জাসদ নিয়ে অজয়দাস গুপ্তের প্রতিবেদন। প্যান্ডোরা বাক্সটি না খোলাই মঙ্গলজনক

জাসদ নিয়ে অজয়দাস গুপ্তের প্রতিবেদন। প্যান্ডোরা বাক্সটি না খোলাই মঙ্গলজনক
ডা. মাহফুজুর রহমান:

হঠাৎ করেই জাসদ সম্পর্কে অজয়দাস গুপ্তের একটি লেখা চোখে পড়লো। তিনি একজন সজ্জন ও জ্ঞানি ব্যক্তিত্ব বলে আমি জানি। তবে লেখা দেখে মনে হলো ৭২- ৭৫ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তিনি একেবারেই অবগত নন। অথবা ইচ্ছা করেই ইতিহাসকে ঘোরাতে চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেছেন, এই ইতিহাস জানা জাতির জন্য খুবই জরুরি। তার এই কথার সূত্র ধরেই আমি তৎকালীণ ইতিহাসের কিছু সত্যের উপর আলোকপাত করছি।

* জাসদ সম্পর্কে অজয় সাহেব যে ধারণা দিয়েছেন তা হলো জাসদ বিপথগামি মুক্তিযোদ্ধাদের দল এবং এতো বিপথগামিতা পৃথিবীর কোন মুক্তিযোদ্ধার মাঝে দেখেননি। তিনি জাসদকে দলছুট তারুণ্যের অপরনাম বলে উল্লেখ করেছেন।
অজয় সাহেবের জানার জন্য বলছি, জাসদ সৃষ্টি হয়েছে ছাত্রলীগের একাংশের দ্বারা, আওয়ামী লীগ থেকে সরে এসে কেউ জাসদ সৃষ্টি করেননি। তাই জাসদকে দলছুট তারুণ্যের দল বলাটা হবে অসত্যের অপরনাম। ছাত্রলীগ কিন্তু আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন ছিল না, সহযোগী সংগঠন ছিল। আরো মনে রাখতে হবে জাসদ যখন সৃষ্টি হয় তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন দল ছিল। জাসদ যারা সৃষ্টি করেছেন তারা সহজেই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে গিয়ে প্রচুর সুযোগ সুবিধা হাতিয়ে নিতে পারতেন। কমিউনিস্ট পার্টিসহ সবাই যখন আওয়ামী লীগের করুণা ভিক্ষা করছিল তখন জাসদের ছেলেরা তাদের আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য জীবন দিচ্ছিল। পৃথিবীতে এই রকম ত্যাগের মাধ্যমে দল গঠনের ইতিহাস কয়টি আছে? জাসদ তার আদর্শ কেন বাস্তবায়ন করতে পারেনি সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

জাসদ কারা সৃষ্টি করেছিল তা অজয় সাহেবের জানার দরকার। বঙ্গবন্ধুর অনুমতি নিয়ে ছাত্রলীগের যে ছেলেরা ৬২ সালে স্বাধীনতার জন্য ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়াস সৃষ্টি করেছিল, সে ছাত্রলীগের ছেলেরাই জাসদের জন্মদাতা। এরাই বঙ্গবন্ধুর সম্মতি নিয়ে ৬ দফার আন্দোলনকে স্বাধীনতা আন্দোলনে রূপান্তরিত করে, এরাই স্বাধীনতার পতাকা তৈরি করে, এরাই জয়বাংলা মিছিল নিয়ে ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশ প্রকম্পিত করে, এরাই স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করে এবং বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক ঘোষণা করে স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনে ৭১ সালের ৩ মার্চ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ডাক দেয়। স্বাধীনতার আগে ছাত্রলীগের এই গ্রুপটি সিরাজপন্থী ও পরবর্তীতে রবপন্থী ছাত্রলীগ হিসেবে পরিচিতি পায়। ৭১ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে এসে বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের এই অংশের কথারই প্রতিধ্বনি করতেন। ছাত্রলীগের অপর একটি অংশ মণি গ্রুপ ও পরবর্তীতে সিদ্দিকি গ্রুপ হিসেবে পরিচিত হয়। এই গ্রুপটি ৭১ এর মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ‘সময় হয়নি’ বলে স্বাধীনতার বিরোধিতা করে । কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্রসংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন মার্চে এসে সশস্ত্র ট্রেনিং নেয়া শুরু করলেও খোদ কমিউনিস্ট পার্টি মার্চ এসেও ‘সময় হয়নি’ মনে করে স্বাধীনতার পক্ষে কোন কথা বলেনি। অবশেষে গোটা জাতি যখন যুদ্ধের জন্য তৈরী হচ্ছে তার চূড়ান্ত সময়ে এসে ৭১ সালের ২৩ মার্চ কমিউনিস্ট পার্টি স্বাধীনতা আন্দোলনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ৬১ সালে বঙ্গবন্ধু কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির কাছে গিয়েছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু করার প্রস্তাব নিয়ে। তার কিন্তু তখনও ‘সময় হয়নি’ বলে বঙ্গবন্ধুকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এরপরপরই বঙ্গবন্ধুর অনুমতি নিয়ে নিউক্লিয়াসের সৃষ্টি বা বঙ্গবন্ধু নিউক্লিয়াসের সৃষ্টি করেন। এই সম্পর্কিত তথ্য পেতে সে সময়ের জাতীয় দৈনিকগুলো দেখতে বলবো। এছাড়া আরো দলিল রয়েছে যা আমার কথার সত্যতা প্রমাণ করবে। ছাত্রলীগের সিরাজপন্থীদের স্বাধীনতা আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অগ্রনায়ক বলা যায়। এরাই স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যখন দেখে দেশ তার লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগোচ্ছেনা তখনই ঐতিহাসিক প্রয়োজনে লোভ লালসা ত্যাগ করে জাসদ গঠন করে। জাসদ কিন্তু হঠাৎ করেই গঠিত হয়নি। তার আগে ছাত্রলীগ প্রকাশ্যে ভাগ হয়েছে এবং সিরাজ বা রবপন্থী ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধুর কাছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক দাবিও জানানো হয়েছিল।

এবার দেখা যাক তখন কি পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে ছাত্রলীগের সিরাজপন্থীরা কি দাবি জানিয়েছিল।

অজয় সাহেব পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও বিপ্লবের ইতিহাস নিশ্চয়ই জানেন। পৃথিবীতে এমন দেশ কি একটিও আছে যে দেশে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ বা বিপ্লবের পর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শক্তিসমূহকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যারা বিপরীত শক্তির পক্ষে প্রশাসন চালিয়েছে, কাজ করেছে তাদের ক্ষমতার অংশীদার বানানো হয়? অজয়সাহেব নিশ্চয়ই জানেন বাংলাদেশ পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে বাঙালি আল বদর রাজাকারদের বাদ দিলেও , তাদের বিচারের মাধ্যমে সাজা দিতে থাকলেও, নয় মাস ধরে যারা পাকিস্তানের হয়ে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন চালিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধা হননে কাজ করেছে তাদের সবাইকে প্রশাসনে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছিল শুধু মাত্র তারা ‘বাঙালি’ এই পরিচয়ের কারণে। তারা পদমর্যাদাসহ সব কিছু ফেরত পেয়েছিল। হ্যাঁ, মুক্তিযুদ্ধে যে সামরিক-বেসামরিক আমলারা গিয়েছিলেন তারা পদোন্নতি পেয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু এই পদোন্নতিও প্রশাসনের জন্য সুখকর হয়নি। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে এসেই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহন করে ৭০ এর নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে বাংলাদেশ গণপরিষদ গঠন করলেন। ৭০ এর নির্বাচনে এমএনএ ও এমপিএ ছিলেন ৪৫৫ জন। এদের নিয়ে বাংলাদেশ গণপরিষদ হয়। ৭২/১০ এপ্রিল গণপরিষদের অধিবেশন বসে। এর আগে ২৩ জন সদস্যকে বহিষ্কার করা হয় দুর্নীতির অভিযোগে। সংবিধান করার দায়িত্ব দেয়া হয় গণপরিষদকে। অজয় সাহেবের জানার কথা, এই গণপরিষদের অন্তত অর্ধেক সদস্য মুক্তিযুদ্ধে এমন কোন অবদান রাখেননি যার দ্বারা তারা সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন দেশের নেতা হতে পারতেন। কিন্তু তারা দেশের নেতা হয়ে গেলেন। বঙ্গবন্ধু একটি মন্ত্রীসভাও গঠন করলেন। মুশতাকের মতো লোক মন্ত্রী সভায় স্থান পেলো যিনি ভারতে বসেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতায় লিপ্ত ছিলেন। বলা চলে শুরুতেই দেশকে ফিরিয়ে নেয়া হলো স্বাধীনতা পূর্ববর্তী অবস্থায়। রাজাকার প্রশাসন আর মুক্তিযোদ্ধা প্রশাসনের দ্বন্দ্ব, মুক্তিযোদ্ধা আওয়ামী লীগার আর মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন না বা বিরোধিতা করেছেন এমন আওয়ামী লীগারদের মাঝে ( মুশতাক গং) দ্বন্দ্ব দেশকে এক অনিশ্চয়তার পথে নিয়ে যেতে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে সিরাজপন্থী ছাত্রলীগ নেতা আসম রব, শাহজাহান সিরাজ, শরীফ নুরুল আম্বিয়া ১৯৭২ সালের ২৬ মে এক বিবৃতিতে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে গণপরিষদ ও মন্ত্রীসভা বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিপ্লবী জাতীয় সরকার গঠনের দাবি জানান। তাদের দাবি ছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারি সকল দল ও পেশার মানুষকে এই সরকারে নিতে হবে। আগে দেশ গঠন করতে হবে। এরপর নির্বাচন, সংবিধান নিয়ে ভাবলে চলবে। এই দাবি কি অযৌক্তিক দাবি ছিল? যুদ্ধের মাধ্যমে এক বিপুল শক্তির বিকাশতো হয়ে গেছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় এরাতো অংশ গ্রহনের নৈতিক অধিকার অর্জন করেছিলো। তাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় নেয়া কি উচিত ছিল না? এখানে ছাত্রলীগের কেউতো ঠাঁই পেতোনা। ঠাঁই পেতো মৌলানা ভাসানী, মনি সিংহ, মোজাফ্ফর আহমদ প্রমুখ। সেক্টর কমান্ডার, বিএলএফ জোনাল কমান্ডার, কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত গেরিলা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ডের নেতারা স্থান পেতেন। দেশ শাসনের অধিকারতো তারা অর্জন করেছিলেন। কিন্তু তা হলোনা। পুরানো সব নেতাকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়া হলো। জাসদের সমালোচনা করতে হলে এইসব কথা আসাতো প্রাসঙ্গিক ছিলো। তাই না?

তারো আগে ৭২ মে মাসে ডাকসু নির্বাচন হয়। নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়ন বিজয়ী হয়। সিরাজপন্থী যা তখন রবপন্থী ছাত্রলীগ নামে পরিচিত, দুটি হলে জিতে। মণি পন্থী যা তখন সিদ্দিকিপন্থী ছাত্রলীগ নামে পরিচিত, কোন আসন পায়নি। উভয় গ্রুপ নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন। বলা চলে স্বাধীনতা যারা চাইতো, স্বাধীন দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য যাদের ছিল, ছাত্রলীগের মাঝে শক্তিশালী অবস্থানে যারা ছিল তারা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে ফিরিয়ে নেয়া হলো ঔপনিবেশিক এক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দিকে।

এরপরও রবপন্থী ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কোন অবস্থান নেয়নি। ১৯৭২ সালের ২১ জুলাই ছাত্রলীগের দুই গ্রুপই সম্মেলন ডাকে। উভয় গ্রুপের প্রধান অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু। নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধুর এতে সম্মতি ছিল। বঙ্গবন্ধু সিদ্দিকি গ্রুপ ছাত্রলীগের সম্মেলনে গিয়ে এবং রব গ্রুপ ছাত্রলীগ সম্মেলনে না এসে ছাত্রলীগের বিভক্তিকে চূড়ান্ত রূপ দেন। বঙ্গবন্ধু জানিয়ে দেন, তিনি যা করছেন তাই সঠিক। এর কয়েক মাস পর ৭২ সালের ৩১ অক্টোবর রবপন্থী ছাত্রলীগাররা জাসদের জন্ম দেন। তাই জাসদের লোকজন ও জন্ম সম্পর্কে অজয় সাহেব যে ধারণা দিতে চেয়েছেন তা তার সংর্কীণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ হতে পারে কিন্তু কোন ক্রমেই নিরপেক্ষও নির্মোহ কোন বক্তব্য নয়। এতে সত্য এবং যুক্তি কোনটিই নেই।

অজয় সাহেব তার বক্তব্যে জাসদ গঠনকারিদের বিপথগামী মুক্তিযোদ্ধা বলেছেন। সত্য হলো এই তরুণেরাই একটি স্বাধীন দেশে যে ধরনের সরকার গঠন করতে হয় তার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এই কাজটি করা উচিত ছিল কমিউনিস্ট পার্টির। তাহলে হয়তো জাসদ গঠনের প্রয়োজন হতো না। রাষ্ট্র যখন বিপথে চলছে তখন সঠিক কথা বলাকে বিপথগামিতা বলে আখ্যা দেয়া কেন? বঙ্গবন্ধু ভেবেছিলেন এখনতো দেশ স্বাধীন। মা-বোন ধর্ষণ কারী, লুটপাটকারী, মানুষহত্যাকারি রাজাকার বদর ছাড়া সবাইতো এক হয়ে কাজ করা উচিত। তিনি ভদ্রলোক লেবাসধারীরা যে দেশ ও তাঁর নিজের সর্বনাশ করতে পারে তা ভাবেননি। তার এই ভুল ভাবনাতে আঘাত করেছিল জাসদ। এটা বিপথগামিতা হয় কি করে? বঙ্গবন্ধুতো বাকশাল গঠন করে জাসদের দাবির যৌক্তিতাই প্রমাণ করেছিলেন যদিও তা তখন আর সময়োপযুগী ছিল না। কারণ প্রশাসন ও তার দলের প্রভাবশালীরা এবং আমেরিকা তা মেনে নেয়নি। বলা যায় জাসদ গঠিত হয়েছিল জাতির এক ঐতিহাসিক প্রয়োজনে। পরবর্তীতে জাসদের শীর্ষ নেতাদের হঠকারি কর্মকান্ডের কারণে জাসদ বিলুপ্তির পথে গেছে। সেটা আরেক বিষয়।

অজয় সাহেবের অভিযোগ জাসদ ব্যাংক ডাকাতি করেছে এবং সে টাকার হিসেব দেয়নি, লুটপাট করেছে, সারা দেশে আগুন লাগিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। এই তথ্যটি অজয় সাহেব কোথায় পেলেন? জাসদের বিরুদ্ধে এই জাতীয় অভিযোগ এনেছেন মুক্তিযুদ্ধকালীণ বিমান বাহিনী প্রধান এ কে খন্দকার। তিনিও কোন সূত্র দেন নি। এটাই কি অজয় দাস গুপ্তের সূত্র? এ কে খন্দকার সাহেবতো স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর কর্তৃত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। অজয়দাস গুপ্ত কি এ কে খন্দকারের এইসব লেখা সঠিক মনে করেন? এ কে খন্দকারকে যদি সূত্র হিসেবে ধরে অজয় গুপ্ত এইসব অভিযোগ করে থাকেন তবে ভয় হয় খন্দকাররা ইতিহাস বিকৃত করতেই থাকবেন আর তা অজয়গুপ্তদের হাত ধরে এমনি ভাবে বিকশিত হতেই থাকবে।৭২-৭৫ সালের কোন পত্রিকায় এই জাতীয় সংবাদ আমি দেখিনি। ব্যাংক ডাকাতির কোন তদন্ত রির্পোটেও এই জাতীয় সংবাদ আমার চোখে পড়েনি। ব্যাংকের অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কে এই সময়ের পত্রিকায় কিছু সংবাদ আছে যার কোথাও জাসদের কোন নেতার নাম নেই। এইসব সংবাদে ব্যাংক ম্যানেজারদের নাম এসেছে। জাসদের কোন লোক ব্যাংক ম্যানেজার ছিলেন কি? জাসদ কোথায় আগুণ লাগালো তাও তিনি উল্লেখ করেননি। হ্যা, তৎকালীণ সংবাদপত্রের সূত্র অনুযায়ী বিভিন্ন পাটের গোদামে আগুণ লাগানো হয়েছিল। সংবাদপত্রগুলোর সংবাদ থেকে আরো জানা যায় পচা পাট কিনা, কম পাট কিনে বেশি পাট দেখানো ইত্যাদি অপকর্ম ঢাকতে পাট কলের কিছু কর্মকর্তা নিজেরাই পাট গোদামগুলোতে আগুন লাগায় এবং তাদের অনেকেই গেফতার হয়। অজয় সাহেবের জানার কথা এইসব পাটকলসহ অনেক মিল ফ্যাক্টরীতে সরকার প্রশাসক হিসেবে তাদের দলের লোকদের নিয়োগ দিয়েছিল। তিনি কার দোষ কার উপর চাপালেন এবার পাঠকরাই তা বুঝে নিন।

*অজয় দাস গুপ্ত লিখেছেন তিনি নিজে জাসদপন্থী ছাত্রলীগারদের ছাত্রনেতা ওবায়দুল কাদের ও বাহালুল মজনু চুন্নুকে আলাওল হলে আটকে রাখতে দেখেছেন। এটাতো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে জাসদপন্থী ছাত্রলীগের শক্তির প্রমাণ দেয়। হয়তো বলবেন এটা কি ধরনের শক্তি হলো। ৭২-৭৫ সালে ছাত্রলীগের উভয়গ্রুপ এই শক্তির প্রদর্শণ করতো । ঔপনিবেশিক শাসনে এটাতো গণতন্ত্রেরই একটা রূপ। এটার কথা বললেন আর জাসদের জন্মলগ্নেই সিদ্দিক মাস্টার হত্যার কথা বললেন না, বিভিন্ন স্থানে মুজিববাদী ছাত্রলীগ ও রক্ষী বাহিনী কর্তৃক শত শত জাসদ ও জাসদপন্থী ছাত্রলীগারদের হত্যার কথা বললেন না এটা কেমন হলো? আসলে জাসদ বনাম আওয়ামী লীগের মাঝে তখন হত্যা খুনের পাল্টাপাল্টি রাজনীতি চলেছে। এরজন্য এক পক্ষকে দায়ী করা কেন? এই খুনোখুনিতে উভয় পক্ষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে এবং উভয় পক্ষের উচিত ছিল এটা এড়িয়ে চলা। বিশেষ করে এই খনোখুনি বন্ধের উদ্যোগ নেয়াতো সরকারি দলেরই কাজ ছিল। তাই না? কিন্তু একপক্ষকে দায়ী করে এব্যাপারেও অজয় সাহেব তার পক্ষপাতদুষ্টতার স্বাক্ষর রাখলেন। ৭২-৭৫ সময়ের রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারণা না থাকার জন্যও এটা হতে পারে। এই সময়ের ধারণা না নিয়ে জাসদ সম্পর্কে লেখা কি তবে ঠিক হলো?
*অজয় দাসের অভিযোগ জাসদের সভা মিছিলে এতা বেশি লোক হওয়ার কারণ ছিল জাসদের সভা মিছিলে মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, জামায়াতে ইসলাম, ভাসানী ন্যাপ, চৈনিক কমিউনিস্টদের লোকসব এসে জড়ো হতো। মিছিলে কারা কারা গেল তা অজয় গুপ্ত চিনলেন কি করে? চট্টগ্রাম জাসদের দায়িত্বশীলদের একজন হিসেবে আমি জোরের সাথে বলতে পারি জাসদের মিছিলে মূলত ছাত্ররাই থাকতো। জাসদ তখনো জনগণের দল হয়ে উঠেনি। জাসদের মিছিলে আমাদের সব সময় তৈরী থাকতে হতো মার খাওয়া বা মার দেয়ার জন্য। তাই এখানে অন্যদলের কোন লোক আসারই সাহস পেতো না। দলটি ছিল শতকরা একশতভাগ মুক্তিযোদ্ধার দল। না , মুক্তিযোদ্ধাদের একশতভাগ জাসদ করতো না, জাসদের সবাই ছিল একেবারে মাঠ পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধা। জেলা-থানা-ইউনিয়ন-বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজের সব কমিটিগুলো ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে। আবার অজয় গুপ্ত যেন বলে না বসেন, ছাত্ররা মুক্তিযোদ্ধা হয় কি করে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ৭২ সালে ছাত্র ইউনিয়ন জিতেছিল। অজয় গুপ্তের এই মত যদি মেনে নিতে হয় তবে তো বলতেই হয় বদর, রাজাকাররা এসে ছাত্র ইউনিয়নকে ভোট দিয়েছিল। এতো ভোটতো তাদের পাওয়ার কথা নয়। না, আমি এটা বলবো না। আমার মতে ছাত্ররা ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে নতুন দেশে একটি নতুন রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা চেয়েছিল এবং এই আশায় তারা ছাত্র ইউনিয়নকে ভোট দিয়েছিল। একই বছর রাকসুতেও ছাত্র ইউনিয়ন জিতেছিল। ছাত্রদের এই আশা ভঙ্গ হয়েছিল পরের বছরই। পরের বার ৭৩ সালে ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্রলীগ( সিদ্দিকি গ্রুপ) যৌথ প্যানেল দিয়েও ছাত্রলীগ(রব) এর সাথে না পেরে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করেছিল। তখন ছাত্ররা জাসদের মাঝেই তাদের এবং সাধারণ মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল। তাই তারা জাসদপন্থী ছাত্রলীগকে ভোট দিয়েছিল। জাসদ এই মুক্তি আনতে পারেনি। কোন দলের মিছিল যদি বড় হয় তবে সেই মিছিলে অন্যদলের লোক থাকে বলে যে ধারণা তা কিন্তু ঠিক নয়। ভাড়াটিয়া লোক থাকতে পারে। এই সংষ্কৃতি এখন চালু থাকলেও ৭২-৭৫ সালে ছিল না। অজয়গুপ্তে এই ধারণার কারণ ৭২-৭৫ রাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞান না থাকা। ভোট যুদ্ধে মেজর জলিলের ভোট দেখে অবাক হয়েছেন অজয় গুপ্ত। তার মতে এই ভোট বদর রাজাকারদের দেয়া। এটা হতেও পারে। তবে এতে অবাক হওয়ার কি আছে? রাজনীতির সাধারণ নিয়মতো এটাই। বিএনপি, আওয়ামী লীগ বিরোধী ভোটে জিতে। তখন জাসদ আওয়ামী লীগ বিরোধী ভোট পেয়েছে। এই ব্যাপারে আগেরটা বললে, বর্তমানেরটাও তো বলা দরকার। আর জাসদের অস্ত্রবাজীর কথা কথা বলে অজয়গুপ্ত ছাত্রলীগ ছাত্রইউনিয়নের ব্যালট ছিনতাই এড়িয়ে গিয়ে কি ইতিহাসের সঠিক পাঠ দিলেন?

* সমাজতন্ত্রের আগে বৈজ্ঞানিক শব্দটি লাগানো নিয়ে অজয় সাহেব কটাক্ষ করেছেন। অজয় সাহেবের জানার কথা রবার্ট ওয়েনরা যখন ইংলন্ডের পুঁজিপতিদের কাছে অনুনয় বিনয় করে শ্রমিকদের অধিকার চাইছিলেন এবং এটাকে সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি বলে উল্লেখ করছিলেন তার বিপরীতে ফ্রেডারিক এঙ্গেলস শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলেন। এই ‘বৈজ্ঞানিক’ শব্দটিতো জাসদের সৃষ্টি নয়। এটা নিয়ে কটাক্ষ করার মানেতো সমাজতন্ত্রের স্বীকৃত অথরিটিকে অস্বীকার করা। জাসদকে দেখতে না পেরে ফ্রেডারিক এঙ্গেলস এর প্রতি কটাক্ষ করে ফেলা হলো না কি? কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে কোন মন্তব্য করার ধৃষ্টতা আমার নেই। তবে আমার কাছে মনে হয় আমাদের কমিউনিস্ট পার্টি সঠিক লাইন তখনো নেয়নি এখনো সঠিক পথে হাঁটছে না। আর ৭২-৭৫ সালে আওয়ামী লীগ. শেখ ফজলুল হক মণি, কমিউনিস্ট পার্টি-সবাই সমাজতন্ত্রের কথা বলছিল। জাসদের কাছে তা ইউটোপিয়ান মনে হয়েছিল। তাই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলেতো জাসদ কোন অন্যায় করেনি। তাই নয় কি? এখনো ২০১৫ সালে এসেও আওয়ামী লীগ- জাসদ- কমিউনিস্ট পার্টিসহ অনেক দলই সমাজতন্ত্রের কথা বলছে যা আমার কাছে ইউটোপিয়ান মনে হয়।

বঙ্গবন্ধু ও চার নেতার হত্যাকান্ডের পরপর জাসদ নেতাদের দেখা পাওয়া যায়নি বলে অজয়গুপ্ত ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর জিজ্ঞাসা জাসদ নেতারা তখন কোথায় ছিলেন? এটাও অবাক করা এক ব্যাপার। বাকশাল গঠনের পর জাসদতো বাকশালে যোগ দেয়নি। জাসদের প্রথম সারির সব নেতাই তো তখন জেলে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ প্রথমে জানানো উচিত ছিলতো আওয়ামী লীগের এবং তাদের ক্ষমতার পার্টনার মোজাফ্ফর ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির। আর জানানো উচিত ছিল বঙ্গবন্ধু যাদের বাকশালে নিয়েছিলেন সেই মে.জে.শফিউল্লাহ,মে.জে. জিয়ার। সবচাইতে অবাক করা ব্যাপার হলো তখন দেশের উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন সম্ভবত সৈয়দ নজরুল ইসলাম। প্রেসিডেন্টের মৃত্যু হলে তারই প্রেসিডেন্ট হওয়ার কথা এবং একই সাথে সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়ার কথা। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন মনসুর আলী। এই দুইজন ব্যক্তিত্ব কেন দ্রুততার সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলায় এগিয়ে এলেন না সেই প্রশ্ন কিন্তু অজয় সাহেব করেননি। সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে সৈয়দ নজরুল ইসলাম বিদ্রোহীদের নিরস্ত্র করতে সেনা প্রধানকে আদেশ দিতে পারতেন । এই ব্যাপারে অজয় সাহেবরা নিরব! আমি বলছি না সৈয়দ নজরুল ইসলাম বা মনসুর আলী তাদের কাজে অবহেলা করেছেন। আসলে তখন কারো কিছু করার ছিল না। করার ছিল একটিই , তা হলো বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করে মুশতাকের গুণগান করা যেমন করেছিলেন তৎকালীণ রাষ্ট্রের তৃতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি স্পীকার আবদুল মালেক উকিলসহ অসংখ্য নেতা। নুরে আলম সিদ্দিকিসহ আওয়ামী লীগের তরুণ ও বয়স্ক নেতারা মুশতাকের সাথে যোগ দেন। মুশতাক যে মন্ত্রীসভা গঠন করেন তারাতো আওয়ামী লীগার ছিলেন। আর অজয় সাহেবরা কিনা প্রশ্ন করছেন জাসদ কোথায় ছিল? অজয় গুপ্তের চেখে আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ মোজাফ্ফর কলঙ্কিত হলো না, কলঙ্কিত হলো জাসদ! অন্ধ দৃষ্টিভঙ্গি আর কাকে বলে!

জাসদ মুশতাকের সাথে বৈঠক করেনি বা তার অনুগ্রহ ভিক্ষা করেনি। অজয়গুপ্ত বোধহয় জানেন না, আওয়ামী লীগের সময় জাসদ নেতা কর্মীদের যেমন হত্যা করা হয়েছে মুশতাকের সময়ে তেমনি হত্যা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আমলে চট্টগ্রাম জাসদ বা আওয়ামী লীগের কেউই নিহত না হলেও মুশতাকের সময় দক্ষিণ জেলা জাসদ নেতা ও পটিয়া অঞ্চলের বিএলএফ নেতা আবু তাহের খান খসরু নিহত হয়েছেন। সারা দেশে মুশতাক কর্তৃক নিহত জাসদ কর্মীর সংখ্যা ৭০- ৮০ জনের মতো হবে।

* অজয় গুপ্ত জাসদকে ভারত বিরোধী একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন। জাসদ ভারত বিরোধী ছিল এটা সত্য। কিন্তু ভারত বিরোধী হলেই তা সাম্প্রদায়িক হবে এই চিন্তা কেন? অজয় গুপ্ত কি ভারত বিরোধীতাকে সাম্প্রদায়িকতা মনে করেন? এটাতো চিন্তার এক মহাদৈন্যতা।

* অজয় গুপ্ত গণবাহিনীকে ভয়ের চোখে দেখেছেন। গণবাহিনী কখনো সাধারণ মানুষের গায়ে হাত দেয়নি বা হত্যা করেনি। তাই অজয়গুপ্ত কেন ভয় পেলেন বোঝা গেল না।

* অজয় দাস গুপ্ত বলেছেন জাসদ ৭৫ এর আগস্টে মুশতাকের চাইতে কম ভুমিকা পালন করেনি। কিভাবে এই ভুমিকা জাসদ পালন করলো তার ব্যাখ্যাতো দরকার ছিল যা তিনি দেন নি। বঙ্গবন্ধু হত্যার সাথে জাসদকে কোন ভাবেই জড়ানো সম্ভব হয়নি। তাই এখন অনেকেই প্রেক্ষাপটের দোহাই দিয়ে জাসদের উপর কিছুটা হলেও দোষ চাপাতে চাইছেন। এর উদ্দেশ্য হলো নিজেদের দোষ আড়াল করা। প্রেক্ষাপট তৈরীর কিছু অংশ আগেই বলেছি যেমন পাকিস্তানি প্রশাসন বহাল রাখা, ৭০ এর নির্বাচিত সব এমপিকে দেশের দায়িত্বে আনা, পাকিস্তানি আমলাদের পুনর্বহাল করা নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আওয়ামী লীগের বাইরে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের দলসমূহকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার না করা ইত্যাদি। ৭৪ সালের পত্রিকাগুলোর নিত্য দিনের খবর ছিল- চোরাচালানের তীব্রতা বাড়া, এমনকি সরকারি ছাত্রলীগের চোরাচালানের বিরুদ্ধে কর্মসূচি ঘোষণা করা (৭৪ সালের ৩ নভেম্বর), সরকারি খাদ্য গোদাম থেকে চাল পাচার, পচা পাট ক্রয় , পাটের ওজন কম, পচা পাটের চিহ্ণ মুছে দিতে পাট গোদামে আগুন লাগানোর অভিযোগে গ্রেফতার, ভুয়া রেশন কার্ড উদ্ধার, সার কারখানায় বিষ্ফোরণ, কোটি টাকার পাটের গুড়া উদ্ধার, দুর্ভিক্ষে মানুষ মরা- এই জাতীয় হাজারো খবর। মন্ত্রীরা পর্যন্ত চোরাচালান রোধে সভা সমিতি করেন। দুর্নীতি এতই ভয়াবহ ছিল যে ৭৪ সালের ১৭ নভেম্বর কমিউনিস্ট পার্টি বর্তমান সরকারের পরিবর্তে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দুর্নীতিমুক্ত সরকার গঠনের দাবি জানায়। এর সাথে কি জাসদের সম্পৃক্ততা ছিলো? মহসীন হলে কোহিনুর হত্যাসহ সরকারি ছাত্রলীগের নয়জন কর্মীকে হত্যার সংবাদ গোটা ৭৪ সাল ধরে আলোচিত ছিল। এটাতো করেছিল সরকারি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম প্রধান। এর মাঝেই আমেরিকা বন্ধুর হাত বাড়ানোর অভিনয়ে আসে। আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের বিরোধিতাকারী কিসিঞ্জার বাংলাদেশ আসেন ৭৪ সালের ২৮ অক্টোবর। তাজুদ্দিন আহমদকে পদত্যাগ করানো হয় ৭৪ সালের ২৫ অক্টোবর । অনুমিত কিসিঞ্জারকে খুশী রাখতেই এই কাজ। কথায় আছে,‘ আমেরিকা যার বন্ধু তার আর কোন শত্রু লাগে না।’ কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে খাদ্যসহ বিভিন্ন দিকে সহায়তা করবেন বলে আশ্বাস দেন বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধু সরল মনে তা বিশ্বাসও করেন। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের সবচাইতে বিশ্বস্থ ব্যক্তিত্ব তাজউদ্দিন আহমদের বিদায় ও মুশতাকের আরো শক্তি অর্জন ক্ষমতা কাঠামোতে বঙ্গবন্ধুকে যে বিপর্যয়ে ফেললো তা অজয় গুপ্ত কেন দেখলেন না তা ভাবতে অবাক লাগে। কিসিঞ্জার একহাতে খাবার পাঠালো, অন্য হাতে তা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে গায়েব করে বঙ্গবন্ধুকে মহা বিপদে ফেললো। মুূলত এইসব কর্মকান্ডই বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরী করতে থাকে। হ্যাঁ, একই সাথে আওয়ামী লীগার হত্যার খবর, থানা ফাঁড়ি লুটের খবরও ছিল। ৭৪ সালের ১৭ মার্চ জাসদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাসভবন আক্রমণ করে । সেখানে জাসদের বেশ কিছু কর্মীকে হত্যা করে এই আক্রমণ ঠেকিয়ে দেয় সরকার। ১৮ মার্চ সরকারি ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগও তো আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে জাসদ অফিস আক্রমণ করে। এই জাতীয় কাজ ছাত্র ইউনিয়নও করেছিল। ৭২ সালের মে মাসে ডাকসু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ৭৩ সালের ১ মে ভিয়েতনাম দিবস পালনের সময় মতিউল ও কাদের নিহত হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ডিগ্রি ছাত্র ইউনিয়ন ছিঁড়ে ফেলে। এরপর সরকারি দলের মারের চোটে বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমা চেয়ে রক্ষা পায়। জাসদ নেতারা বঙ্গবন্ধুকে গালাগাল করতেন বলে অভিযোগ অজয় গুপ্তের। একই অভিযোগ আছে মতিয়া চৌধুরীর বিরুদ্ধে। কাউকে গালাগালি করলে তার হত্যা প্রেক্ষাপট তৈরী হয়ে যায় এমন অদ্ভুত তত্ত্ব আগে শুনিনি। সরকার রক্ষীবাহিনী দিয়ে জাসদ, সিরাজ সিকদার সহ সবাইকে সাফল্যের সাথে দমিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। সরকার দমিয়ে রাখতে পারেনি সরকারি দলের একাংশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের বেশির ভাগের অপকর্মকে। তৎকালীণ দাপুটে নেতা যুবলীগ প্রধান শেখ ফজলুল হক মণি বার বার অভিযোগ করছিলেন সরকারের বিরুদ্ধে, সরকারি ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাদের জেলে আটকে রাখার জন্য। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতা ও যুবনেতাদেরতো আর রাজনৈতিক কারণে জেলে নেয় নি। এইভাবেই সরকারি দল ও প্রশাসনের কর্মকান্ড বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরী করতে থাকে। ফলে জাসদ বা বামেরা বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রেক্ষাপট তৈরী করেছিল এবং ৭৫ আগস্টে জাসদ মুশতাকের চাইতে কম ভুমিকা রাখেনি বলা মানে সেদিনের সত্যকে সরাসরি অস্বীকার করা, আসল সত্যকে লুকিয়ে রেখে উদোর দোষ বুধোর ঘাড়ে চাপানো। তাই নয় কি?

আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টিসহ অনেক দল ও অজয় দাস গুপ্তসহ অনেকের ধারণা সেদিন যদি জাসদ গঠিত না হতো তবে সব ঠিকঠাক চলতো। বঙ্গবন্ধু নিহত হতেন না, আওয়ামী লীগের এই বিপর্যয় ঘটতো না। মূলত এই ক্ষোভ থেকেই তারা অনেক অসত্যকে সত্য বলে চালিয়ে দিতে চান। উদ্দেশ্যতো আগেই বলেছি।

এই প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধতো আওয়ামী লীগ- কমিউনিস্ট পার্টিকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য হয়নি। একটি শোষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্যই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধা এ কে খন্দকারসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও পন্ডিত তা স্বীকার করেন না। আমি তাদের বলবো ৭১ সালের ফেব্রুয়ারি- মার্চের দৈনিকগুলো পড়ে দেখুন, উত্তর পেয়ে যাবেন। দলের অনেকের বিরোধিতা এবং নিষ্ক্রিয়তা সত্ত্বেও তাজউদ্দিন আহমদের পরিচালনায় এই যুদ্ধের নেতৃত্বে দিয়েছিলো আওয়ামী লীগ তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। সে সময় আওয়ামী লীগ জাতির ঐতিহাসিক প্রয়োজন মিটিয়েছে। আওয়ামী লীগের পরবর্তী ঐতিহাসিক দায়িত্ব ছিল মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ, একটি শোষণমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর প্রবর্তন করা। কিন্তু স্বাধীনতার পর যখন ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা চালু হলো তখনই প্রতিবাদ জানালো ছাত্রলীগ এবং পরে গঠিত হলো জাসদ। স্বাধীনতার পর ৭২-৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগ নেতারা বিভিন্ন বক্তৃতায় শোষণমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের কথা বার বার বলছিলেন। ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা বহাল রেখে যে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন বা শোষণহীন সমাজ গঠন করা যায় না এই সত্যটি বার বার তুলে ধরতে চেষ্টা করেছে জাসদ। সমস্যা মোকাবেলায় বার বার সর্বদলীয় সরকার গঠনের দাবি জানিয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের দাবি জানিয়েছে, নতুন সরকার গঠিত না হলেও আবার ক্ষমতাসীন দলের পার্টনার হয়ে ত্রিদলীয় ঐক্যজোট গঠন করেছে। জাসদ ক্ষমতার পার্টনার হয়নি এই যা।

এখন মনে করুন অজয় দাস গুপ্তদের চাহিদামতো রবপন্থী ছাত্রলীগ এসবের বিরোধিতা না করে বঙ্গবন্ধুর সব কাজে একমত হয়ে আওয়ামী লীগে যুক্ত হলো। তা হলে কি হতো? তৎকালীণ অপকর্ম কি কমতো? অপকর্ম কি থামাতে পারতো? উত্তরে বলা যায় আওয়ামী লীগে তখনো বঙ্গবন্ধুর মতো বিশাল নেতা ছাড়াও তাজউদ্দিন , সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী, কামরুজ্জামানের মতো ত্যাগী নেতা ছিলেন। তারা প্রশাসন, আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ নেতাদের এক অংশের সেদিনকার কর্মকান্ড বন্ধ করতে পারেননি। এই ক্ষেত্রে রবপন্থী জুনিয়র ছাত্রলীগ নেতারা কি করতে পারতো? বরঞ্চ আমার মনে হনে হয়, রবপন্থী ছাত্রলীগার সরকারে যুক্ত হলে অবস্থার আরো দ্রুত অবনতি হতো। কারণ ৬২ সাল থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত যে আদর্শে তারা লালিত হয়েছিল সে আদর্শ ছেড়েই তাদের যেতে হতো। আর মেধাবীরা যখন ক্ষমতার স্বাদ নেয়ার জন্য আদর্শ ত্যাগ করে তখন তারা কি ধরনের কাজ করতে পারে আজকের অনেক দলত্যাগী নেতাই তার প্রমাণ। অজয় দাস গুপ্ত এই নেতাদের কথা বিলক্ষণ জানেন, তাই তাদের কারো নাম উল্লেখ করলাম না।

অজয় দাসগুপ্তসহ যারা উন্নত এক সমাজ ব্যবস্থা চান, যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন করতে চান ( আমার জানা মতে অজয় দাস গুপ্ত চান) তাদের বলবো জাসদের পেন্ডারা বাক্সটি খোলার চেষ্টা না করতে। এই পেন্ডারা বাক্সে এমন সব তথ্য আছে যা পুরোপুরি খুলে গেলে জাসদের কিছুই হবে না। আর হওয়ার জন্য জাসদের বাকিই বা কি আছে? এটাতো বিলুপ্ত প্রায় দল। কিন্তু অনেক দলের মুখ থুবরে পড়বে। অনেক নাম করা নেতা বিপাকে পড়বেন। তাই আসুন এসব কল্পিত কাহিনী ( কল্পিত কাহিনী এজন্যই বলছি, জাসদ সম্পর্কে যে সব অভিযোগ এই পর্যন্ত করা হয়েছে তা দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যকান্ডের প্রেক্ষাপট তৈরী হয়েছে তা প্রমাণিত হয়নি) বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করি। আর এটা করতে হলে প্রথমেই যে কাজটি করতে হবে তা হলো ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তণ ঘটিয়ে স্বাধীন দেশের উপযোগী একটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রবর্তন করা। বঙ্গবন্ধু তার জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো বহাল রেখে দুর্নীতি, চোরাচালানসহ অপশক্তির অপকর্ম বন্ধ করা যায়না। এরপর যারাই ক্ষমতায় এসেছে তারাই চেষ্টা করেছেন একই ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো বহাল রেখে জনগণের মঙ্গল করা। সফল হননি। শেখ হাসিনা সরকারও আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। সব ধরণের অপরাধীদের তিনি ধরার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তিনি যে প্রশাসন ও তার দলের একাংশের কর্মকান্ড পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন বা পেরেছেন তা কি বলা যাবে?
তাই আসুন জাসদ চর্চা বাদ দিয়ে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো বদলের চর্চা করি, তর্ক বিতর্ক করি। এটাই হবে ইতিবাচক একটি কাজ। স্বাধীন দেশের রাষ্ট্র কাঠামো একদিকে যেমন যুদ্ধাপরাধীসহ সকল অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করবে তেমনি সকল মানষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবে। সে অধিকার নিশ্চিত করতে সমাজতন্ত্র না জনকল্যাণমুলক রাষ্ট্রের প্রয়োজন সেটা নিয়েও তর্ক করা যায়।

সম্পাদক ও প্রকাশক ডা. মাহফুজুর রহমান কর্তৃক ৫৮ চট্টেশ্বরী রোড, চকবাজার, চট্টগ্রাম হতে প্রকাশিত।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৫ thoughts on “জাসদ নিয়ে অজয়দাস গুপ্তের প্রতিবেদন। প্যান্ডোরা বাক্সটি না খোলাই মঙ্গলজনক

  1. দখল ও একাই খাবো নীতির সাথে
    দখল ও একাই খাবো নীতির সাথে রাজনীতিকে রাজনীতি না বানিয়ে ব্যক্তিমতকে প্রাধান্য দেওয়াই ছিল জাসদের জন্মের মূল কারন । যার ফলে আজও রাজনীতি পরিবার বা ব্যক্তিকে ঘিরেই ঘুরপাক খাচ্ছে ।

  2. জানলাম ইতিহাসের আওয়ামী
    জানলাম ইতিহাসের আওয়ামী চ্যাপ্টারের অনেক কিছু। এই দলটি সব সময়ই বেঈমানীর মাধ্যমে রাজনীতি করেছে। যার কারণে ৭৫ এর পটভুমি তৈরি হয়েছিল, ছিটকে পড়েছিল রাজনীতি থেকে। ইতিহাস থেকে তারা বিন্দুমাত্র শিক্ষা নেয়নি। এবারও একই ঘটনার পুনারাবৃত্তি ঘটলে তাদের নাম-নিশানা মুছে যাবে। এটা তারা আদৌ উপলব্দি করে কিনা যথেষ্ঠ সন্দেহ আছে।

  3. জাসদের উপর দায় দিয়ে নিজেদের
    জাসদের উপর দায় দিয়ে নিজেদের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। ৭৩-এর নির্বাচন সবচেয়ে লজ্জা জনক। তৎকালীন বাম দলগুলো আওয়ামী লীগের পেটের ভেতর না ঢুকে নিজেরা বিরোধী দলের অভস্থানে থাকলে জাসদের প্রয়োজন হতো না।..। জাসদ সম্পর্কে অনেক ধরনের গুজব বাজারে চালু আছে কিন্তু তথ্য প্রমাণ নাই। আওয়ামী লীগ মূলত নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে জাসদকে সামনে নিয়ে এসে দায় মুক্তি প্রার্থনা করে।

  4. আওয়ামী ব্যর্থতাই জাসদে তোইরীর
    আওয়ামী ব্যর্থতাই জাসদে তোইরীর কারণ। তবে দলের আদর্শেই ভুল ছিল। এই দল কখনোই শিক্ষিত শ্রেনী ছাড়া সাধারণ মানুষের কাছে পৌছাবার মত ছিল না। যে দেশের অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত ছিলো, যারা জানতোই না সমাজতন্ত্র কি জিনিস, তারা ব্যক্তিই দেখবে আদর্শের বুলি তাদের মাথায় ঢুকানো সম্ভব না।

  5. জাসদ কেন গঠিত হলো সেটা কেউ
    জাসদ কেন গঠিত হলো সেটা কেউ বলে না। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ৪৫ জনের মধ্যে ৩৭ জন যে পক্ষে বঙ্গবন্ধু কেন মেজরিটি পক্ষের দিকে না গিয়ে বাকী ৮ জনের দিকে গেলেন সেটা কেউ ধরে না। শেখ ফললুল হক মণির কথা কেউ আনেনা। অথচ এই শেখ মণিই ছাত্রলীগের মেজরিটি অংশের বিপক্ষে নিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধুকে। তাজউদ্দীন আহমেদ ও বঙ্গবন্ধুর মধ্যে দূরত্ব বৃদ্ধি করেছেন। ১০ জানুয়ারী বাহাত্তর বঙ্গবন্ধুর দেশের ফেরার রাতেই শুরু হয় ধ্বংসের বীজ বোনা এবং তা শেখ মণির মাধ্যমেই। ধন্যবাদ লেখককে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 1