ব্লগারদের হত্যার পিছনে আসলে কারা দায়ী? সরকার নাকি আনসার আল ইসলাম?

ব্লগার হত্যাকান্ডের কিছু পর্যালোচনা

২০১৩ থেকে আজ পর্যন্ত ১০ জনের বেশি ব্লগারকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। কিছু ব্লগার অলৌকিকভাবে প্রানে বেঁচে গেছেন। অনেক ব্লগার দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। নিজের দেশ ছেড়ে বাইরে পড়ে থাকতে হচ্ছে শুধুমাত্র প্রান বাঁচানোর জন্য।

এই ব্লগারদের হত্যার পিছনে আনসার আল ইসলামকে দায়ী মনে করা হচ্ছে যারা সরাসরিভাবে জামায়াতে ইসলামী এবং আল কায়েদা (এশিয়া প্যাসিফিক) এর সাথে জড়িত। এবং বরাবরই আনসারুল্লাহ বাংলা টিম ( বর্তমানে আনসার আল ইসলাম ) এই সমস্ত হত্যাকান্ডের সরাসরি দায় স্বীকার করে আসছে।

ঘটনার বিস্তারিত বিবরনে যাওয়ার আগে একটু পিছনে ফিরে যাওয়া যাক।

২০১০ সালে আওয়ামী লীগ যারা নিজেদের সেক্যুলার দল হিসেবে দাবী করে তারা যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুন্যাল গঠন করে। ফেব্রুয়ারী ২০১৩ সালে ট্রাইবুন্যাল আব্দুল কাদের মোল্লা যে জামায়াতে ইসলামীর নেতা এবং ১৯৭১ সালে অসংখ্য বাঙালি হত্যার পিছনে সরাসরিভাবে দায়ী তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।কিন্তু এই রায়ের বিরুদ্ধে সেক্যুলার ব্লগার এবং লেখকরা অবস্থান নেয় এবং বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সাক্ষ্যপ্রমানের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদানের আবেদন জানায়। প্রাথমিকভাবে BOAN ( Blogger and Online Activist Network) এই দাবী তুললেও পরবর্তীতে সারা বাংলাদেশের মানুষ এই আন্দোলনে যোগদান করে যা পরবর্তীতে শাহবাগ আন্দোলনে রুপ নেয়। এই শাহবাগ আন্দোলনে পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীকে দলকে বিচারের আওতায় আনার দাবী জানায় এবং সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবী জানায়।

তখন জামায়াতে ইসলামী সহ অনেক ইসলামী দল মিলে একটি নতুন দল গঠন করে যার নাম দেওয়া হয় ”হেফাজতে ইসলাম”। শাহবাগ আন্দোলনকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করতে এই সংগঠন ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। লেখক ও ব্লগারদের বিরুদ্ধে ইসলাম ও নবী মোহাম্মদকে কটুক্তি করার অভিযোগে নাস্তিক ব্লগারদের ফাঁসির আবেদন জানিয়ে পাল্টা আন্দোলন শুরু করে এবং দেশে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। ১৫ ফেব্রুয়ারী সেক্যুলার ব্লগার এবং শাহবাগ আন্দোলনের অগ্রগামী আহমেদ রাজিব হায়দারকে তার বাসার সামনে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

ঠিক তখন থেকে আজ পর্যন্ত ১০ জনের বেশি ব্লগারকে খুন করা হয়েছে। এর আগেও ইসলামী জঙ্গী গ্রুপ বাংলাদেশের লেখকদের উপর আক্রমন চালিয়েছে। ১৯৯৯ সালে কবি শামসুর রাহমানের উপর হামলা করা হয়, এবং এই হামলার পিছনে জঙ্গী গ্রুপ হরকাতুল জিহাদকে দায়ী করা হয়। ২০০৩ সালে প্রফেসর হুমায়ুন আজাদকে একুশে বইমেলায় চাপাতি দিয়ে হামলা করা হয় এবং পরবর্তীতে ২০০৪ সালে জার্মানিতে তার মৃত্যু হয়।

ইসলামিস্ট জঙ্গিদের দ্বারা ব্লগারদের উপর হামলার কিছু চিত্রঃ

১) ]আসিফ মহিউদ্দিন
১৫ জানুয়ারী ২০১৩ সালে তার অফিসের সামনে তার উপর হামলা হয় কিন্তু ভাগ্যক্রমে প্রানে বেঁচে যান, বর্তমানে জার্মানিতে অবস্থান করছেন।
২) আহমেদ রাজিব হায়দারঃ
১৫ ফেব্রুয়ারী মিরপুরস্থ বাসার সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
৩) সানিউর রহমানঃ
৭ই মার্চ ২০১৩ সালে পুরবী সিনেমা হলের সামনে চাপাতি দিয়ে আক্রমন করা হয়, কিন্তু ভাগ্যক্রমে প্রানে বেঁচে যান।
৪) শফিউল ইসলামঃ
১৫ই নভেম্বর, ২০১৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
৫)অভিজিৎ রায়ঃ
২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সালে মুক্তমনার ব্লগের সঞ্চালক এবং লেখক অভিজিৎ রায় এবং তার স্ত্রী বন্যা আহমেদকে একুশে বইমেলার সামনে চাপাতি দিয়ে আক্রমন করা হয়। ভাগ্যক্রমে বন্যা আহমেদ বেঁচে যান কিন্তু অভিজিৎ রায়ের মৃত্যু হয়।
৬)ওয়াশিকুর রহমান বাবুঃ
৩০ মার্চ, ২০১৫ সালে ব্লগার হিসেবে তেমন পরিচিতি না থাকলেও ইসলামের বিরুদ্ধে লেখার কারনে একই ভাবে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
৭) অনন্ত বিজয় দাসঃ
১২ মে, ২০১৫ সালে নাস্তিক ব্লগার অনন্ত বিজয় দাসকে সিলেটে খুন করা হয়।২০১৫ সালে সুইডিশ পেন সোসাইটি বাংলাদেশে লেখকদের উপর হামলার বিষয়ে সেমিনারে অনন্ত বিজয় দাসকে আমন্ত্রন জানায় কিন্তু সুইডিশ সরকার তার ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। যদি অনন্ত বিজয় দাসকে সে সময় ভিসা দেওয়া হত হয়তবা তিনি জীবিত থাকতেন।
৮) নিলয় নীলঃ
৭ই আগস্ট ২০১৫ সালে নিলাদ্রি চট্টপাধ্যায় নিলয় ( যিনি বিভিন্ন ব্লগে নিলয় নীল নামে লিখতেন ) ঢাকার গোরান এলাকায় নিজের বাসায় খুন হন।
৯) ফয়সাল আরেফিন দীপনঃ
৩১ অক্টোবর ২০১৫ সালে অভিজিৎ রায়ের বই ছাপানোর কারনে দীপনসহ আরেফিন রশিদ টুটুল, রনদীপ বসু এবং তারেক রহিমের উপর প্রকাশনা অফিসে হামলা করা হয়। বাকিরা বেঁচে গেলেও দীপন মৃত্যুবরণ করেন।
১০) নাজিমুদ্দিন সামাদঃ
৬ই এপ্রিল, ২০১৬ সালে ইসলামের বিরুদ্ধে লেখার কারনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

এছাড়াও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী এবং সমকামিতার অভিযোগে ১২ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হল, এই হত্যাকান্ডের পিছনে আসলে কারা দায়ী। ব্লগারদের হত্যার পরে হাতে গোনা কয়েকজনকে পুলিশ প্রশাসন গ্রেফতার করে কিন্তু তাদের শাস্তির ব্যাপারে প্রশাসনকে নিরব ভুমিকা পালন করতে দেখা যায়। খুনিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে আসল অপরাধীদের শনাক্ত করতে আওয়ামী সরকারকে খুব একটা মাথা ঘামাতে দেখা যাচ্ছে না।

২০১৪ সালে হেফাজতে ইসলামের আমির মাওলানা শফিকে রেলওয়ের ৩২ কোটি টাকার জমি উপহার দেওয়া হয়। ঠিক তার পরপরেই হেফাজতে ইসলাম সব ধরনের আন্দোলন প্রত্যাহার করে এবং সরকারের গুনগান শুরু করে। প্রথমে ব্লগারদের হত্যার বিষয়ে সরকারের হত্যার বিচারের আশ্বাস পাওয়া গেলেও এতদিনে একটা বিচারও আলোর মুখ দেখেনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও পুলিশ প্রধান একেএম শহিদুল হক অপরাধীদের গ্রেফতারের আশ্বাসের পাশাপাশি ব্লগে ধর্ম অবমাননা করলে তাকেও শাস্তির আওতায় আনার কথা বলেছেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে ব্লগে লেখাকেও সরকার অপরাধ হিসেবে দেখছেন।

২০১৩ তথ্যপ্রযুক্তি আইন সংশোধন করে ৫৭ ধারার মাধ্যমে ব্লগার এবং লেখকদের লেখার স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়। কেউ ধর্মের বিরুদ্ধে লিখলে ৫৭ ধারার ২ নম্বর উপধারা অনুযায়ী, ‘কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১)-এর অধীন অপরাধ করিলে তিনি অনধিক চৌদ্দ বছর এবং ন্যূনতম সাত বৎসর কারাদণ্ডে এবং অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘‘ মুক্তচিন্তার নামে কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া বিকৃত রুচি ও নোংরা রুচির পরিচয়৷ ” পাশাপাশি তিনি এ ধরনের লেখালেখির কারণে হামলার শিকার হলে তার দায় সরকার নেবে না বলেও জানিয়েছেন৷

শেখ হাসিনা এও বলেন এখন নাস্তিকতা একটা ফ্যাশন দাঁড়িয়ে গেছে যে ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু লিখলেই তারা হয়ে গেলো মুক্তচিন্তা।
“আমি তো এখানে মুক্তচিন্তা দেখিনা,আমি এখানে দেখি নোংরামি”।
তিনি বলেন, “যাকে আমি নবী মানি তার সম্পর্কে নোংরা কেউ যদি লেখে সেটা কখনো আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য না”।
প্রধানমন্ত্রী বলেন নোংরা কথা, পর্ণ কথা এগুলো কেন লিখবে ? এটা তো সম্পূর্ণ নোংরা মনের পরিচয়।

এই বক্তব্যের মাধ্যমে সরকার নাস্তিক হত্যার লাইসেন্স দিয়ে দিয়েছেন। এখন থেকে কোন নাস্তিক লেখক অথবা ব্লগার খুন হলে তার বিচার তো দূরে থাক, উল্টো তাকেই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

গত বুধবার মাদারীপুরে সরকারি নাজিম উদ্দিন কলেজের গণিতের প্রভাষক রিপন চক্রবর্তীর উপর হামলার পর ঘটনাস্থল থেকে ফাহিম নামক এক যুবককে ধরে পুলিশে দেয় জনতা। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, সে হিযবুত তাহরীরের একজন কর্মী। সারা দেশে হিযুবত তাহরীর ‘’ নিজেদের অস্তিত্ব ও কার্যক্রম জানান দিতে সফট টার্গেট ” মিশনে নেমেছে বলে ফাহিম জিজ্ঞাসাবাদে জানান।

শনিবার সকালে পুলিশের তথাকথিত ‘’ বন্দুকযুদ্ধে ‘’ ফাহিম নিহত হয় বলে দাবি করেছে পুলিশ।

এই তথাকথিত” বন্দুকযুদ্ধ ” আসলে একটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড। কোন গোপন তথ্য যাতে বাইরে আসতে না পারে তাই এভাবেই ব্রেইনওয়াশড হামলাকারীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হচ্ছে। এই ফাহিমকে ঠিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে হয়ত কোন সরকার সংশ্লিষ্ট কোন ব্যাক্তির পরিচয় বের হয়ে আসতে পারে সেই কারনেই কি ফাহিমকে হত্যা করা হল?

সরকার ব্লগারদের হত্যার বিষয়ে যথেষ্ট মনোযোগী নন, কিন্তু উল্টো ব্লগারদের দোষারোপ করায়, এবং সাক্ষীদের খুন করে প্রমান ধামাচাপা দেওয়ায় সন্দেহের তীর কিন্তু সরকারের দিকেই যাচ্ছে।

নাস্তিকদের খুনের লাইসেন্স দিয়ে, ব্রেইন ওয়াশড ছাত্রদের দিয়ে নাস্তিকদের খুন করিয়ে ৯০ শতাংশ মুসলিমদের কাছে জনপ্রিয় থেকে নিজেদের গদি রক্ষা করার এ কোন বিশাল ষড়যন্ত্র নয় তো?

বিচারের ভার পাঠকদের উপর ছেড়ে দিলাম।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 6 =