সুসাইড নোট। 2090

কোন এক অপরিপক্ক মস্তিষ্কের মননের গর্ভে আমার ভ্রুণের উৎপত্তি । যদিও বা আমার জন্মিক সঠিক তারিখ বা সাল নেই। ধারণা করা হয় প্রায় 7000 বছর পূর্বে আমার পরিস্ফুটন ঘটে। জন্ম মূহুর্ত গুলো ছিলো আমার কৌতূহল দ্বীপ্ত।
তখন আমি গ্রন্থাকারে নেই। মানুষের কেবল চিন্তার জগত জাগ্রত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগ, মারাত্মক রোগ ব্যাধির ব্যাখ্যা তারা দিতে পারতো না। তারা আবিষ্কার করলো কিছু অলৌকিক শক্তি যেমন – বাতাস, সাগর,পাহাড়, চন্দ্র, সূর্য, অন্ধকারের ভূত প্রেত, আগুন ও পানি। টিকে থাকার স্বার্থে তারা অগ্নি পূজা, সূর্য পূজা করতো, ভূত -প্রেত, ফেটিশের কাছে আশির্বাদ করতো। শেষতক আমাকে তারা বহু স্রষ্টার আর্শীবাদ হিসাবে জন্ম দিলো।

আমিও বীরদর্পে শৈশব পার করছি। মানুষ নিয়ম করে বিভিন্ন উপঢৌকন দিয়ে আমার সকল স্রষ্টাদের ভীতস্ত শ্রদ্ধাভরে ভক্তি প্রার্থনা করতো। আমি তখন মিটিমিটি হাসি। কারন আমি জানতাম ভয় থেকে প্রকৃত শ্রদ্ধা বা ভক্তি সম্ভব নয়। ভয়ের সংস্কৃতিতে মানুষ আমাকে তাদের চলার পথ করে নিল।
শৈশব পেরিয়ে যখন কৈশোরে পদার্পণ আমার, মানুষ তখন তাদের চিন্তার ক্রমবিকাশে আমার বহু স্রষ্টা (বহু ঈশ্বরবাদ) থেকে বেরিয়ে এক স্রষ্টার দিকে অগ্রসর (এক ঈশ্বরবাদ)। আমিও বেজায় খুশি। অন্তত বহু পিতা থেকে এক পিতা ভাল। আমাকে নিয়ে আরতো অবিশ্বাসীরা টুটটুট করতে পারবে না।
কিন্তু বাধ সাজলো অন্য জায়গায়। “সুখে থাকলে ভূতে কিলায় “।
মানুষগুলোর আর সুখ সহ্য হলোনা। তারা আমাকে টেনে-হেঁচড়ে বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় ভাগ করা শুরু করলো। যৌবনের উদ্বেল হাওয়ায় আমিও জন্ম দিতে লাগলাম শাখা প্রশাখা, যা নিতান্তই মানুষের প্রয়োজনে। সংক্ষিপ্তভাবে কিছু শাখা প্রশাখার কথা না বললেই নয়।

1.জৈন ধর্ম :- ” দৈব চৈতন্যের আধ্যাত্মিক সোপানে স্বচেষ্টায় আত্মার উন্নতি। ”
কালজয়ী এক ডায়লগ নিয়েও তারা বিশ্বজয় করতে পারলো না। অনেক স্বপ্ন ছিল তাদের নিয়ে। স্বপ্নের সমাপ্তি অবশ্য ঘটতে দেয়নি – তীর্থঙ্কর নামে 24 জন মহাজ্ঞানী কৃচ্ছ্বা সাধকের একটি ধারা পর্যায়ক্রমে উদ্ধার করেছে আমার এ শাখাকে। ভারতবর্ষে খুব ভাল ভাবেই টিকে ছিল এরা।

2. ইহুদি ধর্ম(সেমেটিক ধর্ম) :- প্রাচীনতম ধর্ম। আমার এই শাখার মানুষজন আমার সৃষ্টিকর্তাকে জোহবা (Jehovah) নামে ডাকে। এদের অনুসারীরা মোসেয নামে একজনকে জোহবার বাণীবাহক হিসাবে মানে। যিনি সর্বশেষ বাণীবাহক এবং এদের পাঁচটি বইকে একত্রে তোরাহ গ্রন্থ বলে। একবিংশ শতাব্দীতে 140 লক্ষ লোক আমাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা অব্যহত রেখেছিল।

3.খ্রীষ্টান ধর্ম :- এই ধর্মের লোকেরা স্রষ্টাকে ঈশ্বর নামে ডাকে। বাণীবাহক যীশুর পুনরুত্থান ঘটিয়ে, মানুষকে ধাঁধাঁয় ফেলে টিকে যায় তারা। এদের গ্রন্থ ওল্ড টেস্টামেন্ট অবশ্য ইহুদিদের কাছ থেকে ধার করা।

4. বৌদ্ধ ধর্ম :- এই শাখার জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে। গৌতম বুদ্ধ নামে এক ব্যাক্তি অশ্বত্থ গাছের নিচে তপস্যা করে এই ধর্মের জন্ম দেন। আগের জন্মে পূণ্য করায় তিনি বোধিসত্ত্ব লাভ করেন। দ্বিতীয়বার তিনি আর জন্মাবেন না, কারণ মানুষ তার বোধিসত্ত্বের মুখোশ খুলে দিতে পারে।

5. শিখ ধর্ম :- গুরু নানক দেব ও তার 10 জন উত্তরসূর এই ধর্মের মূল ভিত্তি। একেশ্বরে বিশ্বাসী হলেও অবতারে বিশ্বাসী না তারা। এদের ঈশ্বর আবার সর্বব্যাপী। এমনকি আপনার আমার বিষ্টায়ও।”ওয়াহেদপুর গুরু “।

6. হিন্দু ধর্ম :- এর একক কোন গ্রন্থ বা অবতার নেই। স্বয়ং ভগবান মানুষের উপর অসন্তুষ্ট হইয়া পৃথিবীতে এই ধর্ম ছুড়ে ফেলে। যে,যে অংশ খুড়িয়ে পেয়েছে সে ঐ অংশের অবতার। লৌহযুগের ঐতিহাসিক বৌধিক ধর্মই এর প্রধান শিকড়। মহাভারতের ভগবদ্গীতায় অবশ্য কৃষ্ণকে অবতার হিসাবেই দেখা হয়। এর অন্য প্রধান গ্রন্থগুলি হল – উপনিষদ, পুরাণ, রামায়ণ।

7. ইসলাম ধর্ম :- ঐশ্বরিক হিসাবে এটাই সর্বশেষ ধর্ম। পরিবারের ছোট সন্তানটি একটু দুষ্টু হয়। তাই এরা একটু উগ্র (সমালোচনা করলে কল্লা কাটে)। এদের অবতারের ক্যারেক্টারে একটু সমস্যা থাকলেও রাষ্ট্র নায়ক হিসেবে সফল ছিলেন। সকল ধর্মের কপি করা নিয়ম গুলো এখানে পাওয়া যায়। এরা আবার আমার স্রষ্টাকে আল্লাহ বলে।

8. দ্রুজ ধর্ম :- এই ধর্মকে আলাদা ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়না। ইসলাম ধর্মের একটা শাখা আর আমার প্রশাখা বলা যায়। এরা মূলত শিয়া ইসলামের অন্তর্গত।

আমার শাখা প্রশাখা এতোই বেশী (প্রায় 4200) যে আমি নিজেই এদের হিসাব রাখতে পারি না। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ যখন আমার শাখা প্রশাখার জন্ম দিলো, ততোদিনে যৌবনের ত্যাজ হারিয়ে আমি এখন বৃদ্ধ। আরও কিছু দিন বাঁচতে ইচ্ছে হয় আমার। কিন্তু যে মানুষের কল্যাণের স্বার্থে মানুষই আমাকে জন্ম দিয়েছিলো। আজ তারাই আমাকে নাকানি চুবানি দিয়ে ত্যাগ করছে। জীবনের শেষ মূহুর্তে এসে আমি আজ নিঃস্ব। গুটিকয়েক অজ্ঞেয়বাদী টিকে থাকলেও, আমি অবিশ্বাস্য তাদের কাছে। অথচ আমার কারনেই অজ্ঞেয়বাদীরা সৃষ্টিকর্তা নামক স্বত্তার ধারণা পায়। একটা রাউন্ড ফিগার পর্যন্ত(3000 সাল) বেচেঁ থাকার ইচ্ছা স্বত্বেও, অনেক মান-অভিমান, রাগ, ক্ষোভ নিয়ে এই মানুষগুলোকে কোনো প্রকার দোষী সাব্যস্ত না করেই আমি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
মানবতার জয় হোক। মানুষের মুক্তি হোক।

নিবেদক –
মানুষের জন্য মানুষের সৃষ্টি
“ধর্ম ”
তাং – 01/01 /2090 ইং

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

95 − 90 =