কার্যত স্বাধীন রাষ্ট্রঃ ফিলিস্তিন

.png” width=”400″ />

ফিলিস্তিন মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত। নভেম্বর ১৫, ১৯৮৮ যিশুসনে ‘ফিলিস্তিন জাতীয় কর্তৃপক্ষ’ পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে; আলজেরিয়া থেকে তাদের স্বাধীনতা ঘোষনা করে। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দুইটি অংশ- পশ্চিম তীর এবং গাজা। ২০১২ যিশুসনে রাষ্ট্রটি জাতিসংঘের ‘অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ এর মর্যাদা পায়।

সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ
আজকের ফিলিস্তিনের দূর্ভাগ্যের ইতিহাসের শুরু ১৯৪৮ যিশুসনে। এই সনে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে যায় ফিলিস্তিনের নাম, তার স্থানে জায়গা করে নেয় ইসরাইল। ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইহুদীরা আগে থেকে থাকলেও, তাদের জন্য আলাদা কোনো রাষ্ট্র ছিলোনা। প্রাগৈতিহাসিক যুগে ফিলিস্তিনে মানববসতির নিদর্শন পাওয়া যায়। প্রাচীন ফিনিশিয় সভ্যতার কয়েকটি শহর ফিলিস্তিন অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায়, এই অঞ্চল বেশ অগ্রসর ছিলো। প্রাচীন সুমেরিয়-আশিরিয়-ব্যাবলনীয় সভ্যতা, প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতা এবং প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার যাতায়াত ছিলো এই অঞ্চলে। প্রাচীন ইসরাইল এবং জুদেয়া রাজ্যের অবস্থানও ছিলো এই ভূখণ্ডে। ৫৮৬ যিশুপূর্বসনে ব্যাবিলনের সম্রাট নেবুখদ-নেজার এই ভূখণ্ড দখল করে নেন। আলেকজান্ডার এই ভূখণ্ডের উপর দিয়ে তার সেনাপতিকে মিসর পাঠান, ৩৩০ যিশুপূর্বসনে। ৬৩ যিশুপূর্বসনে এই অঞ্চল রোমান সাম্রাজ্যের দখলে চলে যায়। ৬৩৬ যিশুসনে তৎকালীন মুসলিম সাম্রাজ্য এই অঞ্চলটিকে দখল করে নেয়। শেষ পর্যন্ত, ১৫১৬ যিশুসনে এই ভূখণ্ডের দখল চলে যায়, অটোমান তুর্কীদের হাতে। তখন এটি বৃহত্তর সিরিয়া প্রদেশের অংশ ছিলো। আরব উপদ্বীপে মুসলিম ভিন্ন অন্য ধর্মের লোকেদের না থাকতে পারার আইন চালু হবার পর, সংখ্যালঘু ইহুদীরা সরে ফিলিস্তিন এবং খ্রিস্টিয়ানরা সরে লেবাননে চলে আসে। অর্থাৎ সাম্রাজ্যের সীমানাবর্তী প্রদেশগুলোতে চলে আসে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে অটোমান সাম্রাজ্য যুদ্ধে জড়িয়ে পরে। ইংল্যান্ড সরকার অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ‘বেলফোর ঘোষনা’ জারী করে ১৯১৭ যিশুসনে। এই ঘোষনায়- ফিলিস্তিন অঞ্চলে ‘ইহুদীদের জন্য একটি জাতীয় আবাস তৈরী’ বিষয়ক অঙ্গীকার ছিলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে, ১৯২২ যিশুসনে, অটোমান সাম্রাজ্যের আরব অঞ্চলগুলো ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের মধ্যে ভাগাভাগি হয়। সিরিয়া এবং লেবানন ফ্রান্সের ভাগে পরে। ফিলিস্তিন এবং জর্দান, ট্রান্স-জর্দান নামে ইংল্যান্ডের ভাগে পরে। ১৯২২ যিশুসনের আদমশুমারী অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের জনসংখ্যা ছিলো- ৭,৫৭,০০০ জন। এর মধ্যে ৭৮% মুসলিম, ১১% ইহুদী, ১০% খ্রিস্টিয়ান এবং ১% দ্রুজ, সামারাতিয় এবং অন্যান্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে প্রচুর ইহুদী, ইউরোপ থেকে ফিলিস্তিনে পাড়ি জমায়। বৃটিশরা এই ভূখণ্ডে ইহুদীদের জন্য একটি রাষ্ট্র তৈরীতে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলো, জার্মানীর ইহুদী গণহত্যা সেটি ত্বরান্বিত করে।

নভেম্বর ২৯, ১৯৪৭ যিশুসনে, জাতিসংঘের সাধারন অধিবেশন; ফিলিস্তিন অঞ্চলে, আরব এবং ইহুদীদের জন্য, দুইটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের সপক্ষে বিল পাশ করে। সেই হিসাবে, মে ১৪, ১৯৪৮ যিশুসনে ফিলিস্তিনের বুকে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়, শুরু হয় ফিলিস্তিনিদের জাতীয় বিপর্যয়। প্রায় ৭ লক্ষ ফিলিস্তিনি নিজ দেশে উদ্বাস্তু হয়ে পরে। শুরু হয় আরব-ইসরাইলের প্রথম যুদ্ধ। যুদ্ধে জর্দান ফিলিস্তিন অঞ্চলের পশ্চিম তীর দখল করে, মিসর দখল করে গাজা অঞ্চল। ১৯৬৭ যিশুসনের আরব-ইসরাইলের দ্বিতীয় যুদ্ধে, ইসরাইল পশ্চিম তীর ও গাজা দখল করে নেয়। গঠিত হয়, ফিলিস্তিনি মুক্তি সংস্থা (প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন- পিএলও)। ফিলিস্তিনি মুক্তিসংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে শুরু হয়, গণজাগরণ আন্দোলন- ইন্তিফাদা। প্রথম ইন্তিফাদার সময়কাল ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৩ যিশুসন। ১৯৯৩ যিশুসনে অসলোতে শান্তিচুক্তি হয়। ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি জাতীয় কর্তৃপক্ষকে স্বীকার করে নেয় ইসরাইল, ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে, ‘ফিলিস্তিন জাতীয় কর্তৃপক্ষ’ (প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল অথরিটি- পিএনএ)।

পশ্চিম তীর এবং গাজার ফিলিস্তিনি অধুষ্যিত এলাকাগুলো জাতীয় কর্তৃপক্ষের অধীন প্রশাসনের হাতে হস্তান্তর করলেও, এই অঞ্চলে ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বিরোধীতা করে ইসরাইল। নভেম্বর ১৫, ১৯৮৮ যিশুসনে ফিলিস্তিন জাতীয় কর্তৃপক্ষ, ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষনা করে। ইসরাইল এবং ফিলিস্তিনের দ্বন্দ্ব চলতেই থাকে। ফলস্বরূপ ২০০০ থেকে ২০০৫ যিশুসন পর্যন্ত চলে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা। সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১১ যিশুসনে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হিসেবে, জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদ প্রাপ্তির ব্যাপারে আবেদন করে। আমেরিকার ভেটো এবং প্রবল বিরোধীতা সত্ত্বেও, নভেম্বর ২৯, ২০১২ যিশুসনে, ফিলিস্তিন একটি আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে, জাতিসংঘের ‘অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ এর মর্যাদা পায়।

ভূগোল ও পরিবেশঃ
মাঝখানে ইসরাইল দ্বারা সম্পূর্ণ বিভক্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দুইটি আলাদা অংশ, পশ্চিম তীর ও গাজা। ফিলিস্তিনের আয়তন ৬,০৩১ বর্গ কিলোমিটার। এর মধ্যে পশ্চিম তীর ৫,৬৭১ বর্গ কিলোমিটার এবং গাজা ৩৬০ বর্গ কিলোমিটার। পশ্চিম তীর সম্পূর্ণ ভূমিবেষ্টিত। এর পূর্বে জর্দান, বাকী তিন দিকে ইসরাইল। পশ্চিম তীর নামকরন হয়েছে মূলত মৃত-সাগর থেকে। মৃত সাগরের পূর্ব পাশে জর্দানকে বলা হতো পূর্ব তীর আর পশ্চিম পাশের ফিলিস্তিনকে বলা হতো পশ্চিম তীর।

গাজা অংশের পশ্চিম পাশে ভূমধ্যসাগর। পশ্চিম দিকে মিসরের সাথে সামান্য ভূমি সংযোগ বাদ দিলে বাকীটুকু ইসরাইলের সাথে সীমানা। সমুদ্রের তীরে হওয়ায় গাজা, পশ্চিম তীরের চেয়ে বেশি উর্বর। এছাড়া, পুরো ফিলিস্তিন ভূখণ্ডই ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়ার মধ্যে পরেছে।

‘মৃত সাগর’হ্রদ হিসেবে ফিলিস্তিনের সবচেয়ে বড় জলাশয় এবং বৃহত্তম পানির উৎস। এছাড়া, ‘জর্দান নদী’ সবচেয়ে বড় নদী। ফিলিস্তিনের সর্বোচ্চ বিন্দু, নবী ইউনুস পর্বত, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,০৩০ মিটার বা ৩,৩৭৯ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। পশ্চিম তীরের ভূমি আধা-পাথুরে। প্রাকৃতিক সম্পদ বলতে পশ্চিম তীরে ম্যাগনেসিয়াম, ব্রোমিন ও পটাশ এবং গাজার সমুদ্র সীমানায় প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদ রয়েছে। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে বনভূমির পরিমান অতি সামান্য।

জনসংখ্যাঃ
নৃতাত্ত্বিকভাবে ফিলিস্তিনিরা আরব জাতিভুক্ত। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে মোট ৯১.২% ফিলিস্তিনি আরব এবং ৮.৮% ইহুদী রয়েছে। ইহুদীদের বাস মূলত পূর্ব জেরুজালেম এলাকায়। ভাষার হিসেবে, ফিলিস্তিনিরা আরবী ভাষা ব্যাবহার করে, ইহুদীরা ব্যাবহার করে হিব্রু ভাষা। তবে প্রচুর ফিলিস্তিনি কর্মক্ষেত্রে হিব্রু ভাষা ব্যাবহার করেন। এছাড়া ইংরেজীও বহুল প্রচলিত। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাপ্তরিক ভাষা আরবী।

ধর্মের বিচারে, ফিলিস্তিনিদের মধ্যে, ৮৬% মুসলিম, ৮.৮% ইহুদী, ৪.২% খ্রিস্টিয়ান এবং ১% দ্রুজ ও অন্যান্য।

ফিলিস্তিন কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান বুর‍্যো’র ২০১৪ যিশুসনের হিসাব মোতাবেক, রাষ্ট্রটির মোত জনসংখ্যা- ৪৫,৪৭,৪৩১ জন। এর মধ্যে, পশ্চিম তীরে- ২৭,৩১,০৫২ এবং গাজায়- ১৮,১৬,৩৭৯ জন।

২০১৪ যিশুসন মোতাবেক, পশ্চিম তীরে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৪৮২ জন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.৯৯%। প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৭৫ বছর। সাক্ষরতার হার ৯২.৪% (১৫+)। এবং গাজায় প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৫,০৪৫ জন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩.৪৪%। প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৭২ বছর। সাক্ষরতার হার ৯১.৯% (১৫+)।

অর্থাৎ, ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে, ২০১৪ যিশুসনের হিসাব মোতাবেক, প্রতি বর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৭৫৪ জন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩.১৮%। প্রত্যাশিত গড় আয়ু ৭৩ বছর। সাক্ষরতার হার ৯২% (১৫+)।

সরকার ও রাজনীতিঃ
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সরকার পদ্ধতি- রাষ্ট্রপতিশাসিত গণতন্ত্র। রাষ্ট্রপতি, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পান; সকারপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পান- প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর হাতে কিছু পরিমান ক্ষমতা আছে। ফিলিস্তিনের আইনসভার নাম- ‘ফিলিস্তিন লেজিসলেটিভ কাউন্সিল’। এটি এক কক্ষ-বিশিষ্ট এবং ১৩২ আসন সংবলিত।

বর্তমান ফিলিস্তিনের রাজনীতিতে একটি বড় সংকট, হামাস-ফাতাহ দ্বন্দ্ব। মূলত ২০০৬ যিশুসনের নির্বাচনে, হামাসের বিজয়ের পর এই সংকট শুরু হয়। ফাতাহ মূলত জাতীয়তাবাদী জোট, অপরদিকে হামাস শরিয়াভিত্তিক দল। বর্তমানে পশ্চিম তীরের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে ফাতাহ। হামাস নিয়ন্ত্রণ করছে গাজার রাজনীতি। হামাসের নির্বাচিত সরকারকে বরখাস্ত করে, রাষ্ট্রপতি নিজে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিলে, হামাস ও বিদ্রোহী রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেয়। বর্তমানে তাই, ফিলিস্তিনে দুইটি সরকার। একটি পশ্চিম তীরে ফাতাহ নিয়ন্ত্রিত সরকার, যে সরকারের সাথে আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোর যোগাযোগ হয়। অপরটি গাজা-ভিত্তিক হামাস এর বিদ্রোহী সরকার। এই দুই প্রধান দল ছাড়াও, উল্লেখযোগ্য আরো কিছু রাজনৈতিক দল আছে। যেমন- থার্ড ওয়ে, প্যালেস্টাইন ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভ, পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্যা লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন, ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ফর দ্যা লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন, প্যালেস্টাইন পিপল’স পার্টি ইত্যাদি।

২০১৪ যিশুসনের জুনে, ফাতাহ-হামাস ঐক্যমতের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও, এক বছরের মাথায় তা ভেঙে যায়। বর্তমানে, পশ্চিম তীর অংশে প্রধানমন্ত্রী রামি হামদাল্লাহ এবং গাজা অংশে ইসমাইল হানিয়া। পশ্চিম তীর অংশে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাস এবং গাজা অংশে আজিজ দুয়াইক। দুই অংশে, দুইটি আলাদা মন্ত্রীপরিষদ কাজ করছে।

সংস্কৃতিঃ
ফিলিস্তিনিদের সংস্কৃতি মূলত আরব সংস্কৃতি। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র, যেমন- লেবানন, সিরিয়া, মিসর, জর্দানের সাথে ফিলিস্তিনের সংস্কৃতির মিল লক্ষ্যনীয়। তবে শিল্প, কারুশিল্প, সাহিত্য, সঙ্গীত এবং খাবারে ফিলিস্তিনিদের কিছুটা আলাদা ঐতিহ্য রয়েছে। ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারভিশ বিশ্বের সাহিত্য অঙ্গনে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। ফিলিস্তিনের তাত্ত্বিকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- এডওয়ার্ড সাইদ। অলিম্পিক এবং ফিফা বিশ্বকাপে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র নিজ নামে অংশগ্রহণ করে থাকে। এছাড়া পোষাকেও ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব ঐতিহ্য বর্তমান।

অর্থনীতিঃ
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অর্থনীতির সর্ব বৃহৎ উৎস হলো- কৃষি। মোট জনসংখ্যার ৯০ ভাগ ই পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষ ভাবে কৃষির সাথে জড়িত। কৃষি উৎপাদনের অর্ধেক চাহিদাই পূরণ করা হয় ‘জলপাই’ থেকে। এটা একইসাথে ফিলিস্তিনের সবচেয়ে বৃহৎ রপ্তানি-পন্য। এছাড়া উৎপাদনের মধ্যে আছে- গম, বিভিন্ন রকম ভূমধসাগরীয় ফল এবং ফুল। এবং অ-কৃষি উপাদান উৎপাদনের মধ্যে আছে- সাবান, সিমেন্ট, কাপড়, পাথর, জলপাই কাঠ ইত্যাদি।

আয়ের দ্বিতীয় বৃহৎ উৎস- পর্যটন। বছরে প্রায় ২০-২৫ লক্ষ লোক ভ্রমনের উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিন যান। বিশেষত, জেনিন, জেরিকো, হেবরন, নাবলুস এর মতো ঐতিহাসিক নগরগুলোই পর্যটকদের বেশি আকর্ষন করে। এছাড়া, বেথেলহাম শহর যিশু খ্রিস্টের জন্মভূমি, খ্রিস্টিয়ানদের নিকট অতি পবিত্র। বেথেলহাম, ফিলিস্তিন ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষন। তবে, ইসরাইলের অবরোধের কারনে পর্যটকদের আনা-গোনা কম বলে মনে করে ফিলিস্তিন সরকার।

আয়ের তৃতীয় বৃহৎ উৎস- বৈদেশিক অনুদান। প্রতি বছর প্রচুর পরিমান বৈদেশিক অনুদান ফিলিস্তিনের জন্য বরাদ্দ হয়। এছাড়াও আছে, বিভিন্ন রকম হস্তশিল্প এবং কারখানা। প্রচুর ফিলিস্তিনি ইসরাইলে গিয়েও কাজ করেন।

ফিলিস্তিনের নিজস্ব কোনো প্রচলিত মুদ্রা নেই। দুই অংশেই ইসরাইলি নিউ শেকেল ব্যাবহৃত হয়। এছাড়াও, পশ্চিম তীরে জর্দানি দিনার এবং গাজায় মিসরীয় পাউন্ড ব্যাবহৃত হয়। ফিলিস্তিনের জিডিপি বৃদ্ধির হার, ২০১২ যিশুসনের হিসাব মোতাবেক ৫.৯%। বেকারত্বের হার ২৭.৫%। দারিদ্রসীমার নীচে বাস করে ২৫.৮% লোক। রাষ্ট্রের মোট জিডিপি’র পরিমাণ, ২০১৪ যিশুসনের হিসাব মোতাবেক, প্রায় ১২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আইনগত অবস্থানঃ
ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষনা করে, নভেম্বর ১৫, ১৯৮৮ যিশুসনে। সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৫ যিশুসনের হিসাব মোতাবেক জাতিসংঘভূক্ত ১৯৩ টি রাষ্ট্রের ১৩৬ টি রাষ্ট্রই ফিলিস্তিনকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফিলিস্তিন জাতিসংঘের ‘অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। এছাড়াও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হিসেবে ইউনেস্কো, আরব লীগ, ও আই সি, ন্যাম, রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট মুভমেন্ট, ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন, জি-৭৭, ভূমধ্যসাগরীয় ইউনিয়ন এর সদস্য।

জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে ২০১৭ যিশুসনের মধ্যে পূর্ণ সদস্য করার জন্য ডিসেম্বর ২৩, ২০১৫ যিশুসনে একটি প্রস্তাব আনে। যা ১৬৪/৫ ভোটে জয়লাভ করলেও পাশ হয়নি, একমাত্র আমেরিকার ভেটো’র কারনে। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া প্রায় প্রতিটি দেশেই ফিলিস্তিনের বৈদেশিক মিশন রয়েছে।

প্রশাসনিক বিভাগঃ
ফিলিস্তিন ১৬ টি প্রদেশে (মুহাফাজাত) বিভক্ত। এর মধ্যে ১১ টি প্রদেশ পশ্চিম তীরে এবং বাকী ৫ টি প্রদেশ গাজা অঞ্চলে। প্রদেশগুলো প্রাদেশিক গভর্নর দ্বারা পরিচালিত হয়। প্রদেশগুলো হলো- পশ্চিম তীরে; জেনিন, তুলকারেম, নাবলুস, তুবাস, কালকিলিয়া, সালফেইট, রামাল্লা ও আল-বাইরাহ, জেরিকো, জেরুজালেম, বেথেলহাম এবং হেবরন। গাজায়; উত্তর গাজা, গাজা, দেইর আল বালাহ, খান ইউনিস এবং রাফাহ।

রাষ্ট্রপতিগণের তালিকাঃ
নাম ^ক্ষমতাকাল ^টিপ্পনী
ইয়াসির আরাফাত ^নভেম্বর ১৫, ১৯৮৮-অক্টোবর ২৯, ২০০৪
আহমেদ কোরেইয়া ^অক্টোবর ২৯, ২০০৪-নভেম্বর ১১, ২০০৪ ^ভারপ্রাপ্ত।
রাউহি ফাত্তুহ ^নভেম্বর ১১, ২০০৪-জানুয়ারি ১৫, ২০০৫
মাহমুদ আব্বাস ^জানুয়ারি ১৫, ২০০৫- চলছে…
আজিজ দুয়াইক ^জানুয়ারি ১৯, ২০০৯- চলছে… ^জানুয়ারি ১৯, ২০০৯ গাজা অংশে।

প্রধানমন্ত্রীগণের তালিকাঃ
নাম ^ক্ষমতাকাল ^টিপ্পনী
মাহমুদ আব্বাস ^এপ্রিল ৩০, ২০০৩-অক্টোবর ০৭, ২০০৩
আহমেদ কোরেইয়া ^অক্টোবর ০৭, ২০০৩-ডিসেম্বর ১৫, ২০০৫ ^১ম দফা। অক্টোবর ২৯, ২০০৪-নভেম্বর ১১, ২০০৪ প্রধানমন্ত্রী পদ ছিলোনা।
নাবিল শাথ ^ডিসেম্বর ১৫, ২০০৫- ডিসেম্বর ২৪, ২০০৫ ^ভারপ্রাপ্ত।
আহমেদ কোরেইয়া ^ডিসেম্বর ২৪, ২০০৫-মার্চ ২৯, ২০০৬ ^২য় দফা।
ইসমাইল হানিয়া ^মার্চ ২৯, ২০০৬- চলছে… ^জুন ১৫, ২০০৭ থেকে গাজা অংশে।
সালাম ফাইয়াদ ^জুন ১৫, ২০০৭-জুন ০৬, ২০১৩
রামি হামদাল্লাহ ^জুন ০৬, ২০১৩- চলছে…

তড়িৎ সহায়িকাঃ
সাংবিধানিক নামঃ ফিলিস্তিন রাষ্ট্র (দাওলাত আল ফিলাস্তিন)।
অবস্থানঃ মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া মহাদেশ।
আয়তনঃ ৬,০৩১ বর্গ কিলোমিটার (২,৩২৮.৫৮ বর্গ মাইল)।
জনসংখ্যাঃ ৪৫,৪৭,৪৩১ জন (২০১৪ হিসাব)।
জনসংখ্যার ঘনত্বঃ ৭৫৪ জন, বর্গ কিলোমিটার প্রতি।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারঃ ৩.১৮% (২০১৪ হিসাব)।
মুদ্রাঃ ইসরাইলি নিউ শেকেল (দুই অংশে); জর্দানি দিনার (পশ্চিম তীরে); মিসরীয় পাউন্ড (গাজায়)।
ভাষাঃ আরবী (দাপ্তরিক), হিব্রু এবং ইংরেজী।
নৃগোষ্ঠীঃ ৯১.২% আরব এবং ৮.৮% ইহুদী।
ধর্মঃ ৮৬% মুসলিম, ৮.৮% ইহুদী, ৪.২% খ্রিস্টিয়ান এবং ১% দ্রুজ ও অন্যান্য।
সাক্ষরতার হারঃ ৯২% (২০১৪ হিসাব)।
জিডিপিঃ ১২.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (পিপিপি, ২০১৪ হিসাব)।
স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠাঃ নভেম্বর ১৫, ১৯৮৮ (ইসরাইল থেকে)।
জাতীয় বীরঃ ইয়াসির আরাফাত, ফিলিস্তিনের জাতির জনক।
জাতীয় সঙ্গীতঃ ফিদাই (বিপ্লব)।
আইনসভাঃ লেজিসলেটিভ কাউন্সিল (১৩২ আসন)।
সরকারের ধরনঃ রাষ্ট্রপতিশাসিত গণতন্ত্র।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিঃ সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৫ মোতাবেক জাতিসংঘভূক্ত ১৩৬ টি রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিয়েছে। জাতিসংঘের ‘অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ মর্যাদায় সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বীকৃতি।
প্রধান প্রধান নগরঃ হেবরন, নাবলুস, গাজা, জেনিন, বেথেলহাম, তুলকারেম, কালকিলিয়া, খান ইউনিস, জেরিকো, সালফেইট এবং দেইর আল বালাহ।
সর্বোচ্চ বিন্দুঃ নবী ইউনুস পর্বত (১,০৩০ মিটার/৩,৩৭৯ মিটার)।
সময় স্থানঃ জিএমটি +২।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

44 − = 39