আমার বাবা

আজকাল শুনি সবার বাবা তাদের খুব ভালো বন্ধু ছিলেন কিংবা এখনও আছেন। আমার কিংবা আমার চারপাশের সমস্ত বাবারা অবশ্য তাদের সন্তানের বন্ধু ছিলেন না। আমার বাবার কথা আমার মনে পড়ে। বাবা আমার কাছে ছিল মুর্তিমান আতংক। আমাদের পরিবারে মা আমাদের একমাত্র আপনজন। বাবার আবির্ভাব ঘটত সন্ধ্যার পর। তারপর থেকে পুরো বাসায় থমথমে একটা অবস্থা। বাবার ছায়া দরজা দিয়ে ঢোকার আগেই আম দৌড়ে গিয়ে বই নিয়ে বসতাম। উঁচু গলায় বই পড়তাম। মনে সবসময় ভয় বাবা পড়ার আওয়াজ শুনতে না পেলে যদি আমাকে মারেন।কোনোদিন কোনোকিছু বাবার কাছে চাওয়ার সাহসও হয়নি আমার।

আমার মা ছিল আমার সব আবদারের একমাত্র জায়গা। আর তিনিই ছিলেন বাবার কাছে আমাদের বার্তাবাহক। আমি মাকে বলতাম খাতা লাগবে, পেন্সিল লাগবে। মা গিয়ে বাবার কাছে বলতেন। কখনও বাবার উঁচু গলা শোনা যেত, সেদিনই না পেন্সিল কিনে দিলাম সেটা কি করেছে? আমি ওইটুকু শুনেই চুপ। এক সপ্তাহ আর পেন্সিল চাইতাম না। পুরনো পেন্সিল এর শেষ অংশ দিয়ে লিখার চেষ্টা করতাম।

একবার বাবা আমাকে মাঠে খেলতে দেখে ফেলেন আমিও দেখে ফেলি বাবাকে। সেইদিন ভয়ে আমি আর বাসায় আসিনা। এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াই। সন্ধ্যা হয়ে যায়। বাসার সবাই আমাকে খুঁজতে বের হয়। শহুরে মফস্বলে কাউকে খুঁজে পাওয়া অত সহজ না। আমাকে কেউ খুঁজে পায়না। আমি দূর থেকে সবাইকে দেখি। হঠাত দেখি পেছন থেকে কেউ একজন আমার হাত চেপে ধরেছে। পিছনে ফিরে দেখি আমার বাবা। সেইদন প্রথম আমার বাবা আমার গায়ে হাত তুললেন। আর আমার জায়গা হল ডাক্তারের চেম্বারে। সাত দিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে জ্বরে পুড়েছিলাম। বাবা আমাকে একদিনও তাকিয়ে দেখেননি।

বাবা আমার কখনই বন্ধু ছিলেন না। খুব সম্ভবত তিনি আমার অপছন্দের মানুষ ছিলেন। আমার সবসময় মনে হত আমি কখনই তার মত হবোনা। প্রচণ্ড ভয় আমার আর বাবার মাঝে এক বিশাল দেয়াল তুলে দিয়েছিল। তাই বাবার ঘরেও আমার যাওয়া হতোনা। শুধু বাবার অবর্তমানে তার বইয়ের স্তূপ থেকে বই চুরি করে এনে পড়া শেষ করে আবার চুপিচুপি রেখে দিতাম। খুব সচেতনে বইয়ের পাতা উল্টাতাম যাতে বাবা বুঝতেও না পারেন।

ভয়ের বিশাল দেয়াল ধীরে ধীরে পাহাড়ের চেয়েও বিশাল হয়ে গেলো। পাশাপাশি ঘরে থেকেও আমাদের ঠিক কথা হয়নাই বহুকাল ধরে। তবু যেন কোন ফাঁকে আমি ঠিক আমার বাবার মতন হয়ে গেছি। আমাকে এখন আমার বাবার ছায়া বলেই মনে হয়। তাই বাবাকে ভালো না বাসলেও আমি বাবাকেই ভালোবাসি।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “আমার বাবা

  1. বাবাকে নিয়ে আপনার কথাগুলো
    বাবাকে নিয়ে আপনার কথাগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক বেশি বাস্তব মনে হয়েছে। আমাদের বাবারা এরকমটাই ছিল। তবে ভালবাসার কোন কমতি ছিল না। কিন্তু বাবাত্ব দেখাতে গিয়ে বাবারা কঠিন রূপ ধারন করত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

22 − 12 =