উচ্চশিক্ষার বাণিজ‍্যিকীকরণ:প্রসঙ্গ জাতীয় বিশ্ববিদ‍্যালয়

সেশনজট হ্রাস,শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর লক্ষ‍্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সরকারী ১৮১টি কলেজকে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়ার উদ‍্যোগ নিয়েছে সরকার।এই কথাগুলো চমৎকার শুনালেও বাস্তবে তার পিছনে আছে গভীর ষড়যন্ত্র।১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগ পর্যন্ত কলেজসমূহ ঢাকা চট্রগ্রাম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল।কিন্তু এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে কলেজসমূহের একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা ও মান নিয়ন্ত্রণ সম্ভব ছিল না।যার কারনে সামগ্রিক ভাবে দেশে সেশনজট সৃষ্টি হয়েছিল এই বাস্তবতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা।তাই আমরা দেখি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৯২ এর শুরুতেই বলা আছে”কলেজ শিক্ষার স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠ‍্যক্রম ও পাঠ‍্যসূচির আধুনিকীকরণ ও উন্নতি সাধন শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের যাবতীয় বিষয় ও ব‍্যবস্থাপণার দায়িত্ব একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর ন‍্যস্ত করা সমীচীন”

দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রত‍্যেকটি তাদের নিজ নিজ অধ‍্যাদেশ অনুযায়ী একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে।সরকারী কলেজগুলো অধিভূক্ত হলে সমন্বয় কিভাবে করা হবে?অধিভূক্ত হলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা কী হবে?জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মত?জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় তো সিলেবাস প্রণয়ন, প্রশ্নপত্র তৈরি এবং ফলাফল প্রকাশ অর্থ‍াৎ শিক্ষাবোর্ডের চেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করেনি।তাহলে এই অধিভূক্তির প্রয়োজনীয়তা কী?প্রয়োজনীয়তা বুঝতে হলে একটু ছোখ খোলা রেখে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের ২০ বছর মেয়াদী নীল কৌশলপত্রে নজর দিলেই ব‍্যাপারটা একদম পরিস্কার হয়ে যাবে।

কী আছে এই কৌশলপত্রে?
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণের এখতিয়ার যে প্রতিষ্ঠানের উপর ন‍্যাস্ত সেটি হল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন বা ইউজিসি।সেই প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ব ব‍্যাংকের পরামর্শে ২০০৬ সালে শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণ করার উদ্দেশ্যে বিশ বছর মেয়াদী একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করে।কৌশলপত্রের প্রস্তাবনার মূল ব‍ক্তব‍্যগুলো এরকম-

  • পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে কমিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে চলতে হবে।এজন‍্য বেতন-ফি বৃদ্ধি, হল-ডাইনিং চার্জ বৃদ্ধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন স্থাপনা ভাড়া দেওয়ার মাধ‍্যমে অভ‍্যন্তরীণ আয় বাড়াতে হবে।ব‍্যয় সংকোচন নীতি করতে হবে।
  • চাকুরীর বাজার অনুযায়ী ছাত্র সংখ্যা, বিষয়বস্তু ও সিলেবাস নির্ধারণ করতে হবে।ইতিহাস,সাহিত্য, দর্শন,বিজ্ঞানের মৌলিক বিষয়গুলো বাজার চাহিদা নেই তাই সেগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।
  • প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়াতে হবে যাতে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ‍্যে প্রতিযোগিতা মাধ‍্যমে শিক্ষার মান উন্নয়ন ঘটে।

উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন নাকি পকেট উন্নয়ন?
এই কৌশলপত্রের প্রস্তাবনাসমূহ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ২০০৯ সালে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।প্রকল্পটির নাম higher education quality enhancement project(HEQEP)।বিশ্বব‍্যাংকের এক প্রেস রিলিজে এই প্রকল্প সম্পর্কে বলা হয়েছে” বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়ন ও বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ‍্যে হেকেপ-এর মাধ‍্যমে উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে”।বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নের জন‍্য বিশ্বব‍্যাংকের এত মাথা ব‍্যথার কারণ কী?তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট বোঝা যায় ব‍ক্তব‍্যের দ্বিতীয় অংশে,যেখানে বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টির কথা উল্লেখ আছে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নাকি জাতীয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়!
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত সরকারি কলেজগুলোর পাবলিক বিশ্ববিদ‍্যালয়ের অধীনে যাওয়া শিক্ষার বাণিজ‍্যিকীকরণের ষড়যন্ত্রের অংশ।সারা দেশে জাতীয় বিশ্ববিদ‍্যালয়ের অধিভূক্ত সরকারী ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২১৪৫টি যার মধ‍্যে ১৮১টি সরকারি কলেজ ১৯৭৩টি বেসরকারী কলেজ।জাতীয় বিশ্ববিদ‍্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর ৫৩ শতাংশই বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী।বেসরকারি কলেজের অনার্স কোর্সের শিক্ষকদের বেতন এমপিও ভূক্ত নয়।অর্থ‍াৎ শিক্ষাব‍্যয় অধিকাংশ পূরণ হয় শিক্ষার্থীদের বেতন-ফির মাধ‍্যমে।বেসরকারি কলেজের বেতন,ফি নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদদ্বারা নির্ধারিত। তাই কারণে কলেজভেদে বেতন-ফি তারতম্য আকাশ পাতাল।অপর দিকে সরকারী কলেজগুলো শিক্ষক নিয়োগ ও বেতন দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় যার কারনে জাতীয় বিশ্ববিদ‍্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের বালাই নেই।প্রশ্ন করতে পারেন,স্বায়ত্তশাসন না থাকলে বিশ্ববিদ‍্যালয়ের ক্ষতি কী?উওর এক কথায় বলা যায় মনুষ‍্যত্ব বাদ দিলে মানুষের যা অবশিষ্ট থাকে স্বায়ত্তশাসন বাদ দিলে বিশ্ববিদ‍্যালয়ের তাই অবশিষ্ট থাকে।

জাতীয় বিশ্ববিদ‍্যালয়ের অধিভূক্ত অনার্স পড়ানো হয় এমন প্রতিষ্ঠানের আলোচনা করলাম।এবার আলোচনা করবো জাতীয় বিশ্ববিদ‍্যালয়ের বাণিজ‍্যিকীকরণের সবচেয়ে বড়খাত যেটি আবার সবচেয়ে কম আলোচিত হয়।প্রাইভেট ইনস্টিটিউট! এই ইনস্টিটিউটগুলো নামে ইনস্টিটিউট হলেও কাজে কোন অংশই প্রাইভেট বিশ্ববিদ‍্যালয়ের চেয়ে কম নয়।বরং প্রাইভেট বিশ্ববিদ‍্যালয়ের যে কম পুজি বিনিয়োগ করে বেশি লাভ করা যায়।জাতীয় বিশ্ববিদ‍্যালয়ের অধিভূক্ত এই প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২২৫টি যার মধ‍্যে ঢাকাতে আছে ১০০টি উপরে।সাথে অনুমোদনের পাওয়ার অপেক্ষায় আছে ২০০টির উপর প্রতিষ্ঠান।

এই প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাব‍্যয় কোন লাগাম নেই।২০১০ সালে সেমিস্টার ফি যেখানে প্রতি সেমিস্টার দশ হাজার টাকা ২০১৬তে এসে প্রতিষ্ঠানভেদে ২৫ হাজার টাকা।
মানে জাতীয় বিশ্ববিদ‍্যালয় নামে পাবলিক বিশ্ববিদ‍্যালয়ের হলেও কাজে এটি হবে দেশের সবচেয়ে বড় প্রাইভেট বিশ্ববিদ‍্যালয়।

তথ‍্য সূত্র
বিশ্ববিদ‍্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের কৌশলপত্র
জাতীয় বিশ্ববিদ‍্যালয় আইন ১৯৯২

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.