আমাদের বামাতিগণ

প্রথমেই বলে রাখি , এই লেখাটা আমার বামপন্থী বন্ধুদের উদ্দেশ্যে নহে। আমার ছাত্রজীবনের অধিকাংশ বন্ধুই বামরাজনীতি বিশেষত: ছাত্রইউনিয়নের সাথে জড়িত ছিলেন। আর অনলাইনে যাদের লেখা আমি খুব খুব পছন্দ করি Muhammad Golam Sarowar Akal Kushmando রাহাত মুস্তাফিজ এরা প্রত্যেকেই ছিলেন ,আছেন বামপন্থী রাজনীতির সাথে জড়িত।

আমার আলোচ্য বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রজাতি নিয়ে। বাম + জামাতী = বামাতি। ইহা আসলেই এক আজব চিড়িয়া। এরা এসি রুমে বসে শ্রমজীবী মানুষের কথা বলেন , মার্কসবাদের নিত্যনতুন পিলে চমকানো ব্যাখ্যা হাজির করেন , লণ্ডনে গিয়ে ধর্মীয় বিপ্লবের আহবান জানান , লুঙ্গি পড়ে নতুন ফ্যাশন আইকন হিসেবে দেখা দেন ,আবার লালনের ভাববাদের মায়ায় নিজেকে উজাড় করে দেন।

একটু পেছনে ফিরে যাই প্রথমে , আন্তর্জাতিক মতবাদগত দ্বন্দ্বে সারা বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলন রুশ এবং চায়না শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সেই ভাঙনের সুর এসে ধাক্কা লাগে বাংলায়ও। আন্তর্জাতিক অংগনে সোভিয়েত মিত্র ভারতের বিরোধিতা করতে গিয়ে , চীন পক্ষ নেয় পাকিস্তানের্। হাত মেলায় তাদের ভাষায় সাম্রাজ্যবাদী মার্কিনীদের সাথে। বাঙালির মুক্তিসংগ্রাম আর ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে মস্কোপন্থী বামেরা লীগের পাশাপাশি সব বিভেদ ভুলে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেও চীনপন্থী অংশটি বিরত থাকে। ব্যক্তিগত ভাবে অনেকেই দলীয় নির্দেশের বাইরে গিয়ে পাকবাহিনীর মোকাবেলা করেন অসীম সাহসিকতার সাথে। তথাপি হক ,তোয়াহা , দেবেন শিকদার , শান্তি সেন ,অমল সেনেরা মুক্তিযুদ্ধকে অবহিত করেন “দুই কুকুরের লড়াই ” হিসেবে।

দেশ স্বাধীন হলে এই অংশটি পড়েন নতুন বিপাকে। এদের একটি অংশ নেমে পড়েন শ্রেণীশত্রু খতমের রাজনীতিতে , একটি অংশ অবসর নেন রাজনীতি থেকে আর একটি অংশ শুরু করেন বুদ্ধিভিত্তিক এক প্রতিশোধের লড়াই। ঢাকা -দিল্লী – মস্কোর কাছে পিণ্ডি -পিকিং -ওয়াশিংটনের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেয়ার লড়াই। বন্দুকের নলের বদলে প্রপাগাণ্ডাই হয়ে ওঠে তাদের মূখ্য হাতিয়ার্। মার্কসবাদ আর ধর্মবাদের আড়ালে শুরু হয় পাকিস্তানবাদ সম্প্রসারণের নীল নকশা প্রণয়নের খেলা। এই শেষোক্ত চিঙ্কুরাই অনলাইনে পরিচিত বামাতি বলে।

মূলত বরবাদ মঝহারকেই ধরা হয় এই ধারার পাইওনিয়ার হিসেবে। মহাত্মা আহমদ ছফার শিষ্য বলা পরিচিতি দিলেও ছফার ভারত বা লীগ বিরোধিতা ছিলো দেশপ্রেম হতে উদ্ভুত। ছফা সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। আর বঙ্গবন্ধুকে তিনি বিরোধিতা করলেও অস্বীকার করতেন না। সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত “বেহাত বিপ্লব ” বইতে যা সবিস্তারে উল্লেখ আছে। কিন্তু মঝহাররা সেই তত্বকে উপস্থাপন করা শুরু করেন সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে। বড় আজব চিজ এই ফরহাদ মঝহার্। তিনিই স্যুটের সাথে লুঙ্গি পড়েন , লণ্ডনে গিয়ে জামায়াতের সভায় জিহাদের ডাক দেন , বাসার ড্রইংরুমে বিদ্যার দেবী স্বরস্বতীর মূর্তি রাখেন , চৈত্র সংক্রান্তিতে মহাদেব শিবের গুণগান করেন আবার লালনের আখড়ায় ভাববাদে মাতোয়ারা হয়ে পড়েন। মোদ্দা কথা , একইসাথে মার্কসিজম ,লালনিজম আর আল্লামা সাইদীজমের এক উদ্ভট ককটেল সফলভাবে পরিবেশন করেন।

অনলাইনে এসে তার কিছু যোগ্য শিষ্য জুটে যায় প্রায় বিনা পরিশ্রমে। পিনাকি ভট্টাচার্য্য , ফারুক ওয়াসিফ , গৌতম দাস , পারভেজ আলম , জিয়া হাসানের মতো কিছু অফলাইনের বর্জ্য পদার্থ এসে ভিড় জমায় বরবাদের লুঙ্গির ছায়াতলে। সুকৌশলে চলতে থাকে পাকিস্তানবাদের সম্প্রসারণ।

রাজাকারের বিচারে এদের হৃদয় কেদে উঠলেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপরে নির্যাতন হলে , পাহাড়ে আগুন জ্বললে বা কোন মুক্তচিন্তার মানুষের মাথা চাপাতির আঘাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে তাদের কোন বিকার হয়না। পাকিস্তান জামানায় যেমন সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে পুজি করে ভারত ,লীগ ,স্যাকুলারিজম বিরোধী প্রপাগাণ্ডা চালানো হতো , এরাও বেছে নেয় একই পন্থা। ৪৫ বছরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে রীতিমতো মরিয়া এই গোষ্ঠীটি।

আর তাই কদিন পরপর হয় নিত্যনতুন থিউরীর আমদানী। জাস্টিফাই করা হয় ব্লগার কিলিং , সংখ্যালঘু নির্যাতনের্। কথার মারপ্যাঁচে প্রমাণ করার প্রচেষ্টা হয় ভিকটিমরাই দায়ী তাদের দূর্ভাগ্যের জন্য। আর তাই নিয়ে আত্মতুষ্ঠির ঢেকুর তোলে তাদের প্যায়ারে বান্দারা।

এভাবেই চলছে নীলনকশা বাস্তবায়নের অনন্ত প্রচেষ্টা …………………………………………………

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “আমাদের বামাতিগণ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

80 − = 76