তুমি আমার পক্ষে কিনা বলো?: সরকার

শেখ হাসিনা প্রথম মেয়াদে (১৯৯৬) ক্ষমতায় থাকা-কালীন একটা ঘোষণা দিচ্ছিলেন। ঘোষণা না বলে আহ্বান বলাই ভাল। ডাকাত-ছিনতাইকারীদের ধরতে পারলে যেন গণধোলাই দেয়া হয়। দেখা গেল তখন জনগণ এভাবে গণধোলাই দিয়ে জিন্দা মানুষ মেরে ফেলতেছে। জমি জমা বা প্রেম-ঘটিত ইস্যুতেও এভাবে মানুষ মেরে ফেলা হচ্ছে। কয়দিন আগে পুলিশের থেকে বলা হল মানুষ যদি জঙ্গিদের ধরতে পারে তাহলে যেন বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলে। বিষয়টা মনে হচ্ছে এটা একজন মাত্র জঙ্গি বা সন্ত্রাসীর ব্যাপার। তাতো না। বরং এটা একটা ডিপ ইস্যু। কারা এই মতবাদ ছড়াচ্ছে, কারা এর পেছনে অর্থায়ন করছে, তা জানা দরকার এবং সমূলে এটাকে উৎপাটন করা দরকার। আর সেটা গণধোলাই বা ক্রশফায়ারে সম্ভব না।


প্রকাশক টুটুল ভাই বলেছেন, তার হত্যাচেষ্টার যে আসামীকে গ্রেফতার করা হল তাকে যেন খুনের আদর্শিক দৈন্যতা বুঝার সুযোগ দেয়া হয়। আসল কথা হচ্ছে, আমরা এমন এক সরকারের কাছে এতসব দাবি করতেছি যার নিজেরই কোনো নৈতিক অবস্থান নাই ক্ষমতায় থাকার। ধরেন, সংসারে বাবা-মা যদি নৈতিক না হন তবে তারা কি সন্তানকে নৈতিকতার কথা বলতে পারেন? না, সরকার তো আর বাবা-মা নন, বরং সে জনগণের গোলাম। জনগণ তাকে নির্বাচন করে। তবুও জনগণ তো ৫ বছর সরকারের দিকেই চেয়ে থাকে, সরকার তাদের দাবি পূরণ করবে বলে।

এখন পর্যন্ত জঙ্গি হামলার ঘটনায় জনগণ তিনজনকে হাতে নাতে ধরেছে। আপনাদের মনে থাকার কথা ওয়াশিকুর বাবু হত্যাকারীদের ধরার পর তারা কোনো এক হুজুরের কথা বলেছিল। আমরা কি এরপর আর কখনো তাদের কোনো কথা জানতে পেরেছি? তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের ফলাফল কী? সেখান থেকে কি কোনো উৎস বের করা যায় নি? ফাহিমকে ক্রসফায়ার করা হল। এমন একটি বিষয় মানুষ গণহারে আশংকা করতেছিল। তো, জনগণ যদি বুঝে যে খুনিদের সরকার বিচার করবে না, স্রেফ মেরে ফলবে, তখন জনগণ কি আর পুলিশের হাতে তাদের তুলে দিবে? জনগণকে হত্যা-খুনে সামিল করার মধ্য দিয়ে কি সরকার তার নিজের বর্তমান চরিত্রের ন্যায্যতা নিশ্চিত করবে? তারা তখন বলবে, যে খুনের বদলা খুনই একমাত্র সমাধান? খুনের বদলা খুন চলতে থাকলে রাষ্ট্র, আইন-আদালত এসবের দরকার কী? আর এসব ছাড়া সরকারের আর থাকে কী?
?cb=1391246820″ width=”400″ />

সরকার শুধু ক্ষমতায় থাকতে চায়। নৈতিকতা তাদের ইস্যু না। জনগণ তাদের মাথা ব্যাথা না। ন্যায়বিচার তাদের দায়িত্ব না। তাদের কাজ শুধু ক্ষমতায় থাকা। এটা ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ না হয়ে যদি অন্যকিছু হয় তবুও তারা সেটার ক্ষমতায় থাকতে চায়। শেখ হাসিনা প্রয়োজনে তার বাবার হত্যার মদদদাতা রাষ্ট্রগুলোর সাথে হাত মিলিয়ে হলেও তার ক্ষমতায় থাকা চাই। ক্ষমতার জন্য যদি প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ খুনোখুনি কায়েম করতে হয় তবে তাই হবে, যদি জঙ্গি মদদ দিতে হয় তবে তাই হবে, যদি জঙ্গি উৎপাদন করতে হয় তবে তাই হবে। এটা সহজ সমীকরণ। এখানে সমাধানের রাস্তা একটাই। এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার নৈতিকতাকে চ্যালেঞ্জ করা।

কিন্তু যারা রাজপথে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সরব তারা তো সরকারের ক্ষমতার নৈতিকতাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে না। সরকারের ক্ষমতায় থাকার নৈতিকতাকে চ্যালেঞ্জ করছে বিএনপি-জামাত। তারা আবার জঙ্গিবাদের সমর্থক, পৃষ্ঠপোষক, সোল এজেন্ট, ইত্যাদি। এসব নিয়ে সংশয় নেই। আর সেজন্যই কি জঙ্গিবাদের ভয় যাদের বেশি তারা সরকারের ক্ষমতায় থাকার নৈতিকতাকে চ্যালেঞ্জ করতে চায় না? যদি ক্ষমতায় বিএনপি-জামাত থাকতো তবে কি তারা খুব সহজেই তা করতে পারতো। কারণ বিএনপি-জামাত গেলে আওয়ামীলীগ সে শূন্যস্থান পূরণ করবে? তো, এখন কি দাঁড়ালো বিষয়টা? সরকার জঙ্গি জুজু দেখিয়েই তার ক্ষমতাকে আরও দীর্ঘস্থায়ী করবে কিন্তু জঙ্গিবিরোধীরা সরকারকে ঘাঁটাবে না।

জঙ্গিবিরোধী কারা? কারা জঙ্গি দমনে সরকারের কাছে বারবার ফরিয়াদ জানাতে যায়? লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ইদানীংকালে বিএনপি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। তারা সরকারকে এ বিষয়ে সাহায্যও করতে চায়। কিন্তু খেয়াল করুন, তারা জঙ্গি ইস্যুতে সরকারকে সাহায্য করার ইচ্ছা পোষণ করার মধ্য দিয়ে কি সরকারের ক্ষমতাকে বৈধতা দিচ্ছে না? বিএনপি বাজেটের উপর প্রতিক্রিয়া দেয়নি, কারণ সরকার অবৈধ বলে। তাহলে জঙ্গি দমনে তারা কতটুকু আন্তরিকতা দেখাতে চাইলে এ অবৈধ সরকারের পাশে দাড়াতেও ইতস্তত করবে না? বিএনপি যদি জঙ্গি দমনে সাহায্য করার বিনিময়ে গণতন্ত্র ফেরত চায় তবে কি সেটা খুব দোষের হবে?

কিন্তু সরকার প্রধান তো বলেই দিয়েছেন বিএনপি-জামাতই সব গুপ্তহত্যা করাচ্ছে। তাহলে আর কিভাবে বিএনপি সরকারের পাশে দাঁড়াবে? জঙ্গি দমনে তাহলে শুধু সরকারকেই ভূমিকা রাখতে হবে। সরকার ছাড়া আর কেউ নেই যে জঙ্গিদের দমন করবে। যেমনটা আমেরিকা ও তার মিত্ররা ছাড়া আর কেউ আল কায়দাকে দমন করতে পারবে না বলে প্রচার আছে। কারণ তারাই তো আল-কায়দার শত্রু। তেমনিভাবে আওয়ামীলীগও কি প্রমাণ করতে চাইছে যে জঙ্গিদের শত্রু কেবল আওয়ামীলীগ, আর বিএনপি-জামাতই জঙ্গিদের একমাত্র মিত্র?

আমেরিকা সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধের নামে একের পর এক দেশ দখল করছে। আর আওয়ামীলীগও জঙ্গিবাদবিরোধী যুদ্ধের নামে তার ক্ষমতাকে স্থায়ী করার চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বহর, অস্ত্রের ব্যবসা এসব নিয়ে তাদের জনগণ ততক্ষণ চুপ থাকবে যতক্ষণ যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠিত থাকবে, যতক্ষণ আল কায়েদা থাকবে, আইএস থাকবে। আওয়ামীলীগ কি যুক্তরাষ্ট্রের দেখানো পথেই ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে চাইছে না? সেক্ষেত্রে আওয়ামী শাসন আর জঙ্গিবাদের রেললাইন হাত ধরাধরি করে হোক কিংবা চোর-পুলিশ খেলে আর কতদূর রাস্তা পাড়ি দিবে? আওয়ামীলীগ এভাবে কতদূর পথ পাড়ি দিলে ক্লান্ত হয়ে পড়বে- যখন আমেরিকা আসবে তাকে ‘সাহায্য’ করার জন্য? নাকি তাকেই জঙ্গিবাদের মদদদাতা তকমা দিয়ে আমেরিকা তাকে সুদ্ধই জঙ্গি উৎখাতে আসবে? কিন্তু জঙ্গি থাকলেই তো আর আমেরিকা সেখানে যুদ্ধ জাহাজ পাঠাবে না। কারণ, যুদ্ধজাহাজ ছাড়াই যদি ঐ দেশের যাবতীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপের সুযোগ অবারিত থাকে তবে খামাখা অর্থব্যয় কেন? এবিষয়টাই শেখ হাসিনাকে স্বস্তি দিচ্ছে। কারণ, তিনি তো যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ইচ্ছাই অপূর্ণ রাখেননি। ভবিষ্যতেও রাখবেন না। এখানে অবশ্য অনেকে ভাবতে পারেন, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে উপেক্ষা করেছেন ইতোমধ্যে। ইউনুস ইস্যুতেও আমেরিকাকে খুশি করেননি শেখ হাসিনা।

আমেরিকা বাংলাদেশে জামাতের উপস্থিতিকে ইতিবাচক মনে করে। জামাত তাদের বন্ধুপ্রতিম সংগঠন। এটা বুঝার জন্য গোয়েন্দা হবার প্রয়োজন নেই। তো, জামাতের বিরুদ্ধে সরকার কঠিন হলে আমেরিকার সেটা ভালভাবে নেবে না জেনেও কেন শেখ হাসিনা আমেরিকার কাছে অপ্রিয় হতে গেলেন? কেনো তিনি কাদের মোল্লা, নিজামীদের ফাঁসি কার্যকরে অনমনীয় রইলেন? তিনি কি লৌহমানবীর পরিচয় দিলেন না!

এভাবে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি চলেতেই থাকবে। চায়ের কাপে ঝড়, কন্সপিরেসি থিউরি, টক-শো, উপসম্পাদকীয়, ব্লগিং, ফেসবুকিং……..। কিন্তু আশংকা হচ্ছে, ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করতে ক্ষমতার পরিধি ক্রমাগত বড় হচ্ছে। সরকারের ক্ষমতার পরিধি আপনার ব্যক্তিজীবনের একেবারে বেডরুম পর্যন্ত বিস্তৃত। সরকারকে নি:শর্ত সমর্থন না দিয়ে আপনি আপনার মত করে একটা কূপমণ্ডূকের জীবনও চালিয়ে যেতে পারবেন না। আপনাকে বলতে হবে, ঘোষণা দিতে হবে–আপনি সরকারের পক্ষে না বিপক্ষে। এতদিন আপনারা সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলতেন- সরকার, আপনি প্রমাণ করুন আপনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কিনা। আজ সরকার উল্টো আপনাকে জিজ্ঞেস করছে, চোখ রাঙিয়ে জানতে চাইছে- তুমি আমার পক্ষে কিনা বলো?

———————————————————
বি.দ্র. (এই ব্লগে ব্যবহৃত ছবিগুলোতে বর্ণিত উদ্ধৃতিসমূ্হের সত্যতার বিষয়ে লেখক কোনোপ্রকার নিশ্চয়তা প্রদান করছেন না। উদ্ধৃতিসমূহকে প্রাসঙ্গিক ভাবতে লেখক নিষেধ করছেন!!!)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

৩ thoughts on “তুমি আমার পক্ষে কিনা বলো?: সরকার

  1. এতদিন আপনারা সরকারকে

    এতদিন আপনারা সরকারকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলতেন- সরকার, আপনি প্রমাণ করুন আপনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কিনা। আজ সরকার উল্টো আপনাকে জিজ্ঞেস করছে, চোখ রাঙিয়ে জানতে চাইছে- তুমি আমার পক্ষে কিনা বলো?

    চরম সত্যটা উল্লেখ করেছেন। সরকার পুরো দেশের জনগণকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছে। জনগণকে এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা কি ফ্যাসিজমের পক্ষে নাকি বিপক্ষে থাকব?

  2. When u listen to the fools,
    When u listen to the fools, mob rulz…

    কাহিনী অনেকটা সেরকমই হচ্ছে। কে কার পক্ষে থাকবার কথা? সরকার জনগনের না সেটা অন্ধ সমর্থক আর স্বার্থান্বেষী ছাড়া সবাই বোঝে। সরকার সম্ভবত তাকে উতখাতের সবচেয়ে সহিংস পথটাই আবার কেবল খোলা রাখবার চেষ্টা করছে। যেটা রক্তের পথ। বঙ্ঘবন্ধুকে আমরা সেই পথেই অপসারিত হতে দেখেছি।

    জনতা দৃঢ় হোক আর সরকারের সুমতি ফিরুক।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 40 = 44