যে রাজ্যে হত্যাই একমাত্র সমাধান!

‘‘আমার কাছে ঈশ্বর-চিন্তা আর মানুষের অমরতার চিন্তা সমার্থক। কেউ যদি আমাকে আস্তিক বলেন বিনা বাক্যে মেনে নেব। আমি আস্তিক। যদি কেউ বলেন নাস্তিক আপত্তি করব না। আস্তিক হোন, নাস্তিক হোন, ধর্মে বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, আমি কোন বিবাদের হেতু দেখতে পাইনে। আমার অভীষ্ট বিষয় মানুষ, শুধু মানুষ। মানুষই সমস্ত বিশ্বাস, সমস্ত মূল্যচিন্তা, সমস্ত বিজ্ঞান বুদ্ধির উৎস।’’ রাজনীতি সমালোচক ও কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফা কথাগুলি যখন বলেছিলেন তখন মানুষের রূপ হয়তো মানুষের মতোই ছিলো অথবা ছিলো তার কাছাকাছি। কিন্তু এখন আমাদের রূপ কেমন অবস্থায় আছে? বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা কি নিজেদের মানুষ বলে দাবি করতে পারি? সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে। মনুষ্যকূলের প্রতি আস্থা হারাচ্ছে মানুষ। সর্বদা আতঙ্কিত অবস্থা বিরাজ করছে প্রত্যকের মাঝে। যখন তখন যেখানে সেখানে লাশের মিছিল। মানুষই হত্যা করছে মানুষকে। কী তার উদ্দেশ্য বা কেন এই হত্যাযজ্ঞ? কিছুই জানা নেই। যে হত্যার শিকার হচ্ছে সেও জানে না কি তার অপরাধ? শান্তিপ্রিয় জনগণের মন ছেয়ে গেছে অনিশ্চয়তা আর উৎকণ্ঠায়। আগেও হত্যার ঘটনা ঘটতো। প্রাচীনকাল থেকেই দ্বন্দ্ব সংঘাত লেগে আছে পৃথিবীতে। কিন্তু তাতে নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া যেত। এখন চলছে বিরোতিহীন হত্যা মিশন। ছায়ার মতো সারাক্ষণ সাথে ঘুরছে গুপ্ত ঘাতক। কেউ ধরতে পারছে না। না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। না জনগণ। সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা, রাত যে কোন সময়ই যে কারো উপওে চলছে হামলা। কেউই নিরাপদ নই। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার রাজীব হায়দার থেকে শুরু করে ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন পর্যন্ত আড়াই বছরের ব্যবধানে ছয় জনকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়। অপরাধ হিসেবে প্রচার করা হয় তারা নাস্তিক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হত্যার সংখ্যা বেড়েই চলছে। বাদ পড়ছে না কেউই। অন্ধকারে চলছে দেশ। এক অভিনব মৃত্যুরাজ্যে আমাদের বাস। যে রাজ্যে হত্যাই একমাত্র সমাধান। সংবাদ মাধ্যমে চোখ রাখলেই শুধু হত্যার খবর। সাম্প্রতিক আলোচিত সংবাদ চট্টগ্রামের পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যাকা-। যার রেশ কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার সকালে ঝিনাইদহে মন্দিরে যাওয়ার সময় কুপিয়ে হত্যা করা হয় নলডাঙ্গা দুর্গা মন্দিরের বৃদ্ধ পুরোহিত আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলিকে (৬৯) । এরপর শুক্রবার সকাল সোয়া ৬টার দিকে পাবনা সেবাশ্রমের ২০০ গজ দূরে মানসিক হাসপাতালের প্রধান ফটকের কাছে খুন করা হয় সেবাশ্রমের সেবক নিত্যরঞ্জন পা-েকে। এবং সর্বশেষ নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা জিয়া পরিষদের আহ্বায়ক শামীম মিয়া (৩২) নামে এক যুবকের হত্যার সংবাদ পাওয়া গেছে। সর্বশেষ বলাটাও হয় তো ঠিক হচ্ছে না। নিশ্চয়তা নেই তো। এখনই যে সংবাদ মাধ্যম খুলে আর কোনো হত্যার সংবাদ পাবো না তারগ্যারান্টি কে দিবে? লেখার সময় জিয়া পরিষদের আহ্বায়ক শামীম মিয়া সর্বশেষ হলেও এটি পড়ার সময় যে রনি রেজা হবে না সে গ্যারান্টি কী কেউ দিতে পারবেন? জানি কেউই এ নিশ্চয়তা দিতে পারবেন না। এমনকি আমাদের রাজ্যও না। রাজ্যের কর্ণধরেরা তো কেবল একে অপরের ওপর দায় চাপিয়েই মুক্ত। আর যেন কোনো দায়িক্ত নেই তাদের। জনগণও বেমালুম মেনে নিয়েছে এটা। তারা জেনে গেছে এ রাজ্যের সব সমাধান একটাই। হত্যা। ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, মতানৈক্য, আদর্শগত অমিল, দলীয় স্বার্থ বা প্রতিপক্ষকে দমানোর সহজতর এক সমাধান হত্যা। আর তা যদি হয় রাজনৈতিক চরিতার্থ উদ্ধারের জন্য। তাহলে তো কথাই নেই। নিরিহ মানুষগুলো এ ক্ষেত্রে খুবই উপকারী প্রাণী। সরকারকে ক্ষমতাচ্যূত করতে বিরোধী দলগুলোর সহজপন্থা, কয়েক লক্ষ নিরিহ মানুষের উপর একটা হত্যাযজ্ঞ চালালেই হলো। তাতে কাজ হলো না? বিভিন্ন কায়দায় চালাতে থাকবে এ হত্যাকর্ম। যতক্ষণ না উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে। কোনো সমস্যা নেই। সাধারণ মানুষ মরছে। ওরা তো জন্ম থেকেই সাধারণ নাম ধারণ করে আছে। সাধারণ মরলে রাষ্ট্রের’ই বা কী এমন ক্ষতি হবে? বিরোধী দলগুলোর যেমন কিচ্ছু আসে যায় না। সরকারের বা রাষ্ট্রেরও তেমন কিচ্ছুু আসে যায় না। তাই এ সকল হত্যার বিচারও হয় না। রাজনৈতিক স্বার্থ, ধর্মীয় স্বার্থ, ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে শুরু কওে প্রতিটি ক্ষেত্রেই হত্যাকে বেছে নেয়া হচ্ছে সমাধান হিসেবে। হত্যাকারীরাও কোনো না কোনো ভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি হত্যার পরই দায় স্বীকার করছে আইএস। আর সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে দেশে কোনো আইএস নেই। এটা নিত্যা ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পিটিয়ে মারাকে বলা হচ্ছে উত্তেজিত জনতার শিকার। বাসা থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা কওে চালিয়ে দিচ্ছে বন্ধুকযুদ্ধের নামে। বিদ্রোহী দমনের নামে চলছে গণহত্যা। কোথায় হত্যা নেই? এমনি করেই প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে খতম করার এক অভিনব অভিযান চলছে সারা দেশে। সর্বত্র আজ হত্যাকা-ের জয় জয় কার। অনিশ্চয়তায় ছেয়ে গেছে আমাদের জীবন। বিশেষ কওে যারা একটু লেখালেখি করেন বা মুক্তচিন্তা চর্চা করেন তাদেও তো এক সেকেন্ডেরও নাই ভরসা। সাংবাদিক নির্মল সেন লিখেছিলেন, ‘স্বাভাবিক মৃত্যুও গ্যারান্টি চাই’। স্বাভাবিক মৃত্যু যেন লেখকদেও জন্য একটু বেশীই অনিশ্চিত। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রগতিশীল লেখক ড. হুমায়ুন আজাদকে প্রকাশ্যে কোপানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে শুরু হয় লেখক দমন কর্মসূচী। এরপর এক লম্বা বিরতির পর ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যার মধ্যদিয়ে ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে ব্লগার, লেখক, প্রকাশক, শিক্ষক, পীর, মুয়াজ্জিন, পুরোহিতহত্যা। দিন দিন হত্যার সংখ্যা বাড়লেও বিচার হচ্ছে না। ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে হত্যাকারীরা।

এত কিছুর পরেও আমরা আশায় বুক বেঁধে আছি বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে সকল হত্যার বিচার হবে। যে ভাবে হয়েছে মানবতাবিরোধী রাজাকারদের বিচার। যে ভাবে হয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বিচার। যে ভাবে হয়েছে বুদ্ধিজীবি হত্যার বিচার। কেবল মাত্র এসকল হত্যার বিচারের মাধ্যমেই নির্বিচাওে মানুষহত্যা পদ্ধতির অবসান ঘটানো যেতে পারে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়া যেতে পারে। হত্যাই একমাত্র সমাধান হতে পারে না। সাধারণ জনগণ মুক্তি পেতে চায় এ হত্যারাজ্য থেকে। স্বপ্ন দেখতে চায় একটি সুভ্র সোনার বাংলার।

লেখকঃ কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “যে রাজ্যে হত্যাই একমাত্র সমাধান!

আরণ্যক উৎস শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন জবাব বাতিল

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

74 − = 73