সাদাসিধা খাম- শাহরিয়ার অনিম

তুমি একবারের জন্যও ভাবলে না তোমার চেক শার্টটা জড়িয়ে ধরে সে কত বেলা অভুক্ত কাটাবে?
মা জননীর আর্তনাদ করতে করতে নিথর হয়ে যাওয়া দেখলে মর্গের ডোমের নেশাগ্রস্থ চোখেও পানি জমে।
একটা ঘটনা বর্ণনা করি… অগোছালো আনক্লিয়ার বিষয়টা ক্লিয়ার হবে…

আমার এক পতিচিত ছোট ভাই দেড় বছর আগের এক সন্ধ্যায় মা এর সাথে ঝগড়া বাধিয়ে আত্মহত্যা করে বসল।
কিন্তু পড়ে জানতে পাড়লাম প্রেমঘটিত ব্যাপার ছিলো। ছেলেটা যেদিন মারা যায় তার আগের দিন স্কুলের শিক্ষাসফর ছিলো। আমার এক ব্যাচ জুনিয়র ছিলো ও। কিন্তু আমাদের সেকশন গ্রুপ ফটোতে ওর হাসিমুখটা ছিলো। তাও আবার ফোনের ফ্লাসে ওর দুচোখ বন্ধ হয়ে ফটোটা উঠেছিল।
ফটোতে চোখ পড়লেই কেমন কেমন লাগত। চোখ দুটো বন্ধ থাকায় দেখলেই মনে হত ও মরে গেছে ও ভুল করেছে ও কাজটা ভালো করে নি ও সুখে নেই অবাক ব্যাপার যে ছেলেটার ফোনে বা তার ফ্যামিলির কাছে তার কোন ফটোই ছিল না।
অনেকেই আমায় রাস্তায় দাড় করিয়ে ফটোটা জুম করে করে দেখত। আমি বেশ কিছুদিন বিষয়টা নিয়ে বিব্রত ছিলাম। কিছুদিন পড়ে আমি অনুভব করলাম ছেলেটার আত্মহত্যা, তার ঐ ফটোটা, আর বন্ধ দুটো চোখ সব মিলিয়ে আমি সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম এ ঢুকে যাচ্ছি।
শখের ফোনটা ধরতে ভয় লাগছে। একদিন বিকালে বাসার ছাদে বসে ফটোটা ডিলিট করে ফেললাম। ঠিক তার ২৫ – ৩০ মিনিট পর মা আমায় নিচ থেকে ডেকে বলল কেউ একজন আমার সাথে দেখা করতে এসেছে।
ড্রয়িংরুমে সোফায় এক বৃদ্ধা আর মধ্যবয়স্ক এক মহিলা বসে। মা পরিচয় করিয়ে দিতেই বৃদ্ধার চোখ বেয়ে পানি।
আমি তখনও বুঝে উঠতে পারি নি।হঠাৎ মধ্যবয়স্ক মহিলাটি আমায় নিচু গলায় বলল বাবা তোমার কাছে নাকি আমার ছোট ভাইয়ের একটা ছবি আছে। ছবিটার কথা উঠতেই আমাকে কেউ জোড়ে সোরে একটা ধাক্কা দিলো।

কেউ একজন কানের কাছে ফিসফিসিয়ে গেল “এত মানুষ বন্ধ চোখের ফটোটা দেখে আফসোস করে গেল আর বৃদ্ধাকে আফসোস করার সুযোগ দিলি না” আমি তাদের কি একটা মিথ্যা বলে পাড় পেয়ে গেলাম কিন্তু মিথ্যাটা মনে নাই। সেদিনের বৃদ্ধার কান্নাটা আমার মনে একটা দাগ কেটে গেল।
সেদিনই শেষ ছিলো না কখনো তার বোন আমায় রাস্তার মাঝে,খেলার মাঠে,চায়ের দোকানে হাতে ধরে ফটোটা ভিক্ষা চাইত। তাদের সাথে দেখা হলেই চাইত আর কান্না করত। দিতে পারি নি। ওর মায়ের কান্নাটা দেখলে বার বার মনে হত “ও পাপ করেছে আত্মহত্যা করে আর আমি ফটোটা ডিলিট করে” আরেকটা বিষয় খেয়াল হয়েছিল আমার, যে মেয়েটার জন্য ও আত্মহত্যা করেছিলো মেয়েটার সাথে আমার ভালো পরিচয় ছিলো কই মেয়েটা তো আসে নি একবারও কান্না করে বলেনি ভাইয়া ছবিটা একবার দেখাও।

লাশের সাথে যদি যোগাযোগ করা যেত আমি একটা সাদাসিধে খামে একটা সাদা কাগজে কয়েকটা প্রশ্ন লিখে লাশটার কাছে পাঠাতাম

“মাকে জিজ্ঞাস করিস মা তুমি কি আর কখনো হেসেছ..?
মা তুমি তিন বেলা খাও..?মসত্য করে বল মা..?
আমার জামা কাপড় গুলো কি এখনো মাঝে মাঝে ধুয়ে বেলকুনিতে নেড়ে দাও, ওগুলোকে কি আমার মতই লাগে,
ও মা তোমার চোখ শুকনা কেন তোমায় বিভৎস মন খারাপের মানুষের মত লাগছে কেন..? তোমায় তো আগে কখনো এমন লাগে নি!!! আমি কি করেছি..? আমি কি অনেক খারাপ কিছু করেছি..?
চোখে ভিজে গেছে আর লেখা সম্ভব না….

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

27 + = 29