পাঁচ হাজার বছর…

আজকাল নিজেকে খুব বেশি কুকুরের মতো মনে হয়। বাড়ির পোষা কুকুর যেমন, খাওয়া ছাড়া বিশেষ কোন কাজ করে না, অনেকটা সেরকম শহরের এই ফ্ল্যাটে আমার জীবন। এখানে সকাল বলে কিছু নেই, নেই রাত্রি। যখন ইচ্ছে ঘুমোই, যখন ইচ্ছে জাগি। আমি বুঝি না, একটা নির্বোধ নক্ষত্র, সূর্য, কেন ঠিক করে দেবে, কখন ঘুমোবো, কখন জাগবো?

ভরদুপুরে হাই তুলতে তুলতে শরীর মোচড়াতে মোচড়াতে যেভাবে জাগতো আমাদের বাড়ির পোষা কুকুরটা, সেভাবেই জাগলাম। হঠাৎ কেন কুকুরের কথাই মাথায় এলো, জানি না। বিশেষ পার্থক্য নেই একটা পোষা কুকুরের জীবনযযাত্রার সাথে আমার। পার্থক্য বোধহয় এই যে, কুকুর খুবই প্রভুভক্ত, আমি এখনো ঠাওর করে উঠতে পারি নি কে আমার প্রভু? প্রভু বলতে মানুষ সাধারণত ইশ্বরকেই বুঝে। অথচ আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, ইশ্বরকে আমরা কেউই তেমনভাবে চিনি না। কোন সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই ইশ্বরের। প্রত্যেকের ইশ্বর আলাদা।

ফোন বাজছে। এটাই ভালো। সকাল সকাল, কিংবা বলা যেতে পারে ঘুম ভাঙ্গার পরপর, এরকম এলোমেলো চিন্তার চেয়ে একটা ফোন পাওয়া ঢের ভালো। ফোন পাওয়ার মানে কেউ একজন ভাবছে আমার কথা। এ-ই বা কম কিসে? খালাতো ভাইয়ের ফোন। খবর পেলাম, ঐ পরিবারে নতুন সদস্যের আগমন ঘটেছে। অর্থাৎ, হাসপাতালে যেতে হবে, দেখতে হবে নবজাতক শিশুটিকে, যে সম্পর্কে হবে আমার বোন। ইচ্ছে না করলেও যেতেই হবে, সামাজিকতা!

“এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ মৃত আর ধ্বংসস্তুপ পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের… ”

এই পংক্তিগুলোই কেন মাথায় এলো কে জানে? তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রশ্ন খেলে গেল মগজে। এই শিশুটির বাসযোগ্য পৃথিবী কি রেখে যাচ্ছি আমরা? হাসপাতালের বেডে মা এবং পাশে ভাইয়ার কোলে ক্রন্দনরত শিশু। স্থানান্তরিত হচ্ছে একজনের কোল থেকে আরেকজনের কোলে। কী অসামঞ্জস্যপূর্ণ দৃশ্য, কাঁদছে শিশুটি, বাকি সবার মুখে হাসি। কিন্তু, এসবের কিছুই যেন দেখছি না আমি।

আমি দেখছি গত পাঁচ হাজার বছর… পাঁচ হাজার বছর দাঁড়িয়ে আছে বরণডালা সাজিয়ে শিশুটিকে বরণ করে নেবার জন্য। সভ্যতার ছেঁড়া ফাড়া কদর্য জামা হাতে অপেক্ষায়, শিশুটিকে পরাবে বলে। নৈতিকতার মোহন শেকল হাতে অপেক্ষায়, শিশুটির হাতে পায়ে গলায় জড়াবে বলে। ধর্মের আফিম হাতে অপেক্ষায়, শিশুটিকে পান করাবে বলে। জন্মমুহূর্ত থেকেই ঘোর নেশায় মত্ত করে রাখতে হবে ওকে, আবদ্ধ করতে হবে অযৌক্তিক নৈতিকতার বাঁধনে ও সভ্যতার মেকি সাজে করতে হবে সজ্জিত। এই জন্যেই কি কাঁদছে ও? অথবা, এ সবই আমার নিছক কল্পনা। বড় বেশি কল্পনাপ্রবণ হয়ে যাচ্ছি আজকাল। আচ্ছা, পুরোটাই কি কল্পনা? এখন না হোক, ধীরে ধীরে পরিবার পরিজন মহান দ্বায়িত্বের মতো সভ্যতার কদর্য জামা কি পড়াবে না ওকে? আমি পরিনি? যুক্তিহীন নৈতিকতার শেকল কি জড়াবে না গায়ে? আমি জড়াই নি? ধর্মের নেশায় মাতাল করবে না ওকে? আমি হইনি? ছিলাম, একসময় আমিও ছিলাম অত্যন্ত সভ্য, নৈতিক ও প্রবল ধর্মবিশ্বাসী। এখন নই। কেননা জন্মের পর তোতাপাখির মতো শেখা বুলিগুলোকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করে দেখতে চেয়েছিলাম। দেখলাম, কি ভীষণ অন্তঃসারশূন্য সেগুলো, কি ভীষণ মিথ্যে! এবং হঠাৎই আবিষ্কার করেছিলাম, আমি দূরে ছিটকে গেছি এ প্রথাগত সমাজ থেকে। হঠাৎই মনে হতে লাগলো, জন্ম কি তবে নিরর্থক? কোন উদ্দেশ্য নেই এ জীবনের? তাহলে কেনই বা এ জন্ম? একগাদা প্রশ্নের ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতে আবিষ্কার করেছিলাম, জীবন একটা আশ্চর্য উপহার। অবশ্য, যদি এ উপহারকে কাজে লাগাবার ক্ষমতা থেকে থাকে, তাহলে।

এই মেয়ে, নবজাতক শিশুটি কি কোনদিন আমারই মতো প্রশ্নের পর প্রশ্নের উত্থাল পাতাল সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে ভাসতে ডুবতে ডুবতে বুঝতে চাইবে জীবনের মানে? এবং সবশেষে আমারই মতো উপভোগ করবে এক আশ্চর্য স্বাধীনতা? নাকি একটা জীবন বাকি সবার মতো শৃঙ্খলমুগ্ধ হয়ে কাটিয়ে দেবে? ‘শৃঙ্খলমুগ্ধ’ চমৎকার একটা শব্দ। সাধারণ সভ্য, নৈতিক ও ধার্মিক মানুষগুলোকে এরচেয়ে ভালো কোন শব্দে ব্যাখ্যা করা যায় না।

আমি দাঁড়িয়ে আছি, মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে দাঁড়িয়ে আছি। ঠিক ভালো লাগছিলো না ওখানে ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে। কিন্তু হুট করে চলে যাওয়াও যায় না। সবাই-এখনো- শিশুটিকে নিয়ে মেতে আছে। আমি সবার অলক্ষ্যে বেরিয়ে এলাম। করিডোরে দেখা হয়ে গেলো দু একজনের সঙ্গে, সৌজন্যমূলক কথাবার্তা শেষে পা বাড়ালাম পথে।

একটা সিগারেট খাওয়া দরকার। হাসপাতালের বাইরে ফুটপাতের দোকান থেকে সিগারেট জ্বাললাম। আমার ঠিক পাশেই একটা বাচ্চা মেয়ে ফুল হাতে দাঁড়িয়ে। হঠাৎই ছুটে গেলো একটা গাড়ির দিকে। আমি হাঁটছি। একটা বাচ্চা ছেলে ডাস্টবিন ঘেটে ঠিক কী কী যেন ভরে রাখছে তার পিঠের বস্তায়। আমি হাঁটছি। ওভারব্রিজে এক ভিখারিনী রুগ্ন শিশু কোলে বসে আছে। আমি হাঁটছি। সিগারেট ফুরিয়ে এলো। নাক মুখ দিয়ে গলগল করে বেরোনো একরাশ ধোয়ার মতো হঠাৎ চিন্তাটা এলো মাথায়। আমার বাবা যদি আমার বাবা না হতো? যদি আমার বাবা হতো অন্য কেউ? সেই ডাস্টবিন ঘাটা ছেলেটির পরিবারে যদি জন্মাতাম আমি?তাহলে কি সিগারেটের বিলাসিতা সাজতো? হয়তো, আমিও তখন ডাস্টবিন ঘেটেই জীবিকা নির্বাহ করতাম। আমার সদ্য জন্ম নেয়া বোনটি যদি জন্মাতো এই ভিখিরিনীর কোলে? অথচ, জন্মের উপর আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। আমাকে অস্তিত্বশীল করে তোলার আগে কোন মতামত নেয়া হয়নি আমার, নেয়া হয় না কারোর ক্ষেত্রেই। তাহলে কেন, কোন পাপে এদের যাপন করতে হচ্ছে সম্পূর্ণ জোর করে চাপিয়ে দেয়া এই জীবন নামের উপদ্রব? আমার জন্য, আমার নবজাতক বোনটির জন্য অনেক কিছুই রেখে যাবে আমার বাবা মা, ওর বাবা মা। কিন্তু এইসব বাচ্চাদের জন্য? কিছুই কি করবে না কেউ?

একসময় মানুষ ছিলো বন্য। তারা পাহাড়ে জঙ্গলে বাস করতো। পুরুষরা করতো শিকার, আর নারীরা চাষের কাজ। যে যতো পরিশ্রম করতো, ভোগ করতো তত বেশি। তখন সমাজ অসভ্য ছিলো, ঠিক কেন আমি জানিনা। হয়তো, ধনী-গরিব-উঁচু-নিচু-জাত-ধর্ম-বর্ণ-গোত্ ইত্যাদি বিভেদ ছিলো না বলেই! এখন পরিশ্রম করে যে সবচেয়ে কম, ভোগ করে বেশি। দামী গাড়ি বাড়ি আর পাহাড়সমান সম্পদ থাকলে, সেই বন্য আদিমরা যেরকম কৃষিকাজের জন্য পশু ব্যবহার করতো, সেভাবেই কিংবা তারচেয়ে আরো ভালোভাবে ব্যবহার করা যায় মমানুষকে। পাঁচ হাজার বছর ধরে সভ্যতা বন্য বর্বর আদিম মানবকে উন্নত করেছে। তাদেরকে বিত্তবান করেছে, বিত্তহীন করেছে, ধার্মিক করেছে, প্রভাবশালী করেছে, প্রভাবহীন করেছে, নৈতিক করেছে এবং সর্বোপরি দুর্বৃত্ত করেছে। কিন্তু মানুষ করতে পেরেছে কি?

বাসের পর বাস আমাকে পার হয়ে চলে যাচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি। চলে যাচ্ছে ট্যাক্সি, মাইক্রোবাস, সিএনজি, ভিক্ষুকের তিন চাকাওয়ালা যান, সাইকেল মোটরসাইকেল আর প্রজাপতির মতো পাখা মেলে উড়তে উড়তে একদল রিকশা। যেভাবে ভাবনাগুলো আসে, চলেও যায় অলক্ষ্যে!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 44 = 51