হিন্দুরাও মানুষ! আর হিন্দুদেরও নিজস্ব একটি ধর্ম আছে!

দেশের একটা শ্রেণী একটু সুযোগ পেলেই হিন্দুধর্মাবলম্বীদের প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে শ্রাব্য ও অশ্রাব্য গালিগালাজ করে থাকে। আর তাদের ভাবখানা দেখে মনে হয়: হিন্দুর যেন মা-বাপ নাই। তাই, এদের মুখে যখন-তখন যা আসে তা-ই বলে এরা হিন্দুধর্মাবলম্বীদের গালিগালাজ করে থাকে। এরা সবসময় সুযোগসন্ধানী। আর তারা নিজেরা যেকোনো একটা অজুহাত তৈরি করে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের যাচ্ছেতাই ভাষায় গালিগালাজ করে থাকে। আর এদের গালিগালাজ শুনলে মনে হয়: দুনিয়াতে আর বুঝি মানুষ নাই—এরাই একমাত্র মানুষ!

হিন্দুধর্মাবলম্বীরা তাদের শাস্ত্রমতে সনাতনধর্মাবলম্বী। আমাদের সমাজে তা কালক্রমে হিন্দুধর্ম নামে পরিচিতি লাভ করেছে। তাদের ‘হিন্দু’ বলা যায় আবার ‘সনাতনধর্মাবলম্বী’ও বলা যায়। কিন্তু তাই বলে তাদের প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে ‘মালাউন’ বা ‘মালাউনের বাচ্চা’ বলে গালিগালাজ করা রীতিবিরুদ্ধ, সামাজিক শিষ্টাচার-বহির্ভূত ও সর্বোপরি মানবতাবিরোধী একটি দুষ্কর্ম ও অপকর্ম। আমাদের সমাজে অনেকেই একটুখানি সুযোগ পেলেই অমনি হিন্দুসম্প্রদায়কে সমানে গালিগালাজ করছে। আর তারা নিজের মনের আক্রোশ মিটাতে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের পাইকারিভাবে ‘মালাউন’ বা ‘মালাউনের বাচ্চা’ বলে সশব্দে গালিগালাজ করছে। আর তারা এমনই অমানুষ যে নিজেদের স্বার্থগত কারণে অনেক সময় তারা নিজেরাই হিন্দুধর্মাবলম্বীদের গালিগালাজ করার জন্য একটি আবহ ও পরিবেশ তৈরি করে নেয়। এরা সবসময় হিন্দুধর্মাবলম্বীদের গালি দিয়ে খুব মজা পায়। আর এরা মনে করে থাকে: একজন হিন্দুকে গালি দিতে পারলেই বুঝি তাদের খুব সওয়াব হবে! এমনই মূর্খতা আজ এদের পেয়ে বসেছে। আর এইসব মূর্খের সংখ্যাটা কমছে না। বরং এদের সংখ্যাই যেন আজ বাড়ছে। একশ্রেণীর নামমাত্র-মুসলমান দেশে আজ কথায়-কথায় শিষ্টাচার-বহির্ভূতভাবে একজন হিন্দুকে প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশে ‘মালাউন’ বা ‘মালাউনের বাচ্চা’ বলে গালি দিচ্ছে। এরা মুসলমান নয়—এরা শুধু মুসলমানের বেশ ধরেছে মাত্র। তাই, এদের শরীর এতো গরম! মাথা এতো গরম! আর যে বা যারা প্রকৃত-মুসলমান তারা কখনও অন্য ধর্মাবলম্বীদের গালিগালাজ করবে না। তারা দুনিয়ার কোনো হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদী ইত্যাদি কারও সঙ্গেই অহেতুক সংঘাতে জড়াবে না—আর তাদের গালিগালাজও করবে না। একশ্রেণীর নামধারী ও নিম্নশ্রেণীর মুসলমানরাই এটি সবসময় করে থাকে।

আমাদের দেশের একশ্রেণীর সস্তা-মুসলমান বা নামধারী-মুসলমান গায়ের জোরে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের সবকিছু কেড়ে নিতে চায়—কুক্ষিগত করতে চায়—আর সমূলে গ্রাস করতে চায়। এদের কাছে হিন্দুর ধর্ম ভালো না, হিন্দুর কর্ম ভালো না। হিন্দুর আচারবিধি ভালো না। কিন্তু এদেরই কাছে সবসময় হিন্দুর ঘরবাড়ি ভালো, জায়গাজমি ভালো, বিষয়আশয় ভালো, হিন্দুর বাগান-পুকুর আর জোতজমি সবই ভালো। আরও ভালো হিন্দুধর্মাবলম্বীদের সুন্দরী মেয়ে, বউ-ঝি! এরা এমনই অধম-পশু যে আজ পবিত্র ইসলামের নাম-ভাঙ্গিয়ে নিজেদের স্বার্থের সব নাজায়েজ ও শয়তানী কর্মসম্পাদন করছে, এবং এখনও তা বহাল তবিয়তে করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই পশুদের আবার ধর্ম কী? এদের মধ্যে সামান্যতম মানবচরিত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু পরিচয় দেওয়ার সময় এরা নিজেদের একেকজন পাক্কা-মুসলমান বলে পরিচয় দিচ্ছে। কিন্তু এরা কবে, কখন, কোথায়, কার কাছে, কীভাবে মুসলমান হয়েছে—তার কোনো প্রমাণ নাই। এরা একশ্রেণীর নির্লজ্জ ও আত্মস্বীকৃত জালেম। এরাই সামাজিকভাবে ফায়দা-লোটার জন্য পবিত্র ধর্ম ইসলামকে নিজেদের ভোগদখলের হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে থাকে। আর এরা মনে করে থাকে: তারা নিজেরা যতোই অকাম-কুকাম করুক না কেন শুধু একটি আরবি নামের জোরে নিজেদের মুসলমান পরিচয় দিয়ে সরাসরি একচান্সে বেহেশতে ঢুকে যাবে! পাগল আর কাকে বলে! এই পশুগুলো আজও জানে না, মহান আল্লাহর পবিত্র বেহেশতে এদের মতো নাপাকশয়তান কখনও ঢুকতে পারবে না। এই প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তাঁর পবিত্র কুরআনে বলেছেন:

“যারা ঈমান এনেছে এবং সকর্মশীল হয়েছে—তারা জান্নাতুল ফিরদাউসে আল্লাহর অতিথি হবে।”

আর যারা অন্য ধর্মাবলম্বীদের গালি দেয় মহান আল্লাহ তাদের হুশিয়ার করে দিয়ে বলেছেন:

“তারা আল্লাহকে ছেড়ে যাদের ইবাদত করে তোমরা তাদের গালি দিয়ো না, কেননা, তারা আল্লাহকে গালি দিবে সীমালংঘন করে অজ্ঞতাবশতঃ। এভাবেই আমি শোভন করে দিয়েছি প্রত্যেক জাতির কাছে তাদের কার্যকলাপ। অবশেষে তাদের প্রত্যাবর্তন তাদের রবের কাছে। তখন তিনি তাদের অবহিত করবেন তারা যা করতো সে সম্বন্ধে।”
(সুরা আন’আম ৬: ১০৮)

এর থেকে বুঝা যায়: প্রত্যেকে তার কার্যকলাপের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দায়বদ্ধ। আর তাই, এখানে (পৃথিবীতে) অতিউৎসাহী হয়ে বা মুসলমান-সেজে কারও কোনো মাতবরি করার সুযোগ নাই। আর কেউ কারও ধর্মে আঘাত করতে পারবে না।

যারা দুশ্চরিত্রের অধিকারী খুনী, চরিত্রহীন, লম্পট, ধর্ষক, পারজায়িক, ব্যভিচারী, মিথ্যাবাদী, ধোঁকাবাজ, প্রতারক, চালবাজ, আর একেবারে ভণ্ড তারা মুসলমান হয় কীভাবে? আর তারা মহান আল্লাহর বেহেশতেই বা যাবে কীভাবে? গায়ের জোরে হিন্দুদের ঘরবাড়ি-দখল করার মতো করে? হয়তো এরা তা-ই ভাবছে। আর আরও শয়তানী করার চিন্তাভাবনা করতে-করতে বেহেশতের স্বপ্ন দেখতে-দেখতে মনের সুখে জাবর কাটছে! আর এই পশুদের ভণ্ডামি কবে শেষ হবে?
আর এদের মতো নরপশু ইসলামধর্মে ঢুকেছে বলেই আজ ইসলামধর্ম তার গৌরব হারাতে বসেছে। ভণ্ডগুলো এখনও নিজেদের লাম্পট্য ও ছলচাতুরি একমুহূর্তের জন্য বন্ধ না করে শুধু তাদের একটি আরবি-নামের জোরে আজ নিজেদের মুসলমান ভাবছে! আরে পাপিষ্ঠ, তুই এখনই ইসরাইলে যা। একবার সেখান থেকে ঘুরে আয়। আর দেখে নে সেখানে অনেক ইহুদী এখনও আরবি-ভাষায় তাদের নাম-ধাম রাখে। কারণ, ইসরাইলের ইহুদীরা এখনও আরবি-ভাষায়ই ব্যবহার করছে। আর আমাদের দেশের একশ্রেণীর ভণ্ড মনে করে নিজের ও তদীয় সন্তানদের একটা আরবি-নাম রাখতে পারলেই সে একনিমিষে বিরাট এক মুসলমান! হায়রে গাধা, কবে আর মানুষ হবি!

অনেক ভণ্ড আজকাল হিন্দুধর্মাবলম্বীদের গালিগালাজ করাটাকে বাহাদুরীর কাজ বলে মনে করে থাকে। আবার অনেকে বংশানুক্রমে বা পুরুষানুক্রমে হিন্দুদের গালি দিয়ে তার নিজের বহুদিনের অতৃপ্তআত্মাকে ও পূর্বপুরুষের বিদেহীআত্মাকে শান্তিতে রাখতে চায়।

আমাদের আজ ভাবতে হবে: এই দেশে মুসলমানদের যেমন একটি ধর্ম রয়েছে তেমনি হিন্দুদেরও একটি ধর্ম রয়েছে। আর তাদেরও অধিকার রয়েছে নিজস্ব ধর্মপালনের। এখানে, কাউকেই বা কারও ধর্মকে খারাপ-চোখে দেখার কোনো সুযোগ বা অধিকার নাই। স্বাধীন-বাংলাদেশরাষ্ট্রে প্রত্যেকে তাদের স্ব-স্ব-ধর্মপালন করবেন। আর এটাই আমাদের রাষ্ট্রের মূলনীতি। এখানে, ব্যক্তিবিশেষের খামখেয়ালিপনা বা শয়তানীচিন্তাভাবনার কোনো অবকাশ নাই।

সাইয়িদ রফিকুল হক
মিরপুর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
০৩/০৬/২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 8