দেওয়া হউক, কারণ পরাধীন ভারতীয় মুসলমান সমাজ আবদার ধরিয়াছে। এ কোন সঙ্গত প্রার্থনা? আসলে ইহাও একটা প্যাক্ট। ঘুষের ব্যাপার। যেহেতু আমরা স্বরাজ চাই, এবং তোমরা চাও খিলাফৎ- অতএব এস একত্র হইয়া আমরা খিলাফতের জন্য মাথা খুঁড়ি এবং তোমরা স্বরাজের জন্য তাল ঠুকিয়া অভিনয় শুরু কর। ….একদিন মুসলমান লুন্ঠনের জন্যই ভারতে প্রবেশ করিয়াছিল রাজ্য প্রতিষ্ঠার করিবার জন্য আসে নাই। সেদিন কেবল লুঠ করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই, মন্দির ধ্বংস করিয়াছে, প্রতিমা চূর্ণ করিয়াছে, নারীর সতীত্ব হানি করিয়াছে, বস্তুতঃ অপরের ধর্ম ও মানুষ্যত্বের উপরে যতখানি আঘাত ও অপমান করা যায় কোথাও কোন সঙ্কোচ মানে নাই…’। পূর্ব বঙ্গের মুসলমান সমাজ শরতের এই সমালোচনাকে তাদের ‘পূর্বপুরুষদের’ হেয় করা বলে গ্রহণ করেছিল। ধর্মান্তরিত বাঙালী মুসলমান তূর্কী, আফগান শাসকদের নিজেদের পূর্বপুরুষ মান্য করে ইতিহাসের এই সত্য ভাষণকে শরৎচন্দ্রের ‘মুসলিম বিদ্বেষ’ হিসেবেই দেখেছিল। অথচ মিজানুর রহমান কিংবা কাজি মোতাহার হোসেন চৌধুরী মুসলিম সমাজকে চাবুক মেরে জাগাতে বলেছিলেন! ‘বর্তমান হিন্দু-মুসলমান সমস্যা’ প্রবন্ধে শরৎচন্দ্র যে আশংকার কথা তুলে ধরেছিলেন ১৯৪৭ সালের ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হয়ে তার আশংকাকে সত্য বলে প্রমাণিত করেছে। ইংরেজ রাজশক্তিকে তাড়াতে ধর্মকে সামনে এনে, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী পরিচয় যে সর্বনাশ ঘটাতে পারে ভারত পাকিস্তানের নামের দুটো আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম তারই প্রমাণ।

১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে লেখা ‘বর্তমান হিন্দু-মুসলমান’ প্রবন্ধে শরৎচন্দ্র কড়া কড়া কথা বলেছিলেন মুসলিম সমাজের প্রতি, সেখান থেকে আত্মসমালোচনা নয় বরং শরৎ বিরোধীতাই জেগে উঠেছিল। অনেক ভাষণে, চিঠিতে, লেখায় বাঙালী মুসলমানকে তার শেকড়ের দিকে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন শরৎচন্দ্র। কিন্তু কাজি আবদুল ওদুদদের উত্তর পুরুষ আবদুল মান্নান সৈয়দরা সাহিত্যিকের বর্ণ ও ধর্ম পরিচযের বাইরে যেতে রাজি নন। ‘বাঙালী মুসলমান সাহিত্যিক’ নামের সাম্প্রদায়িক পরিচয় বলতে গেলে পূর্ববঙ্গীয় তথা স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। কাজে বলাই যায় শরৎ যেমন বলেছিলেন, লেখকের কোন জাত নেই, ধর্ম নেই, তারা সকলেই মূলে এক ও অভিন্ন, আর এই চেতনার মাধ্যমেই লেখকরাই সাহিত্যির মাধ্যেমে অসাম্প্রদায়িক বাঙালী জাতির প্রতিষ্ঠা করবেন- তার কোন চেষ্টা সচেতনভাবেই এখানে করা হয়নি।

আমাদের প্রথাবিরোধীতার ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়। পূর্ব বঙ্গে মীর মোশাররফ হোসেনের ‘গোজীবন’ রচনাকে বিবেচনায় ধরলেও আমার এখানেও দেখতে পাই আত্মপরিচয়ের অন্ধ অনুসরণ। বেগম রোকেয়ার সাহসী রচনা শুধুমাত্র শিকড়ের বিচ্ছিন্নতার দরুণ আজ ভিন্ন অর্থে প্রচারিত হয়। শরৎচন্দ্র বাঙালী মুসলমানকে তার শিকড়ে পৌঁছাতে বলেছিলেন। আরজ আলী মাতুব্বরের ‘সত্যের সন্ধানে’ তো আসলে শিকড়ের সন্ধান। সে ধারাবাহিকতায় হুমায়ূন আজাদ হযে অভিজিৎ রায়…। বাংলা সাহিত্যির ইতিহাস ধরলে শরৎচন্দ্রই প্রথম ও প্রভাবশালী প্রধাবিরোধী। সমাজপতিদের হাতে যিনি শিকার হয়েছিলেন ফতোয়ার। মৃত্যুর ৭৮ বছর পরও তার রচনা আমাদের প্রথা ভাঙ্গতে অনুপ্রাণিত করে। তার গোটা সাহিত্য জীবন নিয়ে তুমুল সমালোচনা করা গেলেও সমাজ ও ধর্মকে তিনি যে রকম নির্মমভাবে আঘাত করেছিলেন তা কেবলই মানবিক প্রেম থেকে। দেশ ও দেশের মানুষের চরম দুঃখ-কষ্ট দেখে, তাদের জীবনের সমাজ ও ধর্মের প্রতিবন্ধকতা দেখে ক্ষুব্ধ শরৎ যে পাল্টা আঘাত তার লেখায় ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, আমাদের জন্য এ থেকে বড় শিক্ষাটা হচ্ছে, আমাদের মুক্তচিন্তার চর্চাটা যেন এমনই দেশ ও দেশের মানুষের কথা ভেবে হয়। মানুষের নিপীড়িত হওয়ায় যার মন কাঁদে, তারই সাজে দেশ ও জাতির বিশ্বাসের মূল্যে আঘাত করা। এ আঘাত কল্যাণের। মানুষকে ভালোবেসে…।

তথ্যসূত্র: ১) শরৎচন্দ্র, গোপালচন্দ্র রায় ২) শরৎ রচনা সমগ্র ৩) শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র ৪)বিশ্বাসবাদ-বিজ্ঞানবাদ-যুক্তিবাদ-মৌলবাদ, আহমদ শরীফ ৫) আমার জীবনী, মীর মোশাররফ হোসেন ৬) আনন্দ মঠ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় ৭) ইন্টারনেট

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৫ thoughts on “শরৎচন্দ্র ও সমকালিন হিন্দু-মুসলমান ধর্মানুভূতি

  1. চমৎকার বিশ্লেষণ। ধর্মানুভূতি
    চমৎকার বিশ্লেষণ। ধর্মানুভূতি নামক বিষয়টা যে হঠাৎ করে জন্ম নেয়া রোগ নয় এটা এতো ভালভাবে জানতাম না।

  2. আপনার এই অসাধারন লেখাটা
    আপনার এই অসাধারন লেখাটা ফেসবুকেই পড়েছিলাম । এই ব্লগে নতুন জয়েন করেছি আমি । আপনার এখানে এই প্রথম কমেন্ট করলাম ।

  3. কাজি মোতাহার হোসেন চৌধুরী
    কাজি মোতাহার হোসেন চৌধুরী সম্পর্কে আপনার মতামত কী?
    তিনি খুব উদারমনা ছিলেন। আপনার লেখা পড়ে তার উল্টোটাই মনে হচ্ছে!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 6