‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী

হাসিবুল হাসান : ১৯৭০ সালে ছাত্রলীগের বৈঠকে ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ গঠনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী। তবে তার বিরোধিতার মধ্যেই বৈঠকে পাস হয়েছিল প্রস্তাবটি। ওই সময়ের একাধিক ছাত্রলীগ নেতার সঙ্গে কথা বলে এবং ওই পেক্ষাপট নিয়ে লেখা বই থেকে এমন তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে ওই সময়ের ডাকসুর ভিপি ও ছাত্রলীগ নেতা আ স ম আব্দুর রব এ প্রতিবেদককে বলেন, স্বপন কুমার চৌধুরী ‘স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। এর বিরোধিতা করেছিল স্বাধিকারে সীমাবদ্ধ থাকার একটি গ্রুপ। যে গ্রুপটি সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার প্রশ্নটি বাড়াবাড়ি মনে করত। কিন্তু সিরাজুল আলম খান-এর নিউক্লিয়াসের প্রভাবে স্বাধীনতাকামী ছাত্ররাই প্রস্তাবটির পক্ষে বেশি থাকায় সে প্রস্তাব গৃহীত হয়।

একই প্রসঙ্গে মহিউদ্দিন আহমদ ‘জাসদের উত্থান-পতন ও অস্থির সময়ের রাজনীতি’ বইয়ে লিখেছেন, ছাত্রলীগের মধ্যে যে মেরুকরণ ঘটেছিল, তার একটা বিস্ফোরণ হয় ৭০ সালের আগস্ট মাসে। ঢাকায় ৪২নং বলাকা বিল্ডিংয়ে ছাত্রলীগের অফিসে তখন কেন্দ্রীয় কমিটির বর্ধিত সভা চলছিল। কেন্দ্রীয় কমিটিতে সিরাজপন্থিদের মুখপাত্র ছিলেন স্বপন কুমার চৌধুরী। ২১ আগস্ট রাতে সভা চলার সময় তিনি ‘স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেন। এ নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আলোচনা-বিত-া হয়। স্বপন ভোটাভুটির দাবি জানান। কেন্দ্রীয় কমিটির ৪৫ সদস্যের মধ্যে ৩৬ জন ছিলেন প্রস্তাবের পক্ষে। সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকী এই প্রস্তাবের ঘোরতর বিরোধিতা করেন। অবস্থা বেগতিক দেখে তিনি সভা মুলতবি করে দেন। তখন সবাই মিলে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবের বাসায় যান। শেখ মুজিব সব শুনে বিব্রতবোধ করেন। তিনি তখন নির্বাচন নিয়েই ভাবছিলেন। ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক বদিউল আলম তখন বলেন ‘আমরা মেজরিটি ভোটে প্রস্তাব পাস করেছি।’ উত্তেজিত তরুণ তুর্কিদের শান্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়ে শেখ মুজিব তখন বললেন, ‘স্বাধীনতা চাস, ভালো। কিন্তু রেজুলেশন নিয়ে স্বাধীনতা হয় না। গ্রামে যা, কাজ কর।’

‘বাঙালির জাতীয় রাষ্ট্র’ বইয়ে কাজী আরেফ আহমেদ লিখেছেন, ‘১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ‘স্বাধীন সমজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ’ গঠন করার প্রস্তাব পেশ করেন তৎকালীন প্রচার সম্পাদক স্বপন চৌধুরী (৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে নিখোঁজ/শহিদ হন)। কেন্দ্রীয় কমিটিতে তখন সদস্য সংখ্যা ছিল ৪৫ জন। অনেক বাক-বিত-ার পর এই প্রস্তাব পাস হয়। প্রস্তাবের বিপক্ষে ছিলেন ৮ জন (শেখ সেলিম, শেখ শহিদ, সৈয়দ রেজাউর রহমান, শফিউল আলম প্রধান, এমএ রশিদ, আবদুল কুদ্দুস মাখন, মনিরুল হক চৌধুরী, ওবায়দুল মোকতাদির) প্রভাবশালী সদস্য ভোট দেয়। প্রস্তাব গ্রহণের সময় নূরে আলম সিদ্দিকীসহ বিপক্ষের ৮ জন অনুপস্থিত ছিলেন দাবি করে তিনি তার বইয়ে লিখেছেন, কিন্তু পরবর্তীতে সেই প্রস্তাব শেখ মুজিব ও আবদুর রাজ্জাকের অনুরোধে সংশোধন করতে হয়। শেষ পর্যন্ত ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ গঠন করার প্রস্তাব নেওয়া হয়।’

এ প্রসঙ্গে ছাত্রলীগের ওই বৈঠকে উপস্থিত ছাত্রলীগ নেতা শফিউল আলম প্রধান এ প্রতিবেদককে বলেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই এই বিষয়টা আলোচিত হয়েছিল। নূরে আলম ভাই সভাপতিত্ব করেছিলেন। সেখানে যে বিষয়টা এসেছিল তা হলো- যেহেতু এটা একটা মৌলিক সিদ্ধান্ত ছিল তাই সভাপতি (নূরে আলম সিদ্দিকী) বললেন যে, আমাদের সুপ্রিম লিডারের সম্মতি নেওয়া প্রয়োজন। এটা নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে উত্তেজনার একপর্যায়ে সভাপতি সভার কাজ মুলতবি করে। বৈঠকে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রস্তাব পাস হয়েছিল কি-না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমার যতদূর মনে পড়ে এর মধ্য দিয়ে প্রস্তাব পাসবিহীন অবস্থায় মিটিং-এর কার্যক্রম থেমে যায়।
সম্প্রতি এটিএন নিউজের এক টকশোতে মোস্তাফা জব্বার বলেছেন, ‘১৯৭০ সালে ছাত্রলীগের যে বৈঠকে স্বাধীনতা প্রস্তাব গৃহীত হয় সেই বৈঠকে এর বিরোধিতা করেছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী। তখন তাকে বের করে দিয়ে এই প্রস্তাব পাস করা হয়।’
এদিকে প্রস্তাবের বিরোধিতার কথা স্বীকার করলেও তা পাসের বিষয়টা অস্বীকার করেন নূরে আলম সিদ্দিকী। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ১৯৭০ সালে যারা নির্বাচনের আগেই অস্ত্র ধরতে চেয়েছিলেন, আমি সেই সময় তাদের বিরোধিতা করেছিলাম।

(‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী)

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

8 + 2 =