বন্দুকযুদ্ধের নাটক থামান, এখনই

দুইদিনে চার জেএমবি সদস্য বন্দুকযুদ্ধে(এনকাউন্টার) নিহত। এদেশে আবার পুরনো ক্রসফায়ার নাটকের মঞ্চায়ণ হতে শুরু করেছে। অনেককে দেখলাম, তারা বন্দুকযুদ্ধের এই নাটককে সমর্থন দিচ্ছেন। অনেকে আরও বেশি করে বন্দুকযুদ্ধ হোক সেটা কামনা করছে! এর একটাই কারণ, সকলে জঙ্গিবাদ থেকে মুক্তি চাই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বন্দুকযুদ্ধ কি জঙ্গিবাদ থেকে মুক্তি এনে দিতে পারবে?

যে চারজন জঙ্গি নিহত হয়েছে, পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে এখন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনছে। আজ সকালে বগুড়ায় যাকে বন্দুকযুদ্ধে মারা হলো, সেই ব্যক্তির নাম কাউসার। যার বিরুদ্ধে বগুড়ার শিবগঞ্জে শিয়া মসজিদে হামলার ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছে পুলিশ। শিবগঞ্জে শিয়া মসজিদে হামলা হয়েছিলো গত বছরের ২৬ নভেম্বর। পুলিশ এতোদিন ধরে আসামী ধরতে পারে নাই, আর আজ ধরেই মেরে দিলো! এখন প্রশ্ন, পুলিশ কি আসলেই আসামী ধরতে পারে নাই, নাকি ধরার চেষ্টা করে নাই? অন্যভাবে বলা যায়, আমাদের পুলিশ আসামীকে এনকাউন্টারে মারতে যতটা পটু, আসামী গ্রেপ্তারে ততোটা নয়!

রাজশাহীতে গতকাল যে যুবককে বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয়েছে, পুলিশের দাবি সে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম হত্যার সাথে যুক্ত। এই নিয়ে অধ্যাপক রেজাউল করিম হত্যার অভিযোগে দুইজনকে পুলিশ হত্যা করেছে! প্রথমজন শিবির নেতা হাফিজুর রহমান, যাকে পুলিশী হেফাজতে পিটিয়ে মেরে বলা হয়েছে সে রক্ত শূন্যতায় মারা গেছে। অপরজন তো কাল বন্দুকযুদ্ধের নাটকে মারা গেলো।

যে চারজন মানুষকে বন্দুকযুদ্ধে মারা হলো, আমি বলছিনা তারা নিরপরাধ। পুলিশের দাবি হয়তো সত্য। তারা জঙ্গিবাদের সাথে যুক্ত থাকলেও থাকতে পারে। কিন্তু আমার আপত্তি তাদের বিচার না করে হত্যা করা নিয়ে। দেশের নাগরিক হিসেবে একজন অপরাধীরও আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এভাবে বিনা বিচারে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে মানুষ হত্যা আইনের শাসনের পরিপন্থী।

আজ যারা এই হত্যাকান্ডকে সমর্থন করছেন, যারা বন্দুকযুদ্ধকে সাধুবাদ দিচ্ছেন, তাদের বলছি, এই ধরনের হত্যাকান্ড কখনও কোন সমাধান দিতে পারেনা। এদেশে যখন যে দল ক্ষমতায় ছিলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও তাদের দলীয় বাহিনীর মতো কাজ করেছিলো। বন্দুকযুদ্ধে কাকে মারা হবে সেটাও ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছাতেই হয়। এভাবেই শেখ মুজিবের আমলে হাজার হাজার বামপন্থী-জাসদ কর্মীকে বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হয়েছিলো। জিয়াও একই কায়দায় কমিউনিস্টদের দমন করেছিলো।

বিএনপি – জামাত জোট সরকারের আমলে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধে যতো অপরাধী মারা হয়েছিলো, তার কয়েক গুণ বেশি মারা হয়েছিলো আওয়ামীলীগ নেতা ও কমিউনিস্টদের। উত্তরবঙ্গে চরমপন্থী নাম দিয়ে কমিউনিস্টদের দমন করতে বন্দুকযুদ্ধের পাশাপাশি জঙ্গিদেরও লেলিয়ে দিয়েছিলো জোট সরকার। বর্তমানে যে বন্দুকযুদ্ধের খেলা শুরু হয়েছে সেট যে বিরোধীদের দমনে ব্যবহার করা হবে না সেই নিশ্চয়তা কে দিবে?

দশজন জঙ্গিকে ক্রসফায়ারে মারতে গিয়ে যদি একজনও নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়, তবে তার দায় নিবে কে? আইন বলে একজন নিরপরাধীকে রক্ষায় যদি দুইজন অপরাধীকে মুক্তি দিতে হয়, সেটা করা উচিত। কারণ কোন নিরপরাধীকে সাজা থেকে রক্ষা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা রাষ্ট্র এবং আদালতের দ্বায়িত্ব।

ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধ কখনোই সমর্থন যোগ্য হতে পারেনা। ক্রসফায়ারের মাধ্যমে যদি কাউকে বিচার পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয় তাহলে মানুষ আদালতের উপর আস্থা হারাবে। তাই সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে, বন্দুকযুদ্ধের নাটক থামান, এখনই।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “বন্দুকযুদ্ধের নাটক থামান, এখনই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

73 − 64 =