কল্পনা চাকমা’র অপহরণঃ ইতিহাসের কালো রাত্রি

কল্পনা চাকমা অপহরণের আজ ২০ বছর পূর্ণ হয়ে দুইদিন অতিবাহিত হয়েছে। মুখে ২০ বছর বলতে ও শুনতে কয়েক মুহূর্ত লাগলেও সময়ের দীর্ঘতা অনেক বেশি। ২০ বছর আগে যে ছেলেটা মায়ের গর্ভে ভ্রূণ হয়ে ছিল সেই ছেলেটাও আজ রাজপথে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়েছে তার বোনের অপহরণের বিচারের দাবিতে। কল্পনা চাকমাকে সে কখনো দেখেনি, উনার সম্পর্কেও সে কিছুই জানতো না। ইতিহাস তাকে জানতে শিখিয়েছে সেদিনের সেই কালো রাত্রিতে জলপাই রঙে মোড়ানো কিছু নুপংশু কতটা হিংস্রভাবে নিয়ে গেছে। সেই ইতিহাসেই তাকে অনুভব করতে শিখিয়েছে, তাই আজও সেই ছেলেরা চেতনায় লালন করে।

প্রথমদিকে এই অপহরণের বিরুদ্ধে পাহাড়ের সাধারণ ছাত্র-জনতার একটা জোরালো প্রতিবাদ ছিল। সে সময়ে ২৭ জুন শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচীর মাধ্যমে প্রতিবাদ সমাবেশ করতে গিয়ে আনসার-ভিডিপি গুলিতে দশম শ্রেণীর ছাত্র রূপন চাকমা মারা যায় এবং তারো পরবর্তীতে মনতোষ চাকমা, সুকেশ চাকমা, সমর বিজয় চাকমা নিঁখোজ হন। কিন্তু সময়ের কালক্রমে সেই প্রতিবাদ আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পরে। কল্পনা দি অপহরণের পরবর্তী গত ২০ বছরে অনেক মিছিল-মিটিং, মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। প্রতিবছরে যদি একটা করে ধরা হয় তাহলেও ২০ বছরে ২০ বার মিছিল-মিটিং, মানববন্ধন, সমাবেশ হয়েছে। কিন্তু সেইসব মানববন্ধন সমাবেশ রাষ্ট্রের কাছে যেন নিষ্ফল আবেদন। গত ২০ বছর ধরে অপহরণকারীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তির দাবি করে গেলেও রাষ্ট্র নীরব ভূমিকায় পালন করে যাচ্ছে। আর রাষ্ট্রের এই নীরব ভূমিকা পার্বত্য এলাকায় আরেক কল্পনাকে অপহরণে উদ্বুদ্ধ করার সমতুল্য।

প্রশাসনের ছায়াতলে থাকা এজান্ডারেরা এই অপহরণের মোড় ঘুরাতে তাদের পরিচালিত হলুদ গণমাধ্যমে একেক সময় একেক মতবাদ দিয়ে সংবাদ প্রচার করে যাচ্ছে। কখনো বলা হচ্ছে তিনি শান্তিবাহিনী দ্বারা অপহৃত আবার কখনো বলা হচ্ছে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের গণ্ডাছড়ায় আত্মগোপন করে আছেন, কাল্পনিক এক যুবকের সাথে সুখের সংসার করছে। তাদের ভিত্তিহীন মতবাদের যুক্তিকতায় প্রশ্ন থেকে যায়-

১. কল্পনা চাকমা যদি আদও শান্তিবাহিনী কর্তৃক অপহরণ হয়ে থাকে, তবে সমগ্র পার্বত্যবাসীর জনগণ কেন সেনাবাহিনীর দিকে তীর ছুঁড়ছে ?
২. কল্পনা চাকমার বড় ভাই কালিন্দী কুমার চাকমা তার পরের দিন অর্থাৎ ১২ই জুন ১৯৯৬ তৎকালীন কজইছড়ি ক্যাম্প কমান্ডার লেঃ ফেরদৌস, ভিডিপি সদস্য নুরুল হক ও সালেহ আহমেদের নাম উল্লেখ করে কেন এজাহার ভুক্ত করতে গিয়েছিল ? অর্ধ-উচ্চারণে বাংলা বলা, পাহাড়ে ক্ষেতে খাওয়া একজন জুমিয়ার নিশ্চয় কোন বিত্তবান বা ক্ষমতাবানের সাথে শত্রুতামি থাকার কথা নয়।
৩. কল্পনা চাকমার অপহরণের ঘটনাকে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মিডিয়ায় প্রথম “হৃদয় ঘটিত ব্যাপার” বলে প্রচার করা হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীর যদি কোন সংশ্লিষ্টতা না থাকে তবে তাদের এত মর্মাহত হওয়ার কারন কি ? বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমরা যা দেখি, র‍্যাব বা পুলিশের কোন অভিযানে অনিচ্ছাকৃত যদি আসামী ব্যাতিত অন্য কোন নিরীহ ব্যক্তি সেই অভিযানের স্বীকার হয় তাহলে কর্তৃপক্ষ সেটি তাদের ভুল বা এর জন্য দুঃখপ্রকাশ করে থাকেন। তাহলে অযথা তাদের জন্য কেন “হৃদয় ঘটিত ব্যাপার” বলে প্রচারিত হয় ?
৪. ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬ সালে হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল জলিলকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তদন্ত শেষে উনারা সরকারের কাছে তদন্ত রিপোর্ট জমা দিলেও তা আজও কেন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি ?
৫. গত ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১২ সিআইডি চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করে। সেই রিপোর্টে তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ শহীদউল্লাহ তার চূড়ান্ত রিপোর্টে একদিকে বলেছেন ‘ভবিষৎতে কল্পনা চাকমা সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া গেলে বা উদ্ধার করা সম্ভব হলে যথানিয়মে মামলাটির পুনরায় তদন্তের ব্যবস্থা করা হবে’, আবার অন্যদিকে মামলার ১ নং ও ২ নং আলামত (একটি রশি যার দ্বারা ঘরের দরজা বাধা ছিল এবং ঐ রাতে আগত অজ্ঞাত লোকেরা কাটিয়াছে বলিয়া কথিত এবং একটি খয়েরি রং এর পলিস্টার কাপড়ের তৈরি গুলি রাখার তোজধানী) ধ্বংস করার আদেশ প্রার্থনা করে। কিন্তু একটি মামলা বিচারাধীন অবস্থায় তিনি কেন মামলার আলামত ধ্বংস করতে চেয়েছেন ?

অপহরণের ২০ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও কল্পনা চাকমাকে উদ্ধার করতে না পারা ও অপরাধীদের শাস্তি না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এবং এটি প্রমাণ করে অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় না তুলার জন্য প্রশাসনের দায় এড়ানো একটি প্রক্রিয়া। প্রশাসনের দায়বদ্ধটা ও তৎপরটা সাম্প্রতিক চট্টগ্রামে এসপি বাবুল আক্তার স্যারের সহধর্মিণী হত্যাকাণ্ডের উপর নজর দিলেই আমরা বুঝতে পারবো। প্রশাসনের সদিচ্ছা আছে বিধায় হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহের মাথায় সন্দেহভাজন হত্যাকারী গ্রেপ্তারসহ সেসময় ব্যবহৃত মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাস উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।

ভবিষ্যতে যাতে কল্পনা চাকমার মতো আর কাউকে যেন অপহৃত হতে না হয় সেই জন্য কল্পনা চাকমার অপহরণের সুষ্ঠু বিচার ও অপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি প্রদানের জন্য দাবি জানাই। আর নয়তো বাংলাদেশে স্মরণকালের সেই নিকৃষ্টতম অপহরণের রাত্রি আজীবন কালো রাত্রি হিসেবে পার্বত্যবাসী স্মরণ করে যাবে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “কল্পনা চাকমা’র অপহরণঃ ইতিহাসের কালো রাত্রি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 4