“হিন্দু প্রশ্নে”: বদরুদ্দিন উমরের সংখ্যালঘু তত্ত্বের পর্যালোচনা

১.

গত ৫ জুন ‘দৈনিক যুগান্তর’ –এ “বাংলাদেশে প্রকৃত সংখ্যালঘু কারা”? –এই শিরোনামে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম নেতা, লেখক-গবেষক কমরেড বদরুদ্দীন উমরের একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। সেই লেখার প্রেক্ষিতেই বর্তমান লেখাটি। প্রথমেই আমরা, কমরেড ব. উমরের লেখার একটা সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরতে চাই; পুরো লেখায় যে বিষয়টা পাওয়া যায় তা নিম্নরুপঃ

প্রথমত, বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে একধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে; ফলশ্রুতিতে প্রতিনিয়ত অত্যাচার, নির্যাতন ও হত্যার মত ঘটনাগুলি ঘটছে। যার হাত থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে মুসলমানরাও রেহাই পাচ্ছে না। সুতরাং, এই পরিস্থিতিতে হিন্দু –মুসলিম নির্বিশেষে কেউই রাজনৈতিকভাবে মুক্ত নয়; সেক্ষেত্রে, হিন্দুদের উপর নির্যাতন বিশেষ কোন ধর্মবিশেষের উপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। কাজেই, এদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিসেবে হিন্দুদের সমস্যা কার্যত নেই, যেটুকু আছে তা বিশষ গুরুত্ব বহন করে না। কাজেই, সাম্প্রদায়িকতা বলেও বাস্তবত কিছু নাই; অর্থাৎ বাংলাদেশে ধর্মের পর্যালোচনা কার্যত মীমাংসীত। অতএব, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা বলে যা চালানো হয় ও এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরির পায়তারা যে হয়, তা ভারতীয় প্রোপাগাণ্ডা এবং ভারত (বিশেষত বিজেপি ও আরএসএস) এটা করে তাঁদের নিজেদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির স্বার্থেই। এই প্রোপাগাণ্ডার সাথে এদেশীয় সাধারন হিন্দুরা নয়, বরং এক শ্রেণীর সুবিধাবাদী ও প্রভাবশালী হিন্দুরাই জড়িত।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ একটি জাতিরাষ্ট্র ও উগ্র বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদই এখানে রাজনীতির মূল নিয়ামক। কাজেই মুসলমান নয় বরং বাঙ্গালী পরিচয়ে এদেশে রাজত্ব চলছে শুরু থেকে আজ পর্যন্ত, যার অংশীদার হিন্দুরা নিজেরাও। হিন্দুরা –এইক্ষেত্র সংখ্যাগুরু হিসেবে বিরাজমান সামগ্রিক শোষন –নির্যাতকের ভূমিকায় অবতীর্ন। এমনকি তারা এমনকিছু বিশেষ সুবিধা পায় যা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে মুসলমানরাও পায় না। উপরন্তু তাদের পিছনে ভারতের মত একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র সর্বদা সক্রিয়। অপরদিকে, জাতিগত ও ভাষাগত সংখ্যালঘুরা সবসময়ই অত্যাচার –নির্যাতনের শিকার। অথচ তাদের হয়ে বলার মতো দেশে –বিদেশে কেউ নেই।

উপরের আলোচনা থেকে দুটি মূল প্রকল্প পাওয়া যায়-

১. বাংলাদেশে ধর্মের মীমাংসা হয়ে গেছে।
২. বাংলাদেশ একটি উগ্র জাতিরাষ্ট্র।

অতএব, এই সিদ্ধান্তে উপনিত হওয়া যায় যে, সংগত কারনেই হিন্দুরা (ধর্মীয় সংখ্যালঘু) নয় বরং প্রকৃত সংখ্যালঘু একমাত্র জাতিগত ও ভাষাগত সম্প্রদায়ের লোকেরা।

২.

নিঃসন্দেহে কমরেড ব. উমরের যুক্তি অত্যন্ত শাণিত, বাহুল্য বিবর্জিত এবং খুবই শক্তিশালী। আর নিপুনভাবে তিনি তার কথার গাথুনী দিয়ে প্রচ্ছন্যভাবে দুটি মোক্ষম প্রকল্প হাজির করেছেন। যে প্রকল্পের মধ্য দিয়ে তিনি তার অবস্থানের সঠিকতা যথাযথভাবে প্রমাণ করেছেন; অথবা ঘুরিয়ে বললে বলা যায় এই প্রকল্প প্রমাণিত হলেই কেবল তার অবস্থানের সঠিকতা নির্মিত হয়। কাজেই, এই প্রকল্পের মোকাবেলার মধ্য দিয়েই “হিন্দু প্রশ্নে” আমাদের অবস্থানের সঠিকতা নির্ধারন করতে হবে। তাই প্রশ্ন দিয়েই শুরু করি-

১. বাংলাদেশে কী আদৌ ধর্মের প্রশ্ন মীমাংসীত? যার ভিত্তিতে বলা যায় যে, বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সমস্যা কার্যত গুরুত্বহীন। কাজেই, সাম্প্রদায়িকতা বলতে যা বোঝায়, তার বাস্তব অস্তিত্ব নেই।
২. বাংলাদেশ কী সত্যিই একটি জাতিরাষ্ট্রে পরিনত হয়েছে? যার কারনে উগ্র বাঙালী জাতীয়তাবাদ বিস্তার লাভ করেছে। কাজেই, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে মুসলমান ও হিন্দুদের ‘ধর্মীয়’ পরিচয়ের চেয়ে ‘বাঙালী’ পরিচয়ই মূখ্য অবস্থান লাভ করেছে।

মজার বিষয় হচ্ছে, আজ থেকে প্রায় ১৭৩ বছর আগে, ১৮৪৩ সালে কমরেড কার্ল মার্কসকেও প্রায় একই ধরনেরই প্রশ্নে কলমযুদ্ধে নামতে হয়েছিল। জার্মানীর ততকালীন র‌্যাডিক্যাল সমাজতন্ত্রী কমরেড ব. বাউয়ের ‘ইহুদি প্রশ্নে’ প্রায় অনূরুপ বিতর্ক তুলেছিলেন। যার সাথে আজকের বাংলাদেশে কমরেড ব. উমরের ‘হিন্দু প্রশ্নে’ যে বক্তব্য তার সাথে মৌলিক কিছু পার্থক্য থাকলেও অনেকটা সাদৃশ্য আছে।

কমরেড ব. বাউয়ের ইহুদির মুক্তির প্রশ্নে বলেছিলেন, “জার্মান দেশে কেউই রাজনৈতিকভাবে মুক্ত নয়। আমরা (খ্রিস্টানরা) নিজেরাই যেহেতু মুক্ত নই, কেমন করে তোমাদের (ইহুদিদের) মুক্ত করবো”। তিনি এও বলেছিলেন, “ইহুদিরা যে অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তাকে তারা নিয়মের ব্যতিক্রম হিসেবে ভাবে। অর্থাত’ খ্রীস্টীয় জার্মান রাষ্ট্রের স্বভাব বা বৈশিষ্টের মধ্যে এই অত্যাচার আর অনিবার্যতা নিহিত নেই, যেন এই অত্যাচার আর নির্যাতন শুধুই ইহুদির বিরুদ্ধে। অথচ এই অত্যাচার আর নির্যাতনই খ্রিস্টীয় জার্মান রাষ্ট্রের নিয়ম বা চরিত্র। ইহুদির ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন সেই নিয়মেরই প্রমাণ মাত্র”। -কমরেড ব. উমরের বক্তব্যের সাথে মিলিয়ে দেখুন, তিনিও একই কথাই বলছেন। পার্থক্য এখানে যে, কমরেড ব. বাউয়ের বিতর্ক শুরু করেছেন জার্মানিকে ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকার করে, আর কমরেড ব. উমর শুরু করেছেন বাংলাদেশকে ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে নাকচ করে। এই বিষয়ে বৈশাদৃশ্য থাকার পরেও দুজনের বক্তব্যে অসাধারন মিল।

৩.
মার্কস কিন্তু কমরেড ব. বাউয়েরের অবস্থানের সাথে সহমত পোষণ করেন নি। বরং সেটার অপূর্ণতা ও ত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে আমাদের ‘ইহুদি প্রশ্নে’ নামে একটা অসাধারন ক্ল্যাসিক উপহার দিয়েছেন। যেখানে এক যায়গায় মার্কস বলছেন-

“রাষ্ট্র ভেদে ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক আলাদা হতে বাধ্য। ফরাসী রাষ্ট্র একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্র, সেখানে ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক একটি সাংবিধানিক প্রশ্ন। অর্থাৎ রাজনৈতিক মুক্তির অসম্পূর্ণতার প্রশ্ন। সেখানে রাষ্ট্রধর্ম ঠিকই হাজির আছে। যদিও তার উপস্থিতি স্ববিরোধী ও তাত’পর্যহীন। সেটা হাজির রয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম হিসেবে। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম স্পষ্টভাবে হাজির থাকুক বা না থাকুক সকল সাংবিধানিক রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্ম হিসেবে বিশেষ একটি ধর্ম রাষ্ট্রের মর্মে ঠিকই বহাল থেকে যায়। সেই পরিস্থিতিতে ধর্মের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক হাজির হয় ইহুদির মুক্তির প্রশ্ন হিসেবে। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মের বিপরীতে সংখ্যালঘুর ধর্মের বিরোধিতার রুপ নিয়ে। সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন হিসেবে। এটাই অনিবার্য, এটাই স্বাভাবিক।

এখন আসুন দেখি, আজকের বাংলাদেশের কী অবস্থা?

বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্ম সংযুক্ত। বাংলাদেশে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। এছাড়াও রাষ্ট্রের বাইরেও বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় ধর্মের সরব উপস্থিতি লক্ষ্যনীয়। এখানে ধর্মের প্রশ্ন তাই বিভিন্ন ধর্মের সঙ্গে বিরোধিতার ও সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন হিসেবে হাজির হতে বাধ্য। মার্কস বলছেন, ফরাসী দেশে সে দেশের সংবিধানের কারনে ইহুদির প্রশ্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বা ধর্মতাত্ত্বিক বিরোধিতার রুপ নিয়ে হাজির হয়েছে। তেমনি বাংলাদেশে হিন্দু (বৌদ্ধ, খ্রীস্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী) –দের প্রশ্ন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ধর্মীয় বিরোধিতার বা ধর্মতাত্ত্বিক বিরোধিতার রুপ নিয়ে একইভাবে হাজির হয়। মার্কসের মতে (আমাদেরও মতে), এটাই স্বাভাবিক ও অনিবার্য।

কাজেই, কমরেড ব. উমরের প্রথম প্রকল্পের সাথে কমরেড মার্কসের ভরসায় দ্বিমত পোষণ করে বলতে চাই, এদেশে রাষ্ট্রের সঙ্গে হিন্দুর প্রশ্ন অবশ্যই ধর্মীয় ও ধর্মতাত্ত্বিকরুপে সাম্প্রদায়িক চেহাড়া নিয়েই হাজির হয়। যে কারনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুর উপর যে নির্যাতন সেটাকে সামগ্রিক নৈরাজ্যের কারনে রাষ্ট্রের স্বাভাবিক নির্যাতনকারী চরিত্রের সাথে মেলানো যায় না। রাষ্ট্র যেখানে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ স্তর অর্জন করে নি, অর্থাৎ রাষ্ট্র যখন রাজনৈতিকভাবে মুক্ত নয়, তার বিকাশ যখন অসম্পূর্ণ, উপরন্তু প্রতিদিনের সমাজ জীবনে ধর্মের প্রভাবই প্রধান –তখন ‘হিন্দু প্রশ্ন’ সংখ্যালঘু ধর্ম সম্প্রদায়ের প্রশ্ন হিসেবে, সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন হিসেবে আবির্ভূত হতে বাধ্য। ব্যক্তির পরিচয়গুলোও তখন মুসলমান কিংবা হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান হিসেবেই –অর্থাৎ ধর্মের প্রশ্ন হিসেবে হাজির হয়; নারায়নগঞ্জের ঐ স্কুল শিক্ষকের ক্ষেত্রে ব্যক্তি হিসেবে তাই ঘটেছে। যে কারনে, মার্কসের বিচার্য ফরাসি সংবিধান কিংবা আমাদের কালে এখনকার বাংলাদেশে সংখ্যালঘুর প্রশ্ন সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের বিপরীতে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠি হিসেবে ‘হিন্দু প্রশ্ন’ (বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী) –হিসেবে হাজির হতে বাধ্য।

কমরেড ব. উমরের প্রথম প্রকল্পের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছি যে, বাংলাদেশে ধর্মের প্রশ্নে এখনো মীমাংসা হয় নি; যে কারনে ‘হিন্দু প্রশ্নে’রও মীমাংসা বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদ দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয় নি। বরং স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে ধীরে ধীরে ধর্মের প্রশ্নটি আরো জটিল আকার ধারন করেছে। উপরন্তু, ধর্মীয় নানা গোষ্ঠীর উগ্রতাই বরং রাষ্ট্রীয় নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার মত পরিবেশ তৈরির সুযোগ করে দিচ্ছে। যার সুযোগেই আওয়ামীলীগ, বিএনপি, জাপা, জামায়াত এর মত নানা রঙ –এর শক্তিগুলো এখান থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটছে; ক্ষমতার মসনদে অধিষ্ঠিত হয়ে শোষন –নির্যাতন চালাচ্ছে। অপরদিকে, হেফাযত কিংবা আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের মত ভূইফোড় চরম সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলোও রাতারাতি জনপ্রিয়তা পেয়ে যাচ্ছে। ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরেও যারা নিজেদের পরিচিত করতে চায় অর্থাৎ ‘মুক্তমনা’রাও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বলি হচ্ছে।

৪.

এটা সত্য বটে যে, পাকিস্তানী শাসকশ্রেনীর প্রতি, বিশেষত পাকিস্তানী ইসলামকে যেভাবে শাসন ও শোষনের মতাদর্শ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল তার বিরুদ্ধে সঙ্গত কারনেই বাংলাদেশের জনগণের তীব্র রোষ ও ঘৃণা জন্মেছিল। যার বিরুদ্ধে বাঙালী জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটে এবং তার সাথে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্রের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ দানা বেঁধে উঠেছিল। তবে এটাও সত্য যে, এর সাথে ইউরোপ, জাপান, আমেরিকা, এমনকি ভারতের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একটা বড় পার্থক্য থেকে গেছে। কাজেই সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কখনোই আমরা ঐক্যবদ্ধ কোন বোধ নির্মান করতে পারি নি। স্বাধীনতার অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ‘বাঙালী জাতীয়তাবাদ’র বিপরীতে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’র ভূত আমাদের ঘাড়ে এসে চাপে। আদতে জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে যে জাতিরাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল সেই লক্ষ্য আমরা কখনোই অর্জন করতে পারি নি।

কমরেড ব. উমরের দ্বিতীয় প্রকল্প অনুযায়ী বাংলাদেশ যদি সত্যিই জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত হতো তবে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটাকে একধরনের অগ্রগতি হিসেবেই আমরা বিবেচনা করতাম। কিন্তু, বাস্তবত বাংলাদেশে সেটা ঘটে নি। বরং বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি ক্রমশ ধর্মীয় রুপ পরিগ্রহ করেছে এবং তার জাতীয়তাবাদী বৈশিষ্ট্য থেকে পশ্চাতপদসরন করেছে। যেহেতু ধর্ম এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাংবিধানিকভাবে ও সামাজিকভাবে প্রধান নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা পালন করছে এবং ঘোষিতভাবেই তা ধর্মতাত্ত্বিক। কাজেই বাংলাদেশে এখনো কোন রাজনৈতিক রাষ্ট্র বা রাষ্ট্ররুপে রাষ্ট্র নেই। সেকারনেই, আমরা কমরেড ব. উমরের দ্বিতীয় প্রকল্পকেও বাস্তব বলে স্বীকার করছি না।

তবে নির্দ্বিধায় স্বীকার করছি, জাতিগত ও ভাষাগত জনগোষ্ঠির লোকেরা যেভাবে প্রতিনিয়ত অন্যায় –নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, সেই বিষয়ে আমরাও একমত। তার পক্ষে জনমত তৈরি করা ও তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে আমরাও শরিক। কিন্তু সেটাকে প্রকৃত সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের খারিজ করে দেবার কোন দরকার পড়ে না। এতে করে বরং স্ববিরোধিতাই স্পষ্ট হয়।

৫.

এখন যে প্রশ্নটা আলোচনার বাইরে থেকে গেছে, সেটা হলো ‘ভারত’ প্রশ্ন। এখানে ব. উমর ভারতের ভূমিকা কে যেভাবে বিবৃত করেছেন। সেটা এমন, বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন অস্থিতিশীলতা ভারতের অভ্যন্তরীন রাজনীতির মূল নিয়ামক। যে কারনে, বিজেপি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য কিংবা সেখানকার সাম্প্রদায়িকতাকে বৈধতা দেবার জন্য তারা বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন সাম্প্রদায়িকতার মিথ্যা প্রচারনা চালায়; সাম্প্রদায়িকতার পরিস্থিতি তৈরি করে। আমরা বরং অন্যভাবে বলতে চাই, ভারতের অভ্যন্তরীন রাজনীতিই বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করে। এবং ভারতের সাম্প্রদায়িকতাই বরং বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িকতাকে বৈধতা দেয়ার কাজটি করে। কিন্তু কমরেড ব. উমর বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা নাই –এটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে, বিষয়টাকে উল্টোভাবে উপস্থাপন করেছেন।

আমরা আরো বলতে চাই। ভারত একটি বৃহত রাষ্ট্র ও বৈশিষ্ট্যগতভাবে আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র। সুতরাং, বাংলাদেশের উপর তার আধিপত্যকামী মনোভাব সবসময় ছিল, এখনো আছে। এর জন্য ভারতের ষড়যন্ত্র তত্ত্বের চেয়ে বাংলাদেশের নতজানূ পররাষ্ট্রনীতিই বরং বেশি দায়ী।

সবশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের বাস্তবতায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিশেষত ‘হিন্দু প্রশ্নে’ যে ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। সেটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন সমস্যা এবং একে এর ভেতরে থেকেই সমাধান করতে হবে। এর জন্য কোন হিন্দু নেতা যদি ভারতের হস্তক্ষেপ কামনা করেন, সেটা নতুন সংকটের সৃষ্টি করবে; সমাধানের পথকে আরো জটিল করবে। ‘জাগো হিন্দু জাগো’ স্লোগান দিয়ে পরক্ষনেই ‘সাম্প্রদায়িকতা ধ্বংস হোক, নিপাত যাক’ এই ধরনের সাংঘর্ষিক স্লগান দিয়েও সেটার সমাধান সম্ভব নয়। সকল ধরনের সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে –সম্মিলিত ভাবে সংগ্রামে অবতীর্ন হতে হবে। স্লোগান তুলতে হবে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের দাবিতে, নাগরিক অধিকার প্রদানের পক্ষে দাঁড়িয়ে। কেননা, এর মাধ্যমেই ‘রাজনৈতিক মুক্তি’ সম্ভব, যা হয়তো মানুষের সামগ্রিক মুক্তি নয়; তবে ‘সামনের দিকে এক বড় পদক্ষেপ’।

লিংকঃ
১. বাংলাদেশের প্রকৃত সংখ্যালঘু কারা?
http://www.jugantor.com/sub-editorial/2016/06/05/36501/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%95%E0%A7%83%E0%A6%A4-%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%96%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%98%E0%A7%81-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE

২. On the Jewish Question/ karl marx
https://www.marxists.org/archive/marx/works/1844/jewish-question/

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১৪ thoughts on ““হিন্দু প্রশ্নে”: বদরুদ্দিন উমরের সংখ্যালঘু তত্ত্বের পর্যালোচনা

  1. আগের লেখার সকল বিতর্ক কে
    আগের লেখার সকল বিতর্ক কে কেন্দ্র করে বদরুদ্দীন উমর এর নতুন লেখাটা পড়ে দেখতে পারেন…

    সংখ্যালঘু ও সাম্প্রদায়িকতা বিতর্ক প্রসঙ্গে

  2. পড়লাম। একই কথারই পূনরাবৃত্তি।
    পড়লাম। একই কথারই পূনরাবৃত্তি। উনি আমার লেখা পড়েছেন বলে মনে হয় না। কেননা, এখানে যে দুই পয়েন্টে আলোচনা করা হয়েছে তার কোন ব্যাখ্যা খুজে পাওয়া গেল না।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 81 = 87