পরিত্যাক্ত সন্ধ্যা

আমার নাম ইতু।
নামটা আমার অনেক পছন্দ। কিন্তু নামটা আমার বাবা রাখেনি। এমনকি আমার মাও রাখেনি। নামটা রেখেছি আমি। বাবা আমার নাম রেখেছিলেন পরী। আমি ছোটবেলায় দেখতে অনেক সুন্দর ছিলাম, অবশ্য এখনও আছি। তাই আমার বাবা আমার নাম রেখেছিলেন পরী। ছোটবেলায় আমাকে কেউ পরী বলে ডাকলে আমার খুব ভালো লাগত। আমি অবশ্য পরী বলতে পারতাম না। আমি বলতাম পলী। সবাই অবশ্য বলত আমি পরীর চেয়েও সুন্দর। আমি অবশ্য আমার ছোটবেলার গল্পই শুনেছি শুধু নিজের ছোটবেলার ছবি আমার দেখা হয়নি। আমার ছোটবেলার কোন ছবি ছিলনা।

মা গভীর রাতে শাপলা তুলে আনত তাই দিয়ে আমাদের দিনের খাবার টা হত। সেই শাপলার ঝোল আর ছোট মাছ খেয়ে আমি খুব দ্রুত বড় হয়ে উঠি। একটু বেশীই দ্রুত। আমার জামাগুলো ছোট হয়ে যেতে থাকে। মা আড়চোখে আমাকে দেখতে থাকে। কানামাছি খেলার সময় সবাই আমাকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করতে থাকে। আমার সবকিছু মনে পড়ে। এই স্মৃতি শক্তি হয়ত সেই শাপলা আর ছোট মাছের ঝোলের গুণ।

তবে আমাদের বাড়িতে মাঝে মাঝে মাছ আসতো। ছোট মাছ না বড় মাছ। সেদিন বাড়িতে খুব রান্না হত। কয়েকদিন মা আর শাপলা তুলতে যেতোনা। তখন বাসায় ঈদের আমেজ পাওয়া যেত। তখন সত্যিকার অর্থেই ঈদ হত। সেই ক্ষুধার্ত পরিবারে আমার বাবা স্বর্গের দেবতার মত দুই হাতে বিশাল মাছ আর জামাকাপড় নিয়ে বাসায় আসতো। আমার মা অবশ্য কখনই খুশি হতোনা। বাবা আসলেই সে তার বিশাল অভিযোগ তালিকা নিয়ে হৈ-চৈ শুরু করত। আর বাবা কোন দিকে কান না দিয়ে সোজা আমাকে কোলে নিত। খুব সম্ভবত এই বিশাল পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষ।

কিন্তু আমার বাবাকে আমার খুব একটা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। আমরা থাকতাম গ্রামে, বাবা পুলিশের চাকরি করত। ছোট চাকরি, কনস্টেবল টাইপের কিছু। কিন্তু বাবাকে আমি কখনও পুলিশের পোশাকে দেখিনি। বাবা যখন লঞ্চ থেকে নামতো তখন তার পড়নে থাকতো লুঙ্গি আর শার্ট।

বাবা বাড়িতে আসতোনা খুব একটা। শুধু দুই ঈদে বাবার দেখা মিলতো। আমি ঘুম থেকে উঠে দেখতাম বাবা উঠানে হাঁটাহাঁটি করছে। একবার বাবা আমার জন্যে নতুন জুতো নিয়ে এলেন। সেই জুতো পায়ে দিয়ে হাটলে আলো জ্বলে। কিন্তু জুতো আমার পায়ের চেয়ে অনেক বড়। সারারাত ধরে আমি কাঁদলাম। বাবাও আমাকে বুকে জড়িয়ে কাঁদলেন সারারাত। পরদিন সকালে উঠে দেখলাম বাবা আবার ঢাকা চলে গেছেন। ঈদের একদিন পর বাবা আবার এলেন আমার জন্যে নতুন জুতো নিয়ে। আমি জুতো পরে বাবার হাত ধরে সারা গ্রাম হেটে বেড়ালাম।

বড় হবার পরে বাবাকে শুধু দুইবার লঞ্চঘাট থেকে নিয়ে আসতে গিয়েছিলাম। একবার ঈদের আগেরদিন ভোরবেলা লঞ্চঘাটে বসে আছি, বাবা আসবে। আমি আর মা। কাল ঈদ, আমি বসে আছি বাবা নতুন জামা নিয়ে আসবে, জুতা নিয়ে আসবে। কিন্তু বাবা লঞ্চ থেকে নামেনা। একে একে সব লঞ্চ খালি হয়ে যায় বাবা নামেন না। আমি আর মা সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থাকলাম। কেউ আসলোনা। আমি লঞ্চ ঘাতে বসে চিৎকার করে কাঁদতে থাকলাম। মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠেন একটু পরপর। কিন্তু কেউ আমার বাবা আর লঞ্চ থেকে নামেন না। দেখতে দেখতে আকাশে ঈদের চাদটাও ডুবে যায়।কেউ আসেনা। আমার বড় ভাই আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসলো।

বাবা সেদিন আর আসেননি। আর কোনোদিন আসেননি। আমার কোনোদিন বাবার কোলে চড়া হয়নি। আর কোনোদিন আমাকে কেউ প্রচন্ড ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরে রাখেনি। এক ভয়াবহ শুণ্যতায় আমার পৃথিবী ঢেকে গেল এক পরিত্যাক্ত সন্ধায়।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

83 − = 76