কোরান-হাদিসের মধ্যে বিজ্ঞান? পর্ব-২(ইসলামী মহাবিশ্ব)

কোরান ও হাদিস থেকে আমরা মহাবিশ্বের যে চিত্র পাই তা হলো জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের চিত্র থেকে আলাদা। তাহলে আমরা এখন কোন চিত্র গ্রহন করব ? কোরান হাদিসেরটা নাকি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদেরটা ? প্রসঙ্গত: জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যে চিত্র প্রকাশ করে , তা নানা পরীক্ষা নীরিক্ষার মাধ্যমেই সেটা করে। নিজেদের মনগড়া কোন কথা বলে না। পক্ষান্তরে কোরান হাদিসের মহাবিশ্ব চিত্র শুধুই বিশ্বাসের ব্যাপার। যাইহোক , কোরান হাদিস থেকে এবার আসল বিষয়টা জানা যাক।

সুরা আত ত্বালাক- ৬৫: ১২: আল্লাহ সপ্তাকাশ সৃষ্টি করেছেন এবং পৃথিবীও সেই পরিমাণে, ————–

সুরা নুহ- ৭১: ১৫: তোমরা কি লক্ষ্য কর না যে, আল্লাহ কিভাবে সপ্ত আকাশ একটার ওপরে একটা এভাবে সৃষ্টি করেছেন।

তার মানে আল্লাহ সাতটি আকাশ ও সেই সংখ্যক অর্থাৎ সাতটি পৃথিবী তৈরী করেছে। তবে কোরানে যে আরবী শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তার আসল অর্থ জমীন, পৃথিবী না। জমিন ও পৃথিবী সম্পুর্ন ভিন্ন দুটি বিষয়। তারপরেও ধরে নেয়া যাক এই জমিনই পৃথিবী। বিষয়টা হাদিস থেকেও জানা যায়—-

সহিহ বুখারী :: খন্ড ৪ :: অধ্যায় ৫৪ :: হাদিস ৪১৭:
আলী ইব্ন আবদুল্লাহ (র)……………আবূ সালমা ইব্ন আবদুর রাহমান (রা) থেকে বর্ণিত, (তিনি বলেন), কয়েকজন লোকের সাথে একটি জমি নিয়ে তার বিবাদ ছিল। আয়িশা (রা)-এর নিকট এসে তা ব্যক্ত করল। তিনি বললেন, হে আবু সালমা! জমা-জমির ঝামেলা হতে ধূরে থাক। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি এক বিঘত পরিমাণ অন্যের জমি জুলুম করে আত্মসাৎ করেছে, কিয়ামতের দিন সাতটা জমিনের হার তার গলায় পরানো হবে।

আমাদের মাথার ওপর যে আকাশ আছে , সেটাই সর্ব নিম্ন আকাশ , এই আকাশের ওপরে পর পর আরও ছয়টা আকাশ আছে নির্দিষ্ট দুরত্বে, আর আমাদের পৃথিবীর নিচে পর পর আরও ছয়টা পৃথিবী বিদ্যমান নির্দিষ্ট দুরত্বে— এটাই কোরানের ভাষ্য। সেই সর্বনিম্ন আকাশটার গঠন কিরূপ সেটা আছে কোরানে —-

সূরা আস সাফফাত- ৩৭: ৬: নিশ্চয় আমি সর্বনিম্ন আকাশকে তারকারাজির দ্বারা সুশোভিত করেছি

তার মানে মহাবিশ্বে যত ছায়াপথ বা নক্ষত্র আছে তার সবই সর্ব নিম্ন আকাশে বিদ্যমান। এছাড়াও কোরান বলছে —

সুরা আল মুলক- ৬৭: ৫: আমি সর্বনিম্ন আকাশকে প্রদীপমালা দ্বারা সুসজ্জত করেছি; সেগুলোকে শয়তানদের জন্যে ক্ষেপণাস্ত্রবৎ করেছি এবং প্রস্তুত করে রেখেছি তাদের জন্যে জলন্ত অগ্নির শাস্তি।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে , সর্বনিম্ন আকাশে যে প্রদীপমালা বা নক্ষত্রসমূহ আছে তার কিছুকে আল্লাহ মাঝে মাঝে ক্ষেপনাস্ত্রের মত ছুড়ে মারে , যারা শয়তানদের ধাওয়া করে । কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেন – এক একটা নক্ষত্র হলো লক্ষ লক্ষ পৃথিবীর সমান আকৃতির একটা জ্বলন্ত অগ্নি পিন্ড। যেমন আমাদের নিকটতম নক্ষত্র সূর্য হলো পৃথিবীর চাইতে তের লক্ষ গুন বড় আকারের একটা জ্বলন্ত পিন্ড। এইসব নক্ষত্র কখনই ক্ষেপনাস্ত্রের মত আকাশে ছোটাছুটি করে না। যা ছোটাছুটি করে , তারা হলো ক্ষুদ্রাকৃতির উল্কাখন্ড , তাদেরকেই আসলে ছুটন্ত নক্ষত্র বলে মনে হয়। মঙ্গল ও শনি গ্রহের মাঝখানে একটা স্তর আছে যেখানে লক্ষ লক্ষ গ্রহানুপুঞ্জ বা ক্ষুদ্র ক্ষ্রদ্র খন্ড আছে , যারা সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরছে , কিন্তু ঘোরার সময় কিছু কিছু কক্ষপথ থেকে ছিটকে বের হয়ে চলে আসে , এরা অত:পর প্রচন্ড বেগে ধেয়ে এসে মঙ্গল, শনি , চাঁদ সহ পৃথিবীতে এসে পতিত হয়। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের মধ্যে যখন ৪৫ কিমি/প্রতি সেকেন্ড গতিতে এসব ছোট ছোট বস্তু খন্ড ছুটে চলে তখন তা জ্বলে ওঠে , রাতের বেলায় এদেরকে ছুটন্ত নক্ষত্র বলে মনে হয়। আসলে দিনের বেলায়ও তারা এভাবে ছুটে চলে , তবে দিনের আলোর জন্যে তাদেরকে দেখা যায় না। অধিকাংশ খন্ড এত ছোট যে তারা বায়ূমন্ডলের মধ্যেই জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, আর কিছু কিছু খন্ড পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়ে। দুনিয়ার বহু যাদুঘরে এ ধরনের অনেক উল্কা খন্ডের নমুনা আছে।

অর্থাৎ কোরান এসব ছোট ছোট উল্কা খন্ডকেই নক্ষত্র হিসাবে চিহ্নিত করেছে যারা নাকি আবার শয়তানকে ধাওয়া করে। কোরান খুব পরিস্কার ভাষায় বলেছে এইসব ছুটন্ত অগ্নিপিন্ডের কাজই হলো শয়তানকে ধাওয়া করা যেমন –

সুরা হিজর – ১৫: ১৭- ১৮: আমি আকাশকে প্রত্যেক বিতাড়িত শয়তান থেকে নিরাপদ করে দিয়েছি। কিন্তু যে চুরি করে শুনে পালায়, তার পশ্চাদ্ধাবন করে উজ্জ্বল অগ্নিপিন্ড।

সুরা আল জ্বীন – ৭২: ৮-৯: আমরা আকাশ পর্যবেক্ষণ করছি, অতঃপর দেখতে পেয়েছি যে, কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিন্ড দ্বারা আকাশ পরিপূর্ণ। আমরা আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সংবাদ শ্রবণার্থে বসতাম। এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে জলন্ত অগ্নিপিন্ড ওঁৎ পেতে থাকতে দেখে।

মহাবিশ্ব সম্পর্কে যাদের আদৌ কোন ধারনা নেই , তারাই একমাত্র রাতের বেলায় এসব ছুটন্ত অগ্নিপিন্ডকে ছুটন্ত নক্ষত্র হিসাবে সাব্যাস্ত করবে।

এবার সূর্যের কথায় আসা যাক ,

সূরা ইয়াসিন- ৩৬: ৩৮: সূর্য তার নির্দিষ্ট অবস্থানে আবর্তন করে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞ, আল্লাহর নিয়ন্ত্রণ।

সূর্য যে একটা নির্দিষ্ট পথে চলাচল করে সেটা তো জ্ঞানী মূর্খ, উন্মাদ পাগল সেই হাজার হাজার বছর আগ থেকেই দেখে আসছে। সেটাই অতি সহজ ভাষায় কোরান বলেছে মাত্র, কিন্তু কিছু ইসলামী বিজ্ঞানী এর মধ্যে , সূর্যের ২০ কোটি বছরে তার ছায়াপথ মিল্কি ওয়েকে কেন্দ্র করে ঘুরে আসার ঘটনা আবিস্কার করে বসে আছে। কিন্তু বিষয়টা কি তাই ? সেটা দেখা যাবে , কোরানের নিচের আয়াতে—

সুরা কাহফ- ১৮: ৮৬: অবশেষে তিনি যখন সুর্যের অস্ত স্থলে পৌছলেন; তখন তিনি সুর্যকে এক পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখলেন এবং তিনি সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেলেন। আমি বললাম, হে যুলকারনাইন! আপনি তাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন অথবা তাদেরকে সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পারেন।

তার মানে সূর্য পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যায়। এখন ইসলামী বিজ্ঞানীরা বলে সাদা চোখে সূর্যকে তো অস্তই যেতে দেখা যায়। প্রশ্ন হলো , এই আয়াতের অস্ত যাওয়াকে যদি তারা সাদা চোখে যা দেখায় সেটাকেই অর্থ করে থাকে , তাহলে ৩৬:৩৮ আয়াতের সূর্যের আবর্তনকে কেন সাদা চোখে আমরা যে দেখি সুর্য প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট রেখা ধরে চলাচল করে , সেটা বুঝাবে না ? আর আসলেই যে সেটা তাই তা বলে গেছে স্বয়ং মুহাম্মদ যিনি কোরানের শ্রেষ্ট ব্যখ্যাকার –

সহিহ বুখারী :: খন্ড ৪ :: অধ্যায় ৫৪ :: হাদিস ৪২১:
মুহাম্মদ ইব্ন ইউসুফ (র)……………আবূ যার (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (সাঃ) সূর্য অসত্ম যাওয়ার সময় আবূ যার (রা)-কে বললেন, তুমি কি জান, সূর্য কোথায় যায়? আমি বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, তা যেতে যেতে আরশের নীচে গিয়ে সিজদায় পড়ে যায়। এরপর সে পুনঃ উদিত হওয়ার অনুমতি চায় এবং তাকে অনুমতি দেওয়া হয়। আর অচিরেই এমন সময় আসবে যে, সিজদা করবে তা কবূল করা হবে না এবং সে অনুমতি চাইবে কিন্তু অনুমতি দেওয়া হবে না। তাকে বলা হবে যে পথে এসেছ, সে পথে ফিরে যাও। তখন সে পশ্চিম দিক হতে উদিত হবে–এটাই মর্ম হল আল্লাহ তা‘আলার বাণীঃ “আর সূর্য গমন করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, এটাই পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। (সূরা ইয়াসিন-৩৬:৩৮)”

তার মানে সূর্য দৈনিক অস্ত গিয়ে আল্লাহর আরশের নিচে গিয়ে সিজদায় পতিত হয়, পুনরায় উদিত হওয়ার জন্যে, আল্লাহ সারারাত তাকে সেই অনুমতি দেয় না, দেয় ভোর বেলায় আর তখন সূর্য পুনরায় পূর্ব দিকে উদিত হয়।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে বর্তমানকার কথিত ইসলামী বিজ্ঞানীরা খোদ ইসলামের নবী মুহাম্মদের চাইতে কোরান বা ইসলাম বেশী বোঝে ,তাই নয় কি ?

কোরান-হাদিসের মধ্যে বিজ্ঞান ? পর্ব-১(বিগ ব্যাং তত্ত্ব)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

২ thoughts on “কোরান-হাদিসের মধ্যে বিজ্ঞান? পর্ব-২(ইসলামী মহাবিশ্ব)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

57 − 53 =