শিশু শ্রম বন্ধ হলে ভাত দিবে কে?

‘আপনারা খালি শিশু শ্রম বন্ধের কথা কন। শিশু শ্রম বন্ধ হলে আমাগো ভাত দিবে কে? আমরা কি না খাইয়া থাকুম? কাম না করলে ভাত নাই। বড় কথা কওনের লাইগা অনেক মানুষ পাওন যায়। কিন্তু ভাত দেয় না কেউ।’ চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে এভাবেই একের পর এক প্রশ্নগুলো করছিলো ১২ বছর বয়সী মটর শ্রমিক মিরাজ।

আজ বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস। প্রতিবছর বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হয় গুরুত্বের সাথে। অনুষ্ঠানে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিয়ে যান সুশীল শ্রেণি। তাতে সমবেদনা ঝরে, এমনকি করণীয় কর্মসূচীর কথাবার্তাও উচ্চারিত হয় জোরালো কণ্ঠে। আবার আমরা দু’দিন বাদেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি অন্য কোন দিবস পালনে বা অন্য বিষয়ে। শিশু অধিকার হয়ে ওঠে নিছক কথার কথা। মিরাজের প্রশ্নের জবাব দেয় না কেউ। আড়ালেই থেকে যায় মিরাজদের জীবন কথা। চলতে থাকে শিশু শ্রম। বাড়তে থাকে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের প্রতি অবহেলা। শুধু বাংলাদেশ নয় এখন সারা বিশ্বেরই ভয়ংকার পেশার নাম শিশু শ্রম। বিভিন্ন দেশের সরকারি, বেসরকারি সংস্থাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠান এর বিরুদ্ধে আলাপ, আলোচনা, পরিসংখ্যান তুলে ধরলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে কোমলমতি শিশুদের। শিশু শ্রম রোধে বিভিন্ন আইন থাকলেও নেই তার প্রয়োগ। নিরুপায় হয়েই দুরন্তপনার এই বয়সে ঘাম ঝড়াতে নামে ওরা।

কথা হলো শিশু শ্রমিক জাহিদের সাথে। আবেগ ঘন কণ্ঠে বললো, ‘আমাগো কি খেলাধুলা করবার মন চায় না? আমরাওতো মানুষ। আমাগোও ইচ্ছা অয় বই নিয়া স্কুলে যাইতে। কন, কেউ কি এ বয়সে কাম করবার চায়? কোনো উপায় না পাইয়াই আমরা কামে আইছি। আপনারা যে শিশু শ্রম বন্ধের কথা কন এতে আমাগো আরো ঝামেলা অয়। মালিকরা কামে নিতে চায় না। এত আলগা দরদ আমাগো লাগবো না। ভিক্ষা তো করি না। কাম কইরা খাই।’

বাংলাদেশের শ্রম আইন (২০০৬) অনুযায়ী শ্রমিকের বয়স ১৪ বছরের নিচে হওয়া যাবে না। কিন্তু বাস্তবে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। শ্রমে নিয়োজিত শিশুরই বয়স ১৪ বছরের নিচে।

শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন কিছু সংস্থার দেয়া তথ্যমতে বর্তমানে দেশে ৭৪ লাখের বেশি শিশু শ্রমের সঙ্গে জড়িত এবং ২০১১ সালের সরকারি একটি জরিপের মাধ্যমে জানা গেছে প্রায় ৭৯ লাখ শিশু বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। এদের বিরাট অংশ ব্যাটারি নির্মাণ কারখানা, চামড়ার কারখানা, মোটর গ্যারেজ, ইটভাটা, চায়ের দোকান, হোটেল, রেস্তোরাঁ, পোশাক কারখানা, জাহাজশিল্প, চিংড়ির হ্যাচারি, জুটমিল, প্লাস্টিক সামগ্রী তৈরির কারখানা, বাসাবাড়িতে ও রাজমিস্ত্রির সাহায্যকারী এবং বিভিন্ন ধরেনের যানবাহনে সাহায্যকারী হিসেবে কাজ করে।

যদিও জাতীয় শিশুনীতিতে ঝুঁকিপূর্ণ ও নিকৃষ্ট ধরনের শ্রমসহ বিভিন্ন ধরনের শ্রমে নিয়োজিত শিশুদের প্রত্যাহারের কথা বলেছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের করে আনার লক্ষ্যে পিতা-মাতাদের আয় বৃদ্ধিমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার জন্য বৃত্তি ও আনুতোষিক প্রদান করার কথা বলেছে তারা। বলা হয়েছিল ২০১৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের শিশুশ্রম নির্মূলের লক্ষ্যে বিভিন্ন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কৌশল ও কর্মসূচি নেওয়ার কথা। আজও তার বাস্তবায়নের দেখা নেই। জাতীয় শিশু শ্রম নীতির অনুসারী পদক্ষেপ হিসাবে শিশু শ্রমিকদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১৯৮৮ সালে শুরু হয় এনসিএলপি পরিকল্পনা । পরিকল্পনায় প্রাথমিক ভাবে বিপজ্জনক কাজ ও পেশায় নিযুক্ত শিশুদের পুনর্বাসনে নজর দেওয়া হয়। এই পরিকল্পনা অনুসারে, বিপজ্জনক কাজ ও পেশায় নিযুক্ত শিশুদের ওপর একটি সমীক্ষা করার পর, তাদের সেই সব কাজ ও পেশা থেকে সরিয়ে এনে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত করার লক্ষ্যে বিশেষ স্কুলে পুনর্বাসন করার পরিকল্পনা গৃহীত হয়।

১৯৭৪ সালের ২২ জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শিশুদের কল্যাণে জারি করেছিলেন জাতীয় শিশু আইন (চিলড্রেন অ্যাক্ট)। যার মাধ্যমে শিশুদের নাম ও জাতীয়তার অধিকারের স্বীকৃতি, সব ধরনের অবহেলা, শোষণ, নিষ্ঠুরতা, নির্যাতন, খারাপ কাজে লাগানো ইত্যাদি থেকে নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তা আর আলোর মুখ দেখেনি। এরপরেও অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে শিশু শ্রম বন্ধে। সরকারি বেসরকারিভাবে গ্রহণ করা হয়েছে অনেক উদ্যগ। এরপরেও শ্রমের ঘনি টানা বেতিত অন্য কোনো উপায় হয়নি তাদের।

তবে আশার কথা হচ্ছে, বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় গরিব ও ছিন্নমূলদের নিয়ে কাজ করছে প্রথম সূর্য, জুম বাংলাদেশসহ একাধিক সংগঠন। চট্টগ্রামে কাজ করছে বেসরকারী সংগঠন ‘অক্ষর গাড়ি’। হয়তো নাম না জানা আরো অনেক সংগঠন আছে যারা এই পথশিশুদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। সরকারের একার পক্ষে হয়তো সম্ভব না, সে ক্ষেত্রে যে সংস্থাগুলো পথশিশুদের নিয়ে কাজ করছে সরকারের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো।

সরকারের পাশাপাশি ওই সংগঠনগুলো যদি সম্মিলিতভাবে কাজ করে এবং এ পথশিশুদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাসহ শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য, বস্ত্র ইত্যাদির ব্যবস্থা করে, তাহলে এ শিশু শ্রমিকদের মধ্য থেকেও আমরা পেতে পারি অনেক ভালো কিছু। বই হাতে স্কুলে যাবে ওরা। আরো সুন্দর হয়ে উঠবে আমাদের পৃথিবী। সম্ভাবনা হাতছানি দিবে ঘাম ঝড়ানো শ্রমিক শিশুদের মাঝে। ওদের হাসিতেও আলো ফুটবে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

84 − 76 =